ইসরা থেকে মিরাজ

  ড. জিশান আরা আরাফুন্নেছা ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসরা থেকে মিরাজ

হাদিসে বলা হয়েছে, রজব মাস আল্লাহর মাস, শাবান তাঁর [নবীজী (সা.)]-এর মাস, আর রমজান তাঁর উম্মতের মাস। রজব মাসের মর্যাদা অন্যান্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি। এ মাসেই আল্লাহতায়ালার নির্দেশে মহানবী (সা.)-এর জীবনে ঘটেছিল সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল, বিস্ময়কর ও চমকপ্রদ ঘটনা- মহাশূন্য ভ্রমণ; ইস্রা আর মিরাজ।

সপ্তম আসমান পার হয়ে সিদরাতুল মুনতাহা সফর অবশেষে আল্লাহ পাকের দিদার লাভ।

নবুয়্যতের দশম বছরে পরপর দুটি শোকাবহ ঘটনা মহানবী (সা.)-এর জীবনে ঘটে। এ বছর তাঁর চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। নবীজী (সা.) যখন চারদিকে শত্র“কবলিত হয়ে সময় অতিবাহিত করছিলেন তখন এ চাচা ভাতিজাকে আগলে রেখেছেন।

চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর কয়েকদিন পরই মহানবী (সা.)-কে শোক সাগরে ভাসিয়ে তাঁর জীবনসঙ্গিনী, প্রেমাস্পদ বিবি খাদিজা (রা.) পরপারে পাড়ি জমান। প্রিয়জনের বিদায় আঘাতে যখন নবীজী ছটফট করছিলেন- এমন সময়ই সৃষ্টিকর্তা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল সাধনে মিরাজের মর্যাদা দিয়ে নবীজীকে সম্মানিত করেন।

এক রাতের কিছু অংশে ঐশী নির্দেশনায় মহানবী (সা.) ভ্রমণ করেছিলেন মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং সাত আসমান পাড়ি দিয়ে আরশে মুয়াল্লায় যেখানে তিনি আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালার সঙ্গে সশরীরে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

বিস্ময়কর এ যাত্রা! নবুয়্যতের দ্বাদশ বছর। রজব মাসের ২৭ তারিখে গভীর রাতে নিদ্রামগ্ন মহানবী (সা.)-কে জাগ্রত করে জিবরাঈল (আ.) জানান যে, আল্লাহ পাক তাঁকে আরশে মুয়াল্লায় ডেকে পাঠিয়েছেন।

শুরু হয় নবীজীর বিস্ময়কর নৈশ ভ্রমণ ও ঊর্ধ্বলোক যাত্রা। এ সম্পর্কে কোরআনুল কারিমের সূরা বনি ইসরাইলে সুস্পষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে। এ জন্য এ সূরাটিকে ‘সুরাতুল ইসরা’ও বলা হয়। এক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘...তিনিই ওই পবিত্র সত্তা, যিনি তার বান্দাকে এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে দূরের ওই মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে গেলেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছি, যাতে তাকে আমার কতক নিদর্শন দেখাতে পারি।

নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন’ (সূরা বনি ইসরাঈল : ১)। এ আয়াতে ‘লাইলান’ শব্দটি ব্যবহার করে রাতের এক অংশ বা কিছু অংশকে বুঝানো হয়েছে। কুদরতী ভ্রমণ ইসরা এবং মিরাজ দিয়ে প্রায় চল্লিশ রাতের দূরত্বের সফরকে রাতের কিছু অংশে সম্পাদন করানো হল।

মিরাজ কথাটির জন্ম আরবি ‘উরূজ’ শব্দ থেকে, যার শাব্দিক অর্থ হল আরোহণ করা বা ওপরে ওঠা। মহানবী (সা.)-কে নিয়ে জিবরাইল (আ.) প্রথম আসমানে পৌঁছে আসমানের দরজা খুলতে বললে দ্বাররক্ষী ফেরেশ্তা নবীজীর (সা.)-এর পরিচয় জানতে চান।

ফেরেশ্তা তাঁর ঊর্ধ্বাকাশে আসার কারণ জানতে চাইলে জিবরাইল (আ.) তার উত্তর দেন। একে একে সপ্তম আসমান পর্যন্ত সব আসমানের দ্বাররক্ষী ফেরেশ্তাই একই প্রশ্ন করেন এবং জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে মহানবীর (সা.) পরিচয় পেয়ে এবং স্রষ্টার নির্দেশে তাঁর এ ভ্রমণের বিষয় জানতে পেরে সবাই অভিবাদন জানিয়ে তাঁর জন্য আসমানের দরজা খুলে দেন। এগোতে এগোতে এভাবে তাঁরা সিদরাতুল মুনতাহার কাছে পৌঁছে যান।

সিদ্রাতুল মুনতাহায় নবীজী (সা.) জিবরাইল (আ.)-কে আসল রূপে দেখলেন। তিনি সেখানে আল্লাহতায়ালার অগণিত অতুলনীয় নিদর্শন, নূরে তাজাল্লি, বিস্ময়কর কুদরত, অসংখ্য ফেরেশ্তাদের পালক- যা সিদ্রাতুল মুনতাহাকে ঘিরে রেখেছে- প্রত্যক্ষ করলেন।

জিবরাইল (আ.) এ সফরে নবীজীকে বেহেশত ও দোজখ দেখালেন। তিনি বেহেশ্তের নিয়ামতগুলো এবং কি কি নেক কাজের মাধ্যমে কোন্টি লাভ করা যায় তার সবই জানালেন। এরপর বললেন, ‘হে রাসূল! এর চেয়ে সামনে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।

আমি যদি এখান থেকে আরও অগ্রসর হই, তাহলে নূরের তাপে পুড়ে যাব। এরপর ‘রাফরাফ’ নামের দ্রুতগামী বাহনে মহানবী (সা.) আরশে মুয়াল্লা পৌঁছলেন।

আল্লাহর দরবার থেকে উম্মতের জন্য তিনি সেই রাতে যেসব নিয়ামত এনেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম হল ফরজ নামাজ। নামাজে রয়েছে ফজিলত মুসলমানের প্রতি নামাজের মাধ্যমেই মিরাজ হবে বলে রাসূলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নামাজ হচ্ছে মুমিনের মিরাজ।’

জাগতিক হিসেবে মহানবী (সা.) ২৭ বছরের সমপরিমাণ সময় মিরাজের একটা রাতের কিছু সময়ের মধ্যেই এ অলৌকিক ও ঐশী ভ্রমণ সম্পন্ন করেছিলেন। আল্লাহর কুদরত নিয়ে ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.