মুজাদ্দিদে আলফেসানির আধ্যাত্মিকতা
jugantor
মুজাদ্দিদে আলফেসানির আধ্যাত্মিকতা

  সৈয়দ ইরফানুল বারী  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাকিকত ও মারেফাতকে জ্যামিতির ভাষায় প্রথম কে লিখেছিলেন- আমার জানা নেই। ইমাম গাজ্জালিকে পড়ে বিশেষ করে তার ইয়াহ্ইয়া-উল-উলুমুদ্দিন, কিমিয়ায়ে সাদাত ও মিনহাজুল আবেদিন পড়ে মনে হয়েছে, তার প্রকাশভঙ্গি ও উপস্থাপন গাণিতিক।

শায়খে আকবর মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি, শায়খ ফরিদউদ্দিন আত্তার ও শায়খ ইয়াহ্ইয়া মানেরি অনেক লিখেছেন। তাদের রুহানি সফর-অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন। এদের আমার ততটুকু গাণিতিক মনে হয়নি যতটুকু মনে হয়েছে শায়খ আহমদ মুজাদ্দিদ আলফে সানিকে তার মকতুবাত শরিফ পড়ে।

মুজাদ্দিদের রুহানি সফর, রুহানি অভিজ্ঞতা ও রুহানি অর্জন সবটুকুর বর্ণনা জ্যামিতিক। তিনি বৃত্তের পর বৃত্ত দিয়ে সবটুকুকে কখনও খণ্ডিত বা কখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ দান করেছেন। তার শুরু বৃত্ত দিয়ে, শেষও বৃত্ত দিয়ে। কখনও মনে হবে বৃত্ত একটিই।

আবার মনে হবে, প্রত্যেকটি পদক্ষেপের জন্য একেকটি বৃত্ত। এক্ষেত্রে সত্য হয় কালামে পাকের সূরা আর-রহমানের ওই আয়াত- কুল্লা ইয়াওমিন হুয়া ফি শাঅ্আন (নিত্যনতুন শানে তিনি প্রবৃত্ত)। মকতুবাত শরিফে বলা হচ্ছে, সব অস্তিত্বের নিজ নিজ উৎসস্থল বিদ্যমান। ওই উৎস একটি বিন্দু বৃত্ত। জাগতিক জীবনে বান্দা বা সৃষ্টি উৎসতে অবস্থানরত নয়। অবস্থান করছে বহু বহু দূরের বৃত্তে।

কিন্তু শেষ লক্ষ্য হল উৎসের বৃত্তে প্রবেশ করা বা স্থিতিবান হওয়া। মুজাদ্দিদ এ-ও বর্ণনা করেছেন- সিদ্দিক, শহীদ, নবী এদের উৎস-বৃত্ত অতিক্রম করে নিছক সফর-অভিজ্ঞতা লাভ করা যায় যদিও সিদ্দিক, শহীদ, নবী এক কথায় মকবুল আবরারদের উৎসস্থলে অন্য কেউ অবস্থান নিতে পারবেন না।

এখানেই শায়েখ আহমদকে আধ্যাত্মিকতায় অনভিজ্ঞ আলেম সমাজ ভুল বুঝে ছিলেন। এমনকি শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভি প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। শায়খ আহমদের উৎস অতিক্রমের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাগুলো কেবল তার মুর্শিদ খাজা বাকিবিল্লাহ্র জন্য মজুদ ছিল- আলেম-উলামাদের জন্য নয়।

আধ্যাত্মিক জীবনের প্রথম বৃত্ত হল- দশ লতিফার বৃত্ত। মুজাদ্দিদ দেখিয়েছেন, বৃত্তের পূর্ণাঙ্গ ব্যাসের নিুস্থানে আলেম খাল্ক, ঊর্ধ্বস্থানে আলমে আমর। আবার দেখুন, এ বৃত্তের সর্ব ঊর্ধ্ব অবস্থান আখফা লতিফায় যেখানে পরম পবিত্রতার হিস্যা থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী বৃত্তে ওই পরম পবিত্রতা উৎকৃষ্টতা রহিত।

অর্থাৎ পরের বৃত্তেই বান্দা নিজেকে অনেক অপূর্ণ ও অজ্ঞ দেখতে পাবে। ওই মুহূর্তে আল্লাহর কোনো এক সিফাতের প্রতিচ্ছায়ার বৃত্ত তাকে রক্ষা করবে অথবা লালন-পালন করবে। এ বৃত্তও তাকে অপূর্ণ রেখে আল্লাহর সিফাতের প্রতিবিম্ব বৃত্তে আরোহণের ও অবস্থানের যোগ্যতা দান করবে।

প্রতিবিম্ব কখনও প্রকৃত বিষয় নয়। তবুও প্রতিবিম্ব এক ধরনের পূর্ণতার স্বাদ দান করে থাকে যদিও আসলে পূর্ণতার বৃত্ত ভিন্ন স্বাদ ও অবস্থান দিয়ে থাকে।

হুজুর পাক (সা.)-এর মতো পরিপূর্ণতা ও সর্বোচ্চতা আর কারও ক্ষেত্রে হয়নি এবং হওয়ার নয়। যিনি যত বৃত্তই অবগাহন করেন না কেন, হুজুর পাক (সা.)-এর প্রতিচ্ছায়ায় কিংবা প্রতিবিম্ব বৃত্তের মধ্যেই তার বৃত্ত। বৃত্তের ধর্ম হল পূর্ণতা। বিন্দুমাত্র শূন্যতা বা বক্রতা নিয়ে কখনও তা বৃত্ত হয় না।

প্রত্যেক মানুষে বৃত্তের উপাদান বিদ্যমান। সে বৃত্ত হুজুর পাক (সা.)-এর বৃত্ত না হলেও তার বৃত্ত থেকে ভিন্ন কিংবা বিচ্ছিন্ন নয়। তাই সুফিরা বলেন, প্রত্যেক মানুষ হুজুর পাক (সা.)-এর আবির্ভাবস্থল; কিন্তু তিনি আবির্ভূত নন।

আমার কত বড় ধৃষ্টতা, আমি সারওয়ারে কায়েনাত রাহমাতুল্লিল আলামিনের বৃত্তের উল্লেখ করলাম। এতে বরং আনন্দ পেলাম। যখন ভাবছি, মওলানা ভাসানী হুজুরের বৃত্ত প্রসঙ্গ লিখব তখন আমি কম্পমান। কোনো মুরিদের পক্ষে সম্ভব নয় আপন মুর্শিদের বৃত্ত-পরিধি যাচাই-বাছাই করবে।

নিজেকে নিত্য অযোগ্য ও অক্ষম ভাবতে পারলে বা বুঝতে পারলে তবে তো মুরিদ হওয়া। তবে আমি এটুকু করতে পারি, মওলানা ভাসানী হুজুর যে বৃত্তের কথা বলে গেছেন, তার উল্লেখ করতে পারি মাত্র।

এ বৃত্তের কথা হুজুর বলেছিলেন ১৯৭৬ সালের ১৩ নভেম্বর সন্তোষের দরবার হলে জীবনের সর্বশেষ ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা মনে রাখবেন, ইসলামের দুটি অঙ্গ- একটি শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাত; আরেকটি প্রধান অঙ্গ জিহাদ।’

একই ভাষণে শুরুতে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘আজ বহুদিন ধরে ইসলামের অন্যতম একটা অংশ শরিয়ত, তরিকত, মারেফাত ও হাকিকতের কথা মানুষকে শোনানো হচ্ছে। আমল করার জন্য বারবার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে ইসলামের প্রধান এবং অন্যতম নির্দেশ হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জালেমের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, শোষকের বিরুদ্ধে ও শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য জিহাদ করা ফরজ।’

আমি বলতে চাচ্ছি, হুজুর মওলানা ভাসানী মারেফাতের বৃত্তের মধ্যে ইহজাগতিকতাকেও স্থান করে দিয়েছেন। ওই ইহজাগতিকতা নাফসানিয়াতের নয়- রবুবিয়াতের। তাই বৃত্ত একই।

পাঁচটি আলাদা আলাদা বৃত্তকে তিনি একটি বৃত্তে পরিগণিত করেছেন। অথবা এমনও বলা চলে, একই বৃত্তের দুটিই আমলে আমর। একটিতে একযোগে শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাত; অপরাংশে কেবলই জিহাদ।

লেখক : কোর্স টিচার, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মুজাদ্দিদে আলফেসানির আধ্যাত্মিকতা

 সৈয়দ ইরফানুল বারী 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাকিকত ও মারেফাতকে জ্যামিতির ভাষায় প্রথম কে লিখেছিলেন- আমার জানা নেই। ইমাম গাজ্জালিকে পড়ে বিশেষ করে তার ইয়াহ্ইয়া-উল-উলুমুদ্দিন, কিমিয়ায়ে সাদাত ও মিনহাজুল আবেদিন পড়ে মনে হয়েছে, তার প্রকাশভঙ্গি ও উপস্থাপন গাণিতিক।

শায়খে আকবর মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি, শায়খ ফরিদউদ্দিন আত্তার ও শায়খ ইয়াহ্ইয়া মানেরি অনেক লিখেছেন। তাদের রুহানি সফর-অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন। এদের আমার ততটুকু গাণিতিক মনে হয়নি যতটুকু মনে হয়েছে শায়খ আহমদ মুজাদ্দিদ আলফে সানিকে তার মকতুবাত শরিফ পড়ে।

মুজাদ্দিদের রুহানি সফর, রুহানি অভিজ্ঞতা ও রুহানি অর্জন সবটুকুর বর্ণনা জ্যামিতিক। তিনি বৃত্তের পর বৃত্ত দিয়ে সবটুকুকে কখনও খণ্ডিত বা কখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ দান করেছেন। তার শুরু বৃত্ত দিয়ে, শেষও বৃত্ত দিয়ে। কখনও মনে হবে বৃত্ত একটিই।

আবার মনে হবে, প্রত্যেকটি পদক্ষেপের জন্য একেকটি বৃত্ত। এক্ষেত্রে সত্য হয় কালামে পাকের সূরা আর-রহমানের ওই আয়াত- কুল্লা ইয়াওমিন হুয়া ফি শাঅ্আন (নিত্যনতুন শানে তিনি প্রবৃত্ত)। মকতুবাত শরিফে বলা হচ্ছে, সব অস্তিত্বের নিজ নিজ উৎসস্থল বিদ্যমান। ওই উৎস একটি বিন্দু বৃত্ত। জাগতিক জীবনে বান্দা বা সৃষ্টি উৎসতে অবস্থানরত নয়। অবস্থান করছে বহু বহু দূরের বৃত্তে।

কিন্তু শেষ লক্ষ্য হল উৎসের বৃত্তে প্রবেশ করা বা স্থিতিবান হওয়া। মুজাদ্দিদ এ-ও বর্ণনা করেছেন- সিদ্দিক, শহীদ, নবী এদের উৎস-বৃত্ত অতিক্রম করে নিছক সফর-অভিজ্ঞতা লাভ করা যায় যদিও সিদ্দিক, শহীদ, নবী এক কথায় মকবুল আবরারদের উৎসস্থলে অন্য কেউ অবস্থান নিতে পারবেন না।

এখানেই শায়েখ আহমদকে আধ্যাত্মিকতায় অনভিজ্ঞ আলেম সমাজ ভুল বুঝে ছিলেন। এমনকি শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভি প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। শায়খ আহমদের উৎস অতিক্রমের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাগুলো কেবল তার মুর্শিদ খাজা বাকিবিল্লাহ্র জন্য মজুদ ছিল- আলেম-উলামাদের জন্য নয়।

আধ্যাত্মিক জীবনের প্রথম বৃত্ত হল- দশ লতিফার বৃত্ত। মুজাদ্দিদ দেখিয়েছেন, বৃত্তের পূর্ণাঙ্গ ব্যাসের নিুস্থানে আলেম খাল্ক, ঊর্ধ্বস্থানে আলমে আমর। আবার দেখুন, এ বৃত্তের সর্ব ঊর্ধ্ব অবস্থান আখফা লতিফায় যেখানে পরম পবিত্রতার হিস্যা থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী বৃত্তে ওই পরম পবিত্রতা উৎকৃষ্টতা রহিত।

অর্থাৎ পরের বৃত্তেই বান্দা নিজেকে অনেক অপূর্ণ ও অজ্ঞ দেখতে পাবে। ওই মুহূর্তে আল্লাহর কোনো এক সিফাতের প্রতিচ্ছায়ার বৃত্ত তাকে রক্ষা করবে অথবা লালন-পালন করবে। এ বৃত্তও তাকে অপূর্ণ রেখে আল্লাহর সিফাতের প্রতিবিম্ব বৃত্তে আরোহণের ও অবস্থানের যোগ্যতা দান করবে।

প্রতিবিম্ব কখনও প্রকৃত বিষয় নয়। তবুও প্রতিবিম্ব এক ধরনের পূর্ণতার স্বাদ দান করে থাকে যদিও আসলে পূর্ণতার বৃত্ত ভিন্ন স্বাদ ও অবস্থান দিয়ে থাকে।

হুজুর পাক (সা.)-এর মতো পরিপূর্ণতা ও সর্বোচ্চতা আর কারও ক্ষেত্রে হয়নি এবং হওয়ার নয়। যিনি যত বৃত্তই অবগাহন করেন না কেন, হুজুর পাক (সা.)-এর প্রতিচ্ছায়ায় কিংবা প্রতিবিম্ব বৃত্তের মধ্যেই তার বৃত্ত। বৃত্তের ধর্ম হল পূর্ণতা। বিন্দুমাত্র শূন্যতা বা বক্রতা নিয়ে কখনও তা বৃত্ত হয় না।

প্রত্যেক মানুষে বৃত্তের উপাদান বিদ্যমান। সে বৃত্ত হুজুর পাক (সা.)-এর বৃত্ত না হলেও তার বৃত্ত থেকে ভিন্ন কিংবা বিচ্ছিন্ন নয়। তাই সুফিরা বলেন, প্রত্যেক মানুষ হুজুর পাক (সা.)-এর আবির্ভাবস্থল; কিন্তু তিনি আবির্ভূত নন।

আমার কত বড় ধৃষ্টতা, আমি সারওয়ারে কায়েনাত রাহমাতুল্লিল আলামিনের বৃত্তের উল্লেখ করলাম। এতে বরং আনন্দ পেলাম। যখন ভাবছি, মওলানা ভাসানী হুজুরের বৃত্ত প্রসঙ্গ লিখব তখন আমি কম্পমান। কোনো মুরিদের পক্ষে সম্ভব নয় আপন মুর্শিদের বৃত্ত-পরিধি যাচাই-বাছাই করবে।

নিজেকে নিত্য অযোগ্য ও অক্ষম ভাবতে পারলে বা বুঝতে পারলে তবে তো মুরিদ হওয়া। তবে আমি এটুকু করতে পারি, মওলানা ভাসানী হুজুর যে বৃত্তের কথা বলে গেছেন, তার উল্লেখ করতে পারি মাত্র।

এ বৃত্তের কথা হুজুর বলেছিলেন ১৯৭৬ সালের ১৩ নভেম্বর সন্তোষের দরবার হলে জীবনের সর্বশেষ ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা মনে রাখবেন, ইসলামের দুটি অঙ্গ- একটি শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাত; আরেকটি প্রধান অঙ্গ জিহাদ।’

একই ভাষণে শুরুতে মওলানা ভাসানী বলেন, ‘আজ বহুদিন ধরে ইসলামের অন্যতম একটা অংশ শরিয়ত, তরিকত, মারেফাত ও হাকিকতের কথা মানুষকে শোনানো হচ্ছে। আমল করার জন্য বারবার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে ইসলামের প্রধান এবং অন্যতম নির্দেশ হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জালেমের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, শোষকের বিরুদ্ধে ও শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য জিহাদ করা ফরজ।’

আমি বলতে চাচ্ছি, হুজুর মওলানা ভাসানী মারেফাতের বৃত্তের মধ্যে ইহজাগতিকতাকেও স্থান করে দিয়েছেন। ওই ইহজাগতিকতা নাফসানিয়াতের নয়- রবুবিয়াতের। তাই বৃত্ত একই।

পাঁচটি আলাদা আলাদা বৃত্তকে তিনি একটি বৃত্তে পরিগণিত করেছেন। অথবা এমনও বলা চলে, একই বৃত্তের দুটিই আমলে আমর। একটিতে একযোগে শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাত; অপরাংশে কেবলই জিহাদ।

লেখক : কোর্স টিচার, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়