রহমতের বৃষ্টিতে প্রাণ পায় সৃষ্টি
jugantor
রহমতের বৃষ্টিতে প্রাণ পায় সৃষ্টি

  আহনাফ আবদুল কাদির  

১১ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঝমঝম বৃষ্টি ঝরছে। রিমঝিম সুরে গাইছে প্রকৃতি। বৃষ্টির মন মাতানো সুর ও ছন্দে দুলে উঠছে মন। এ যেন প্রভুর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বিশেষ আয়োজন।

খরতাপে শুকিয়ে যাওয়া মাটির পৃথিবীকে জাগিয়ে দিয়ে আবার বসবাসের যোগ্য করে তোলে বৃষ্টি। আসমানি ফোঁটায় প্রাণ ফিরে পায় মরা জমিন। একবার ভাবুন তো! বৃষ্টির এ ফোঁটাগুলো কি কেবলই জলকণার সমষ্টি? নাকি পৃথিবীবাসীর প্রতি রবের করুণা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

একটু নিবিড়ভাবে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ভাবুন। কোনো সেই সত্তা যিনি এ গরম পৃথিবীকে বৃষ্টির নরম ছোঁয়ায় ভিজিয়ে দেন। জাগিয়ে দেন পৃথিবীর সব প্রাণ ও প্রাণীকে।

পবিত্র কুরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জলাধর মেঘমালা থেকে প্রচুর বৃষ্টি প্রেরণ করি এবং এর মাধ্যমে উৎপন্ন করি ফসল, শাকসবজি ও পাতাঘন উদ্যান’। (সূরা নাবা, আয়াত ১৪-১৬)।

আরও বলা হয়েছে, ‘তিনি সেই সত্তা; যিনি বৃষ্টির আগে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন, যা ভারী মেঘমালা বহন করে নিয়ে আসে। আর আমি তা মৃত ভূমির দিকে নিয়ে যাই। অতঃপর আমি বৃষ্টিবর্ষণ করি এবং এর দ্বারা সব ধরনের ফল উৎপন্ন করি। এভাবেই আমি মৃতকে প্রাণ দেই যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর’। (সূরা আরাফ, আয়াত ৫৭)।

বৃষ্টি এলেই চারদিকে তার অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতি হেসে ওঠে নতুন প্রাণে। মৃতপ্রায় পৃথিবী তার চিরচেনা রূপ ফিরে পায়। তপ্ত রোদে পোড়া পৃথিবীতে সজীবতা ফিরে আসে। ফসলি জমিন হয় উর্বর ও উৎপাদনশীল। বৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রাণ জাগে।

এর মায়াবি রূপ আন্দোলিত করে মানুষের দেহ-মনকে। তাই মহান আল্লাহতায়ালা রহমের বৃষ্টি দেখে তাকে চেনার ও তার সৃষ্টি রহস্য উপলব্ধি করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষত বিজ্ঞান আমাদের জানিয়েছে যে, পৃথিবীতে এত পানি থাকার কথা নয়। মূলত প্রচুর বৃষ্টিপাত থেকেই বেশিরভাগ পানি এসেছে।

প্রতিদিন প্রায় এক ট্রিলিয়ন টন বা দশ লাখ কোটি টন পানি বাষ্প হয়ে আকাশে চলে যায়। আবার একই পরিমাণ পানি বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসে। এ ভারসাম্যের কারণেই পৃথিবীর সজীবতা এখনো টিকে আছে। আরেকটি বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, মেঘমালাতে শুধু বিশুদ্ধ পানিই নয়; রয়েছে বিপুল পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া, অন্যান্য অনুজীব ও পুষ্টিকর উপাদান।

এ কারণেই মৃত জমি বৃষ্টির পানি পেয়ে সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বৃষ্টি ছাড়া ফসলের কথা ভাবাও যায় না। আজও বিজ্ঞান বৃষ্টির বিকল্প অবিষ্কার করতে পারেনি।

অন্তরদৃষ্টি শক্তিসম্পন্ন মানুষজন মহান আল্লাহর এমন সৃজনশীলতা, ক্ষমতা ও সুনিপুণ পরিকল্পনায় মুগ্ধ হয়ে তার সামনে নিজেকে সপে দেন। কেবল অন্ধ ও তালাবদ্ধ হৃদয় মহান আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

এ জন্যই আমরা দেখি নবীজি (সা.) রহমতের বৃষ্টির জন্য সদা উদগ্রীব থাকতেন। উপকারী বৃষ্টি কামনা করে তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা সাইয়িবান নাফিয়া- হে আল্লাহ আমাদের জন্য উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন।’ (সহিহ বুখারি, ১০৩২)।

আবার মহান আল্লাহর কাছে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি থেকে আশ্রয় চাইতেন। এ সময় তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা- হে আল্লাহ, আমাদের ওপর নয়, আশপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন।’ (নাসায়ি, ১৫২৭)। বৃষ্টির সময় দোয়া কবুলের কথা বর্ণিত হয়েছে নবীজির হাদিসে। তিনি বলেন, ‘দুই সময়ের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। আজানের সময়ের দোয়া ও বৃষ্টির সময়ের দোয়া’ আবু দাউদ, ২৫৪০।

বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন প্রভুর রহমের ধারা। তাই নবীজি (সা.) নিজের শরীরে ছুঁয়ে নিতেন বৃষ্টির সুশীতল বারিধারা। নবীজির একান্ত সঙ্গী হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘আমরা নবীজির সঙ্গেই ছিলাম। এমন সময় বৃষ্টি নামল। নবীজি তার কাপড়ের কিছু অংশ উঠিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মেখে নিলেন।

আমরা নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন আপনি এমনটা করলেন? তিনি জানালেন, কারণ এটি রবের কাছ থেকেই এসেছে’। (মুসলিম, ৮৯৮)। নবীজির সঙ্গীরাও মাঝে মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজতেন। বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মেখে প্রভুর কাছে কল্যাণ কামনা করতেন। নিজের জন্য ও পৃথিবীবাসীর জন্য দোয়া চাইতেন। আমরাও রবের পাঠানো বারিধারায় একটুখানি ভিজে প্রশান্তি লাভ করতে পারি। আর রবের কাছে দুই হাত তুলে মোনাজাত করি, প্রভু হে! আমাদের দিন রহমের বৃষ্টি। দিন প্রশান্তিময় উপকারী বৃষ্টি। পৃথিবীর অসুখ দূর করে দিন। করোনার আজাব থেকে মুক্তি দিন। আপনার রহমের চাদরে আবৃত করে নিন। আমিন।

রহমতের বৃষ্টিতে প্রাণ পায় সৃষ্টি

 আহনাফ আবদুল কাদির 
১১ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঝমঝম বৃষ্টি ঝরছে। রিমঝিম সুরে গাইছে প্রকৃতি। বৃষ্টির মন মাতানো সুর ও ছন্দে দুলে উঠছে মন। এ যেন প্রভুর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বিশেষ আয়োজন।

খরতাপে শুকিয়ে যাওয়া মাটির পৃথিবীকে জাগিয়ে দিয়ে আবার বসবাসের যোগ্য করে তোলে বৃষ্টি। আসমানি ফোঁটায় প্রাণ ফিরে পায় মরা জমিন। একবার ভাবুন তো! বৃষ্টির এ ফোঁটাগুলো কি কেবলই জলকণার সমষ্টি? নাকি পৃথিবীবাসীর প্রতি রবের করুণা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

একটু নিবিড়ভাবে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ভাবুন। কোনো সেই সত্তা যিনি এ গরম পৃথিবীকে বৃষ্টির নরম ছোঁয়ায় ভিজিয়ে দেন। জাগিয়ে দেন পৃথিবীর সব প্রাণ ও প্রাণীকে।

পবিত্র কুরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জলাধর মেঘমালা থেকে প্রচুর বৃষ্টি প্রেরণ করি এবং এর মাধ্যমে উৎপন্ন করি ফসল, শাকসবজি ও পাতাঘন উদ্যান’। (সূরা নাবা, আয়াত ১৪-১৬)।

আরও বলা হয়েছে, ‘তিনি সেই সত্তা; যিনি বৃষ্টির আগে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন, যা ভারী মেঘমালা বহন করে নিয়ে আসে। আর আমি তা মৃত ভূমির দিকে নিয়ে যাই। অতঃপর আমি বৃষ্টিবর্ষণ করি এবং এর দ্বারা সব ধরনের ফল উৎপন্ন করি। এভাবেই আমি মৃতকে প্রাণ দেই যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর’। (সূরা আরাফ, আয়াত ৫৭)।

বৃষ্টি এলেই চারদিকে তার অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতি হেসে ওঠে নতুন প্রাণে। মৃতপ্রায় পৃথিবী তার চিরচেনা রূপ ফিরে পায়। তপ্ত রোদে পোড়া পৃথিবীতে সজীবতা ফিরে আসে। ফসলি জমিন হয় উর্বর ও উৎপাদনশীল। বৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রাণ জাগে।

এর মায়াবি রূপ আন্দোলিত করে মানুষের দেহ-মনকে। তাই মহান আল্লাহতায়ালা রহমের বৃষ্টি দেখে তাকে চেনার ও তার সৃষ্টি রহস্য উপলব্ধি করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষত বিজ্ঞান আমাদের জানিয়েছে যে, পৃথিবীতে এত পানি থাকার কথা নয়। মূলত প্রচুর বৃষ্টিপাত থেকেই বেশিরভাগ পানি এসেছে।

প্রতিদিন প্রায় এক ট্রিলিয়ন টন বা দশ লাখ কোটি টন পানি বাষ্প হয়ে আকাশে চলে যায়। আবার একই পরিমাণ পানি বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসে। এ ভারসাম্যের কারণেই পৃথিবীর সজীবতা এখনো টিকে আছে। আরেকটি বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, মেঘমালাতে শুধু বিশুদ্ধ পানিই নয়; রয়েছে বিপুল পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া, অন্যান্য অনুজীব ও পুষ্টিকর উপাদান।

এ কারণেই মৃত জমি বৃষ্টির পানি পেয়ে সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বৃষ্টি ছাড়া ফসলের কথা ভাবাও যায় না। আজও বিজ্ঞান বৃষ্টির বিকল্প অবিষ্কার করতে পারেনি।

অন্তরদৃষ্টি শক্তিসম্পন্ন মানুষজন মহান আল্লাহর এমন সৃজনশীলতা, ক্ষমতা ও সুনিপুণ পরিকল্পনায় মুগ্ধ হয়ে তার সামনে নিজেকে সপে দেন। কেবল অন্ধ ও তালাবদ্ধ হৃদয় মহান আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

এ জন্যই আমরা দেখি নবীজি (সা.) রহমতের বৃষ্টির জন্য সদা উদগ্রীব থাকতেন। উপকারী বৃষ্টি কামনা করে তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা সাইয়িবান নাফিয়া- হে আল্লাহ আমাদের জন্য উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন।’ (সহিহ বুখারি, ১০৩২)।

আবার মহান আল্লাহর কাছে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি থেকে আশ্রয় চাইতেন। এ সময় তিনি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা- হে আল্লাহ, আমাদের ওপর নয়, আশপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন।’ (নাসায়ি, ১৫২৭)। বৃষ্টির সময় দোয়া কবুলের কথা বর্ণিত হয়েছে নবীজির হাদিসে। তিনি বলেন, ‘দুই সময়ের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। আজানের সময়ের দোয়া ও বৃষ্টির সময়ের দোয়া’ আবু দাউদ, ২৫৪০।

বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন প্রভুর রহমের ধারা। তাই নবীজি (সা.) নিজের শরীরে ছুঁয়ে নিতেন বৃষ্টির সুশীতল বারিধারা। নবীজির একান্ত সঙ্গী হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘আমরা নবীজির সঙ্গেই ছিলাম। এমন সময় বৃষ্টি নামল। নবীজি তার কাপড়ের কিছু অংশ উঠিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মেখে নিলেন।

আমরা নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন আপনি এমনটা করলেন? তিনি জানালেন, কারণ এটি রবের কাছ থেকেই এসেছে’। (মুসলিম, ৮৯৮)। নবীজির সঙ্গীরাও মাঝে মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজতেন। বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মেখে প্রভুর কাছে কল্যাণ কামনা করতেন। নিজের জন্য ও পৃথিবীবাসীর জন্য দোয়া চাইতেন। আমরাও রবের পাঠানো বারিধারায় একটুখানি ভিজে প্রশান্তি লাভ করতে পারি। আর রবের কাছে দুই হাত তুলে মোনাজাত করি, প্রভু হে! আমাদের দিন রহমের বৃষ্টি। দিন প্রশান্তিময় উপকারী বৃষ্টি। পৃথিবীর অসুখ দূর করে দিন। করোনার আজাব থেকে মুক্তি দিন। আপনার রহমের চাদরে আবৃত করে নিন। আমিন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন