বাজেট রাষ্ট্রের কাছে জনগণের আমানত
jugantor
সাক্ষাৎকারে : মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ
বাজেট রাষ্ট্রের কাছে জনগণের আমানত

  তোফায়েল গাজালি  

২৮ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তিন জুন জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতো বাজেট নিয়ে স্বপ্ন দেখেন আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ জনতা। তারা কেমন বাজেট চান?

তিন জুন জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতো বাজেট নিয়ে স্বপ্ন দেখেন আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ জনতা। তারা কেমন বাজেট চান?

ইসলামে বাজেটের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ইত্যাদি বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ইসলামি অর্থনীতিবিদ মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদের সঙ্গে কথা বলেছেন - তোফায়েল গাজালি

-ইসলামে বাজেটের গুরুত্ব কতটুকু?

মুফতি মিযান : ইসলামে বাজেটের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম একটি স্বভাবজাত ধর্ম। কুরআন-হাদিসে বর্ণিত প্রতিটি নির্দেশনা মানুষের স্বভাবসম্মত, সুবিন্যস্ত এবং পরিপাটি। সুশৃঙ্খল ও উন্নত জীবনযাপনের জন্য আয় অনুপাতে ব্যয়ের যে খাত নির্ধারণ করা হয়, সেটাই বাজেট।

বাজেটের সঙ্গে দেশের উন্নতি-অগ্রগতি এবং জনগণের ভাগ্য অনেকাংশে জড়িত। তাই ইসলামে বাজেটকে একটি জাতীয় আমানত হিসাবে দেখা হয়। বাজেটের ওপর ভিত্তি করে একটি দেশ যেমন এগিয়ে যায়, তেমনি অপরিকল্পিত বাজেটের কারণে একটি দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে।

সরকারের দায়িত্ব হলো, বাজেট প্রণয়নের সময় দেশ ও জনগণের কল্যাণে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আমানতের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা। অন্যথায় আল্লাহর দরবারে কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

-বাজেটের ইসলামি ফর্মুলা কী?

মুফতি মিযান : ইসলামি অর্থব্যবস্থায় বাজেট প্রণয়নের মৌলিক নীতিমালা হলো, ‘সর্বপ্রথম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।’ তার পর তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে আসা।

বাজেটের খাত নির্ধারণের পর দেখতে হবে, নির্ধারিত খাতের জন্য একান্ত প্রয়োজন কী বা কতটুকু। সব খাতের একান্ত প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পর খাতের অলংকরণের দিকে নজর দিতে হবে। আমরা আগের বহু বাজেটে দেখেছি, কম গুরুত্বপূর্ণ খাতের অলংকরণ করতে গিয়ে কোটি কোটি টাকার বিলাসী বাজেট করা হয়েছে, অথচ অতিগুরুত্বপূর্ণ খাতকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

এতে করে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ইসলাম এসব অপ্রতুল বিলাসী বাজেট সমর্থন করে না।

- বাজেট প্রণয়নের আগে মোটামুটিভাবে সব শ্রেণির মানুষের মতামত নেওয়া হয়। আলেমদের মতামত নেওয়া হয় না। এটাকে কীভাবে দেখেন?

মুফতি মিযান : এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের রাষ্ট্রের কর্তারা মনে করেন, আলেম-ওলামারা কুরআন-হাদিস পড়েন। তারা নামাজ রোজা, দোয়া কালাম করবেন। তাদের কাছে অর্থনীতির কোনো জ্ঞান নেই। অথচ আমাদের মাদ্রাসাগুলোয় যে ‘ফিকহুল বূয়ো’ পড়ানো হয়, এটা পুরোটাই ইসলামি অর্থনীতি।

বাজেট প্রণয়নের সময় আলেমদের মতামত না নেওয়ার একটি বড় কারণ এটাও হতে পারে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতি সম্পূর্ণ সুদনির্ভর আর ওলামায়ে কেরাম সুদমুক্ত অর্থনীতির কথা বলেন।

প্রত্যেক মুসলমানকে একটি কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, তাহলো- একজন মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের, প্রতিটি সমস্যার সঠিক ও যৌক্তিক সমাধান রয়েছে ইসলামে। লক্ষ করলে দেখবেন, আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও বাজেটের অমীমাংসিত বহু বিষয়েরই সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান রয়েছে ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায়।

তাই আমি মনে করি, বাজেট প্রণয়নের আগে সমাজের অপরাপর জনসাধারণের মতো আলেমদের মতামতও নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

-এবারের বাজেটে কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?

মুফতি মিযান : করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশও এ থেকে মুক্ত নয়। এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, অল্প আয় দিয়ে ব্যাপক চাহিদা পূরণ অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

দীর্ঘ লকডাউনের কারণে জনজীবনে অভাব-অনটন নেমে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ইসলামের বক্তব্য হলো, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের উপার্জন দিয়ে জীবন নির্বাহ করতে না পারে, তাহলে অন্তত তার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান তথা মৌলিক চাহিদা রাষ্ট্রকে পূরণ করতে হবে। (আজকের আধুনিক সমাজব্যবস্থাও এ কথাই বলে)। সুতরাং সব নাগরিকের জীবন রক্ষা ও জীবিকার নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে এবারের বাজেটে।

-বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোন খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

মুফতি মিযান : আল্লাহতায়ালা বলেন, আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করে দেই এবং তাদের একজনকে অপরজনের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করি, যাতে একে-অপরকে অধীনস্থ হিসাবে গ্রহণ করতে পারে। (সূরা আয যুখরুফ, আয়াত ৩২)।

এ আয়াত দিয়েই ইসলামি স্কলাররা জোগান ও চাহিদার ব্যাখ্যা করেন। ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় বাজেটের ক্ষেত্রে জনগণের চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়। খালি চোখে যেটুকু মনে হচ্ছে, এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে অধিক গুরুত্ব দেওয়াই জনগণের চাহিদা ও দাবি।

- শতভাগ সুদনির্ভর বাজেট সম্পর্কে আপনার মত কী? বিশ্ব অর্থনীতির চাকা যেখানে সুদের ওপর ভিত্তি করে চলছে, সেখানে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব?

মুফতি মিযান : প্রথম কথা হলো, সুদনির্ভর বাজেট তথা সুদি লেনদেন থেকে বেরিয়ে এসে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব। দ্বিতীয় কথা হলো- আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৮৬নং আয়াতে বলেন, ‘লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উস আহা’ আল্লাহ বান্দাকে এমন কিছু করার আদেশ দেন না, যা তার জন্য অসম্ভব।

আরেক আয়াতে আছে, ‘আহাল্লাল্লাহুল বাইয়া ওয়া র্হারামার রিবা’ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। (সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৫)। এ দুটি আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, শতভাগ সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা অবশ্যই সম্ভব। এ কথা বিশ্বাস করা একজন মুমিনের ইমানের অংশও বটে।

তাই বলা যায়, সম্পূর্ণ সুদমুক্ত অর্থনীতির প্রচলনের জন্য একটি রাষ্ট্রের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। হ্যাঁ! সুদমুক্ত অর্থনীতির প্রতিষ্ঠায় আরেকটি মূলনীতি আমাদের জেনে রাখা দরকার। তাহলো আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় কর’ (তাগাবুন, আয়াত ১৬)।

এ আয়াতটিকে সাধ্যের বাইরের সুদি লেনদেনের সাময়িক অনুমতির পক্ষে দলিল হিসাবে উপস্থাপন করে থাকেন ইসলামিক স্কলাররা। কারণ বিশ্ববাজারের সঙ্গে চলতে হলে আমাদের পক্ষে চাইলেই সুদি লেনদেন বর্জন করা সম্ভব নয়।

-বিশেষ ধর্মীয় খাত কী? বাজেটে যেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি?

মুফতি মিযান : একটি মুসলিমপ্রধান দেশে বিশেষ ধর্মীয় খাতের অভাব নেই, তবুও বিগত দিনের বাজেটগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের বাজেটে ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় খাতে বরাদ্দের পরিমাণও খুবই কম। সারা দেশের হাজার হাজার ইমাম-খতিব ও মুয়াজ্জিনদের জন্য বাজেটে কোনো বরাদ্দই থাকে না।

মসজিদ, মাদ্রাসা ও মক্তবগুলো সরকারি কোনো ধরনের সহযোগিতা ছাড়াই পরিচালিত হয়ে আসছে যুগ যুগ থেকে। বাজেটে ধর্মীয় এসব প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি। ধর্মীয় খাতে ব্যাপক বরাদ্দ দেওয়ার দাবির সঙ্গে সঙ্গে অতিপ্রয়োজনীয় আরেকটি বিষয় সম্পর্কে আমি অবগত করতে চাই, তাহলো- স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আমরা বরাবরই দেখে আসছি, ধর্মীয় খাতগুলো যে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয় অর্থাৎ ধর্ম মন্ত্রণালয় বা এতদসংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে এমনসব লোকদের বসানো হয়, যারা আসলে ধর্ম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। ফলে সরকারের বরাদ্দ দ্বারা ধর্মের খুব কমই উপকার হয়ে থাকে।

আমি মনে করি, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অন্তত মূল দায়িত্বগুলোয় এমনসব লোকদের বসানো উচিত, যারা ধর্ম সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন। তাহলে সরাকারি বাজেট দ্বারা ইসলামের ব্যাপক এবং পূর্ণাঙ্গ খেদমত হবে ইনশাআল্লাহ।

- বাজেটে কালো টাকা সাদা করার একটি সুযোগ প্রতি বছরই থাকে। হয়তো এবারও থাকছে। এ বিষয়ে ইসলামের বক্তব্য কী?

মুফতি মিযান : কালো টাকা বলতে যদি অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ হয়ে থাকে, তবে সে অর্থ কখনো সাদা হওয়ার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। সব কালো টাকার প্রকৃত মালিক হচ্ছে রাষ্ট্র ও ওইসব জনগণ যাদের কাছ থেকে দুর্নীতি ও নানা ধরনের অসৎ উপায়ে এই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ইসলামের বিধান হলো, এসব হারাম টাকা তার প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে। প্রকৃত মালিক পাওয়া না গেলে গরিব-দুঃখীদের মাঝে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিতে হবে। সরকার চাইলে এটাকে জনকল্যাণ ফান্ডেও জমা নিতে পারে।

কেউ নিজ উদ্যোগে তা করতে না চাইলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, তাদের তা করতে বাধ্য করবে। হারাম আয় দিয়ে অর্থনীতির চাকা কখনো সচল হতে পারে না।

সাক্ষাৎকারে : মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ

বাজেট রাষ্ট্রের কাছে জনগণের আমানত

 তোফায়েল গাজালি 
২৮ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
তিন জুন জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতো বাজেট নিয়ে স্বপ্ন দেখেন আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ জনতা। তারা কেমন বাজেট চান?
মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ।

তিন জুন জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতো বাজেট নিয়ে স্বপ্ন দেখেন আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ জনতা। তারা কেমন বাজেট চান?

ইসলামে বাজেটের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ইত্যাদি বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ইসলামি অর্থনীতিবিদ মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদের সঙ্গে কথা বলেছেন - তোফায়েল গাজালি

-ইসলামে বাজেটের গুরুত্ব কতটুকু?

মুফতি মিযান : ইসলামে বাজেটের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম একটি স্বভাবজাত ধর্ম। কুরআন-হাদিসে বর্ণিত প্রতিটি নির্দেশনা মানুষের স্বভাবসম্মত, সুবিন্যস্ত এবং পরিপাটি। সুশৃঙ্খল ও উন্নত জীবনযাপনের জন্য আয় অনুপাতে ব্যয়ের যে খাত নির্ধারণ করা হয়, সেটাই বাজেট।

বাজেটের সঙ্গে দেশের উন্নতি-অগ্রগতি এবং জনগণের ভাগ্য অনেকাংশে জড়িত। তাই ইসলামে বাজেটকে একটি জাতীয় আমানত হিসাবে দেখা হয়। বাজেটের ওপর ভিত্তি করে একটি দেশ যেমন এগিয়ে যায়, তেমনি অপরিকল্পিত বাজেটের কারণে একটি দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে।

সরকারের দায়িত্ব হলো, বাজেট প্রণয়নের সময় দেশ ও জনগণের কল্যাণে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আমানতের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা। অন্যথায় আল্লাহর দরবারে কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

-বাজেটের ইসলামি ফর্মুলা কী?

মুফতি মিযান : ইসলামি অর্থব্যবস্থায় বাজেট প্রণয়নের মৌলিক নীতিমালা হলো, ‘সর্বপ্রথম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।’ তার পর তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে আসা।

বাজেটের খাত নির্ধারণের পর দেখতে হবে, নির্ধারিত খাতের জন্য একান্ত প্রয়োজন কী বা কতটুকু। সব খাতের একান্ত প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পর খাতের অলংকরণের দিকে নজর দিতে হবে। আমরা আগের বহু বাজেটে দেখেছি, কম গুরুত্বপূর্ণ খাতের অলংকরণ করতে গিয়ে কোটি কোটি টাকার বিলাসী বাজেট করা হয়েছে, অথচ অতিগুরুত্বপূর্ণ খাতকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

এতে করে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ইসলাম এসব অপ্রতুল বিলাসী বাজেট সমর্থন করে না।

- বাজেট প্রণয়নের আগে মোটামুটিভাবে সব শ্রেণির মানুষের মতামত নেওয়া হয়। আলেমদের মতামত নেওয়া হয় না। এটাকে কীভাবে দেখেন?

মুফতি মিযান : এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের রাষ্ট্রের কর্তারা মনে করেন, আলেম-ওলামারা কুরআন-হাদিস পড়েন। তারা নামাজ রোজা, দোয়া কালাম করবেন। তাদের কাছে অর্থনীতির কোনো জ্ঞান নেই। অথচ আমাদের মাদ্রাসাগুলোয় যে ‘ফিকহুল বূয়ো’ পড়ানো হয়, এটা পুরোটাই ইসলামি অর্থনীতি।

বাজেট প্রণয়নের সময় আলেমদের মতামত না নেওয়ার একটি বড় কারণ এটাও হতে পারে, আমাদের জাতীয় অর্থনীতি সম্পূর্ণ সুদনির্ভর আর ওলামায়ে কেরাম সুদমুক্ত অর্থনীতির কথা বলেন।

প্রত্যেক মুসলমানকে একটি কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, তাহলো- একজন মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের, প্রতিটি সমস্যার সঠিক ও যৌক্তিক সমাধান রয়েছে ইসলামে। লক্ষ করলে দেখবেন, আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও বাজেটের অমীমাংসিত বহু বিষয়েরই সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান রয়েছে ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায়।

তাই আমি মনে করি, বাজেট প্রণয়নের আগে সমাজের অপরাপর জনসাধারণের মতো আলেমদের মতামতও নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

-এবারের বাজেটে কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?

মুফতি মিযান : করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশও এ থেকে মুক্ত নয়। এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, অল্প আয় দিয়ে ব্যাপক চাহিদা পূরণ অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

দীর্ঘ লকডাউনের কারণে জনজীবনে অভাব-অনটন নেমে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ইসলামের বক্তব্য হলো, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের উপার্জন দিয়ে জীবন নির্বাহ করতে না পারে, তাহলে অন্তত তার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান তথা মৌলিক চাহিদা রাষ্ট্রকে পূরণ করতে হবে। (আজকের আধুনিক সমাজব্যবস্থাও এ কথাই বলে)। সুতরাং সব নাগরিকের জীবন রক্ষা ও জীবিকার নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে এবারের বাজেটে।

-বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোন খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

মুফতি মিযান : আল্লাহতায়ালা বলেন, আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করে দেই এবং তাদের একজনকে অপরজনের ওপর মর্যাদায় উন্নীত করি, যাতে একে-অপরকে অধীনস্থ হিসাবে গ্রহণ করতে পারে। (সূরা আয যুখরুফ, আয়াত ৩২)।

এ আয়াত দিয়েই ইসলামি স্কলাররা জোগান ও চাহিদার ব্যাখ্যা করেন। ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় বাজেটের ক্ষেত্রে জনগণের চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়। খালি চোখে যেটুকু মনে হচ্ছে, এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে অধিক গুরুত্ব দেওয়াই জনগণের চাহিদা ও দাবি।

- শতভাগ সুদনির্ভর বাজেট সম্পর্কে আপনার মত কী? বিশ্ব অর্থনীতির চাকা যেখানে সুদের ওপর ভিত্তি করে চলছে, সেখানে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব?

মুফতি মিযান : প্রথম কথা হলো, সুদনির্ভর বাজেট তথা সুদি লেনদেন থেকে বেরিয়ে এসে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব। দ্বিতীয় কথা হলো- আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৮৬নং আয়াতে বলেন, ‘লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উস আহা’ আল্লাহ বান্দাকে এমন কিছু করার আদেশ দেন না, যা তার জন্য অসম্ভব।

আরেক আয়াতে আছে, ‘আহাল্লাল্লাহুল বাইয়া ওয়া র্হারামার রিবা’ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। (সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৫)। এ দুটি আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, শতভাগ সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা অবশ্যই সম্ভব। এ কথা বিশ্বাস করা একজন মুমিনের ইমানের অংশও বটে।

তাই বলা যায়, সম্পূর্ণ সুদমুক্ত অর্থনীতির প্রচলনের জন্য একটি রাষ্ট্রের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। হ্যাঁ! সুদমুক্ত অর্থনীতির প্রতিষ্ঠায় আরেকটি মূলনীতি আমাদের জেনে রাখা দরকার। তাহলো আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় কর’ (তাগাবুন, আয়াত ১৬)।

এ আয়াতটিকে সাধ্যের বাইরের সুদি লেনদেনের সাময়িক অনুমতির পক্ষে দলিল হিসাবে উপস্থাপন করে থাকেন ইসলামিক স্কলাররা। কারণ বিশ্ববাজারের সঙ্গে চলতে হলে আমাদের পক্ষে চাইলেই সুদি লেনদেন বর্জন করা সম্ভব নয়।

-বিশেষ ধর্মীয় খাত কী? বাজেটে যেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি?

মুফতি মিযান : একটি মুসলিমপ্রধান দেশে বিশেষ ধর্মীয় খাতের অভাব নেই, তবুও বিগত দিনের বাজেটগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের বাজেটে ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় খাতে বরাদ্দের পরিমাণও খুবই কম। সারা দেশের হাজার হাজার ইমাম-খতিব ও মুয়াজ্জিনদের জন্য বাজেটে কোনো বরাদ্দই থাকে না।

মসজিদ, মাদ্রাসা ও মক্তবগুলো সরকারি কোনো ধরনের সহযোগিতা ছাড়াই পরিচালিত হয়ে আসছে যুগ যুগ থেকে। বাজেটে ধর্মীয় এসব প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি। ধর্মীয় খাতে ব্যাপক বরাদ্দ দেওয়ার দাবির সঙ্গে সঙ্গে অতিপ্রয়োজনীয় আরেকটি বিষয় সম্পর্কে আমি অবগত করতে চাই, তাহলো- স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আমরা বরাবরই দেখে আসছি, ধর্মীয় খাতগুলো যে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয় অর্থাৎ ধর্ম মন্ত্রণালয় বা এতদসংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে এমনসব লোকদের বসানো হয়, যারা আসলে ধর্ম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। ফলে সরকারের বরাদ্দ দ্বারা ধর্মের খুব কমই উপকার হয়ে থাকে।

আমি মনে করি, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অন্তত মূল দায়িত্বগুলোয় এমনসব লোকদের বসানো উচিত, যারা ধর্ম সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন। তাহলে সরাকারি বাজেট দ্বারা ইসলামের ব্যাপক এবং পূর্ণাঙ্গ খেদমত হবে ইনশাআল্লাহ।

- বাজেটে কালো টাকা সাদা করার একটি সুযোগ প্রতি বছরই থাকে। হয়তো এবারও থাকছে। এ বিষয়ে ইসলামের বক্তব্য কী?

মুফতি মিযান : কালো টাকা বলতে যদি অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ হয়ে থাকে, তবে সে অর্থ কখনো সাদা হওয়ার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। সব কালো টাকার প্রকৃত মালিক হচ্ছে রাষ্ট্র ও ওইসব জনগণ যাদের কাছ থেকে দুর্নীতি ও নানা ধরনের অসৎ উপায়ে এই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ইসলামের বিধান হলো, এসব হারাম টাকা তার প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে। প্রকৃত মালিক পাওয়া না গেলে গরিব-দুঃখীদের মাঝে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিতে হবে। সরকার চাইলে এটাকে জনকল্যাণ ফান্ডেও জমা নিতে পারে।

কেউ নিজ উদ্যোগে তা করতে না চাইলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, তাদের তা করতে বাধ্য করবে। হারাম আয় দিয়ে অর্থনীতির চাকা কখনো সচল হতে পারে না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন