মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালিমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাইফুল ইসলাম

মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালিমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর হামলে পড়ার কারণে পরবর্তীতে বাংলাদেশের মানুষের সশস্ত্র সংগ্রামকে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই বা সত্যিকারের জিহাদ বৈ অন্যকিছু বলা যাবে না।

সেদিন হানাদাররা চেয়েছিল অস্ত্রের জোরে জুলুম, নিপীড়ণ আর শোষণের ইতিহাসকে আরও দীর্ঘায়িত করতে এবং মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতাবঞ্চিত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে।

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক গণহত্যা, জীবন্ত পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা থাকলেও একই ধর্মের অনুসারী নিরীহ ঘুমন্ত মানুষের ওপর হামলে পড়ার ইতিহাস নেই বললেই চলে। পাকিস্তানিরা সেদিন চেয়েছিল নিজেদের দোসর ছাড়া সব মানুষকে খুন করে হলেও এ দেশের মাটির মালিকানা ধরে রাখতে।

অথচ আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি একজন মানুষকে হত্যা করল সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একজন মানুষকে বাঁচাল সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচাল।

আশ্চর্যের বিষয়, এমন একটি শাসকগোষ্ঠী বর্বর হত্যাকাণ্ডটি পরিচালিত করেছিল, যারা কিনা মাত্র কয়েক বছর আগে ধর্মের দোহাই দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে।

আমরা জানি, আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাতিলের বিরুদ্ধে লড়াই যেমন জিহাদ, তেমনই নিজেদের জানমাল ও ইজ্জত-আব্রু প্রতিষ্ঠার লড়াইও জিহাদ।

জিহাদের বিভিন্ন প্রকারভেদ থাকার পরও জানমাল, ইজ্জত-আব্রু রক্ষা এবং জালিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরাকে জিহাদের সর্বোচ্চ পর্যায় তথা মুখোমুখী লড়াই বলে ঘোষণা দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা।

তিনি বলেন, ‘আর তোমাদের কী হল যে তোমরা আল্লাহর রাহে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে হে আমাদের পালনকর্তা আমাদের এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষাবলম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।’

২৫ মার্চ কালরাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির ওপর হামলে পড়ে, তখন এখানকার মজলুম মানুষের কণ্ঠই যেন ওপরে উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলে রেখেছেন।

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, উত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের কাছে সত্যের বাণী তুলে ধরা। ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভাষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যমে বাঙালি জাতি নিজেদের হক তথা অধিকারের বিষয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের অবহিত করে আসছিল।

কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে উল্টো জুলুম-নিপীড়নের মাত্রা দিনের পর দিন বাড়িয়ে যাচ্ছিল জালিমরা। যার চূড়ান্ত পর্যায় ছিল রাতের আঁধারে নিজেদের ভাইবোনদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। তো জীবন বাঁচাতে, নিজেদের জানমাল রক্ষায় আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা অস্ত্রধারণ যে কোরআন ও হাদিসের আলোকে সত্যিকারের জিহাদ, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

এ কারণেই তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের হালকা অস্ত্রের বিরুদ্ধে মাত্র ৯ মাস টিকতে পেরিছিল। আল্লাহ জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে কীভাবে সাহায্য করেছেন, তা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা থেকে স্পষ্ট।

দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ থাকা, খাওয়া, আশ্রয়, এমনকি পথ দেখিয়ে, দিকনির্দেশনা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন। এমনকি ইসলামিক রিপাবলিক (!) অব পাকিস্তান যখন তার মুসলিম ভাইদের হত্যায় মেতে উঠেছে, তখন প্রতিবেশী ভিন্নধর্মী মানুষদের দিয়ে আল্লাহ তাদের সাহায্য করিয়েছেন। মজলুমের পক্ষে আল্লাহ ভিন্ন জাতিকে এগিয়ে এনেছেন। এর থেকেই প্রমাণিত হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সত্যিকারের জিহাদ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন তার উম্মতের বেশিরভাগ মানুষ যেন বিভ্রান্তিতে না জড়ায়। মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের বৃহদাংশ থেকে শুরু করে (হাতেগোনা সুবিধাবাদী আলেম ও পাকিস্তান সরকারের চাটুকার দোসর কিছু মানুষ ছাড়া) সর্বস্তরের মানুষ এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

যারা সরাসরি যুদ্ধ করতে পেরেছেন তারা সেটি করেছেন। যারা পারেননি তারা জনমত তৈরি করে বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছেন। ফলে সম্মিলিত জনশক্তির কাছে দ্রুততম সময়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে জালিম পাকিস্তানিদের।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যে সত্যিকারের জিহাদ ছিল তার আরেকটি প্রমাণ দেশের মূলধারার আলেমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় করণীয় প্রশ্নে সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমে দ্বীন মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর (রহ.) বলেন, ‘পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করেছে, সুতরাং তারা জালেম। জুলুম আর ইসলাম এক হতে পারে না।

তুমি যদি মুসলমান হও তবে পাকিস্তানের পক্ষে যাও কীভাবে? এটা তো জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ’। এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে, গণহত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে সত্যিকারের জিহাদ। এ কারণে এ যুদ্ধে যারা সক্রীয় অংশগ্রহণ করেছেন, তারা মুজাহিদ।

যুগ যুগ ধরে সত্যের ও মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের পথে যে সংগ্রাম চলবে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে চিহ্নিত হবে। কোরআন, হাদিসে রাসূল (সা.) ও আকাবেরে ওলামাদের অবস্থান তা-ই বলে।

আল্লাহ বলেছেন, জালিমের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই। অর্থাৎ, জালিমের যত বড় সাহায্যকারীই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত, তারা জালিমের উপকারে আসতে পারবে না।

তাই তো আমরা দেখি, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা, চীন, এমনকি সৌদি আরবের মতো দেশ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়ার পরও তারা জয়ী হতে তো পারেইনি, উল্টো দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকাশ্য আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে কোনোমতে প্রাণ বাঁচাতে হয়েছে।

একটি বিষয় স্পষ্ট। ইসলাম, রাজনীতি, বৃহৎ সংহতি বা যে কোনো নামেই পাকিস্তানি জালিমদের পক্ষাবলম্বন ২৫ মার্চ কালরাতের হামলার আগ পর্যন্ত হয়তো মেনে নেয়া যায়।

কিন্তু গণহত্যা, নির্বিচারে ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলা, মা-বোনের ইজ্জত হরণ এবং ‘এ দেশের মানুষ নয়, মাটি চাই’- জেনারেল টিক্কা খান এমন হুমকি দিয়ে হত্যায় মেতে ওঠার পরও যারা তাদের সহায়তা করেছে, তারাও নিজেদের জালিমের কাতারে শামিল করেছে।

লেখক : সাংবাদিক ও ধর্মীয় বিশ্লেষক

[email protected]