জেগে ওঠো হোসাইনি দুনিয়া
jugantor
জেগে ওঠো হোসাইনি দুনিয়া

  আহনাফ আবদুল কাদির  

২০ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নবীজি (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় মেয়ে ফাতেমা তনয় ইমাম হোসাইন (রা.)। শিশুকাল থেকেই নবীজির আদর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন।

নবীজির হেরা গুহায় প্রাপ্ত আলোর প্রস্রবণ পেয়ে আর ইকরার প্রতিধ্বনি শুনে আলোকিত হয়েছেন। ছিলেন অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সত্য প্রতিষ্ঠায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও বুকভরা সাহস ছিল তার। চলনে, বলনে, কর্মে ও ধ্যানে যেন নানার প্রতিচ্ছবি।

সাহাবায়ে কেরাম তার মধ্যে নবীজি (সা.)-কে খুঁজে পেতেন। রাসূল (সা.)-এর ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা সম্পর্কে তার ছিল সুস্পষ্ট জ্ঞান। তাই নবীজির ইন্তেকালের পর খলিফারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তার সঙ্গে পরামর্শ করতেন।

নাগরিকদের পারস্পরিক পরামর্শ এবং স্বাধীন মতামতের আলোকেই পরিচালিত হতো রাষ্ট্র। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.)-এর সময়কাল থেকে খেলাফত ব্যবস্থার শিকল ভেঙে পড়ে। জনমতকে উপেক্ষা করে নতুন নতুন রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি হতে থাকে। জনগণের সঙ্গে প্রশাসকদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। কমতে থাকে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা।

উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা পেয়ে ইয়াজিদ ধর্মের ভুল ব্যবহার শুরু করেন। সত্যপন্থিদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে চান। অন্যায়-অবিচার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। চলমান অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে যারাই আওয়াজ তুলতেন তাদের অকথ্য নির্যাতন করা হতো।

সত্যকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। চারদিকে ভীতিকর এক অবস্থার সৃষ্টি হয়। সত্য বলার লোক কমে যেতে থাকে। প্রশাসনে অনৈতিক লোক ও দরবারি আলেমের সংখ্যা বেড়ে যায়। রাষ্ট্রীয় দরবারে বিবেক বিক্রেতা ও তোষামোদকারীর চাহিদাও বাড়তে থাকে।

ফলে প্রকৃত আলেম ও সত্যপন্থিদের রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা বেড়ে যেতে থাকে। অব্যাহত দমন-নিপীড়নের ফলে সহাবি ও তাবেয়িদের মধ্য থেকে অনেক বিজ্ঞ আলেমরা নিজেদের রাষ্ট্র থেকে গুটিয়ে নিয়ে জ্ঞান সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। অনেকে আবার ইয়াজিদের রাষ্ট্র ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দাওয়াতি মিশন নিয়ে ছুটে যান। এভাবে রাষ্ট্রের সর্বত্র নবীজির কুরআনি আদর্শের বিপরীতে ইয়াজিদি আদর্শ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ইমাম হোসাইন (রা.) গর্জে ওঠেন সত্য প্রতিষ্ঠায়। জুলুম নির্যাতনের মূলোৎপাটনে প্রতিবাদের সুর তোলেন তিনি। ক্ষমতার মোহে অন্ধ ইয়াজিদকে বারবার সতর্ক করেন। তবু ইয়াজিদ সতর্ক হননি। উল্টো অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয় নবী পরিবার ও সত্যপন্থি সাহাবিদের ওপর।

অবর্ণনীয় জুলুম-অবিচার চালানো হয় মক্কা-মদিনার প্রতিটি ঘরে ঘরে। সত্যের পথে অবিচল থেকে ইয়াজিদের পাপকর্মের তীব্র বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন ইমাম হোসাইন।

ফলে ইয়াজিদের চূড়ান্ত রোষানলে পড়ে ১০ মহররম কারবালা প্রান্তরে নিজ পরিবার ও সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে ইয়াজিদের সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন ইমাম। তাই মুসলিম বিশ্বের কাছে এটি যেমন বেদনার দিন, তেমনি ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় সংকল্প গ্রহণের দিন।

জালেম শাসকের সামনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইমাম হোসাইন (রা.) নিজেকে কুরবান করেছেন। রাজতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে দ্বীনের পতাকা উড়িয়ে প্রমাণ করেছেন, ‘শির দেগা, নাহি দেগা আমামা।’ প্রয়োজনে জীবন দেব, শহিদি মৃত্যুবরণ করে নেব; তবু পাপীষ্ঠ নেতৃত্বের কাছে আনুগত্য করব না।

সেদিন ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের আনুগত্য মেনে নিলে বেঁচে যেতেন তিনি ও তার পরিবার। কিন্তু চিরদিনের জন্য সত্য প্রতিষ্ঠায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো কোনো প্রেরণা আমাদের সামনে থাকত না। অত্যাচারের দহনে পুড়ে গেলেও আমরা থাকতাম রাষ্ট্রীয় জুলুমের নীরব দর্শক।

কারবালার এ নির্মম শাহাদত সত্যপ্রেমীদের চোখ খুলে দেয়। যুগে যুগে সত্যের সেনানিরা অনুপ্রেরণা লাভ করে যে-জীবন যায় যাবে, তবুও মিথ্যার কাছে, অসত্যের কাছে মাথা নত করা যাবে না। বাতিলের কাছে মাথা নত করা সত্যপ্রেমীদের ধর্ম নয়। সত্যপ্রেমীরা রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে সত্যের জয়গান গায়। জুলমাত ও জাহেলিয়াতের দেওয়াল ভেঙে সর্বত্র ইনসাফ ও ন্যায়ের ধ্বনি তোলে।

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পথে নিজেকে পরিচালিত করে। সর্বদা ইয়াজিদি ভণ্ডামি, কপটতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে।

হায়! বিশ্ব মুসলিম আজ ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শিক্ষা ভুলে গেছে। ভুলে গেছে মানবকল্যাণে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার কথা। মুসলিম বিশ্বের ভোগবিলাসী এক শ্রেণির মুখোশধারী শাসক ও তাদের পূজারিরা গোপনে ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সত্যিকারের মুসলমানের বুকে বুলেট চালাতেও দ্বিধাবোধ করে না।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সৌন্দর্যকে ধূলিসাৎ করে দেয়। সাধারণ মানুষের জানমালকে শত্রুর হাতে তুলে দেয়। হোসাইনপ্রেমীদের দায়িত্ব হচ্ছে, এসব অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তোলা। হৃদয়ে হোসাইন (রা.) ও আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা লালন করা। হে প্রভু! আমাদের বেহেশতের সর্দারের কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত করে নিন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

akpatwary.qp@gmail.com

জেগে ওঠো হোসাইনি দুনিয়া

 আহনাফ আবদুল কাদির 
২০ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নবীজি (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় মেয়ে ফাতেমা তনয় ইমাম হোসাইন (রা.)। শিশুকাল থেকেই নবীজির আদর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন।

নবীজির হেরা গুহায় প্রাপ্ত আলোর প্রস্রবণ পেয়ে আর ইকরার প্রতিধ্বনি শুনে আলোকিত হয়েছেন। ছিলেন অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সত্য প্রতিষ্ঠায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও বুকভরা সাহস ছিল তার। চলনে, বলনে, কর্মে ও ধ্যানে যেন নানার প্রতিচ্ছবি।

সাহাবায়ে কেরাম তার মধ্যে নবীজি (সা.)-কে খুঁজে পেতেন। রাসূল (সা.)-এর ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা সম্পর্কে তার ছিল সুস্পষ্ট জ্ঞান। তাই নবীজির ইন্তেকালের পর খলিফারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তার সঙ্গে পরামর্শ করতেন।

নাগরিকদের পারস্পরিক পরামর্শ এবং স্বাধীন মতামতের আলোকেই পরিচালিত হতো রাষ্ট্র। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.)-এর সময়কাল থেকে খেলাফত ব্যবস্থার শিকল ভেঙে পড়ে। জনমতকে উপেক্ষা করে নতুন নতুন রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি হতে থাকে। জনগণের সঙ্গে প্রশাসকদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। কমতে থাকে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা।

উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা পেয়ে ইয়াজিদ ধর্মের ভুল ব্যবহার শুরু করেন। সত্যপন্থিদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে চান। অন্যায়-অবিচার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। চলমান অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে যারাই আওয়াজ তুলতেন তাদের অকথ্য নির্যাতন করা হতো।

সত্যকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। চারদিকে ভীতিকর এক অবস্থার সৃষ্টি হয়। সত্য বলার লোক কমে যেতে থাকে। প্রশাসনে অনৈতিক লোক ও দরবারি আলেমের সংখ্যা বেড়ে যায়। রাষ্ট্রীয় দরবারে বিবেক বিক্রেতা ও তোষামোদকারীর চাহিদাও বাড়তে থাকে।

ফলে প্রকৃত আলেম ও সত্যপন্থিদের রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা বেড়ে যেতে থাকে। অব্যাহত দমন-নিপীড়নের ফলে সহাবি ও তাবেয়িদের মধ্য থেকে অনেক বিজ্ঞ আলেমরা নিজেদের রাষ্ট্র থেকে গুটিয়ে নিয়ে জ্ঞান সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। অনেকে আবার ইয়াজিদের রাষ্ট্র ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দাওয়াতি মিশন নিয়ে ছুটে যান। এভাবে রাষ্ট্রের সর্বত্র নবীজির কুরআনি আদর্শের বিপরীতে ইয়াজিদি আদর্শ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ইমাম হোসাইন (রা.) গর্জে ওঠেন সত্য প্রতিষ্ঠায়। জুলুম নির্যাতনের মূলোৎপাটনে প্রতিবাদের সুর তোলেন তিনি। ক্ষমতার মোহে অন্ধ ইয়াজিদকে বারবার সতর্ক করেন। তবু ইয়াজিদ সতর্ক হননি। উল্টো অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয় নবী পরিবার ও সত্যপন্থি সাহাবিদের ওপর।

অবর্ণনীয় জুলুম-অবিচার চালানো হয় মক্কা-মদিনার প্রতিটি ঘরে ঘরে। সত্যের পথে অবিচল থেকে ইয়াজিদের পাপকর্মের তীব্র বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন ইমাম হোসাইন।

ফলে ইয়াজিদের চূড়ান্ত রোষানলে পড়ে ১০ মহররম কারবালা প্রান্তরে নিজ পরিবার ও সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে ইয়াজিদের সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন ইমাম। তাই মুসলিম বিশ্বের কাছে এটি যেমন বেদনার দিন, তেমনি ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় সংকল্প গ্রহণের দিন।

জালেম শাসকের সামনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইমাম হোসাইন (রা.) নিজেকে কুরবান করেছেন। রাজতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে দ্বীনের পতাকা উড়িয়ে প্রমাণ করেছেন, ‘শির দেগা, নাহি দেগা আমামা।’ প্রয়োজনে জীবন দেব, শহিদি মৃত্যুবরণ করে নেব; তবু পাপীষ্ঠ নেতৃত্বের কাছে আনুগত্য করব না।

সেদিন ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের আনুগত্য মেনে নিলে বেঁচে যেতেন তিনি ও তার পরিবার। কিন্তু চিরদিনের জন্য সত্য প্রতিষ্ঠায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো কোনো প্রেরণা আমাদের সামনে থাকত না। অত্যাচারের দহনে পুড়ে গেলেও আমরা থাকতাম রাষ্ট্রীয় জুলুমের নীরব দর্শক।

কারবালার এ নির্মম শাহাদত সত্যপ্রেমীদের চোখ খুলে দেয়। যুগে যুগে সত্যের সেনানিরা অনুপ্রেরণা লাভ করে যে-জীবন যায় যাবে, তবুও মিথ্যার কাছে, অসত্যের কাছে মাথা নত করা যাবে না। বাতিলের কাছে মাথা নত করা সত্যপ্রেমীদের ধর্ম নয়। সত্যপ্রেমীরা রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে সত্যের জয়গান গায়। জুলমাত ও জাহেলিয়াতের দেওয়াল ভেঙে সর্বত্র ইনসাফ ও ন্যায়ের ধ্বনি তোলে।

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পথে নিজেকে পরিচালিত করে। সর্বদা ইয়াজিদি ভণ্ডামি, কপটতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে।

হায়! বিশ্ব মুসলিম আজ ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শিক্ষা ভুলে গেছে। ভুলে গেছে মানবকল্যাণে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার কথা। মুসলিম বিশ্বের ভোগবিলাসী এক শ্রেণির মুখোশধারী শাসক ও তাদের পূজারিরা গোপনে ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সত্যিকারের মুসলমানের বুকে বুলেট চালাতেও দ্বিধাবোধ করে না।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সৌন্দর্যকে ধূলিসাৎ করে দেয়। সাধারণ মানুষের জানমালকে শত্রুর হাতে তুলে দেয়। হোসাইনপ্রেমীদের দায়িত্ব হচ্ছে, এসব অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তোলা। হৃদয়ে হোসাইন (রা.) ও আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা লালন করা। হে প্রভু! আমাদের বেহেশতের সর্দারের কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত করে নিন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

akpatwary.qp@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন