শান্তির জন্য ধর্ম
jugantor
শান্তির জন্য ধর্ম

  মাহমুদ আহমদ  

১৬ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ম ঐশ্বরিক, এটা মানুষের একান্ত স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যেরই নাম, যার কারণে সে নিজের অজান্তে স্বীয় স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করে। নবীগণের যারা বিরোধিতা করতেন, তারাও স্বীয় পূর্বপুরুষের ধর্ম পালন করতেন। ধর্ম মানুষের আনন্দ, বেদনা, ভালোবাসা, ইত্যাদির মতো মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি, যে বৈশিষ্ট্য তাকে ভাবতে শেখায় যে, মহাশক্তিশালী কেউ তার অভিভাবক।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘ধর্ম সৎকর্মশীলদের জন্য হেদায়াত এবং রহমত স্বরূপ’ (সূরা লোকমান, আয়াত : ৩)। ধর্ম মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করে আর মন্দকর্ম থেকে বিরত রাখে। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ উন্নত ও যুগোপযোগী জীবন বিধান নিয়ে এসেছেন। কেননা আল্লাহ কারও ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। মানব শিশু মানবীয় সব বৈশিষ্ট্য ধারণ করলেও একমাত্র পরিণত বয়সেই সে এর সব কিছুর উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। তাই বলে এর আগে তাকে দেওয়া শিক্ষা তো মূল্যহীন নয়। যেমন আমরা সবাই জানি, পশু জন্ম নিলেই পশু কিন্তু মানুষ জন্ম নিলেই মানুষ নয়, তাকে আবার মানুষ হিসাবে জন্ম নিতে হয়। মানুষ যখন মন, মেধা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরিপূর্ণতা লাভ করল, তখনই পরিপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হলো।

ধর্ম হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সেতুবন্ধ সৃষ্টিকারী পথ-নির্দেশনা। ধর্ম মানুষের জন্য বয়ে আনে কল্যাণ। ধর্ম মানুষকে এ শিক্ষা দেয় যে, তার জীবনের উদ্দেশ্য কী, কী তার করণীয় এবং কীভাবে জীবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে পারে। যুগে যুগে মানুষ যখন অজ্ঞতাকে আলিঙ্গন করে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই ধর্ম প্রবর্তক ও সংস্কারকেরা স্রষ্টার পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা ও মুক্তির শাশ্বত উপায় নিয়ে এ ধরাধামে আগমন করে মানবজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। অনেকের ধারণা, ধর্মের জন্যই পৃথিবীতে রক্তপাত বেশি হচ্ছে অথচ কোনো ধর্মই রক্তপাতের কথা বলেনি বা কোনো ধর্মই চায় না সমাজে অশান্তি বিরাজ করুক। বরং ধর্ম একটি ফলবতী গাছ ধংস করতেও বারণ করে। ধর্ম মানুষকে স্বীয় প্রবৃত্তি দমন করার মাধ্যমে সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিয়েছে। ধর্ম মানুষকে মানুষের জন্য শান্তি কামনা করার শিক্ষা দিয়েছে আর ইসলামে পারস্পরিক সালাম বিনিময়ের প্রথা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখনো প্রায় সব ধর্মেই বিভিন্নভাবে এ প্রথা প্রচলিত আছে। ধর্ম অস্ত্র-ধারণ করতে বলেছে শুধু আত্মরক্ষার জন্য। আর আত্মরক্ষা করার অধিকার সবারই আছে। তাহলে ধর্মের দোষ হবে কেন? সর্বদা পরিবর্তনশীল এ ধরাধামে মানুষ যখন স্বীয় সংকীর্ণ স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্ম তখন শিকার হয় অপব্যাখ্যার, ব্যবহৃত হয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে। তখন ধর্ম হয় কারও জন্য লাভজনক এবং কারও জন্য স্বপ্ন।

ধর্ম যখন ‘লাভজনক’ হয় তখন আমরা সৃষ্টির কল্যাণে কাজ না করে শুধু মোনাজাতে স্রষ্টার সান্নিধ্য কামনা করি; জ্ঞানচর্চা ছেড়ে আমিত্ব ও স্বার্থের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে অন্যায় ও পাপাচারে লিপ্ত হই তখন ধর্ম হয়ে ওঠে কারও কাছে বাহ্যিক আড়ম্বরতা এবং কারও কাছে উপার্জনের উৎস।

ধর্ম মানুষকে এ পার্থিব জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে অনন্ত জীবনের পথে নিয়ে চলে। দর্শন অথবা বিজ্ঞান এখনো বলতে পারে না, জীবনাবসানের পর মানুষের আত্মার প্রকৃত অবস্থা কী হবে? ধর্ম মানুষকে চিরস্থায়ী ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী স্রষ্টার সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে মানবজীবনকে অর্থবহ ও উচ্চ মর্যাদা দান করে। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হওয়ার রহস্য নিহিত। তাই যুগে যুগে ধর্ম মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছে। নয়তো একটি প্রাণীর জীবন থেকে মানুষের জীবনের ভিন্নতা কি শুধুই মেধায়? জীবন্ত ধর্মে আল্লাহর অসন্তুষ্টির নাম জাহান্নাম এবং সন্তুষ্টির নাম জান্নাত।

একজন মানুষ সে যে ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন সে যদি তার ধর্মের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে চলে তাহলে পরিবার, সমাজ ও দেশে কোনো ভাবেই বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে না। আজকে সর্বত্রে যে অশান্তি এর মূল কারণ হলো মানুষ তার ধর্মের প্রকৃত আদেশ নিষেধ মেনে চলছে না। আমাদের সবার উচিত হবে আমাদের সৃষ্টিকর্তার আদেশ নিষেধ মেনে চলে জীবন পরিচালনা করা।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

