একজন আল মাহমুদ : গাছের সঙ্গে সংলাপ
jugantor
একজন আল মাহমুদ : গাছের সঙ্গে সংলাপ

  আল ফাতাহ মামুন  

১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আল মাহমুদ একজন শ্রেষ্ঠতম কবি হয়েছেন বটে কিন্তু ধর্ম বিসর্জন দেননি কখনও। শৈশব থেকেই তিনি ইসলামী ভাবধারায় বেড়ে উঠেছেন। যৌবনে তিনি জীবন থেকে লোক দেখানো ধার্মিকতার পোশাক খুলে ফেলেছেন। আর বার্ধক্যে পরছেন আল্লাহওয়ালা সুফির পোশাক।

এই যে ‘সুফির পোশাক’ কথাটি বললাম, আসলে সুফির পোশাক বলে কিছু হয় না। জীবন থেকে অহংকার আর লোক দেখানো ধার্মিকতার পোশাক খুলে ফেললেই সুফির পোশাক পরা হয়ে যায়। কথাটা যত সহজে লিখে ফেললাম বাস্তবতা আরও নির্মম।

গভীর সাধনা করে জানতে হয় কোনটি লোক দেখানো ধার্মিকতার পোশাক। এ পোশাক পরে থাকার বিপুল সুবিধার লোভ ত্যাগ করে তবেই সুফির পোশাক পরতে হয়। কবি তা পেরেছেন-

‘মসজিদ আর মাদ্রাসার প্রতি আমি বেজার।

আমি দেহ থেকে খুলে ফেলেছি খোদাভীতি ও লোক দেখানো

ধার্মিকতার পোশাক।

এবং পরে নিয়েছি নিরাসক্ত পীরের মোটা আলখাল্লা, শালীন।’

আল মাহমুদের সাহিত্যে আধ্যাত্মিকতার যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় তা তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা নিংড়ানো কাহিনীর নির্যাস। ছেলেবেলায় আল মাহমুদ বিচিত্র সুফিদের আদলে বেড়ে উঠেছিলেন।

আত্মজীবনীতে তিনি লিখেন, একজন ফকিরের সঙ্গে আমার আব্বার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। আব্বা ছিলেন ফখরে বাঙাল মাওলানা তাজুল ইসলামের স্নেহধন্য। তা ছাড়া বাবার শরীরে পীর-পরিব্রাজকদের রক্ত বইছে- এ নিয়ে বাবার গর্বের সীমা ছিল না। পাক্কা শরিয়ত মানা মানুষ বাবা। বে-শরিয়তি কাজকাম দেখলে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হতেন। এমন মানুষের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন একজন ফকির ধরনের মানুষ। ওই ফকিরের শুধু সতরটুকু একটি খাটো ইজার দিয়ে ঢাকা থাকত।

কী গরম, কী শীত- সবসময়ই এ পোশাক পরতেন। নামাজের কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। যখন খুশি যেখানে খুশি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। রাত জেগে দীর্ঘ রুকু-সেজদা করতেন। চোখ টকটকে লাল দেখাত। বোঝা যেত বহু বছর তিনি ঘুমাননি। আসলে তিনি ছিলেন নিশাচর ধরনের দরবেশ। বাবা তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন।

চিশতিয়া তরিকার মস্তানদের মতো ফকির সাহেব গরিব নেওয়াজের নামে হাঁক দিতে দিতে বাড়িতে ঢুকতেন। আব্বাকে ডাকতেন ‘দোস্ত’ বলে। বাড়িতে ঢুকেই বলতেন, ‘দোস্ত! এসে পড়েছি।’ আব্বা মুচকি হাসতেন। মাকে বলতেন, ‘বড় রাতা মোরগটি জবাই দাও। আমার দোস্ত এসেছেন।’

ফকিরের নাম ছিল নূর আলী। আল মাহমুদের জীবনী যারাই পড়েছেন নূর আলী ফকিরের আশ্চর্য বর্ণনা পাঠকের হৃদয়ে দাগ না কেটে পারে না। ফকিরের অভ্যাস ছিল প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলা। বাতাস, পানি ও গাছ এদের সঙ্গে কথা বলতেন। একদিনের ঘটনা। আল মাহমুদ তখন বয়সে দুরন্ত বালক। থাকতেন মসজিদের হুজরায়।

হুজরার পেছনে একটি প্রকাণ্ড কুলগাছ ছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বাইরে এসে দেখেন অবাক দৃশ্য। নূর আলী ফকির কুলগাছের সঙ্গে কথা বলছেন। গাছের সঙ্গে ফকিরের কথাবার্তা এমনই আবেগ ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে পূর্ণ ছিল, যা ছোট্ট আল মাহমুদের হৃদয়ের গভীরে গেঁথে যায়। জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও গাছের সঙ্গে দরবেশের সংলাপ হুবহু মনে রেখেছেন।

আল মাহমুদ বলেন, সেদিন রাতে জ্যোৎস্নার ঢল নামে। আমি স্পষ্ট দেখলাম, লাঠি হাতে নূর আলী ফকির দাঁড়িয়ে আছেন। কুলগাছকে বলছেন, ‘আপনি ক্যামনে সারা দিন কথাবার্তা না বলে দাঁড়িয়ে থাকেন? আপনার কষ্ট হয় না! আপনি শুধু বাতাস খেয়ে ক্যামনে বাঁচেন? আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে।’

এরপর ফকির যা বললেন তা শুনে প্রবন্ধ লেখকেরও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। ‘আচ্ছা আপনার কাছে মাবুদ হিসাব চাইবে না! আমি ও হিসাব-টিসাব দিতে পারব না। আমি কী হিসাব দেব? মাটি বুঝি আল্লাহর কাছে হিসাব দেয়?

আমি তো মাটিই। আমারে আগুনে ফেলতে চাইলে আমি বলব, আমি তো আদমের বাচ্চা না, আমি গাছের ছাও। বরইগাছের বাচ্চা। গাছের তো হিসাব নেই মাবুদ। আমারে বেহেশতের কুলগাছ বানিয়ে খাড়া করে দিন।’

আল মাহমুদ পা টিপে টিপে নূর আলীর কাছে গেলেন। বললেন, ‘এই যে কুলগাছের বাচ্চা! এখানে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা হচ্ছে?’

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন ফকির। ‘আরে! আমার ভাই যে। আপনিও তাহলে ঘুমান না?’

‘আমি তো ঘুমিয়েই ছিলাম। আপনার বকবকানিতে ঘুম ভেঙে গেল। আপনি কুলগাছের সঙ্গে কথা বলছিলেন?’

‘হ্যাঁ। গাছটা আমার ভাই। আমার সঙ্গে কথা কয়।’

‘কী বলে গাছটা?’

‘না বাতেনি- জাহির করব না। দেখতে পাচ্ছেন না আদমের পোলাপানরা সারা দিন টাকা-পয়সা লেনদেন করে এখন পড়ে পড়ে নাক ডাকছে। মসজিদ খালি, জমিন খালি। খাল-বিল সব খালি। শুধু গাছ জেগে আছে। আম-কাঁঠাল-কুল আর এই নূর আলী গাছ। সারা দুনিয়া এই রাতে মসজিদ হয়ে গেছে। আমি বাতেনি জাহির করব না।’ কথাগুলো বলেই নূর আলী দরবেশ রাস্তার দিকে দৌড় দিলেন। আল মাহমুদের মনে হল, কোনো মানুষ নয়- একটি চলন্ত বৃক্ষ দৌড়াচ্ছে।

একটা সময় নূর আলী ফকির মানুষজনের সংস্পর্শ পুরোপুরি ত্যাগ করেন। এমনকি তার দোস্ত আল মাহমুদের পিতাকেও। তবে এমন হালাতেও তিনি আল মাহমুদকে ত্যাগ করেননি। প্রায় রাতেই আড়াইটা-তিনটার দিকে আল মাহমুদের জানালায় এসে লাঠি দিয়ে আস্তে করে টোকা দিতেন। বলতেন, ‘দুনিয়া এখন এই রাতে মসজিদ হয়ে গেছে। যারা গাছের সঙ্গে ইবাদত করতে চাও তারা জেগে ওঠো।’

একদিন রাতে নূর আলী দরবেশ আল মাহমুদকে দূরে একটি শ্মশানঘাটে নিয়ে যান। শ্মশানের পাশেই ছিল কবরস্থান। আল মাহমুদ বলল, ‘কবরস্থান আমার বড্ড ভয় লাগে।’ নূর আলী দরবেশ হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘আদমের বাচ্চারা কবরস্থানকে ভয় পায়। জীবিত মানুষই মরা মানুষকে ডরায়। আমি আর আপনি তো মানুষ জিন্দেগি ছেড়ে দিয়েছি। আমরা দু’ভাই গাছ।’

আল মাহমুদ লেখেন, নূর আলী ফকিরের স্মৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সবক আমি পরবর্তী জীবনে কখনই ভুলিনি। মানুষটি আল্লাহর কাছে হিসাব দেয়ার ভয়ে গাছ হয়ে যেতে চাইতেন। নিজেকে মাটি বলে কান্নাকাটি করতেন। আমি যখনই একাকী প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসেছি, নূর আলী ফকিরকে আমার চোখের সামনে ভাসতে দেখেছি। আল মাহমুদের আধ্যাত্মিকতার মাকাম তার কবিতা ও গদ্য পড়ে বোঝা যায়। শেষ করছি তেমনই একটি কবিতাংশ শুনিয়ে-

‘আমি তো অনন্তকালের যাত্রী ছিলাম, তুমি আমাকে

থামালে কেন? এখন আমাকে নিয়ে দেখ কত সমস্যা

কারণ আমি তো মানুষের রক্তের সব ইতিহাস

অকপটে বলতে পারি, আমার সঙ্গে গাছ কথা বলে

বাতাস কথা বলে, বায়ুতাড়িত মেঘ কথা বলে।’

 

লেখক: সাংবাদিক

Email: [email protected]

একজন আল মাহমুদ : গাছের সঙ্গে সংলাপ

 আল ফাতাহ মামুন 
১০ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আল মাহমুদ একজন শ্রেষ্ঠতম কবি হয়েছেন বটে কিন্তু ধর্ম বিসর্জন দেননি কখনও। শৈশব থেকেই তিনি ইসলামী ভাবধারায় বেড়ে উঠেছেন। যৌবনে তিনি জীবন থেকে লোক দেখানো ধার্মিকতার পোশাক খুলে ফেলেছেন। আর বার্ধক্যে পরছেন আল্লাহওয়ালা সুফির পোশাক।

এই যে ‘সুফির পোশাক’ কথাটি বললাম, আসলে সুফির পোশাক বলে কিছু হয় না। জীবন থেকে অহংকার আর লোক দেখানো ধার্মিকতার পোশাক খুলে ফেললেই সুফির পোশাক পরা হয়ে যায়। কথাটা যত সহজে লিখে ফেললাম বাস্তবতা আরও নির্মম।

গভীর সাধনা করে জানতে হয় কোনটি লোক দেখানো ধার্মিকতার পোশাক। এ পোশাক পরে থাকার বিপুল সুবিধার লোভ ত্যাগ করে তবেই সুফির পোশাক পরতে হয়। কবি তা পেরেছেন-

‘মসজিদ আর মাদ্রাসার প্রতি আমি বেজার।

আমি দেহ থেকে খুলে ফেলেছি খোদাভীতি ও লোক দেখানো

ধার্মিকতার পোশাক।

এবং পরে নিয়েছি নিরাসক্ত পীরের মোটা আলখাল্লা, শালীন।’

আল মাহমুদের সাহিত্যে আধ্যাত্মিকতার যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় তা তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা নিংড়ানো কাহিনীর নির্যাস। ছেলেবেলায় আল মাহমুদ বিচিত্র সুফিদের আদলে বেড়ে উঠেছিলেন।

