লকডাউনে ভালো নেই আলেমরা
jugantor
লকডাউনে ভালো নেই আলেমরা

  রাকিবুল হাসান  

০৯ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান করোনা দুর্যোগের প্রভাবে প্রায় সব খাতই বিপর্যস্ত। কিন্তু মাদ্রাসার শিক্ষা খাতে এ অভিঘাতে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশে করোনা আঘাত হানার পর সরকার গত বছরের ১৭ মার্চ বন্ধ করে দেয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তারপর ১২ জুন কওমি মাদ্রাসাগুলো খুলে দেওয়া হলেও চলতি বছরের ৮ এপ্রিল আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। করোনার তৃতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে চলতে থাকে একের পর এক লকডাউন।

দীর্ঘ এ লকডাউনে বন্ধ মাদ্রাসার আয়ের খাত, বন্ধ শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন। ফলে নাকাল হয়ে পড়েছেন মাদ্রাসার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাই। বাধ্য হয়ে অনেকে পরিবর্তন করছেন শিক্ষকতার পেশা, অন্য কিছু আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছেন প্রাণপণ।

দীর্ঘ আঠারো বছর ইমামতি করেছেন বরিশালের মাওলানা আনিসুর রহমান। ইমামতির বেতন নিতান্ত স্বল্প হলেও স্থানীয় একটি কোচিংয়ে আরবি পড়ানোর সুবাদে দিন চলে যেত অনায়াসে। কিন্তু করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যায় কোচিং। ইমামতির স্বল্প বেতনে জীবিকা নির্বাহ বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও আশায় ছিলেন একদিন কোচিং খুলবে। টানা লকডাউনে আশা যখন নিরাশায় পরিণত হলো, তিনি সিদ্ধান্ত নেন পেশা বদলানোর।

যুগান্তরকে মাওলানা আনিসুর রহমান বলেন, ‘একজন আমাকে পরামর্শ দিল, ঢাকায় গিয়ে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করতে পারেন। এতে বেশ আয় হবে এবং অনায়াসে সংসারও চলবে। তার পরামর্শে জুনের শেষদিকে ঢাকা এসে এই ভ্যান নিয়েছি। আজকেই প্রথম ভ্যান নিয়ে বের হলাম।’

মাওলানা আনিস এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সেদিনই প্রথম সবজির ভ্যান নিয়ে বেরিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিজের দুর্দশার কথা বলতে খুব লজ্জা লাগে! বেশি কিছু বলতে চাই না, বুঝতেও চাই না। শুধু বুঝি-পরিবারের পাঁচ সদস্যের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিতে হবে। করোনার জন্য কোচিং বন্ধ থাকায় খুবই নাজেহাল অবস্থায় আছি। বাধ্য হয়ে সবজি বিক্রিতে নেমেছি। কেমন বেকায়দায় পড়েছি, বুঝতেই পারছেন!’

রাজধানীর এক মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষিকা আলেমা আয়েশা জান্নাত। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে তিনি একাই থাকেন। তার আয়েই চলে পরিবার। মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার বেতনও বন্ধ হয়ে যায়। জীবিকা নির্বাহের বিকল্প উপায় হিসাবে কিছু টাকা ঋণ করে অনলাইনে স্বল্প পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা পলিসি ধরতে না পারায় এখানেও লোকসান গুনতে হয় তাকে। তার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাক্সিডেন্টে আঘাতপ্রাপ্ত হয় তার পা। এখন নিতান্তই মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই আলেমা।

করোনার প্রথম দিকে এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল বিভিন্ন সেবা সংস্থা, রাজনৈতিক দল, কওমি শিক্ষা বোর্ড। তবে এখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। তাদের বুকে গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস তাদের বুকেই নিভৃতে মরে।

এ বিষয়ে আন নূর হ্যাল্পিং হ্যান্ডের নির্বাহী পরিচালক মাওলানা আনসারুল হক ইমরান বলেন, আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। প্রতিনিয়ত সাহায্যের আর্তি জানিয়ে মেসেজ আসছে। হাহাকারে বুক ভারী হয়ে উঠছে আমাদের। সেদিন একজন প্রসিদ্ধ আলেম আমাকে মেসেজ করে বললেন, খুব সংকটে আছি। যদি সাহায্য করতেন ভালো হতো। আপনি আমাকে চিনবেন। তাই আমি আপনার সামনে আসতে পারব না লজ্জায়। পরে তার বাবা এসে সাহায্য নিয়ে যান।

সামনে কুরবানির ঈদ উল্লেখ করে মাওলানা আনসারুল হক বলেন, ‘কুরবানির ঈদে আমরা গরু জবাই করে মাংস বিতরণ করব। দুঃসময়ে ঈদ এলে মানুষের দুঃখ বাড়ে। চেষ্টা করব সেই দুঃখ কিছুটা হলেও ঘোচাতে। শুধু আমরা নই, বরং আমাদের সবাইকেই চেষ্টা করতে হবে। সবাই যদি সবার পাশে দাঁড়াই, তাহলে এ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে।’

লকডাউনে ভালো নেই আলেমরা

 রাকিবুল হাসান 
০৯ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান করোনা দুর্যোগের প্রভাবে প্রায় সব খাতই বিপর্যস্ত। কিন্তু মাদ্রাসার শিক্ষা খাতে এ অভিঘাতে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশে করোনা আঘাত হানার পর সরকার গত বছরের ১৭ মার্চ বন্ধ করে দেয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তারপর ১২ জুন কওমি মাদ্রাসাগুলো খুলে দেওয়া হলেও চলতি বছরের ৮ এপ্রিল আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। করোনার তৃতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে চলতে থাকে একের পর এক লকডাউন।

দীর্ঘ এ লকডাউনে বন্ধ মাদ্রাসার আয়ের খাত, বন্ধ শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন। ফলে নাকাল হয়ে পড়েছেন মাদ্রাসার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাই। বাধ্য হয়ে অনেকে পরিবর্তন করছেন শিক্ষকতার পেশা, অন্য কিছু আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছেন প্রাণপণ।

দীর্ঘ আঠারো বছর ইমামতি করেছেন বরিশালের মাওলানা আনিসুর রহমান। ইমামতির বেতন নিতান্ত স্বল্প হলেও স্থানীয় একটি কোচিংয়ে আরবি পড়ানোর সুবাদে দিন চলে যেত অনায়াসে। কিন্তু করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যায় কোচিং। ইমামতির স্বল্প বেতনে জীবিকা নির্বাহ বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও আশায় ছিলেন একদিন কোচিং খুলবে। টানা লকডাউনে আশা যখন নিরাশায় পরিণত হলো, তিনি সিদ্ধান্ত নেন পেশা বদলানোর।

যুগান্তরকে মাওলানা আনিসুর রহমান বলেন, ‘একজন আমাকে পরামর্শ দিল, ঢাকায় গিয়ে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করতে পারেন। এতে বেশ আয় হবে এবং অনায়াসে সংসারও চলবে। তার পরামর্শে জুনের শেষদিকে ঢাকা এসে এই ভ্যান নিয়েছি। আজকেই প্রথম ভ্যান নিয়ে বের হলাম।’

মাওলানা আনিস এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সেদিনই প্রথম সবজির ভ্যান নিয়ে বেরিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিজের দুর্দশার কথা বলতে খুব লজ্জা লাগে! বেশি কিছু বলতে চাই না, বুঝতেও চাই না। শুধু বুঝি-পরিবারের পাঁচ সদস্যের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিতে হবে। করোনার জন্য কোচিং বন্ধ থাকায় খুবই নাজেহাল অবস্থায় আছি। বাধ্য হয়ে সবজি বিক্রিতে নেমেছি। কেমন বেকায়দায় পড়েছি, বুঝতেই পারছেন!’

রাজধানীর এক মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষিকা আলেমা আয়েশা জান্নাত। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে তিনি একাই থাকেন। তার আয়েই চলে পরিবার। মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার বেতনও বন্ধ হয়ে যায়। জীবিকা নির্বাহের বিকল্প উপায় হিসাবে কিছু টাকা ঋণ করে অনলাইনে স্বল্প পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা পলিসি ধরতে না পারায় এখানেও লোকসান গুনতে হয় তাকে। তার ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাক্সিডেন্টে আঘাতপ্রাপ্ত হয় তার পা। এখন নিতান্তই মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই আলেমা।

করোনার প্রথম দিকে এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল বিভিন্ন সেবা সংস্থা, রাজনৈতিক দল, কওমি শিক্ষা বোর্ড। তবে এখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। তাদের বুকে গুমরে ওঠা দীর্ঘশ্বাস তাদের বুকেই নিভৃতে মরে।

এ বিষয়ে আন নূর হ্যাল্পিং হ্যান্ডের নির্বাহী পরিচালক মাওলানা আনসারুল হক ইমরান বলেন, আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। প্রতিনিয়ত সাহায্যের আর্তি জানিয়ে মেসেজ আসছে। হাহাকারে বুক ভারী হয়ে উঠছে আমাদের। সেদিন একজন প্রসিদ্ধ আলেম আমাকে মেসেজ করে বললেন, খুব সংকটে আছি। যদি সাহায্য করতেন ভালো হতো। আপনি আমাকে চিনবেন। তাই আমি আপনার সামনে আসতে পারব না লজ্জায়। পরে তার বাবা এসে সাহায্য নিয়ে যান।

সামনে কুরবানির ঈদ উল্লেখ করে মাওলানা আনসারুল হক বলেন, ‘কুরবানির ঈদে আমরা গরু জবাই করে মাংস বিতরণ করব। দুঃসময়ে ঈদ এলে মানুষের দুঃখ বাড়ে। চেষ্টা করব সেই দুঃখ কিছুটা হলেও ঘোচাতে। শুধু আমরা নই, বরং আমাদের সবাইকেই চেষ্টা করতে হবে। সবাই যদি সবার পাশে দাঁড়াই, তাহলে এ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন