সাহাবিদের নবীপ্রেম
jugantor
সাহাবিদের নবীপ্রেম

  মেহেদী হাসান সাফিক  

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহর রাসূল (সা.) ছিলেন মায়া-মমতা ও ভালোবাসার এক মূর্তপ্রতীক। তিনি সর্বকালের সর্বোত্তম মহামানব।

সবুজ-কচি জীবন থেকে শুভ্র-প্রৌঢ় জীবন নাগাদ প্রতিটি ধাপের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটেছে তার জীবনে।

মহান আল্লাহকেও ভালোবাসতে হলে রাসূল (সা.)-এর অনুকরণ-অনুসরণ করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১)।

আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে হজরত আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেন, কোরআন-ই ছিল আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর চরিত্র।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। (সূরা আহযাব, আয়াত ২১)।

নিজের সন্তান-সন্তুতি মা-বাবাকে এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও রাসূল (সা.)কে বেশি ভালোবেসেছিলেন সাহাবিরা। রাসূলকে এতটা না ভালোবাসলে তো পরিপূর্ণ মুমিন হওয়াই সম্ভব হয় না। আর রাসূলকে ভালোবেসে তার রেখে যাওয়া অনুসৃত পথ অনুসরণ করে মুমিন বান্দারা দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।’ (বুখারি, হাদিস ১৪)।

সারাটি জীবন নবীজি ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। মাক্কি জীবনের ২৩টি বছর অত্যাচারের এক স্টিমরোলার চালান হয়েছে। একবার এক বেদুইন মসজিদে পেশাব করে দিয়েছিল। তাকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তায়েফের ময়দানে দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে রক্তাক্ত হয়েছিলেন। ফেরেশতারা তাদের ওপর পাহাড় উঠিয়ে দিতে চেয়েছিল। নবী (সা.) তাদেরও ক্ষমা করে দিয়েছেন।

আমরা সদা-সর্বদা নিজেকে নবীর উম্মত দাবি করলেও তার আদর্শ থেকে যোজন-যোজন দূরে বাস করছি। আজকের দিনে আমাদের সমাজের অনেক দ্বীনদার মানুষের মধ্যেও মহানবীর ক্ষমার আদর্শ খুঁজে পাওয়া যায় না। নবীজি ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে জিহাদের ময়দানে অংশ নিয়েছেন। পেটে পাথর বেঁধে দিন কাটিয়ে দিয়েছেন।

এরপরও কখনও কোনও অভাবী মানুষ তার কাছে হাত পাতলে তিনি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। অসুস্থ মানুষের সেবা করার ক্ষেত্রে তিনি মুসলিম-অমুসলিম ফারাক করতেন না।

এক ইহুদি যুবক নবী (সা.)-এর খেদমত করতেন। তার মৃত্যুশয্যায় নবী (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। তিনি তার মাথার পাশে বসে বললেন, হে অমুক! তুমি ইসলাম গ্রহণ কর। যুবকটি তার পাশে থাকা পিতার দিকে তাকাল। পিতা তাকে বলল, আবুল কাসিমের কথা মেনে নাও। যুবকটি ইসলাম গ্রহণ করল। এরপর নবী (সা.) তার কাছ থেকে বের হয়ে এসে বললেন, আল্লাহর শুকরিয়া। তিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন। (বুখারি ১৩৫৬)।

আমরা আল্লাহর হকসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতন থাকলেও বান্দার হক বিষয়ে বড়ই অসচেতন। আমাদের নিকটাত্মীয় ও পাড়া-প্রতিবেশী অনেক কষ্টে থাকলে তাদের দিকে এক মুহূর্তের জন্য ফিরে তাকানোর সময় আমাদের নেই, যা রাসূল (সা.)-এর আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের সমাজের এক শ্রেণির মানুষ রাসূলের আদর্শকে বেচে খায় অথচ সত্যিকারার্থে তারা নিজেরাই রাসূলের আদর্শের ওপর নেই। সবার প্রতি বিদ্বেষমুক্ত অন্তরে দিন-রাতযাপন রাসূল (সা.)-এর খুবই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। মক্কা বিজয়ের দিন কাফেরদের সর্দার আবু সুফিয়ানকেও রাসূল (সা.) ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা সামান্য মনোমালিন্যতেই মানুষের সঙ্গে দিনের পর দিন যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। এটা কোনো মুমিনের জন্য মোটেই কাম্য নয়। রাসূল (সা.) ছিলেন উম্মতদের জন্য দয়া ও ভালোবাসার মূর্তপ্রতীক। রাসূল (সা.)-এর সাহাবিরা ছিলেন রাসূল (সা.)কে ভালোবাসার সর্বোত্তম নমুনা। রাসূলের হুকুমে মুহূর্তেই নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। আমাদের উচিত, তাদের মতোই রাসূলকে ভালোবাসা।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ; জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

সাহাবিদের নবীপ্রেম

 মেহেদী হাসান সাফিক 
২৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহর রাসূল (সা.) ছিলেন মায়া-মমতা ও ভালোবাসার এক মূর্তপ্রতীক। তিনি সর্বকালের সর্বোত্তম মহামানব।

সবুজ-কচি জীবন থেকে শুভ্র-প্রৌঢ় জীবন নাগাদ প্রতিটি ধাপের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটেছে তার জীবনে।

মহান আল্লাহকেও ভালোবাসতে হলে রাসূল (সা.)-এর অনুকরণ-অনুসরণ করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১)।

আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে হজরত আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেন, কোরআন-ই ছিল আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর চরিত্র।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। (সূরা আহযাব, আয়াত ২১)।

নিজের সন্তান-সন্তুতি মা-বাবাকে এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও রাসূল (সা.)কে বেশি ভালোবেসেছিলেন সাহাবিরা। রাসূলকে এতটা না ভালোবাসলে তো পরিপূর্ণ মুমিন হওয়াই সম্ভব হয় না। আর রাসূলকে ভালোবেসে তার রেখে যাওয়া অনুসৃত পথ অনুসরণ করে মুমিন বান্দারা দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।’ (বুখারি, হাদিস ১৪)।

সারাটি জীবন নবীজি ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। মাক্কি জীবনের ২৩টি বছর অত্যাচারের এক স্টিমরোলার চালান হয়েছে। একবার এক বেদুইন মসজিদে পেশাব করে দিয়েছিল। তাকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তায়েফের ময়দানে দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে রক্তাক্ত হয়েছিলেন। ফেরেশতারা তাদের ওপর পাহাড় উঠিয়ে দিতে চেয়েছিল। নবী (সা.) তাদেরও ক্ষমা করে দিয়েছেন।

আমরা সদা-সর্বদা নিজেকে নবীর উম্মত দাবি করলেও তার আদর্শ থেকে যোজন-যোজন দূরে বাস করছি। আজকের দিনে আমাদের সমাজের অনেক দ্বীনদার মানুষের মধ্যেও মহানবীর ক্ষমার আদর্শ খুঁজে পাওয়া যায় না। নবীজি ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে জিহাদের ময়দানে অংশ নিয়েছেন। পেটে পাথর বেঁধে দিন কাটিয়ে দিয়েছেন।

এরপরও কখনও কোনও অভাবী মানুষ তার কাছে হাত পাতলে তিনি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। অসুস্থ মানুষের সেবা করার ক্ষেত্রে তিনি মুসলিম-অমুসলিম ফারাক করতেন না।

এক ইহুদি যুবক নবী (সা.)-এর খেদমত করতেন। তার মৃত্যুশয্যায় নবী (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। তিনি তার মাথার পাশে বসে বললেন, হে অমুক! তুমি ইসলাম গ্রহণ কর। যুবকটি তার পাশে থাকা পিতার দিকে তাকাল। পিতা তাকে বলল, আবুল কাসিমের কথা মেনে নাও। যুবকটি ইসলাম গ্রহণ করল। এরপর নবী (সা.) তার কাছ থেকে বের হয়ে এসে বললেন, আল্লাহর শুকরিয়া। তিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন। (বুখারি ১৩৫৬)।

আমরা আল্লাহর হকসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতন থাকলেও বান্দার হক বিষয়ে বড়ই অসচেতন। আমাদের নিকটাত্মীয় ও পাড়া-প্রতিবেশী অনেক কষ্টে থাকলে তাদের দিকে এক মুহূর্তের জন্য ফিরে তাকানোর সময় আমাদের নেই, যা রাসূল (সা.)-এর আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের সমাজের এক শ্রেণির মানুষ রাসূলের আদর্শকে বেচে খায় অথচ সত্যিকারার্থে তারা নিজেরাই রাসূলের আদর্শের ওপর নেই। সবার প্রতি বিদ্বেষমুক্ত অন্তরে দিন-রাতযাপন রাসূল (সা.)-এর খুবই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। মক্কা বিজয়ের দিন কাফেরদের সর্দার আবু সুফিয়ানকেও রাসূল (সা.) ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা সামান্য মনোমালিন্যতেই মানুষের সঙ্গে দিনের পর দিন যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। এটা কোনো মুমিনের জন্য মোটেই কাম্য নয়। রাসূল (সা.) ছিলেন উম্মতদের জন্য দয়া ও ভালোবাসার মূর্তপ্রতীক। রাসূল (সা.)-এর সাহাবিরা ছিলেন রাসূল (সা.)কে ভালোবাসার সর্বোত্তম নমুনা। রাসূলের হুকুমে মুহূর্তেই নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। আমাদের উচিত, তাদের মতোই রাসূলকে ভালোবাসা।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ; জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়