এলো রহমতের রমজান
jugantor
এলো রহমতের রমজান

  মুফতি জহির ইবনে মুসলিম  

১৬ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাসূল (সা.)-এর আগে অন্য নবীর উম্মতেরা দীর্ঘ হায়াতপ্রাপ্ত হতেন। সে তুলনায় উম্মতে মুহাম্মদীর হায়াত অনেকগুণ কম। তারা দীর্ঘ জীবন পেতেন তাই আল্লাহ রাস্তায় ত্যাগ-কুরবানি ও অন্যান্য সৎকর্ম বেশি বেশি করতেন। এ উম্মতের সময় যেহেতু কম এ কারণে আল্লাহতায়ালা তার নিজ অনুগ্রহে এ উম্মতকে এমন কিছু মাস, দিন, রাত, ক্ষণ দান করেছেন যা হাজার মাস বা বছরের চেয়ে উত্তম। রমজানুল মোবারক আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহগুলোর অন্যতম। এটা এ উম্মতের জন্য এক মহাপ্রাপ্তি ও সীমাহীন নিয়ামত। এর প্রতিটি মুহূর্ত অমূল্য সম্পদ। রমজান মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করতে রাসূল (সা.) হজরত সাহাবায়ে কেরামের সামনে এক দীর্ঘ ভাষণ পেশ করেছিলেন- হজরত সালমান ফারসি (রা.) বলেন, শাবান মাসের শেষ তারিখে রাসূল (সা.) আমাদের নসিহত পেশ করেছেন, তোমাদের ওপর একটি মর্যাদাপূর্ণ মোবারক মাস ছায়া স্বরূপ আসছে। যার মধ্যে শবেকদর নামে একটি রাত্রি আছে যা হাজার মাস থেকেও উত্তম। আল্লাহতায়ালা রোজা তোমাদের জন্য ফরজ করেছেন যার রাত্রি জাগরণ অর্থাৎ তারাবি পড়াকে করেছেন পুণ্যের কাজ। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল আদায় করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল সে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করল।

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, এটা ধৈর্য ধারণের মাস, আর ধৈর্যের পরিবর্তে আল্লাহতায়ালা জান্নাত প্রস্তুত রেখেছেন। এটা মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার মাস। এ মাসে মুমিনের রিজিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে সে ব্যক্তির জন্য তা গোনাহ মাফ ও দোজখ থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং ওই রোজাদারের সওয়াব সমতুল্য সওয়াব সে ব্যক্তি লাভ করবে অথচ সে রোজাদারের সওয়াব বিন্দুমাত্র কম হবে না। রমজান এমন একটি মাস যার প্রথম দশকে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়, দ্বিতীয়াংশে মাগফিরাত ও তৃতীয়াংশে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে আপন গোলাম ও মজদুর থেকে কাজের বোঝা হালকা করে দেয় আল্লাহতায়ালা তাকে মাফ করে দিয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে পানি পান করাবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহতায়ালা তাকে হাউজে কাওসার থেকে এমন পানি পান করাবেন যার পর জান্নাতে প্রবেশ পর্যন্ত তার আর পিপাসা লাগবে না। (সুনানে বায়হাকি)।

অপর আরেকটি হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, রমজানের প্রতিটি দিবা-রজনিতে অসংখ্য জাহান্নামিকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন প্রতিটি মুসলমানের একটি করে দোয়া কবুল হয়। আত্তারগিব ওয়াত্তারহিব) হজরত উবাদাহ্ উবনে সাবেত (রা.) বলেন, একবার রমজানের কিছুদিন আগে রাসূল (সা.) আমাদের বললেন, রমজান মাস সমাগত প্রায়। এটা বড়ই বরকতের মাস। আল্লাহতায়ালা এ মাসে তোমাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং রহমত বর্ষণ করেন। গোনাহ মাফ করেন, দোয়া কবুল করেন। ইবাদতের প্রতি তোমাদের আগ্রহ লক্ষ করেন এবং তা নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন। সুতরাং আল্লাহকে সৎকাজ দেখাও। হতভাগা ওই ব্যক্তি, যে এ মাসে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত রইল। (তবরানি শরিফ) এমন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত রমজান হলো প্রতিটি মুসলমানের জন্য এক মহাসম্পদ। রহমত-বরকতও মহা মুক্তির মাস হলো রমজান। এ রমজানের মধ্যেমে আল্লাহতায়ালা মানুষকে ইহ-পরলৌকিক সফলতার সোনালি প্রান্তরে পৌঁছাতে চান। এর মাধ্যমে তিনি জাগ্রত করতে চান মানুষের মনুষ্যত্ব বোধ। সৃষ্টি করতে চান পরস্পরে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা। এ রমজানের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে, রিপুর তাড়না থেকে তাকে মুক্ত করে তার ভেতর তাকওয়া তথা খোদাভীতি ও আল্লাহ প্রেম জাগ্রত করে চান তাকে সত্য-সুন্দরের পথে পরিচালিত করতে। যে সত্য-সুন্দরের পথ তাকে নিয়ে যাবে চির সফলতা ও মহামুক্তির রাজ তোরণে। তাই আল্লাহ এ রমজানের বিধান সম্পর্কে বলতে গিয়ে কুরআন শরিফে ইরশাদ করেছেন, হে ইমানদাররা, তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে যে রূপ দেওয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য, যাতে তোমরা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করতে পারি। (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৮৩)।

‘মানুষের দুটি বড় দুশমন রয়েছে যা তাকে চিরতরে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় সে দুশমন দুটি হলো শয়তান ও নফ্স বা কুপ্রকৃতি, এ কুপ্রকৃতির সহজাত প্রকৃতি হলো ক্রোধ ও কামপ্রবৃত্তি। রোজার মাধ্যমে ক্রোধও কামভাবকে দমন করা যায় আর এ দুটি যখন দমন হয় তখন কুপ্রবৃত্তি-নফ্স মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তখন তার ভেতর মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয় ফলে ক্রমে সে মুত্তাকি বা পরহেজগার হয়ে ওঠে। তাকওয়া সম্পর্কে হজরত উমর ফারুক (রা.)কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, তোমাদের কেউ কি কখনো কণ্টকাকীর্ণ সব গিরিপথ পাড়ি দিয়েছে? পাড়ি দিলে কীভাবে দিয়েছে? জবাবে বলা হয়েছিল। আমরা যখন এমন গিরিপথ পাড়ি দিয়ে থাকি তখন অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করি। যাতে আমার কাপড় কোনো কাঁটার সঙ্গে আটকে না যায় এবং আমি যেন পা পিছলে পড়ে না যাই। তখন হজরত উমর (রা.) বললেন, এটাই হলো তাকওয়া। অর্থাৎ জীবন চলার পথে পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা। যেন কোনো সময় আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানি করে না বসি। শরিয়তের পরিপন্থি কোনো কাজ যেন আমার দ্বারা না হয়। সদা যেন আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে পারি। আমার চলার পথ বড় বন্ধুর। এ পথে সর্বদা ওতপেতে বসে আছে শয়তান ও আমার কুপ্রবৃত্তি। তারা আমাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য সদা ব্যস্ত। আমি যেন তাদের পাতা ফাঁদে পা না দিই বরং পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করে যেন সত্য-সুন্দরের পথে পরিচালিত হই, আমার জীবনে যেন সামান্যতমও পাপের ছোঁয়া না লাগে, আমি যেন হই সর্বোপরি ভেজালমুক্ত, কোনো কিছুই যেন আমাকে কলুষিত করতে না পরে এ ব্যাপারে আমি যেন হই একান্ত সচেষ্ট, অতন্দ্র প্রহরীর মতো সর্বদা থাকি যেন জাগ্রত, পূর্ণ সতর্ক। এরই নাম হলো তাকওয়া বা পরহেজগারি।

এ তাকওয়া বা পরহেজগারি যখন আমার ভেতরে সৃষ্টি হবে তখন আমার মাঝে জাগ্রত হবে আল্লাহ প্রেম। আর সে প্রেমই আমাকে নিয়ে চলবে তার পূর্ণ আনুগত্য ও সন্তুষ্টির পথে। আমি ক্রমে পাগল পারা হয়ে উঠব আমার প্রেমিক আল্লাহকে পাওয়ার জন্য। তখন প্রতিটি সৎকাজ ও আল্লাহর বিধানে আমি খুঁজে পাব শান্তি ও পরিতৃপ্তি। অসৎ ও পাপ কাজ আমাকে পীড়া দেবে। আল্লাহও তার রাসূলের হুকুম অমান্য করা আমার জন্য হবে বিষতুল্য। তখনই আমার ভেতর জাগ্রত হবে পূর্ণ মাত্রায় মনুষ্যত্ব আর আমি হতে পারব ইনসানে কামেল বা পূর্ণ সফল মানুষ, মুত্তাকি ও পরহেজগার।

আমরা যেন মুত্তাকি ও পরহেজগার অর্থাৎ একজন ইনসানে কামেল হতে পরি তাই প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে আসে রমজানুল মোবারক। প্রতিবারের মতো এবারও মাহে রমজান আমাদের দ্বারপ্রান্তে সমাগত। এ রমজানের রোজা পালনের মাধ্যমে আমরা যদি সত্যিকার অর্থে মুত্তাকি হতে পারি, খুঁজে পাই মুক্তির মোহনা তাহলেই আমাদের রোজা রাখা সার্থক হবে। তা না হলে আমার উপবাস থাকা ছাড়া কোনো লাভ হবে না। এদিকে ইঙ্গিত করেই রাসূল (সা.) বলেছেন, বহু রোজাদার রয়েছে যারা কেবল ক্ষুধার জ্বালা ভোগ করা ছাড়া কিছুই পায় না।

রমজান মাসে আমাদের মাঝে আসে রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির পয়গাম নিয়ে। কিন্তু অতীত দুঃখের বিষয় কিছু অসাধু ও দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের কারণে রমজান মাস সাধারণ মানুষের জন্য কষ্ট আর দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ রমজানের মহান শিক্ষা ও তাৎপর্যকে পিছে ফেলে কালোবাজারি, মজুদদারি ও পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে জনজীবনকে করে তোলে অতিষ্ঠ, তাই আমরা দেখতে পাই রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেড়ে যায়। অফিস আদালতে চলতে থাকে হাদিয়ার নামে ঘুসের মহাউৎসব। এসব অমানবিক গুণাবলি যদি আমরা পরিহার না করতে পারি তাহলে রমজান আমার জন্য রহমত ও মুক্তির পয়গাম নয় বরং চির ধ্বংসের বার্তা বয়ে আনবে। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে তার বিধান মোতাবেক সিয়াম পালনের তাওফিক দিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, খতিব, প্রবন্ধকার

এলো রহমতের রমজান

 মুফতি জহির ইবনে মুসলিম 
১৬ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাসূল (সা.)-এর আগে অন্য নবীর উম্মতেরা দীর্ঘ হায়াতপ্রাপ্ত হতেন। সে তুলনায় উম্মতে মুহাম্মদীর হায়াত অনেকগুণ কম। তারা দীর্ঘ জীবন পেতেন তাই আল্লাহ রাস্তায় ত্যাগ-কুরবানি ও অন্যান্য সৎকর্ম বেশি বেশি করতেন। এ উম্মতের সময় যেহেতু কম এ কারণে আল্লাহতায়ালা তার নিজ অনুগ্রহে এ উম্মতকে এমন কিছু মাস, দিন, রাত, ক্ষণ দান করেছেন যা হাজার মাস বা বছরের চেয়ে উত্তম। রমজানুল মোবারক আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহগুলোর অন্যতম। এটা এ উম্মতের জন্য এক মহাপ্রাপ্তি ও সীমাহীন নিয়ামত। এর প্রতিটি মুহূর্ত অমূল্য সম্পদ। রমজান মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করতে রাসূল (সা.) হজরত সাহাবায়ে কেরামের সামনে এক দীর্ঘ ভাষণ পেশ করেছিলেন- হজরত সালমান ফারসি (রা.) বলেন, শাবান মাসের শেষ তারিখে রাসূল (সা.) আমাদের নসিহত পেশ করেছেন, তোমাদের ওপর একটি মর্যাদাপূর্ণ মোবারক মাস ছায়া স্বরূপ আসছে। যার মধ্যে শবেকদর নামে একটি রাত্রি আছে যা হাজার মাস থেকেও উত্তম। আল্লাহতায়ালা রোজা তোমাদের জন্য ফরজ করেছেন যার রাত্রি জাগরণ অর্থাৎ তারাবি পড়াকে করেছেন পুণ্যের কাজ। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল আদায় করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল সে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করল।

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, এটা ধৈর্য ধারণের মাস, আর ধৈর্যের পরিবর্তে আল্লাহতায়ালা জান্নাত প্রস্তুত রেখেছেন। এটা মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার মাস। এ মাসে মুমিনের রিজিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে সে ব্যক্তির জন্য তা গোনাহ মাফ ও দোজখ থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং ওই রোজাদারের সওয়াব সমতুল্য সওয়াব সে ব্যক্তি লাভ করবে অথচ সে রোজাদারের সওয়াব বিন্দুমাত্র কম হবে না। রমজান এমন একটি মাস যার প্রথম দশকে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়, দ্বিতীয়াংশে মাগফিরাত ও তৃতীয়াংশে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে আপন গোলাম ও মজদুর থেকে কাজের বোঝা হালকা করে দেয় আল্লাহতায়ালা তাকে মাফ করে দিয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে পানি পান করাবে কিয়ামত দিবসে আল্লাহতায়ালা তাকে হাউজে কাওসার থেকে এমন পানি পান করাবেন যার পর জান্নাতে প্রবেশ পর্যন্ত তার আর পিপাসা লাগবে না। (সুনানে বায়হাকি)।

অপর আরেকটি হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, রমজানের প্রতিটি দিবা-রজনিতে অসংখ্য জাহান্নামিকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন প্রতিটি মুসলমানের একটি করে দোয়া কবুল হয়। আত্তারগিব ওয়াত্তারহিব) হজরত উবাদাহ্ উবনে সাবেত (রা.) বলেন, একবার রমজানের কিছুদিন আগে রাসূল (সা.) আমাদের বললেন, রমজান মাস সমাগত প্রায়। এটা বড়ই বরকতের মাস। আল্লাহতায়ালা এ মাসে তোমাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং রহমত বর্ষণ করেন। গোনাহ মাফ করেন, দোয়া কবুল করেন। ইবাদতের প্রতি তোমাদের আগ্রহ লক্ষ করেন এবং তা নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন। সুতরাং আল্লাহকে সৎকাজ দেখাও। হতভাগা ওই ব্যক্তি, যে এ মাসে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত রইল। (তবরানি শরিফ) এমন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত রমজান হলো প্রতিটি মুসলমানের জন্য এক মহাসম্পদ। রহমত-বরকতও মহা মুক্তির মাস হলো রমজান। এ রমজানের মধ্যেমে আল্লাহতায়ালা মানুষকে ইহ-পরলৌকিক সফলতার সোনালি প্রান্তরে পৌঁছাতে চান। এর মাধ্যমে তিনি জাগ্রত করতে চান মানুষের মনুষ্যত্ব বোধ। সৃষ্টি করতে চান পরস্পরে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা। এ রমজানের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে, রিপুর তাড়না থেকে তাকে মুক্ত করে তার ভেতর তাকওয়া তথা খোদাভীতি ও আল্লাহ প্রেম জাগ্রত করে চান তাকে সত্য-সুন্দরের পথে পরিচালিত করতে। যে সত্য-সুন্দরের পথ তাকে নিয়ে যাবে চির সফলতা ও মহামুক্তির রাজ তোরণে। তাই আল্লাহ এ রমজানের বিধান সম্পর্কে বলতে গিয়ে কুরআন শরিফে ইরশাদ করেছেন, হে ইমানদাররা, তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে যে রূপ দেওয়া হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য, যাতে তোমরা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করতে পারি। (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৮৩)।

‘মানুষের দুটি বড় দুশমন রয়েছে যা তাকে চিরতরে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় সে দুশমন দুটি হলো শয়তান ও নফ্স বা কুপ্রকৃতি, এ কুপ্রকৃতির সহজাত প্রকৃতি হলো ক্রোধ ও কামপ্রবৃত্তি। রোজার মাধ্যমে ক্রোধও কামভাবকে দমন করা যায় আর এ দুটি যখন দমন হয় তখন কুপ্রবৃত্তি-নফ্স মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তখন তার ভেতর মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয় ফলে ক্রমে সে মুত্তাকি বা পরহেজগার হয়ে ওঠে। তাকওয়া সম্পর্কে হজরত উমর ফারুক (রা.)কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, তোমাদের কেউ কি কখনো কণ্টকাকীর্ণ সব গিরিপথ পাড়ি দিয়েছে? পাড়ি দিলে কীভাবে দিয়েছে? জবাবে বলা হয়েছিল। আমরা যখন এমন গিরিপথ পাড়ি দিয়ে থাকি তখন অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করি। যাতে আমার কাপড় কোনো কাঁটার সঙ্গে আটকে না যায় এবং আমি যেন পা পিছলে পড়ে না যাই। তখন হজরত উমর (রা.) বললেন, এটাই হলো তাকওয়া। অর্থাৎ জীবন চলার পথে পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা। যেন কোনো সময় আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানি করে না বসি। শরিয়তের পরিপন্থি কোনো কাজ যেন আমার দ্বারা না হয়। সদা যেন আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে পারি। আমার চলার পথ বড় বন্ধুর। এ পথে সর্বদা ওতপেতে বসে আছে শয়তান ও আমার কুপ্রবৃত্তি। তারা আমাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য সদা ব্যস্ত। আমি যেন তাদের পাতা ফাঁদে পা না দিই বরং পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করে যেন সত্য-সুন্দরের পথে পরিচালিত হই, আমার জীবনে যেন সামান্যতমও পাপের ছোঁয়া না লাগে, আমি যেন হই সর্বোপরি ভেজালমুক্ত, কোনো কিছুই যেন আমাকে কলুষিত করতে না পরে এ ব্যাপারে আমি যেন হই একান্ত সচেষ্ট, অতন্দ্র প্রহরীর মতো সর্বদা থাকি যেন জাগ্রত, পূর্ণ সতর্ক। এরই নাম হলো তাকওয়া বা পরহেজগারি।

এ তাকওয়া বা পরহেজগারি যখন আমার ভেতরে সৃষ্টি হবে তখন আমার মাঝে জাগ্রত হবে আল্লাহ প্রেম। আর সে প্রেমই আমাকে নিয়ে চলবে তার পূর্ণ আনুগত্য ও সন্তুষ্টির পথে। আমি ক্রমে পাগল পারা হয়ে উঠব আমার প্রেমিক আল্লাহকে পাওয়ার জন্য। তখন প্রতিটি সৎকাজ ও আল্লাহর বিধানে আমি খুঁজে পাব শান্তি ও পরিতৃপ্তি। অসৎ ও পাপ কাজ আমাকে পীড়া দেবে। আল্লাহও তার রাসূলের হুকুম অমান্য করা আমার জন্য হবে বিষতুল্য। তখনই আমার ভেতর জাগ্রত হবে পূর্ণ মাত্রায় মনুষ্যত্ব আর আমি হতে পারব ইনসানে কামেল বা পূর্ণ সফল মানুষ, মুত্তাকি ও পরহেজগার।

আমরা যেন মুত্তাকি ও পরহেজগার অর্থাৎ একজন ইনসানে কামেল হতে পরি তাই প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে আসে রমজানুল মোবারক। প্রতিবারের মতো এবারও মাহে রমজান আমাদের দ্বারপ্রান্তে সমাগত। এ রমজানের রোজা পালনের মাধ্যমে আমরা যদি সত্যিকার অর্থে মুত্তাকি হতে পারি, খুঁজে পাই মুক্তির মোহনা তাহলেই আমাদের রোজা রাখা সার্থক হবে। তা না হলে আমার উপবাস থাকা ছাড়া কোনো লাভ হবে না। এদিকে ইঙ্গিত করেই রাসূল (সা.) বলেছেন, বহু রোজাদার রয়েছে যারা কেবল ক্ষুধার জ্বালা ভোগ করা ছাড়া কিছুই পায় না।

রমজান মাসে আমাদের মাঝে আসে রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির পয়গাম নিয়ে। কিন্তু অতীত দুঃখের বিষয় কিছু অসাধু ও দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের কারণে রমজান মাস সাধারণ মানুষের জন্য কষ্ট আর দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ রমজানের মহান শিক্ষা ও তাৎপর্যকে পিছে ফেলে কালোবাজারি, মজুদদারি ও পণ্যে ভেজাল মিশিয়ে জনজীবনকে করে তোলে অতিষ্ঠ, তাই আমরা দেখতে পাই রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেড়ে যায়। অফিস আদালতে চলতে থাকে হাদিয়ার নামে ঘুসের মহাউৎসব। এসব অমানবিক গুণাবলি যদি আমরা পরিহার না করতে পারি তাহলে রমজান আমার জন্য রহমত ও মুক্তির পয়গাম নয় বরং চির ধ্বংসের বার্তা বয়ে আনবে। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে তার বিধান মোতাবেক সিয়াম পালনের তাওফিক দিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, খতিব, প্রবন্ধকার

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন