এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তরীকুর রহমান

স্বাধীনতা সোনার কাঠি/ খোদার সুধা দান/ স্পর্শে তার নেচে ওঠে শূন্য দেহ প্রাণ। স্বাধীনতা প্রভুর এক অনুপম নিয়ামত। যার শোকর আদায় করে শেষ করা যায় না। অপরিমেয় রক্ত আর অসংখ্য মা বোনের সম্মানের বিনিময় যা আমরা অর্জন করেছি ১৯৭১ সালে।

মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামী সংহতির বুলিকে আশ্রয় করে ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে সৃষ্টি হয় পাকিস্তানের। কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অন্তগূঢ় অভিপ্রায় যে হঠকারিতা আর দ্বিমুখিতা দেখিয়েছিল তা স্পষ্ট হতে থাকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরই।

মুখে সাম্য ভ্রাতৃত্ব আর সমানাধিকারের কথা বললেও অন্তরে পোষা বিশাল কুটিলতা প্রকাশ পেতে থাকে সময়ের হাত ধরে। যার প্রথম নগ্ন প্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে রাস্তায় নামা রফিক, জাব্বার, সালাম, বরকতের বুকে অন্যায়ভাবে গুলি চালানোর মাধ্যমে। সামাজিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্র একের পর এক বিমাতাসুলভ আচরণ করে যাচ্ছিল পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় জনসমষ্টির ওপর।

স্বজাতি স্বভাষা ও স্বাধীনতার ব্যাপারে ইসলামে যে মূল্যবোধ রয়েছে তার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের অবজ্ঞা, অনিহা ছিল মাত্রাতিরিক্ত। যার ফলে তাদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে বাধ্য হয় এ ভূখণ্ডের মানুষগুলো। সে জন্য ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ। জালিমের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ন্যায়ভাবে মজলুম জনগণ রুখে দাঁড়ান।

ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অবিশ্বাসীদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর যেসব জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তার একটিও আক্রমণাত্মক ছিল না, বরং সবই ছিল আত্মরক্ষামূলক অর্থাৎ শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য।

প্রথমে আক্রমণ না করার এই যে ইসলামী আদর্শ তা একাত্তরে পাকবাহিনী চরমভাবে অবজ্ঞা করেছে। ইসলামের আত্মরক্ষামূলক নীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী প্রথম ব্যাপক আক্রমণ চালায় এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর।

ইন্নামাল মু’মিনুনা ইখওয়াহ’ তথা সব মুসলমান ভাই ভাই এই পবিত্র বাণীকে কলুষিত করে সংঘটিত করে নৃংশস গণহত্যা। সংযোজন করেছে বিশ্বের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। যার মাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে দিনের পর দিন।

অথচ প্রভু কোরআনে ইরশাদ করেছেন- নরহত্যা বা দুনিয়ার ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে তারা যেন দুনিয়ার সব মানুষকে হত্যা করল। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল (সূরা মায়িদা-৩২)।

আক্রান্ত হওয়ার পর অদম্য বাঙালি জাতি গণহত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় কোরআন নির্দেশিত পথে। তাই তো মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনায় ইসলামী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে চমৎকারভাবে।

১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত জনগণের প্রতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিদের্শনাবলীর শীর্ষে লেখা ছিল আল্লাহু আকবর। আরও লেখা ছিল- বাঙালির অপরাধ এই যে বাঙালি আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি এই পৃথিবীতে আল্লাহর নির্দেশ মতো সম্মানের সঙ্গে সুখে শান্তিতে বাস করতে চেয়েছে।

বাঙালির অপরাধ এই যে, বাঙালি মহান স্রষ্টার নির্দেশ মতো অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে এক সুন্দর ও সুখী সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলবার সংকল্প ঘোষণা করেছে। মানবতার বিরুদ্ধে হানাদারবাহিনী দানবীয় শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

তাদের সহায় আধুনিক মারণাস্ত্র। আর আমাদের সহায় পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্য। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং- ১৬, সম্পাদক, হাসান হাফিজুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ ই আর্কাইভ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারে তথ্য মন্ত্রণালয়) এবং তার শেষে লেখা ছিল ‘এ সংগ্রাম আমাদের বাঁচার সংগ্রাম। সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে ন্যায়ের

সংগ্রামে অবিচল থাকুন। স্মরণ করুন : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ‘অতীতের চাইতে ভবিষ্যৎ নিশ্চয় সুখকর। বিশ্বাস রাখুন : আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং- ১৮।

এমনকি স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণে একপর্যায় বলেছেন- রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। তার এই উচ্চারিত বাক্যে মুক্তিযুদ্ধে ইসলামী চেতনার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ইরশাদ হচ্ছে- কখনই তুমি কোনো বিষয়ে বলিওনা আমি তা আগামীকাল করিব তবে আল্লাহ ইচ্ছা করিলে (সূরা কাহাফ-২৩-২৪)।

১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশ, স্বাধীনতা যুদ্ধে গুটিকতক ভ্রান্ত ইসলামপন্থী জালেমের পক্ষাবলম্বন করলেও অধিকাংশ ইসলামপন্থী-ই মজলুমের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।

প্রখ্যাত কথাসাহ্যিতিক আনিসুল হক তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিখ্যাত উপন্যাস ‘মা’ তে উল্লেখ করেন মুক্তিযুদ্ধা আজাদের মা জুরাইনের পীর সাহেবের পরামর্শক্রমে ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠান। ‘পীর সাহেব বললেন- ছেলেকে যেতে দাও, পাকিস্তানিরা বড় অন্যায় করতেছে। জুলুম করতেছে। (পৃষ্ঠা-১১০। মা, আনিসুল হক। প্রকাশক, ফরিদ আহমদ সময় প্রকাশন)।

আলেম মুক্তিযুদ্ধার খোঁজে গ্রন্থে- আলেম মুক্তিযোদ্ধা মা. ইমদাদুল হক আড়াইহাজারির প্রতি মাওলানা মুহাম্মাদ উল্লা হাফেজ্জী হুজুরের (র.) উপদেশ এভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করছে সুতরাং তারা জালেম। জুলুম আর ইসলাম কখনও এক হতে পারে না।

তুমি যদি খাঁটি মুসলমান হও, ইসলাম মান তবে পাকিস্তানিদের পক্ষে যাও কীভাবে? এটা ইসলামের সঙ্গে কুফরের যুদ্ধ নয় বরং এটা হল জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ প্রতিরোধ। বাঙালি মাজলুম। সুতরাং বাঙালির পক্ষে কাজ কর। (আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে, লেখক শাকের হোসেন শিবলি, আল্-ইসহাক প্রকাশনী)।

২নং সেক্টরে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধা মেজর কামরুল ইসলাম ভূঁইয়া তার জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা নামক গ্রন্থে কাশীমপুরের পীর সাহেবের কথা উল্লেখ করে লেখেন- ‘পীর সাহেব এবার আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, বাবা তৈরি হয়ে যাও, যুদ্ধ করতে হবে, দেশ স্বাধীন করতে হবে’ (পৃষ্ঠা-২৬ ‘জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা’ লেখক মেজর কামরুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রকাশক ঈবহঃবৎ ভড়ৎ ইধহমষধফবংয খরনবৎধঃরড়হ ধিৎ ংঃঁফরবং.)

আলেম মুক্তিযুদ্ধা ‘মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী আল্ আজহারী বলেন, দেশটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি, তাই আমি একজন মুক্তিযুদ্ধা। .......... আমার ধর্মীয় মূল্যবোধই আমাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে জিহাদে (মুক্তিযুদ্ধে) ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে এ জিহাদের (মুক্তিযুদ্ধের) সময়ও আমি নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে বিজয় কামনা করেছি।

যুদ্ধের সময় বাঙ্কারে শুয়ে শুয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আমারই অনুজের মুখে স্বাধীন বাংলা বেতারের কোরআনের তেলাওয়াত শুনেছি। (আলেম মুক্তিযুদ্ধার খোঁজে- পৃ.-১৮৩, লেখক শাকের হোসেন শিবলি, আল্-ইসহাক প্রকাশনী।)

দঃখজনক হলেও সত্য আজকাল অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায়। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ইসলামী চেতনাকে পৃথক করতে চায়, তাদের এই ধারণা ঠিক নয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রভাষক, রায়হান কলেজ ঢাকা