বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা আর ইউরোপীয় ভাবনা এক নয়
jugantor
বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা আর ইউরোপীয় ভাবনা এক নয়

  সাদিয়া আফরিন কুমু  

১৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনৈতিক আদর্শে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি গুলিয়ে ফেলেননি। রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বঙ্গবন্ধু ব্যক্তি জীবনে ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহারের ঘোরবিরোধী ছিলেন। ধর্মের নামে রাজনীতি করাকে ভণ্ডামি মনে করতেন তিনি।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু দৃঢ়কণ্ঠে জানান, ‘যে দেশে ৯৫ শতাংশ মুসলমান, সে দেশে ইসলামবিরোধী আইনের কথা ভাবতে পারে তারাই, ইসলামকে যারা ব্যবহার করে দুনিয়াটা ফানা করে তোলার কাজে।’

নির্বাচনী ইশতেহারে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাসের বিপক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। জন্ম পরিচয়ে মুসলমান হয়েও যারা বাঙালি মুসলমানদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন করে এসেছে, মহান এ নেতার লড়াই ছিল সেসব মুনাফিকদের বিরুদ্ধে, কারণ মুসলমান কখনও জালিমের অধীনে থাকতে পারে না।

১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, মুসলমান দুইবার মরে না’। ’৭২-এর ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে তার বলিষ্ঠ উচ্চারণ ছিল, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। যদি কেউ বলে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু এমন একটি দেশ গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত হবে। বঙ্গবন্ধু ধর্মকে এমন একটা জায়গায় রাখতে চেয়েছিলেন, যেখানে কোনো গোষ্ঠী ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে পারবে না।

এ উদার চেতনা সমুন্নত রাখতেই বঙ্গবন্ধু প্রণয়ন করেছিলেন সাংবিধানিক অসাম্প্রদায়িকতা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রণয়ন ছিল তৎকালীন ঝুঁকিপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ইউরোপীয়রা ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যা বুঝায় তা আমি মানি না। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’।

স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে ১৯৭৩ সালে সিরাত মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। সিরাত মজলিসের মাধ্যমে সরকারিভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের নির্দেশ দেন, তার নির্দেশেই ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে সরকারি উদ্যোগে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজে। সেদিন থেকেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রেডিওতে কোরআন তেলাওয়াত, তাফসির ও আরবি অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ঈদে মিলাদুন্নবী, শবেবরাত, শবেকদরসহ ইসলামের তাৎপর্যবাহী দিনগুলোয় সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন এবং ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ যেমন- মদ, গাঁজা ও ঘোড়দৌড় ইত্যাদি বন্ধের আইন প্রণয়ন করেন।

১৯৭৫ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশিদের ওপর হজযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সৌদি আরব। জাতির পিতার অনুরোধে সৌদি সরকার সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ফলে বাঙালির জন্য ধর্ম পালনের নতুন এক দুয়ার খুলে যায়। স্বাধীনতার আগে হজযাত্রীদের ভ্রমণ কর দিতে হতো, হজযাত্রীদের সুবিধার্থে ভ্রমণ কর বাতিল করে সরকারি তহবিল থেকে হজযাত্রার জন্য অনুদানের ব্যবস্থা করেন ধর্মদরদী এ নেতা।

স্বাধীনতাবিরোধীর মিথ্যা অভিযোগে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়, বঙ্গবন্ধু সে মাদ্রাসা খুলে দেন ও অনুদানও দেন। বিশ্ব ইজতিমার জন্য টঙ্গীর তুরাগ নদীর পারে বৃহদায়তনের জায়গা চিরস্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেন বঙ্গবন্ধু।

রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রথম তাবলিগ জামাতের দল প্রেরণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ন্যায়পন্থী বঙ্গবন্ধু আরব বিশ্বের পক্ষে সর্বাত্মক সমর্থন প্রদান করার পাশাপাশি ২৮ সদস্যের মেডিকেল টিম ও ৫ হাজার সদস্যের স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা দল পাঠান।

আলেমদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিল চোখে পড়ার মতো। আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরীকে বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধাভরে ‘দাদাজি’ ডাকতেন। ফরিদপুরী হুজুর লালবাগ মাদ্রাসার মুহতামিম থাকাকালীন সপ্তাহে কয়েকবার তরুণ মুজিব তার সোহবত পেতে লালবাগ যেতেন। একদিন ফরিদপুরী হুজুর বঙ্গবন্ধুকে নিজের পছন্দের কোটটি পরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তুমি সবসময় এটি পরে মিটিং-মিছিলে যাবে।’ পরবর্তী সময়ে এ কোটই হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ- মুজিব কোট।

মাসিক মদিনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছিল অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। ১৯৭৫ সালের দিকে তথ্য মন্ত্রণালয় অন্যান্য পত্রিকার সঙ্গে মাসিক মদিনাও বন্ধ করে দিয়েছিল। মাসিক মদিনার নিয়মিত পাঠক বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান পত্রিকা না পাওয়ায় চিঠি লিখলেন সম্পাদক বরাবর। চিঠি হাতে মহিউদ্দিন খান গেলেন বঙ্গবন্ধুর কার্যালয়ে। সদ্য পিতা বিয়োগের বেদনায় কাতর মুজিব বাবার হাতে লেখা চিঠি দেখে মহিউদ্দিন খানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। বললেন, ‘হারামজাদাদেরকে তো ইসলামিক পত্রিকা বন্ধ করতে বলিনি’। তিনি তৎক্ষণাৎ তথ্য সচিবকে ফোন করে বকাঝকা করলেন এবং মাসিক মদিনার ডিক্লারেশন চালু করার নির্দেশ দিলেন।

মওলানা ভাসানীকে তিনি ধর্মীয় পথপ্রদর্শক হিসেবে মানতেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে জেল জীবনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমরা মওলানা ভাসানী সাহেবের সঙ্গে নামাজ পড়তাম। মাগরিবের নামাজের পর মওলানা সাহেব কোরআনের অর্থ করে আমাদের বুঝাতেন। এটা আমাদের জন্য প্রতিদিনের বাঁধা নিয়ম ছিল।’ লেবাসধারী মুসলমান না হলেও তিনি ছিলেন ইসলামের প্রকৃত আদর্শ, ইনসাফ ও মানবপ্রেমের চেতনায় উদীপ্ত একজন খাঁটি আল্লাহওয়ালা নবীপ্রেমিক মুসলমান।

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা আর ইউরোপীয় ভাবনা এক নয়

 সাদিয়া আফরিন কুমু 
১৪ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনৈতিক আদর্শে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি গুলিয়ে ফেলেননি। রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বঙ্গবন্ধু ব্যক্তি জীবনে ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহারের ঘোরবিরোধী ছিলেন। ধর্মের নামে রাজনীতি করাকে ভণ্ডামি মনে করতেন তিনি।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু দৃঢ়কণ্ঠে জানান, ‘যে দেশে ৯৫ শতাংশ মুসলমান, সে দেশে ইসলামবিরোধী আইনের কথা ভাবতে পারে তারাই, ইসলামকে যারা ব্যবহার করে দুনিয়াটা ফানা করে তোলার কাজে।’

নির্বাচনী ইশতেহারে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাসের বিপক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। জন্ম পরিচয়ে মুসলমান হয়েও যারা বাঙালি মুসলমানদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন করে এসেছে, মহান এ নেতার লড়াই ছিল সেসব মুনাফিকদের বিরুদ্ধে, কারণ মুসলমান কখনও জালিমের অধীনে থাকতে পারে না।

১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, মুসলমান দুইবার মরে না’। ’৭২-এর ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে তার বলিষ্ঠ উচ্চারণ ছিল, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। যদি কেউ বলে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু এমন একটি দেশ গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত হবে। বঙ্গবন্ধু ধর্মকে এমন একটা জায়গায় রাখতে চেয়েছিলেন, যেখানে কোনো গোষ্ঠী ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে পারবে না।

এ উদার চেতনা সমুন্নত রাখতেই বঙ্গবন্ধু প্রণয়ন করেছিলেন সাংবিধানিক অসাম্প্রদায়িকতা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রণয়ন ছিল তৎকালীন ঝুঁকিপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ইউরোপীয়রা ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যা বুঝায় তা আমি মানি না। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’।

স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে ১৯৭৩ সালে সিরাত মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। সিরাত মজলিসের মাধ্যমে সরকারিভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের নির্দেশ দেন, তার নির্দেশেই ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে সরকারি উদ্যোগে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজে। সেদিন থেকেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রেডিওতে কোরআন তেলাওয়াত, তাফসির ও আরবি অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ঈদে মিলাদুন্নবী, শবেবরাত, শবেকদরসহ ইসলামের তাৎপর্যবাহী দিনগুলোয় সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন এবং ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ যেমন- মদ, গাঁজা ও ঘোড়দৌড় ইত্যাদি বন্ধের আইন প্রণয়ন করেন।

১৯৭৫ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশিদের ওপর হজযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সৌদি আরব। জাতির পিতার অনুরোধে সৌদি সরকার সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ফলে বাঙালির জন্য ধর্ম পালনের নতুন এক দুয়ার খুলে যায়। স্বাধীনতার আগে হজযাত্রীদের ভ্রমণ কর দিতে হতো, হজযাত্রীদের সুবিধার্থে ভ্রমণ কর বাতিল করে সরকারি তহবিল থেকে হজযাত্রার জন্য অনুদানের ব্যবস্থা করেন ধর্মদরদী এ নেতা।

স্বাধীনতাবিরোধীর মিথ্যা অভিযোগে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়, বঙ্গবন্ধু সে মাদ্রাসা খুলে দেন ও অনুদানও দেন। বিশ্ব ইজতিমার জন্য টঙ্গীর তুরাগ নদীর পারে বৃহদায়তনের জায়গা চিরস্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেন বঙ্গবন্ধু।

রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রথম তাবলিগ জামাতের দল প্রেরণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ন্যায়পন্থী বঙ্গবন্ধু আরব বিশ্বের পক্ষে সর্বাত্মক সমর্থন প্রদান করার পাশাপাশি ২৮ সদস্যের মেডিকেল টিম ও ৫ হাজার সদস্যের স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধা দল পাঠান।

আলেমদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিল চোখে পড়ার মতো। আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরীকে বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধাভরে ‘দাদাজি’ ডাকতেন। ফরিদপুরী হুজুর লালবাগ মাদ্রাসার মুহতামিম থাকাকালীন সপ্তাহে কয়েকবার তরুণ মুজিব তার সোহবত পেতে লালবাগ যেতেন। একদিন ফরিদপুরী হুজুর বঙ্গবন্ধুকে নিজের পছন্দের কোটটি পরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তুমি সবসময় এটি পরে মিটিং-মিছিলে যাবে।’ পরবর্তী সময়ে এ কোটই হয়ে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ- মুজিব কোট।

মাসিক মদিনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছিল অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। ১৯৭৫ সালের দিকে তথ্য মন্ত্রণালয় অন্যান্য পত্রিকার সঙ্গে মাসিক মদিনাও বন্ধ করে দিয়েছিল। মাসিক মদিনার নিয়মিত পাঠক বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান পত্রিকা না পাওয়ায় চিঠি লিখলেন সম্পাদক বরাবর। চিঠি হাতে মহিউদ্দিন খান গেলেন বঙ্গবন্ধুর কার্যালয়ে। সদ্য পিতা বিয়োগের বেদনায় কাতর মুজিব বাবার হাতে লেখা চিঠি দেখে মহিউদ্দিন খানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। বললেন, ‘হারামজাদাদেরকে তো ইসলামিক পত্রিকা বন্ধ করতে বলিনি’। তিনি তৎক্ষণাৎ তথ্য সচিবকে ফোন করে বকাঝকা করলেন এবং মাসিক মদিনার ডিক্লারেশন চালু করার নির্দেশ দিলেন।

মওলানা ভাসানীকে তিনি ধর্মীয় পথপ্রদর্শক হিসেবে মানতেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে জেল জীবনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমরা মওলানা ভাসানী সাহেবের সঙ্গে নামাজ পড়তাম। মাগরিবের নামাজের পর মওলানা সাহেব কোরআনের অর্থ করে আমাদের বুঝাতেন। এটা আমাদের জন্য প্রতিদিনের বাঁধা নিয়ম ছিল।’ লেবাসধারী মুসলমান না হলেও তিনি ছিলেন ইসলামের প্রকৃত আদর্শ, ইনসাফ ও মানবপ্রেমের চেতনায় উদীপ্ত একজন খাঁটি আল্লাহওয়ালা নবীপ্রেমিক মুসলমান।

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

 

ঘটনাপ্রবাহ : অশ্রুঝরা আগস্ট