ধর্মে দলাদলি নেই
jugantor
ধর্মে দলাদলি নেই

  আহনাফ আবদুল কাদির  

০২ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আপনার সঙ্গে কারও মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্ব থাকাটাও স্বাভাবিক। মানুষে মানুষে এই মতপার্থক্য ও বৈচিত্র্যময়তা যুগযুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু সেই ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যময়তা যখন নোংরামি ও কাদা ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয় এবং তার চেয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে সেটি যদি কুফরি, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের রূপ ধারণ করে তবে এটি ধর্ম ও মানবতার জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষত কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও নবীজি (সা.)-এর বহু হাদিসে এমন আচরণকে প্রবৃত্তির অনুসরণ ও চরম মূর্খতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের কিছু ধর্মীয় পণ্ডিতদের মাঝে এটি আজ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আলেম আলেমের বিরুদ্ধে, দল দলের বিরুদ্ধে, পীর পীরের বিরুদ্ধে অহরহ বিষোদ্গার করে যাচ্ছেন। মাহফিলের স্টেজে, ফেসবুকের ওয়ালে এবং ইউটিউবের চ্যানেলে নোংরামি ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য আজ যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কখনো কখনো এক পক্ষ অপর পক্ষকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের এজেন্ট এবং সরাসরি কাফের ফতোয়া দিচ্ছে। আবার খুব মামুলি বিষয় যেমন টুপির ধরন ও পাঞ্জাবি-পায়জামার কাটিং এসব নিয়েও মতভেদ করতে দেখা যায়। অথচ ইসলামে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যারা তর্কবিতর্কে লিপ্ত হয় এবং অহংকার ও গোঁড়ামিবশত নিজেদের একমাত্র মুমিন-মুসলমান মনে করে তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে এ ধরনের আচরণকে মুশরিকদের স্বভাব হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা তাদের দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করেছে আর নিজেরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত’ (সূরা রুম : ৩১, ৩২)। আরও বলা হয়েছে, ‘যারা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে এবং নিজেরা বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই’ (সূরা আল-আন’আম : ১৫৯)। আরও বহু আয়াতে দলাদলি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। স্রষ্টার অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দারাই কেবল এ ধরনের বিভক্তি পরিহার করে চলতে পারে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার পালনকর্তা যাদেরকে অনুগ্রহ করেন তারা ছাড়া অন্যরা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে’ (সূরা : হুদ-১১৮, ১১৯)। নবীজি (সা.) তার বাণীতে মুসলিম উম্মাহকে মতবিরোধ ও দলাদলি থেকে বিরত থাকার জন্য বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি বহু হাদিস বলেছেন, আমার মৃত্যুর পর তোমরা শেষ জামানায় অনেক মতবিরোধ, দলাদলি ও বিভক্তি দেখতে পাবে। সে সময় বিভক্তি পরিহার করে আমার ও সুপথপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের রীতির ওপর চলবে। কোনো ধরনের দলাদলি করবে না। একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে না।’ অথচ নবীজির বাণীকে উপেক্ষা করে আলেম সমাজই আজ সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনার সম্মুখীন। নিজেরা যেমন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদের দোষারোপ করছে, তেমনি সমর্থকগোষ্ঠীও ভিন্ন মতাবলম্বীদের সঙ্গে অহরহ তর্কে জড়াচ্ছে। এমনকি প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে কোথাও কোথাও। অথচ নবীজি (সা.)-এর হাদিসে আমলের বৈচিত্র্যময়তা আমরা লক্ষ্য করি। একই আমল নবীজি একাধিক নিয়মে করেছেন এবং অন্যদের শিখিয়েছেন। পরে সাহাবাদের মাঝেও আমলের ভিন্নতা ছিল। কিন্তু কেউই নিজেকে হক এবং অন্যদের বাতিল বলেননি। বরং শ্রদ্ধার সঙ্গে অপরের মতামত প্রাধান্য দিতেন। তারা অন্ধভাবে কারও অনুসরণ করতেন না। বরং সবার থেকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতেন। অথচ আমরা আজ আমাদের পছন্দসই দল, পীর অথবা শায়খের বক্তব্যই সঠিক মনে করছি। ওই শায়খ ভুল বললেও মেনে নিচ্ছি। বিবাদে জড়াচ্ছি পরস্পর। এর ফলে সংকীর্ণ হচ্ছে আমাদের জানার বহর। আটকে যাচ্ছি ব্যক্তি পূজায়। ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হচ্ছি। ইমাম গাজালি তার ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ে সুন্দর করে বলেছেন, ‘বিশ্বাস ও ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ এবং পথের ভিন্নতা একটি গভীর সমুদ্রের মতো, যাতে বহু ব্যক্তি নিমজ্জিত হয়েছে, কিন্তু খুব কম লোকই উদ্ধার পেয়েছে। অথচ প্রত্যেকেই মনে করছেন তিনিই শুধু মুক্তির সন্ধান পেয়েছেন’। আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মে দলাদলি নেই এবং দলাদলিতেও ধর্ম নেই। ধর্ম আছে জ্ঞান আহরণে ও আমলে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ আজ কঠিন সময় পার করছে। অথচ আমরা এখনো পড়ে আছি টুপি আর পাঞ্জাবির সাইজ নিয়ে। যা আমাদের ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে। বড় আফসোস করে বিদ্রোহী কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে/ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’ এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর। যুগের সমস্যা সমাধানে আলেমদের যুগোপযোগী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার। কুরআনের আলোয় তরুণ প্রজন্মকে পথে ফেরানোর। না হয় পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়িতে বিপথগামী হবে ধর্মপ্রিয় তরুণরা। দলাদলির কবলে পড়ে তরুণদের একটি শ্রেণি আজ ধর্মের প্রতি আবেদনহীন হয়ে পড়ছে। আরেক শ্রেণি হয়ে পড়ছে উগ্র মানসিকতাসম্পন্ন। তাই এখনই আলেম সমাজকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও দলাদলি পরিহার করে ইলম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া উচিত।

লেখক : প্রাবন্ধিক

akpatwary.qp@gmail.com

ধর্মে দলাদলি নেই

 আহনাফ আবদুল কাদির 
০২ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আপনার সঙ্গে কারও মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্ব থাকাটাও স্বাভাবিক। মানুষে মানুষে এই মতপার্থক্য ও বৈচিত্র্যময়তা যুগযুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু সেই ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যময়তা যখন নোংরামি ও কাদা ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয় এবং তার চেয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে সেটি যদি কুফরি, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের রূপ ধারণ করে তবে এটি ধর্ম ও মানবতার জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষত কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও নবীজি (সা.)-এর বহু হাদিসে এমন আচরণকে প্রবৃত্তির অনুসরণ ও চরম মূর্খতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের কিছু ধর্মীয় পণ্ডিতদের মাঝে এটি আজ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আলেম আলেমের বিরুদ্ধে, দল দলের বিরুদ্ধে, পীর পীরের বিরুদ্ধে অহরহ বিষোদ্গার করে যাচ্ছেন। মাহফিলের স্টেজে, ফেসবুকের ওয়ালে এবং ইউটিউবের চ্যানেলে নোংরামি ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য আজ যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কখনো কখনো এক পক্ষ অপর পক্ষকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের এজেন্ট এবং সরাসরি কাফের ফতোয়া দিচ্ছে। আবার খুব মামুলি বিষয় যেমন টুপির ধরন ও পাঞ্জাবি-পায়জামার কাটিং এসব নিয়েও মতভেদ করতে দেখা যায়। অথচ ইসলামে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যারা তর্কবিতর্কে লিপ্ত হয় এবং অহংকার ও গোঁড়ামিবশত নিজেদের একমাত্র মুমিন-মুসলমান মনে করে তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে এ ধরনের আচরণকে মুশরিকদের স্বভাব হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা তাদের দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করেছে আর নিজেরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত’ (সূরা রুম : ৩১, ৩২)। আরও বলা হয়েছে, ‘যারা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে এবং নিজেরা বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই’ (সূরা আল-আন’আম : ১৫৯)। আরও বহু আয়াতে দলাদলি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। স্রষ্টার অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দারাই কেবল এ ধরনের বিভক্তি পরিহার করে চলতে পারে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার পালনকর্তা যাদেরকে অনুগ্রহ করেন তারা ছাড়া অন্যরা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে’ (সূরা : হুদ-১১৮, ১১৯)। নবীজি (সা.) তার বাণীতে মুসলিম উম্মাহকে মতবিরোধ ও দলাদলি থেকে বিরত থাকার জন্য বারবার সতর্ক করেছেন। তিনি বহু হাদিস বলেছেন, আমার মৃত্যুর পর তোমরা শেষ জামানায় অনেক মতবিরোধ, দলাদলি ও বিভক্তি দেখতে পাবে। সে সময় বিভক্তি পরিহার করে আমার ও সুপথপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের রীতির ওপর চলবে। কোনো ধরনের দলাদলি করবে না। একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে না।’ অথচ নবীজির বাণীকে উপেক্ষা করে আলেম সমাজই আজ সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনার সম্মুখীন। নিজেরা যেমন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদের দোষারোপ করছে, তেমনি সমর্থকগোষ্ঠীও ভিন্ন মতাবলম্বীদের সঙ্গে অহরহ তর্কে জড়াচ্ছে। এমনকি প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে কোথাও কোথাও। অথচ নবীজি (সা.)-এর হাদিসে আমলের বৈচিত্র্যময়তা আমরা লক্ষ্য করি। একই আমল নবীজি একাধিক নিয়মে করেছেন এবং অন্যদের শিখিয়েছেন। পরে সাহাবাদের মাঝেও আমলের ভিন্নতা ছিল। কিন্তু কেউই নিজেকে হক এবং অন্যদের বাতিল বলেননি। বরং শ্রদ্ধার সঙ্গে অপরের মতামত প্রাধান্য দিতেন। তারা অন্ধভাবে কারও অনুসরণ করতেন না। বরং সবার থেকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতেন। অথচ আমরা আজ আমাদের পছন্দসই দল, পীর অথবা শায়খের বক্তব্যই সঠিক মনে করছি। ওই শায়খ ভুল বললেও মেনে নিচ্ছি। বিবাদে জড়াচ্ছি পরস্পর। এর ফলে সংকীর্ণ হচ্ছে আমাদের জানার বহর। আটকে যাচ্ছি ব্যক্তি পূজায়। ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হচ্ছি। ইমাম গাজালি তার ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ে সুন্দর করে বলেছেন, ‘বিশ্বাস ও ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ এবং পথের ভিন্নতা একটি গভীর সমুদ্রের মতো, যাতে বহু ব্যক্তি নিমজ্জিত হয়েছে, কিন্তু খুব কম লোকই উদ্ধার পেয়েছে। অথচ প্রত্যেকেই মনে করছেন তিনিই শুধু মুক্তির সন্ধান পেয়েছেন’। আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মে দলাদলি নেই এবং দলাদলিতেও ধর্ম নেই। ধর্ম আছে জ্ঞান আহরণে ও আমলে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ আজ কঠিন সময় পার করছে। অথচ আমরা এখনো পড়ে আছি টুপি আর পাঞ্জাবির সাইজ নিয়ে। যা আমাদের ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে। বড় আফসোস করে বিদ্রোহী কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে/ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’ এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর। যুগের সমস্যা সমাধানে আলেমদের যুগোপযোগী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার। কুরআনের আলোয় তরুণ প্রজন্মকে পথে ফেরানোর। না হয় পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়িতে বিপথগামী হবে ধর্মপ্রিয় তরুণরা। দলাদলির কবলে পড়ে তরুণদের একটি শ্রেণি আজ ধর্মের প্রতি আবেদনহীন হয়ে পড়ছে। আরেক শ্রেণি হয়ে পড়ছে উগ্র মানসিকতাসম্পন্ন। তাই এখনই আলেম সমাজকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও দলাদলি পরিহার করে ইলম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া উচিত।

লেখক : প্রাবন্ধিক

akpatwary.qp@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন