লকডাউনে তারাবির হাফেজদের কষ্ট
jugantor
লকডাউনে তারাবির হাফেজদের কষ্ট

  রাকিবুল হাসান  

২৩ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাগ গোছানো শেষ হাফেজ মুহাম্মদ আবিরের। বিকালেই রওনা হবেন চট্টগ্রাম। সৌদিতে আজ রমজান শুরু হয়েছে। আগামীকাল শুরু হবে বাংলাদেশে।

ইন্টারভিউ বোর্ডে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে পটিয়ার একটি মসজিদে খতমে তারাবির ইমাম হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। মন তাই ফুরফুরে। ঘরময় ছোটাছুটি করে দেখছিলেন আর কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগে তোলা বাকি আছে কিনা।

এমন সময় মসজিদের সভাপতির ফোন এলো। সভাপতি জানালেন, ‘খতমে তারাবির পরিবর্তে এবার তারা সূরা তারাবি পড়তে চান। সরকারের নতুন নির্দেশনার কারণেই মসজিদের দায়িত্বশীলরা এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। সুতরাং আবিরকে আর কষ্ট করে চট্টগ্রাম যেতে হবে না।’

বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবি বিষয়ে সরকারের নতুন নির্দেশনার কারণে এবার রমজানেও তারাবির নামাজ পড়ার সুযোগ হারিয়েছেন আবিরের মতো পবিত্র কুরআনের অসংখ্য হাফেজ। গত বছর তারাবি পড়াতে না পারলেও এবার পড়াবেন এমন আশায় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হাফেজরা। কিন্তু রমজান শুরু না হতেই দুঃসংবাদ শুনতে হয়েছে তাদের।

যুগান্তরকে আবির জানান, ‘গতবারও তারাবি পড়াতে পারিনি। এবারও পারলাম না। এত কষ্ট করে তারাবির জন্য নিয়োগ পেয়েও যখন পড়াতে পারি না, তখন খুব খারাপ লাগে। একজন হাফেজে কুরআনের জন্য প্রতি বছর রমজানে খতমে তারাবিতে ইমামতি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাবির নামাজে তিলাওয়াতের ওসিলায় এ মাসে আমরা পুরো বছরের জন্য কুরআন মুখস্থ ঝালাই করে নিই। গত দু’বছর এ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’

কথা হলো বসুন্ধরা টের্নামেন্টের ইমাম হাফেজ মাওলানা ইয়াকুব সিরাজির সঙ্গে। তিনি জানালেন, তার মসজিদে প্রথম খতমে তারাবি পড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সরকার যখন নামাজে মুসল্লি সংখ্যা বিশজন নির্ধারণ করে দিল, তখন সিদ্ধান্ত বদলে গেল। বলা হলো, খতমে তারাবি হবে না। পরে বিশেষ অনুরোধ করে খতমে তারাবি চালু করেছি।’

জানতে চাইলাম, ‘খতমে তারাবি তো দশজনেও পড়া যায়। মুসল্লি কম হওয়ার কারণে খতমে তারাবি বাদ দেওয়ার রহস্যটা কী? তিনি বললেন, রমজানে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেওয়া খতমে তারাবির হাফেজদের সম্মানী দিতে হয়। আগের বছর হয়তো হাফেজ সাহেবকে ৩০ হাজার দিয়েছে, এবার মুসল্লি কম হওয়ার কারণে তা দিতে পারবে না। ফলে খতমে তারাবিই বাদ দিয়ে দেয়। এটা সমাজের একটা মন্দরীতি হয়ে গেছে। অথচ চাইলেই তারা কম মুসল্লি নিয়েও খতমে তারাবি পড়তে পারে।’

গত বছর তারাবি ঠিক হলেও করোনার কারণে খতমে তারাবি পড়াতে পারেননি হাফেজ মাওলানা খাইরুল ইসলাম। তবে এবার তিনি মুহাম্মদপুরের আসসুন্নাহ কমপ্লেক্স মসজিদে খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন।

তার ভাষ্য, খতমে তারাবির সম্মানী নিয়ে হাফেজদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। তাদের সামনেই টাকা কালেকশনের সময় বলা হয়, ‘টাকা দিন। টাকা না দিলে হাফেজ সাহেব খাবেন কী। তারও পরিবার আছে।’ এমন আরও অনেক কিছু। এতে লজ্জাবোধ করেন হাফেজরা। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না। অথচ এমন ভরা মজলিসে টাকা কালেকশন না করে মুসল্লিদের চিঠি দিয়ে টাকা তুলতে পারে মসজিদ কমিটি। এতে হাফেজ সাহেব বিব্রতবোধ করবেন না।

চলতি বছর নিয়ে ৪৩ বছর হলো খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া আরাবিয়া এমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মুফতি ইমাদুদ্দিন। যুগান্তরের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে তিনি এ সংকট ও তার থেকে উত্তরণের পন্থা তুলে ধরেছেন।

তার মতে, হাফেজদের সম্মানী তুলতে গিয়ে যে পদ্ধতি মসজিদ কমিটি অবলম্বন করেন, আজকাল তা আত্মমর্যাদাশীল হাফেজদের জন্য সহ্য করা কষ্টকর এবং চরম অপমানজনক। হাফেজদের যদি সম্মানী দিতেই হয়, তাহলে এমনভাবে টাকা ওঠানো উচিত, যেন হাফেজদের হেয় না করা হয়। হাফেজরা যেন অপমানিত বোধ না করেন। এটা চিঠির মাধ্যমেও হতে পারে।

মুফতি ইমাদুদ্দিন সাহেব বলেন, ‘তবে মুসল্লি কম হওয়ার কারণে খতমে তারাবি বাদ দেওয়া ঠিক নয়। এতে হাফেজদের কুরআন চর্চায় দারুণ বিঘ্ন ঘটে। এমনিতেই প্রতি বছর হাফেজে কুরআনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে রমজানে তারাবি পড়ানোর জন্য মসজিদের সংকট দেখা দিয়েছে। হাফেজে কুরআনদের উল্লেখযোগ্য বড় একটি অংশ রমজানে তারাবি পড়ানোর মতো মসজিদ পান না। তার ওপর যদি মুসল্লি কমের অজুহাতে খতমে তারাবি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে রমজানজুড়ে তারাবির ওসিলায় হাফেজরা নিজেদের হিফজকে ঝালাই করার যে মওকা পেতেন, সেটা থেকে তারা বঞ্চিত হবেন।’

বিদগ্ধ এ মুফতির পরামর্শ হলো, শুধু মসজিদ নয়, বাড়ির ছাদ, অফিস, শপিংমলেও খতমে তারাবি হোক। খতমে তারাবি হোক ঘরে ঘরে। ফলে তারাবির মাধ্যমে হাফেজদের হিফজ চর্চার যে সংকট তৈরি হচ্ছে, তা কেটে যাবে। কুরআন নাজিলের মাস রমজানও হয়ে উঠবে কুরআনময়।’

রমজান মাসের একটি বিশেষ আকর্ষণ তারাবির নামাজ। কুরআনের হাফেজরা তাদের সুললিত সুরের মূর্ছনায় কুরআন তিলওয়াত করে নামাজের সময়টা মুখরিত করে তুলেন। কিন্তু করোনার ভয়ে হাফেজদের তিলাওয়াতে মুখর হয়নি অনেক মসজিদ। তারাবি পড়ানো থেকে বঞ্চিত হয়েছেন লাখ লাখ হাফেজ। খুব সূক্ষ্মভাবে কান পাতলে সেসব হাফেজের বুকের হাহাকার শুনতে পাওয়া যায়।

লকডাউনে তারাবির হাফেজদের কষ্ট

 রাকিবুল হাসান 
২৩ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাগ গোছানো শেষ হাফেজ মুহাম্মদ আবিরের। বিকালেই রওনা হবেন চট্টগ্রাম। সৌদিতে আজ রমজান শুরু হয়েছে। আগামীকাল শুরু হবে বাংলাদেশে।

ইন্টারভিউ বোর্ডে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে পটিয়ার একটি মসজিদে খতমে তারাবির ইমাম হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। মন তাই ফুরফুরে। ঘরময় ছোটাছুটি করে দেখছিলেন আর কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগে তোলা বাকি আছে কিনা।

এমন সময় মসজিদের সভাপতির ফোন এলো। সভাপতি জানালেন, ‘খতমে তারাবির পরিবর্তে এবার তারা সূরা তারাবি পড়তে চান। সরকারের নতুন নির্দেশনার কারণেই মসজিদের দায়িত্বশীলরা এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। সুতরাং আবিরকে আর কষ্ট করে চট্টগ্রাম যেতে হবে না।’

বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবি বিষয়ে সরকারের নতুন নির্দেশনার কারণে এবার রমজানেও তারাবির নামাজ পড়ার সুযোগ হারিয়েছেন আবিরের মতো পবিত্র কুরআনের অসংখ্য হাফেজ। গত বছর তারাবি পড়াতে না পারলেও এবার পড়াবেন এমন আশায় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হাফেজরা। কিন্তু রমজান শুরু না হতেই দুঃসংবাদ শুনতে হয়েছে তাদের।

যুগান্তরকে আবির জানান, ‘গতবারও তারাবি পড়াতে পারিনি। এবারও পারলাম না। এত কষ্ট করে তারাবির জন্য নিয়োগ পেয়েও যখন পড়াতে পারি না, তখন খুব খারাপ লাগে। একজন হাফেজে কুরআনের জন্য প্রতি বছর রমজানে খতমে তারাবিতে ইমামতি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাবির নামাজে তিলাওয়াতের ওসিলায় এ মাসে আমরা পুরো বছরের জন্য কুরআন মুখস্থ ঝালাই করে নিই। গত দু’বছর এ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’

কথা হলো বসুন্ধরা টের্নামেন্টের ইমাম হাফেজ মাওলানা ইয়াকুব সিরাজির সঙ্গে। তিনি জানালেন, তার মসজিদে প্রথম খতমে তারাবি পড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সরকার যখন নামাজে মুসল্লি সংখ্যা বিশজন নির্ধারণ করে দিল, তখন সিদ্ধান্ত বদলে গেল। বলা হলো, খতমে তারাবি হবে না। পরে বিশেষ অনুরোধ করে খতমে তারাবি চালু করেছি।’

জানতে চাইলাম, ‘খতমে তারাবি তো দশজনেও পড়া যায়। মুসল্লি কম হওয়ার কারণে খতমে তারাবি বাদ দেওয়ার রহস্যটা কী? তিনি বললেন, রমজানে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেওয়া খতমে তারাবির হাফেজদের সম্মানী দিতে হয়। আগের বছর হয়তো হাফেজ সাহেবকে ৩০ হাজার দিয়েছে, এবার মুসল্লি কম হওয়ার কারণে তা দিতে পারবে না। ফলে খতমে তারাবিই বাদ দিয়ে দেয়। এটা সমাজের একটা মন্দরীতি হয়ে গেছে। অথচ চাইলেই তারা কম মুসল্লি নিয়েও খতমে তারাবি পড়তে পারে।’

গত বছর তারাবি ঠিক হলেও করোনার কারণে খতমে তারাবি পড়াতে পারেননি হাফেজ মাওলানা খাইরুল ইসলাম। তবে এবার তিনি মুহাম্মদপুরের আসসুন্নাহ কমপ্লেক্স মসজিদে খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন।

তার ভাষ্য, খতমে তারাবির সম্মানী নিয়ে হাফেজদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। তাদের সামনেই টাকা কালেকশনের সময় বলা হয়, ‘টাকা দিন। টাকা না দিলে হাফেজ সাহেব খাবেন কী। তারও পরিবার আছে।’ এমন আরও অনেক কিছু। এতে লজ্জাবোধ করেন হাফেজরা। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না। অথচ এমন ভরা মজলিসে টাকা কালেকশন না করে মুসল্লিদের চিঠি দিয়ে টাকা তুলতে পারে মসজিদ কমিটি। এতে হাফেজ সাহেব বিব্রতবোধ করবেন না।

চলতি বছর নিয়ে ৪৩ বছর হলো খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া আরাবিয়া এমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মুফতি ইমাদুদ্দিন। যুগান্তরের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে তিনি এ সংকট ও তার থেকে উত্তরণের পন্থা তুলে ধরেছেন।

তার মতে, হাফেজদের সম্মানী তুলতে গিয়ে যে পদ্ধতি মসজিদ কমিটি অবলম্বন করেন, আজকাল তা আত্মমর্যাদাশীল হাফেজদের জন্য সহ্য করা কষ্টকর এবং চরম অপমানজনক। হাফেজদের যদি সম্মানী দিতেই হয়, তাহলে এমনভাবে টাকা ওঠানো উচিত, যেন হাফেজদের হেয় না করা হয়। হাফেজরা যেন অপমানিত বোধ না করেন। এটা চিঠির মাধ্যমেও হতে পারে।

মুফতি ইমাদুদ্দিন সাহেব বলেন, ‘তবে মুসল্লি কম হওয়ার কারণে খতমে তারাবি বাদ দেওয়া ঠিক নয়। এতে হাফেজদের কুরআন চর্চায় দারুণ বিঘ্ন ঘটে। এমনিতেই প্রতি বছর হাফেজে কুরআনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে রমজানে তারাবি পড়ানোর জন্য মসজিদের সংকট দেখা দিয়েছে। হাফেজে কুরআনদের উল্লেখযোগ্য বড় একটি অংশ রমজানে তারাবি পড়ানোর মতো মসজিদ পান না। তার ওপর যদি মুসল্লি কমের অজুহাতে খতমে তারাবি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে রমজানজুড়ে তারাবির ওসিলায় হাফেজরা নিজেদের হিফজকে ঝালাই করার যে মওকা পেতেন, সেটা থেকে তারা বঞ্চিত হবেন।’

বিদগ্ধ এ মুফতির পরামর্শ হলো, শুধু মসজিদ নয়, বাড়ির ছাদ, অফিস, শপিংমলেও খতমে তারাবি হোক। খতমে তারাবি হোক ঘরে ঘরে। ফলে তারাবির মাধ্যমে হাফেজদের হিফজ চর্চার যে সংকট তৈরি হচ্ছে, তা কেটে যাবে। কুরআন নাজিলের মাস রমজানও হয়ে উঠবে কুরআনময়।’

রমজান মাসের একটি বিশেষ আকর্ষণ তারাবির নামাজ। কুরআনের হাফেজরা তাদের সুললিত সুরের মূর্ছনায় কুরআন তিলওয়াত করে নামাজের সময়টা মুখরিত করে তুলেন। কিন্তু করোনার ভয়ে হাফেজদের তিলাওয়াতে মুখর হয়নি অনেক মসজিদ। তারাবি পড়ানো থেকে বঞ্চিত হয়েছেন লাখ লাখ হাফেজ। খুব সূক্ষ্মভাবে কান পাতলে সেসব হাফেজের বুকের হাহাকার শুনতে পাওয়া যায়।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন