মায়ের ভাষা দাওয়াতের প্রাণ
jugantor
মায়ের ভাষা দাওয়াতের প্রাণ

  মাহমুদা আক্তার নীনা  

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহর কিতাব হেদায়েতের আলোকবর্তিকা অর্থাৎ আলোকিত পথের দিশা। আল্লাহ তাঁর কিতাবের শিক্ষা, জ্ঞান ও উপদেশ দ্বারা বিশ্বভুবনে মানবসভ্যতার আলো জ্বালিয়েছেন।

তাই তো তিনি কুরআনে বলেছেন, ‘তিনি (আল্লাহ) তাঁর বান্দার প্রতি স্পষ্ট আয়াত নাজিল করেন তোমাদের অন্ধকার থেকে আলোয় আনতে’ (সূরা হাদিদ, আয়াত ৯)।

অর্থাৎ তিনি তাঁর কিতাব দ্বারা মানবজাতিকে অজ্ঞতার অন্ধকার ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলো ও ইমানের আলোয় আনতে চেয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, রাসূলকে কবিতা শিখাইনি এবং তাঁর জন্য তা শোভনীয় নয়, ইহা শুধু উপদেশ ও স্পষ্ট কুরআন। যাতে সে জাগ্রত চিত্তের ব্যক্তিদের ভয় প্রদর্শন করে এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে শাস্তির বাক্য সত্যি হয় (সূরা ইয়াছিন, আয়াত ৬৯-৭০)।

এ ছাড়াও তিনি সূরা কামারের ১৭, ২২, ৩২ ও ৪০নং আয়াতে একইভাবে বলেন, উপদেশ গ্রহণের জন্য আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি। আছ কি কেউ, এর থেকে উপদেশ গ্রহণের?

মানুষ যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের কথা উপদেশ পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে, সে জন্য তিনি প্রত্যেক রাসূলকে স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং প্রত্যেক রাসূলের কাছে নিজ নিজ জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষায় কিতাব নাজিল করেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক রাসূলকেই আমি স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছি, যেনো তাদের (স্বজাতিকে) পরিষ্কার বুঝাতে পারে’ (সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৪)।

এ আয়াতটি মাতৃভাষা চেতনার আলো ছড়িয়ে চলেছে। সত্যান্বেষী ধর্মানুরাগী ব্যক্তির অন্তরকে এ আয়াতটি রাঙিয়ে দিতে পারে গভীর অনুরাগে। এ আয়াতটি সত্যান্বেষী জাগ্রত চিত্তের অধিকারী ব্যক্তির অন্তরকে আল্লাহপ্রদত্ত ভাষানীতির সরলপথের অনুসন্ধানে ধাবিত করতে যথেষ্ট বলেই আমি মনে করি।

ধর্মসচেতন, ধর্মভীরুদের সত্যানুসন্ধানে তৎপর থাকা অত্যাবশ্যক। এ আয়াতে ব্যাপক প্রচারই ধর্মসচেতন ব্যক্তির অন্তরে ভাষা চেতনার উন্মেষ ঘটাবে। মাতৃভাষার কুরআনই জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনবে। উপদেশ ও হেদায়েত পেতে হলে সে কথা বুঝতে হবে ও জানতে হবে।

বোঝার জন্য বোধগম্য ভাষা অত্যাবশ্যকীয় ও অপরিহার্য। বোঝার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েই আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন (ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ হওয়ার আগে), তোমরা মদ্যপান করে ততক্ষণ পর্যন্ত নামাজের কাছেও এসো না, যতক্ষণ না যা বলছ তা বুঝতে পার। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বোঝার ওপরেই গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম দিল, সে তার কিছুই বুঝল না। এ ছাড়াও তিনি বলেছেন, ‘নামাজের মধ্যে ঘুমের ভাব এলে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেবে। কেননা ঘুমজড়ানো চোখে নামাজ পড়া হলে নামাজি তা বুঝতে পারে না, সে কিছু পাঠ করছে না কাউকে গালি দিচ্ছে’।

ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, তোমরা নিজেদের কুরআন খতমের প্রতিযোগিতায় প্রলুব্ধ করো না, কেননা সারা রাতে না বুঝে দুবার কুরআন খতম দেওয়ার চেয়ে বুঝে একটি আয়াত পাঠ করাও উত্তম। অর্থাৎ কথা হচ্ছে- না বুঝে দুবার কুরআন খতম দেওয়ার চেয়ে বুঝে একটি আয়াত পাঠ করাও উত্তম।

তাহলে আমাদের এ খতমে তারাবিহ, কুরআন খতমের প্রতিযোগিতা আমরা কোন মাপে মাপব? আমাদের দেশে অনেক নারীকে দেখা যায়, জীর্ণ কুটিরে বসে মাটির পিদিম জ্বালিয়ে রাত্রি নিশীথেও কুরআন পাঠে মশগুল থাকেন রমজানে কুরআন খতমের প্রতিযোগিতায়।

তাদের কেউ কেউ বছরের কয়েকবারও কুরআন খতম দেন। কিন্তু অবোধ ভাষার কারণে তারা অজ্ঞতার যেই তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই পড়ে থাকে।

তাদের মন-মানসিকতা ডুবে থাকে নিশীথ অন্ধকারে। সেখানে এ পাঠ যদি সহজবোধ্য মাতৃভাষায় হতো, তাহলে এসব নারীর মধ্য থেকেই তৈরি হতো অনেক কুরআন গবেষক, জ্ঞানতাপসী ও জ্ঞানানুরাগী। সন্তানদের দেখাতে পারত আলোর পথ। সন্তানের জন্য বয়ে আনত কল্যাণ।

আল্লাহ মাতৃভাষা বা জাতিসত্তার ভাষাকে প্রাকৃতিক বোধগম্য শক্তিদ্বারা আলোকিত করেছেন। কেবল মাতৃভাষাই নিশ্চিত বোধগম্য ভাষা। এ ভাষার আলো মধ্য দিনের সূর্যালোকের মতোই। তাই তো আল্লাহতায়ালা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তাদের মাতৃভাষাকেই নির্ধারণ করেছেন।

মানবজাতির শিক্ষা ও জ্ঞানগত মুক্তির জন্য তাদের দিয়েছেন ভাষাগত মুক্তি। তাই রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে দাবি জানাই কুরআন-হাদিস পাঠ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে আরবি ভাষার সঙ্গে মাতৃভাষাকে বাধ্যতামূলক করার। ফেব্রুয়ারি এলে বেশ কিছু পত্রিকা ধর্মের পাতায় মাতৃভাষার বিষয়ে লেখা প্রকাশ করে। যা দেখে মনে হয় এতদিনের বিরহের নিশি বুঝি ভোর হলো।

আমাদের ভাষা, ভাষাশহিদদের রক্তের আতর মাখা। এ ভাষার সৌরভ বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা ভাষাশহিদের জাতি। উষার দুয়ারে হানি আঘাত আমরা আনিব রাঙা প্রভাত, আমরা টুটাব তিমির রাত।’ আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

মায়ের ভাষা দাওয়াতের প্রাণ

 মাহমুদা আক্তার নীনা 
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহর কিতাব হেদায়েতের আলোকবর্তিকা অর্থাৎ আলোকিত পথের দিশা। আল্লাহ তাঁর কিতাবের শিক্ষা, জ্ঞান ও উপদেশ দ্বারা বিশ্বভুবনে মানবসভ্যতার আলো জ্বালিয়েছেন।

তাই তো তিনি কুরআনে বলেছেন, ‘তিনি (আল্লাহ) তাঁর বান্দার প্রতি স্পষ্ট আয়াত নাজিল করেন তোমাদের অন্ধকার থেকে আলোয় আনতে’ (সূরা হাদিদ, আয়াত ৯)।

অর্থাৎ তিনি তাঁর কিতাব দ্বারা মানবজাতিকে অজ্ঞতার অন্ধকার ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলো ও ইমানের আলোয় আনতে চেয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, রাসূলকে কবিতা শিখাইনি এবং তাঁর জন্য তা শোভনীয় নয়, ইহা শুধু উপদেশ ও স্পষ্ট কুরআন। যাতে সে জাগ্রত চিত্তের ব্যক্তিদের ভয় প্রদর্শন করে এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে শাস্তির বাক্য সত্যি হয় (সূরা ইয়াছিন, আয়াত ৬৯-৭০)।

এ ছাড়াও তিনি সূরা কামারের ১৭, ২২, ৩২ ও ৪০নং আয়াতে একইভাবে বলেন, উপদেশ গ্রহণের জন্য আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি। আছ কি কেউ, এর থেকে উপদেশ গ্রহণের?

মানুষ যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের কথা উপদেশ পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে, সে জন্য তিনি প্রত্যেক রাসূলকে স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং প্রত্যেক রাসূলের কাছে নিজ নিজ জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষায় কিতাব নাজিল করেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক রাসূলকেই আমি স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছি, যেনো তাদের (স্বজাতিকে) পরিষ্কার বুঝাতে পারে’ (সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৪)।

এ আয়াতটি মাতৃভাষা চেতনার আলো ছড়িয়ে চলেছে। সত্যান্বেষী ধর্মানুরাগী ব্যক্তির অন্তরকে এ আয়াতটি রাঙিয়ে দিতে পারে গভীর অনুরাগে। এ আয়াতটি সত্যান্বেষী জাগ্রত চিত্তের অধিকারী ব্যক্তির অন্তরকে আল্লাহপ্রদত্ত ভাষানীতির সরলপথের অনুসন্ধানে ধাবিত করতে যথেষ্ট বলেই আমি মনে করি।

ধর্মসচেতন, ধর্মভীরুদের সত্যানুসন্ধানে তৎপর থাকা অত্যাবশ্যক। এ আয়াতে ব্যাপক প্রচারই ধর্মসচেতন ব্যক্তির অন্তরে ভাষা চেতনার উন্মেষ ঘটাবে। মাতৃভাষার কুরআনই জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনবে। উপদেশ ও হেদায়েত পেতে হলে সে কথা বুঝতে হবে ও জানতে হবে।

বোঝার জন্য বোধগম্য ভাষা অত্যাবশ্যকীয় ও অপরিহার্য। বোঝার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েই আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন (ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ হওয়ার আগে), তোমরা মদ্যপান করে ততক্ষণ পর্যন্ত নামাজের কাছেও এসো না, যতক্ষণ না যা বলছ তা বুঝতে পার। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বোঝার ওপরেই গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম দিল, সে তার কিছুই বুঝল না। এ ছাড়াও তিনি বলেছেন, ‘নামাজের মধ্যে ঘুমের ভাব এলে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেবে। কেননা ঘুমজড়ানো চোখে নামাজ পড়া হলে নামাজি তা বুঝতে পারে না, সে কিছু পাঠ করছে না কাউকে গালি দিচ্ছে’।

ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, তোমরা নিজেদের কুরআন খতমের প্রতিযোগিতায় প্রলুব্ধ করো না, কেননা সারা রাতে না বুঝে দুবার কুরআন খতম দেওয়ার চেয়ে বুঝে একটি আয়াত পাঠ করাও উত্তম। অর্থাৎ কথা হচ্ছে- না বুঝে দুবার কুরআন খতম দেওয়ার চেয়ে বুঝে একটি আয়াত পাঠ করাও উত্তম।

তাহলে আমাদের এ খতমে তারাবিহ, কুরআন খতমের প্রতিযোগিতা আমরা কোন মাপে মাপব? আমাদের দেশে অনেক নারীকে দেখা যায়, জীর্ণ কুটিরে বসে মাটির পিদিম জ্বালিয়ে রাত্রি নিশীথেও কুরআন পাঠে মশগুল থাকেন রমজানে কুরআন খতমের প্রতিযোগিতায়।

তাদের কেউ কেউ বছরের কয়েকবারও কুরআন খতম দেন। কিন্তু অবোধ ভাষার কারণে তারা অজ্ঞতার যেই তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই পড়ে থাকে।

তাদের মন-মানসিকতা ডুবে থাকে নিশীথ অন্ধকারে। সেখানে এ পাঠ যদি সহজবোধ্য মাতৃভাষায় হতো, তাহলে এসব নারীর মধ্য থেকেই তৈরি হতো অনেক কুরআন গবেষক, জ্ঞানতাপসী ও জ্ঞানানুরাগী। সন্তানদের দেখাতে পারত আলোর পথ। সন্তানের জন্য বয়ে আনত কল্যাণ।

আল্লাহ মাতৃভাষা বা জাতিসত্তার ভাষাকে প্রাকৃতিক বোধগম্য শক্তিদ্বারা আলোকিত করেছেন। কেবল মাতৃভাষাই নিশ্চিত বোধগম্য ভাষা। এ ভাষার আলো মধ্য দিনের সূর্যালোকের মতোই। তাই তো আল্লাহতায়ালা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তাদের মাতৃভাষাকেই নির্ধারণ করেছেন।

মানবজাতির শিক্ষা ও জ্ঞানগত মুক্তির জন্য তাদের দিয়েছেন ভাষাগত মুক্তি। তাই রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে দাবি জানাই কুরআন-হাদিস পাঠ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে আরবি ভাষার সঙ্গে মাতৃভাষাকে বাধ্যতামূলক করার। ফেব্রুয়ারি এলে বেশ কিছু পত্রিকা ধর্মের পাতায় মাতৃভাষার বিষয়ে লেখা প্রকাশ করে। যা দেখে মনে হয় এতদিনের বিরহের নিশি বুঝি ভোর হলো।

আমাদের ভাষা, ভাষাশহিদদের রক্তের আতর মাখা। এ ভাষার সৌরভ বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা ভাষাশহিদের জাতি। উষার দুয়ারে হানি আঘাত আমরা আনিব রাঙা প্রভাত, আমরা টুটাব তিমির রাত।’ আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।