জীবনভর উগ্রতা, সহিংসতার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি
jugantor
জীবনভর উগ্রতা, সহিংসতার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি

  আহনাফ আবদুল কাদির  

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মহানবী (সা.) আজীবন উগ্রতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জোরাল ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষত জাহেলি যুগে সামান্য ঘটনা কেন্দ্র করেও বড় ধরনের সংঘর্ষ দেখা দিত। আর তার রেশ চলত বছরের পর বছর।

মহানবী নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে থেকেই এসব উগ্র মানসিকতাকে ঘৃণা করতেন। নবুওতের আগে কাবাঘর পুনর্নির্মাণের সময় হাজারে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন নিয়ে মক্কার লোকেরা উগ্রতার চরম সীমায় পৌঁছে। প্রত্যেক গোত্রই অপরাপর গোত্র থেকে বেশি মর্যাদাবান দাবি করে নিজেদেরই এ কাজের বেশি হকদার বলে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সহিংসতায় রূপ নেয়।

তখন সবার সামনে বৃদ্ধ আবু উমাইয়া প্রস্তাব পেশ করেন- আগামীকাল ভোরে যে কাবার চত্বরে সর্বপ্রথম পা রাখবে সেই দেবে এর সমাধান। সে দিনের মতো তার প্রস্তাব সবাই মেনে নেয়।

পরদিন যুবক মুহাম্মদ (সা.) সবার আগে হাজির হন কাবার প্রান্তরে। তারপর এ উগ্রতা ও সহিংসতা দমনে তিনি এক চমৎকার সমাধান পেশ করেন। কালো পাথরটি রুমালের ওপর রেখে সব গোত্র থেকে গোত্রপ্রধানদের নিয়ে ধরাধরি করে কাবার দেয়ালে প্রতিস্থাপন করেন। এতে সবাই তার ওপর পরম সন্তোষ প্রকাশ করে। জাহেলি আরবের লোকেরা পরিচিত হয় এক অসাধারণ যুবক নেতার সঙ্গে। সবার মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সহিংসতার কবল থেকে রক্ষা পায় কাবা চত্বর।

নবুওয়াত প্রাপ্তির পর রাসূল (সা.) আজীবন অন্যায়, অবিচার ও উগ্রতা দমনে সচেষ্ট ছিলেন। সমাজ পরিবর্তনে তিনি কখনই উগ্রতা দেখাননি। তার দয়া, ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় চরম শত্রুরাও মুগ্ধ হয়ে যেত। ভিন্ন ধর্মের কেউ অন্যায় করলেও তিনি রূঢ় আচরণ করতেন না। একবার এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে এসে পেশাব করে দিল। সাহাবিরা তাকে মারতে এলে নবীজি বাধা দেন এবং বলেন, যে কোনো বিষয় সহজভাবে নেবে। উগ্রতা দেখাবে না। তারপর তিনি এক বালতি পানি এনে জায়গাটি পরিষ্কার করলেন। এরপর লোকটিকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, এটি তো পেশাবের জায়গা নয়, বরং নামাজ ও আল্লাহর জিকিরের জায়গা। এতে লোকটি তার ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হল। (বুখারি, ইবনে মাজাহ)।

তিনি শক্তি ও সামর্থ্য হওয়া সত্ত্বেও উগ্রতা ও কঠোরতা দেখাতেন না। বরং মানুষের চিন্তার জগতকে পরিবর্তনের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা দূর করার জন্য কাজ করতেন। এমন অসংখ্য প্রমাণাদি রয়েছে প্রসিদ্ধ হাদিস ও সিরাত গ্রন্থাবলিতে। অস্ত্রের ঝনঝনানি আর যুদ্ধের প্রস্তুতি মুহূর্তের মধ্যে থেমে যেত তার কৌশলী পদক্ষেপে। সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে মক্কায় হজ করতে এসে হুদায়বিয়া নামক স্থানে কাফেরদের তীব্র বাধার মুখে পড়েন নবীজি।

তবু অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে যেতে কাফেরদের সব একপেশে শর্ত মেনে নিয়ে হজ না করেই ফিরে আসেন মদিনায়। উগ্রতার পরিবর্তে ধৈর্য, সাহসিকতা আর নমনীয়তার পরিচয় দিতেন নবীজি (সা.)।

এমনকি এক সময় যেই মক্কার কুরাইশরা তাকে অকথ্য নির্যাতন করে দেশছাড়া করেছিল মক্কা বিজয়ের দিন তাদের সবাইকে হাতের কাছে পেয়েও তিনি ক্ষমা করে দেন। প্রতিশোধের আগুন নিভে যেত তার ক্ষমার গুণের কাছে। বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) অনৈক্য, উগ্রতা ও সহিংসতার পথকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ঐক্য, শান্তি ও সম্প্রীতির পতাকা উড়িয়েছেন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

Email: [email protected]

জীবনভর উগ্রতা, সহিংসতার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি

 আহনাফ আবদুল কাদির 
২৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মহানবী (সা.) আজীবন উগ্রতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জোরাল ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষত জাহেলি যুগে সামান্য ঘটনা কেন্দ্র করেও বড় ধরনের সংঘর্ষ দেখা দিত। আর তার রেশ চলত বছরের পর বছর।

মহানবী নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে থেকেই এসব উগ্র মানসিকতাকে ঘৃণা করতেন। নবুওতের আগে কাবাঘর পুনর্নির্মাণের সময় হাজারে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন নিয়ে মক্কার লোকেরা উগ্রতার চরম সীমায় পৌঁছে। প্রত্যেক গোত্রই অপরাপর গোত্র থেকে বেশি মর্যাদাবান দাবি করে নিজেদেরই এ কাজের বেশি হকদার বলে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সহিংসতায় রূপ নেয়।

তখন সবার সামনে বৃদ্ধ আবু উমাইয়া প্রস্তাব পেশ করেন- আগামীকাল ভোরে যে কাবার চত্বরে সর্বপ্রথম পা রাখবে সেই দেবে এর সমাধান। সে দিনের মতো তার প্রস্তাব সবাই মেনে নেয়।

পরদিন যুবক মুহাম্মদ (সা.) সবার আগে হাজির হন কাবার প্রান্তরে। তারপর এ উগ্রতা ও সহিংসতা দমনে তিনি এক চমৎকার সমাধান পেশ করেন। কালো পাথরটি রুমালের ওপর রেখে সব গোত্র থেকে গোত্রপ্রধানদের নিয়ে ধরাধরি করে কাবার দেয়ালে প্রতিস্থাপন করেন। এতে সবাই তার ওপর পরম সন্তোষ প্রকাশ করে। জাহেলি আরবের লোকেরা পরিচিত হয় এক অসাধারণ যুবক নেতার সঙ্গে। সবার মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সহিংসতার কবল থেকে রক্ষা পায় কাবা চত্বর।

নবুওয়াত প্রাপ্তির পর রাসূল (সা.) আজীবন অন্যায়, অবিচার ও উগ্রতা দমনে সচেষ্ট ছিলেন। সমাজ পরিবর্তনে তিনি কখনই উগ্রতা দেখাননি। তার দয়া, ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় চরম শত্রুরাও মুগ্ধ হয়ে যেত। ভিন্ন ধর্মের কেউ অন্যায় করলেও তিনি রূঢ় আচরণ করতেন না। একবার এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে এসে পেশাব করে দিল। সাহাবিরা তাকে মারতে এলে নবীজি বাধা দেন এবং বলেন, যে কোনো বিষয় সহজভাবে নেবে। উগ্রতা দেখাবে না। তারপর তিনি এক বালতি পানি এনে জায়গাটি পরিষ্কার করলেন। এরপর লোকটিকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, এটি তো পেশাবের জায়গা নয়, বরং নামাজ ও আল্লাহর জিকিরের জায়গা। এতে লোকটি তার ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হল। (বুখারি, ইবনে মাজাহ)।

তিনি শক্তি ও সামর্থ্য হওয়া সত্ত্বেও উগ্রতা ও কঠোরতা দেখাতেন না। বরং মানুষের চিন্তার জগতকে পরিবর্তনের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা দূর করার জন্য কাজ করতেন। এমন অসংখ্য প্রমাণাদি রয়েছে প্রসিদ্ধ হাদিস ও সিরাত গ্রন্থাবলিতে। অস্ত্রের ঝনঝনানি আর যুদ্ধের প্রস্তুতি মুহূর্তের মধ্যে থেমে যেত তার কৌশলী পদক্ষেপে। সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে মক্কায় হজ করতে এসে হুদায়বিয়া নামক স্থানে কাফেরদের তীব্র বাধার মুখে পড়েন নবীজি।

তবু অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধকে এড়িয়ে যেতে কাফেরদের সব একপেশে শর্ত মেনে নিয়ে হজ না করেই ফিরে আসেন মদিনায়। উগ্রতার পরিবর্তে ধৈর্য, সাহসিকতা আর নমনীয়তার পরিচয় দিতেন নবীজি (সা.)।

এমনকি এক সময় যেই মক্কার কুরাইশরা তাকে অকথ্য নির্যাতন করে দেশছাড়া করেছিল মক্কা বিজয়ের দিন তাদের সবাইকে হাতের কাছে পেয়েও তিনি ক্ষমা করে দেন। প্রতিশোধের আগুন নিভে যেত তার ক্ষমার গুণের কাছে। বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) অনৈক্য, উগ্রতা ও সহিংসতার পথকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ঐক্য, শান্তি ও সম্প্রীতির পতাকা উড়িয়েছেন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

Email: [email protected]