আত্মজীবনীতে তিনি লিখেন, একজন ফকিরের সঙ্গে আমার আব্বার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। আব্বা ছিলেন ফখরে বাঙাল মাওলানা তাজুল ইসলামের স্নেহধন্য। তা ছাড়া বাবার শরীরে পীর-পরিব্রাজকদের রক্ত বইছে- এ নিয়ে বাবার গর্বের সীমা ছিল না। পাক্কা শরিয়ত মানা মানুষ বাবা। বে-শরিয়তি কাজকাম দেখলে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হতেন। এমন মানুষের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন একজন ফকির ধরনের মানুষ। ওই ফকিরের শুধু সতরটুকু একটি খাটো ইজার দিয়ে ঢাকা থাকত।

কী গরম, কী শীত- সবসময়ই এ পোশাক পরতেন। নামাজের কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। যখন খুশি যেখানে খুশি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। রাত জেগে দীর্ঘ রুকু-সেজদা করতেন। চোখ টকটকে লাল দেখাত। বোঝা যেত বহু বছর তিনি ঘুমাননি। আসলে তিনি ছিলেন নিশাচর ধরনের দরবেশ। বাবা তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন।

চিশতিয়া তরিকার মস্তানদের মতো ফকির সাহেব গরিব নেওয়াজের নামে হাঁক দিতে দিতে বাড়িতে ঢুকতেন। আব্বাকে ডাকতেন ‘দোস্ত’ বলে। বাড়িতে ঢুকেই বলতেন, ‘দোস্ত! এসে পড়েছি।’ আব্বা মুচকি হাসতেন। মাকে বলতেন, ‘বড় রাতা মোরগটি জবাই দাও। আমার দোস্ত এসেছেন।’

ফকিরের নাম ছিল নূর আলী। আল মাহমুদের জীবনী যারাই পড়েছেন নূর আলী ফকিরের আশ্চর্য বর্ণনা পাঠকের হৃদয়ে দাগ না কেটে পারে না। ফকিরের অভ্যাস ছিল প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলা। বাতাস, পানি ও গাছ এদের সঙ্গে কথা বলতেন। একদিনের ঘটনা। আল মাহমুদ তখন বয়সে দুরন্ত বালক। থাকতেন মসজিদের হুজরায়।

হুজরার পেছনে একটি প্রকাণ্ড কুলগাছ ছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বাইরে এসে দেখেন অবাক দৃশ্য। নূর আলী ফকির কুলগাছের সঙ্গে কথা বলছেন। গাছের সঙ্গে ফকিরের কথাবার্তা এমনই আবেগ ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে পূর্ণ ছিল, যা ছোট্ট আল মাহমুদের হৃদয়ের গভীরে গেঁথে যায়। জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও গাছের সঙ্গে দরবেশের সংলাপ হুবহু মনে রেখেছেন।

আল মাহমুদ বলেন, সেদিন রাতে জ্যোৎস্নার ঢল নামে। আমি স্পষ্ট দেখলাম, লাঠি হাতে নূর আলী ফকির দাঁড়িয়ে আছেন। কুলগাছকে বলছেন, ‘আপনি ক্যামনে সারা দিন কথাবার্তা না বলে দাঁড়িয়ে থাকেন? আপনার কষ্ট হয় না! আপনি শুধু বাতাস খেয়ে ক্যামনে বাঁচেন? আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে।’

এরপর ফকির যা বললেন তা শুনে প্রবন্ধ লেখকেরও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। ‘আচ্ছা আপনার কাছে মাবুদ হিসাব চাইবে না! আমি ও হিসাব-টিসাব দিতে পারব না। আমি কী হিসাব দেব? মাটি বুঝি আল্লাহর কাছে হিসাব দেয়?

আমি তো মাটিই। আমারে আগুনে ফেলতে চাইলে আমি বলব, আমি তো আদমের বাচ্চা না, আমি গাছের ছাও। বরইগাছের বাচ্চা। গাছের তো হিসাব নেই মাবুদ। আমারে বেহেশতের কুলগাছ বানিয়ে খাড়া করে দিন।’

আল মাহমুদ পা টিপে টিপে নূর আলীর কাছে গেলেন। বললেন, ‘এই যে কুলগাছের বাচ্চা! এখানে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা হচ্ছে?’

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন ফকির। ‘আরে! আমার ভাই যে। আপনিও তাহলে ঘুমান না?’

‘আমি তো ঘুমিয়েই ছিলাম। আপনার বকবকানিতে ঘুম ভেঙে গেল। আপনি কুলগাছের সঙ্গে কথা বলছিলেন?’

‘হ্যাঁ। গাছটা আমার ভাই। আমার সঙ্গে কথা কয়।’

‘কী বলে গাছটা?’

‘না বাতেনি- জাহির করব না। দেখতে পাচ্ছেন না আদমের পোলাপানরা সারা দিন টাকা-পয়সা লেনদেন করে এখন পড়ে পড়ে নাক ডাকছে। মসজিদ খালি, জমিন খালি। খাল-বিল সব খালি। শুধু গাছ জেগে আছে। আম-কাঁঠাল-কুল আর এই নূর আলী গাছ। সারা দুনিয়া এই রাতে মসজিদ হয়ে গেছে। আমি বাতেনি জাহির করব না।’ কথাগুলো বলেই নূর আলী দরবেশ রাস্তার দিকে দৌড় দিলেন। আল মাহমুদের মনে হল, কোনো মানুষ নয়- একটি চলন্ত বৃক্ষ দৌড়াচ্ছে।

একটা সময় নূর আলী ফকির মানুষজনের সংস্পর্শ পুরোপুরি ত্যাগ করেন। এমনকি তার দোস্ত আল মাহমুদের পিতাকেও। তবে এমন হালাতেও তিনি আল মাহমুদকে ত্যাগ করেননি। প্রায় রাতেই আড়াইটা-তিনটার দিকে আল মাহমুদের জানালায় এসে লাঠি দিয়ে আস্তে করে টোকা দিতেন। বলতেন, ‘দুনিয়া এখন এই রাতে মসজিদ হয়ে গেছে। যারা গাছের সঙ্গে ইবাদত করতে চাও তারা জেগে ওঠো।’

একদিন রাতে নূর আলী দরবেশ আল মাহমুদকে দূরে একটি শ্মশানঘাটে নিয়ে যান। শ্মশানের পাশেই ছিল কবরস্থান। আল মাহমুদ বলল, ‘কবরস্থান আমার বড্ড ভয় লাগে।’ নূর আলী দরবেশ হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘আদমের বাচ্চারা কবরস্থানকে ভয় পায়। জীবিত মানুষই মরা মানুষকে ডরায়। আমি আর আপনি তো মানুষ জিন্দেগি ছেড়ে দিয়েছি। আমরা দু’ভাই গাছ।’

আল মাহমুদ লেখেন, নূর আলী ফকিরের স্মৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সবক আমি পরবর্তী জীবনে কখনই ভুলিনি। মানুষটি আল্লাহর কাছে হিসাব দেয়ার ভয়ে গাছ হয়ে যেতে চাইতেন। নিজেকে মাটি বলে কান্নাকাটি করতেন। আমি যখনই একাকী প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসেছি, নূর আলী ফকিরকে আমার চোখের সামনে ভাসতে দেখেছি। আল মাহমুদের আধ্যাত্মিকতার মাকাম তার কবিতা ও গদ্য পড়ে বোঝা যায়। শেষ করছি তেমনই একটি কবিতাংশ শুনিয়ে-

‘আমি তো অনন্তকালের যাত্রী ছিলাম, তুমি আমাকে

থামালে কেন? এখন আমাকে নিয়ে দেখ কত সমস্যা

কারণ আমি তো মানুষের রক্তের সব ইতিহাস

অকপটে বলতে পারি, আমার সঙ্গে গাছ কথা বলে

বাতাস কথা বলে, বায়ুতাড়িত মেঘ কথা বলে।’

লেখক: সাংবাদিক

Email: [email protected]