শান্তির জন্য ধর্ম

 মাহমুদ আহমদ 
১৬ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ম ঐশ্বরিক, এটা মানুষের একান্ত স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যেরই নাম, যার কারণে সে নিজের অজান্তে স্বীয় স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করে। নবীগণের যারা বিরোধিতা করতেন, তারাও স্বীয় পূর্বপুরুষের ধর্ম পালন করতেন। ধর্ম মানুষের আনন্দ, বেদনা, ভালোবাসা, ইত্যাদির মতো মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি, যে বৈশিষ্ট্য তাকে ভাবতে শেখায় যে, মহাশক্তিশালী কেউ তার অভিভাবক।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘ধর্ম সৎকর্মশীলদের জন্য হেদায়াত এবং রহমত স্বরূপ’ (সূরা লোকমান, আয়াত : ৩)। ধর্ম মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করে আর মন্দকর্ম থেকে বিরত রাখে। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ উন্নত ও যুগোপযোগী জীবন বিধান নিয়ে এসেছেন। কেননা আল্লাহ কারও ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। মানব শিশু মানবীয় সব বৈশিষ্ট্য ধারণ করলেও একমাত্র পরিণত বয়সেই সে এর সব কিছুর উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। তাই বলে এর আগে তাকে দেওয়া শিক্ষা তো মূল্যহীন নয়। যেমন আমরা সবাই জানি, পশু জন্ম নিলেই পশু কিন্তু মানুষ জন্ম নিলেই মানুষ নয়, তাকে আবার মানুষ হিসাবে জন্ম নিতে হয়। মানুষ যখন মন, মেধা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরিপূর্ণতা লাভ করল, তখনই পরিপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হলো।

ধর্ম হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সেতুবন্ধ সৃষ্টিকারী পথ-নির্দেশনা। ধর্ম মানুষের জন্য বয়ে আনে কল্যাণ। ধর্ম মানুষকে এ শিক্ষা দেয় যে, তার জীবনের উদ্দেশ্য কী, কী তার করণীয় এবং কীভাবে জীবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে পারে। যুগে যুগে মানুষ যখন অজ্ঞতাকে আলিঙ্গন করে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই ধর্ম প্রবর্তক ও সংস্কারকেরা স্রষ্টার পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা ও মুক্তির শাশ্বত উপায় নিয়ে এ ধরাধামে আগমন করে মানবজাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। অনেকের ধারণা, ধর্মের জন্যই পৃথিবীতে রক্তপাত বেশি হচ্ছে অথচ কোনো ধর্মই রক্তপাতের কথা বলেনি বা কোনো ধর্মই চায় না সমাজে অশান্তি বিরাজ করুক। বরং ধর্ম একটি ফলবতী গাছ ধংস করতেও বারণ করে। ধর্ম মানুষকে স্বীয় প্রবৃত্তি দমন করার মাধ্যমে সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিয়েছে। ধর্ম মানুষকে মানুষের জন্য শান্তি কামনা করার শিক্ষা দিয়েছে আর ইসলামে পারস্পরিক সালাম বিনিময়ের প্রথা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখনো প্রায় সব ধর্মেই বিভিন্নভাবে এ প্রথা প্রচলিত আছে। ধর্ম অস্ত্র-ধারণ করতে বলেছে শুধু আত্মরক্ষার জন্য। আর আত্মরক্ষা করার অধিকার সবারই আছে। তাহলে ধর্মের দোষ হবে কেন? সর্বদা পরিবর্তনশীল এ ধরাধামে মানুষ যখন স্বীয় সংকীর্ণ স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্ম তখন শিকার হয় অপব্যাখ্যার, ব্যবহৃত হয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে। তখন ধর্ম হয় কারও জন্য লাভজনক এবং কারও জন্য স্বপ্ন।

ধর্ম যখন ‘লাভজনক’ হয় তখন আমরা সৃষ্টির কল্যাণে কাজ না করে শুধু মোনাজাতে স্রষ্টার সান্নিধ্য কামনা করি; জ্ঞানচর্চা ছেড়ে আমিত্ব ও স্বার্থের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে অন্যায় ও পাপাচারে লিপ্ত হই তখন ধর্ম হয়ে ওঠে কারও কাছে বাহ্যিক আড়ম্বরতা এবং কারও কাছে উপার্জনের উৎস।

ধর্ম মানুষকে এ পার্থিব জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে অনন্ত জীবনের পথে নিয়ে চলে। দর্শন অথবা বিজ্ঞান এখনো বলতে পারে না, জীবনাবসানের পর মানুষের আত্মার প্রকৃত অবস্থা কী হবে? ধর্ম মানুষকে চিরস্থায়ী ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী স্রষ্টার সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে মানবজীবনকে অর্থবহ ও উচ্চ মর্যাদা দান করে। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হওয়ার রহস্য নিহিত। তাই যুগে যুগে ধর্ম মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছে। নয়তো একটি প্রাণীর জীবন থেকে মানুষের জীবনের ভিন্নতা কি শুধুই মেধায়? জীবন্ত ধর্মে আল্লাহর অসন্তুষ্টির নাম জাহান্নাম এবং সন্তুষ্টির নাম জান্নাত।

একজন মানুষ সে যে ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন সে যদি তার ধর্মের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে চলে তাহলে পরিবার, সমাজ ও দেশে কোনো ভাবেই বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে না। আজকে সর্বত্রে যে অশান্তি এর মূল কারণ হলো মানুষ তার ধর্মের প্রকৃত আদেশ নিষেধ মেনে চলছে না। আমাদের সবার উচিত হবে আমাদের সৃষ্টিকর্তার আদেশ নিষেধ মেনে চলে জীবন পরিচালনা করা।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন