কোরআনের শিক্ষা : আলেম ও সুশীল সমাজের দায়িত্ব

  রফিকুল ইসলাম চৌধুরী ০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোরআন

দেশের আলেম এবং সুশীল সমাজের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব লক্ষ্য করা যায়। আলেম সমাজের অনেকেই মনে করেন, সুশীল সমাজ কোরআন পড়ে না, ধর্মাচার করে না। আর সুশীল সমাজ মনে করে, আলেম সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা করে না। যদিও দু’পক্ষের মাঝে বিভাজন রেখাটি কঠোর নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই নমনীয়। যারা আলেম তাদের অনেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা করেন এবং সুশীল সমাজের অনেকেই কোরআন পড়েন, ধর্মাচারও করেন। আলেম-সুশীল বা সুশীল-আলেম একই ব্যক্তি হতে পারেন। তবে, আলোচনার সুবিধার্থে একটা বিভাজন রেখা ধরে নেয়া যায়। আলেম ও সুশীল উভয়ই কোরআন পড়ে ইহকাল-পরকালের কল্যাণ-মুক্তির বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করলে পরস্পরের আন্তরিকাত ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি হতে পারে। যতদূর জানা যায়, ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীরা সঙ্গীত ও সংস্কৃতিকে ধর্মীয় আচার হিসেবে পালন করেন। কিন্তু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কেউ কেউ সংস্কৃতি চর্চাকে ধর্মবিরোধী মনে করেন। এ বিষয়ে সূরা বাকারার একটি আয়াতের প্রতি লক্ষ্য করা যায়, যেমন- আর যখন তোমরা ইবাদতের যাবতীয় অনুষ্ঠানাদি শেষ করবে তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে যেমন তোমাদের পূর্ব পুরুষদের স্মরণ করতে, অথবা তার চেয়েও অধিক স্মরণ করবে (২ বাকারা : ২০০)। সেকালে হজ বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে মক্কাবাসী মিনা, আরাফাত বা অন্য কোথাও মিলিত হয়ে কবিতা, লোকগাঁথা ও সঙ্গীতের মাধ্যমে পূর্ব পুরুষদের গৌরব করত, সেভাবে বা আরও অধিকভাবে আল্লাহকে স্মরণ করতে বলা হয়েছে এখানে। কোরআন মানবজাতি ও বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ (৩৮ সাদ : ২৯, ৮১ তাকবির : ২৭)। সুশীল ও আলেম সমাজ কোরআনে বর্ণিত ঈমান-আমল-শিক্ষা-কল্যাণ-জ্ঞান-বিজ্ঞান-গবেষণা ইত্যাদি অনেক বিষয়ে মতবিনিময় করতে পারে। এদের কয়েকটি হল- কোরআনে আল্লাহ্ বলেন, আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি (৫১ জারিয়াত : ৫৬)। ইবাদত অর্থ আনুগত্য বা নির্দেশ পালন। নামাজ-রোজা ইত্যাদি ইবাদতেরই অংশ, আল্লাহ্র যাবতীয় আদেশ-নির্দেশ পালন করাই ইবাদত। ‘নামাজ বেহেশতের চাবি’, হাদিসের এই কথাটি বহুল প্রচলিত এবং অধিকাংশ মুসল্লি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন। কিন্তু নামাজিদের জন্য ওয়াইলুল দোযখ (দুর্ভোগ), যারা নামাজ বিষয়ে উদাসীন এবং লোক দেখানোর জন্য করে (১০৭ মাউন : ৪-৬)। কোরআনের এই কথাটির গুরুত্ব কিছুটা কম দেয়া হয়। নামাজ পড়ার জন্য যতটা তাগিদ দেয়া হয়, কায়েমের জন্য ততটা নয়। কোরআনে আল্লাহ্ বলেন, যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তাদের জন্য জান্নাত (২ বাকারা : ৮২)। যারা কোরআনের আয়াত বা নিদর্শন বিষয়ে গাফেল তাদের ঠিকানা জাহান্নাম (১০ ইউনুস : ৭-৮)। নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াত (নিদর্শন) প্রত্যাখ্যান (গোপন) করে আমি অবশ্যই তাদের অগ্নিতে দগ্ধ করব (৪ নিসা : ৫৬) কাফির ও জালিমরাই আল্লাহ্র আয়াত (নিদর্শন) অস্বীকার করে (২৯ আনতাবুত : ৪৭, ৪৯)। আমি আপনার প্রতি কেতাব নাজিল করেছি, যাতে আছে সব বিষয়ের ব্যাখ্যা, হেদায়াত, রহমত ও সুসংবাদ মুসলমানদের (আত্মসমর্পণকারী) জন্য (১৬ নাহল : ৮৯)। যারা আমার আয়াত (নিদর্শন) অস্বীকার করে তাদের আমি এমনভাবে ক্রমে ক্রমে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাই যে, তারা বুঝতেও পারে না (৭ আরাফ : ১৮২)। বুঝে পড়া, সৎকর্ম, মানবকল্যাণ, নিদর্শন, গবেষণা ইত্যাদি বিষয়ে কোরআনে অনেক আয়াত রয়েছে।

কোরআনে আল্লাহ্ ঈমানদারদের পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামে দাখিল হতে বলেছেন (২ বাকারা : ২০৮) এবং কোরআনের কিছু মানা, কিছু না মানা বিষয়ে আল্লাহ্ সতর্ক করে দিয়েছেন (২ বাকারা : ৮৫, ২ বাকারা : ১৫৯, ৪ নিসা : ১৫০-১৫১)। আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি তার রবের আয়াতে উপদিষ্ট হওয়ার পর তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার চেয়ে বড় জালিম আর কে (৩২ সাজদা : ২২)। জালিমরা চরম মতভেদে আছে (২২ হাজ : ৫৩)। কোরআন মীমাংসাকারী বাণী (৮৬ তরিক : ১৩)। তবে কি তারা গভীরভাবে কোরআন অনুধাবন করে না, তাদের অন্তর কী তালাবদ্ধ? (৪৭ মুহাম্মদ : ২৪)। কোরআন নিশ্চয়ই আপনার ও আপনার সম্প্রদায়ের জন্য অতিআবশ্যিক উপদেশ, শিগগিরই এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে (৪৩ যুখরুফ : ৪৪)। না পড়লে না বুঝলে কিভাবে প্রশ্নের জবাব দেব। কোরআন পড়া কি খুব কঠিন? আল্লাহ্ বলেন, শিক্ষা গ্রহণের জন্য আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি, শিক্ষা গ্রহণে কেউ আছে কি (৫৪ কামার : ১৭, ২২, ৩২, ৪০)।

আলেম ও সুশীল সমাজ কোআনের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর শিক্ষণীয় বিষয় অনুসন্ধান করে কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রতি অধিকতর দায়িত্বশীল হতে পারেন। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ কোরআন ও ধর্ম বিষয়ে আলোচনা, সেমিনার, টকশো করতে পারেন। এদিকে আমাদের সমাজে নাস্তিক একটি বহুল উচ্চারিত শব্দ। কিন্তু নাস্তিক কে? সূরা আরাফের ১৭২ নং আয়াত অনুযায়ী জন্মের পূর্বে আমরা আল্লাহকে প্রভু বলে স্বীকার করে এসেছি এবং সূরা রাদের ১৫ নং আয়াত অনুযায়ী আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছেন তারা ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আল্লাহর ইবাদত করে। তাই কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী একজন ঈমানদার কাউকে নাস্তিক বলতে পারেন না। আবার কেউ যদি নিজেকে নাস্তিক বলে দাবি করেনও কোরআন অনুযায়ী তিনিও নাস্তিক নন। কারণ তিনি আল্লাহ্র দুনিয়ায় বাস করেন এবং তার সেবা নিয়ামত ভোগ করেন।

কোরআনের প্রতিটি শব্দ আয়াত ও সূরার অর্থ রয়েছে, আছে শানেনজুল, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এতে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কল্যাণের অসংখ্য আয়াত (নিদর্শন) রয়েছে। এই বিশ্বজগৎ কত বিশাল, কত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম-ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আর বিশাল-প্রকাণ্ড প্রতিটি অস্তিত্ব, কত সুবিন্যাস্ত, কত সুশৃঙ্খল, মানুষ এর এক অণুর লাখো কোটি ভাগের এক ভাগও এখন পর্যন্ত জানতে পারেনি। আল্লাহ্ মহাবিশ্বের স্রষ্টা। সূরা ফাতিহায় বলা হয়েছে, আল্লাহ্ জগৎসমূহের প্রতিপালক। আমরা যে গ্যালাক্সিতে আছি তার গ্রহ-নক্ষত্রের সংখ্যা ১০ হাজার কোটি। এরকম গ্যালাক্সির সংখ্যাও ১০ হাজার কোটি। তাই জগৎসমূহ মানে ১০ হাজার কোটি ূ ১০ হাজার কোটি গ্রহ-নক্ষত্র (৬৫ তালাক : ১২, ৭১ নূহ : ১৫)। মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো গ্রহের সংখ্যা কি ১০ হাজার কোটি? সূরা তালাকে বলা হয়েছে, তিনি আল্লাহ্, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত (সাবআ) আসমান ও একইসংখ্যক পৃথিবী (৬৫ তালাক : ১২)। আয়াতে উল্লেখিত ‘সাবআ’ অর্থ সাত বা অসংখ্য বা দুটোই। তাহলে এ আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ্ হচ্ছেন তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য আকাশ ততসংখ্যক পৃথিবী। যত আকাশ তত পৃথিবী। যদি প্রতি গ্যালাক্সিকে একটা আকাশ ধরা হয়, মাহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো গ্রহের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার কোটি। বর্তমানে পৃথিবীর মতো গ্রহ একের পর এক আবিষ্কার হয়ে চলেছে। কোটি কোটি টন ওজনের পৃথিবী সূর্যের চারদিকে এবং কোটি কোটি টন ওজনের চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে সুশৃঙ্খল ও সুনির্দিষ্ট পথে ঘুরে চলেছে, এটা কত বিশাল বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড। কোরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চিত বিশ্বাসীর জন্য আয়াত (নিদর্শন) রয়েছে পৃথিবীতে এবং তোমাদের মধ্যেও, তোমরা কি অনুধাবন করবে না (৫১ যারিয়াত : ২০-২১)। তাই বলা হয়, যা আছে বিশ্বভাণ্ডে তা আছে মানবভাণ্ডে। আরও বলা হয়েছে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে ঈমানদারদের জন্য অতিআবশ্ব্যিক আয়াত (নিদের্শন) রয়েছে (৪৫ জাছিয়া : ৩)। কোরআন নিজেই একটা আয়াত বা নিদর্শন। এর মধ্যেও আছে হাজার হাজার আয়াত (নিদর্শন)। আকাশমণ্ডলী, মানুষ, পশু-পাখি, পানি, বাতাস- সবই আল্লাহর আয়াত (নিদর্শন) এবং প্রতিটির মধ্যেও আছে কোটি কোটি আয়াত বা নিদর্শন। কোরআনে আছে, পৃথিবীর সব বৃক্ষ যদি কলম হয় আর সমুদ্র যদি কালি হয় এবং এর সঙ্গে সাত সমুদ্র যুক্ত হয় তবুও আল্লাহর বাণী লেখা শেষ হবে না। (৩১ লুকমান : ২৭) হ

লেখক : কৃষিবিদ ও কোরআন ভাবুক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter