কারবালার স্মৃতিবাহী হোসাইনি দালান
jugantor
কারবালার স্মৃতিবাহী হোসাইনি দালান

  আশরাফ জিয়া  

২০ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তখন শাহ সুজার সুবেদারি যুগ। একদিন তার এক নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ হজরত হোসাইন (রা.)কে স্বপ্নে দেখলেন, তিনি একটি তাজিয়াখানা নির্মাণ করছেন।

এ স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেই মীর মুরাদ বললেন, তিনি একটি তাজিয়াখানা নির্মাণ করবেন তার নাম হবে ‘হোসাইনি দালান’। রাজধানীর পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত হোসাইনি দালান বা ইমামবাড়া নির্মাণের এটাই লোক ইতিহাস।

প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরের পুরোনো এ স্থাপনা মোগল আমলের ঐতিহ্যের নিদর্শন। সম্রাট শাহজাহানের আমলে এটি নির্মাণ হয়। নৌ সেনাপতি মীর মুরাদ ছোট আকারের একটি ইমামবাড়া নির্মাণ করেছিলেন। কিছুদিন পর এটি ভেঙে যায়। এরপর নায়েব-নাজিমরা নতুন করে তা নির্মাণ করেন। ইতিহাসবিদ জেমস টেলর তার বইয়ে উল্লেখ করেন, ১৮৩২ সালেও আদি ইমামবাড়া টিকে ছিল।

ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দুই দফায় ইমামবাড়ার সংস্কার হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়। পরে খাজা আহসান উল্লাহ তৎকালীন সময়ে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে তা পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করেন। ১৯৯৫-এ আরও একবার এবং পরে ২০১১-এ পুনর্বার দক্ষিণের পুকুরটির সংস্কার করা হয়।

২০১১ খ্রিষ্টাব্দে আবার হোসাইনি দালান ইমামবাড়ার সংস্কারসাধন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। হোসাইনি দালানের প্রতিটা দেওয়ালে রয়েছে নান্দনিক ইরানি শিল্পের ছোঁয়া। মনের মাধুরী মিশিয়ে ইরানি শিল্পীরা হোসাইনি দালানকে সাজিয়েছেন।

২০১১ সালে ইরান সরকার যখন হোসাইনি দালানের ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেন তখন ইরানের নামিদামি স্থপতিবিদ ও শিল্পীরা এতে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ইরানি ধর্মীয় স্থাপনার নৈসর্গিক রূপ ও নান্দনিকতা এ সংস্কার কাজে প্রতিফলিত হয়েছে।

ইরানি শিল্প সংস্কৃতির চিত্র ফুটিয়ে উঠেছে সুস্পষ্টভাবে। সংস্কারের আগে ভেতরে রংবেরঙের নকশা করা কাচের মাধ্যমে যে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, তা পরিবর্তন করে বিভিন্ন আয়াত ও মুদ্রা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। একইভাবে এর পূর্বদিকের ফটকে এবং উত্তর দিকের চৌকোনা থামগুলোয় আয়াত ও সূরা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। ইরান থেকে আমদানি করা টাইলসগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইরানের ধর্মীয় শিল্পকলা ক্যালিগ্রাফি।

ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য হোসাইনি দালান উৎকৃষ্ট জায়গা। স্বচ্ছ পানির একটি পুকুরের পারে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। পাশেই গাছগাছালিতে ঘেরা একটি কবরস্থানে পরিবেশ নিয়েছে গাম্ভীর্যপূর্ণ রূপ। সেখানে গেলে এক অসম্ভব ভালো লাগায় মন ভরে ওঠে। শুধু শিয়াই না সুন্নি মুসলমানরাও সেখানে বরকতের জন্য যান হজরতের হোসাইনের আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন। অন্যায়ের সামনে মাথানত না করার হোসাইনি চেতনার সবক নেন।

প্রতি বছর মহররম মাসের শুরু থেকেই জমজমাট আর লোকে লোকারণ্য থাকে হোসাইনি দালান। পহেলা মহররম থেকে ৬ মহররম পর্যন্ত প্রতিদিন চলে ‘মেহেদি নাজার’ নামের বিশেষ মজলিশ।

মিছিল শুরু হয় ৭ মহররম থেকে। এ মিছিলকে বলা হয় ‘গাশত’। মহররমের মিছিলকে সাধারণত ‘তাজিয়া’ মিছিল বলা হলেও ৭ মহররম থেকে যে মিছিলগুলো বের হয়, তার প্রতিটিরই আলাদা নাম আছে। ৭ মহররম সন্ধ্যায় বের হয় নিশান মিছিল-এর আরেক নাম হলো ‘আলম গাশত’।

এ মিছিলে ইমাম হোসেন (রা.)-এর স্মরণে কালো পতাকা নিয়ে মাতম করেন ইমামভক্তরা। ৮ মহররম সন্ধ্যায় যে মিছিলটি বের হয়, তার নাম ‘তাগ গাশত’। এই মিছিলে থাকে বিশেষ সজ্জায় সজ্জিত ভেস্তা ও কাসেদের দল। ৯ মহররম সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় ‘মজলিশ-এ-আশুরা’। এতে ইমাম হোসেন (রা.)-এর শিশুপুত্র হজরত আলী আসগরের শহিদের ঘটনা তুলে ধরা হয়। মাতম করা হয় তার জন্য। মজলিশ শেষে রাত দেড়টায় বের হয় ‘গাহওয়ারা গাশত’ নামের শোক মিছিল।

আর ১০ মহররম সকাল ১০টায় বের হয় আশুরার ঐতিহ্যবাহী ‘মঞ্জিল গাশত’, যেটাকি আমরা তাজিয়া মিছিল বলে থাকি। মিছিলে থাকে তাজিয়া, ঝুলা, নিশান, দুলদুল, পাকপাঞ্জাতুনসহ বিভিন্ন উপকরণ।

আশুরার পরের দুদিনও জনাকীর্ণ থাকে হোসাইনি দালান। আশুরার দিন বিকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘ফাঁকা শিকানি’ নামের বিশেষ মাহফিল। সন্ধ্যার পর থেকে সারা রাত ধরে চলে ‘মজলিশ-এ-শামে গারিবাঁ’।

১২ মহররম রাতে অনুষ্ঠিত হয় ‘মজলিশ-এ-সায়েম’। শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে ইমামভক্ত অসংখ্য মানুষ তাদের নিজ নিজ মকসুদ পূরণের জন্য আশুরার মানত করে থাকে। এ মানতকারীসহ ইমামভক্তরা এসব মজলিশে অংশ নিয়ে শিরনি দেয়। আশুরা শুধু শিয়া সম্প্রদায়ের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কারণে সুন্নি মুসলমানদের কাছেও এর বিরাট তাৎপর্য রয়েছে।

কারবালার স্মৃতিবাহী হোসাইনি দালান

 আশরাফ জিয়া 
২০ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তখন শাহ সুজার সুবেদারি যুগ। একদিন তার এক নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ হজরত হোসাইন (রা.)কে স্বপ্নে দেখলেন, তিনি একটি তাজিয়াখানা নির্মাণ করছেন।

এ স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেই মীর মুরাদ বললেন, তিনি একটি তাজিয়াখানা নির্মাণ করবেন তার নাম হবে ‘হোসাইনি দালান’। রাজধানীর পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত হোসাইনি দালান বা ইমামবাড়া নির্মাণের এটাই লোক ইতিহাস।

প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরের পুরোনো এ স্থাপনা মোগল আমলের ঐতিহ্যের নিদর্শন। সম্রাট শাহজাহানের আমলে এটি নির্মাণ হয়। নৌ সেনাপতি মীর মুরাদ ছোট আকারের একটি ইমামবাড়া নির্মাণ করেছিলেন। কিছুদিন পর এটি ভেঙে যায়। এরপর নায়েব-নাজিমরা নতুন করে তা নির্মাণ করেন। ইতিহাসবিদ জেমস টেলর তার বইয়ে উল্লেখ করেন, ১৮৩২ সালেও আদি ইমামবাড়া টিকে ছিল।

ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দুই দফায় ইমামবাড়ার সংস্কার হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়। পরে খাজা আহসান উল্লাহ তৎকালীন সময়ে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে তা পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করেন। ১৯৯৫-এ আরও একবার এবং পরে ২০১১-এ পুনর্বার দক্ষিণের পুকুরটির সংস্কার করা হয়।

২০১১ খ্রিষ্টাব্দে আবার হোসাইনি দালান ইমামবাড়ার সংস্কারসাধন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। হোসাইনি দালানের প্রতিটা দেওয়ালে রয়েছে নান্দনিক ইরানি শিল্পের ছোঁয়া। মনের মাধুরী মিশিয়ে ইরানি শিল্পীরা হোসাইনি দালানকে সাজিয়েছেন।

২০১১ সালে ইরান সরকার যখন হোসাইনি দালানের ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেন তখন ইরানের নামিদামি স্থপতিবিদ ও শিল্পীরা এতে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ইরানি ধর্মীয় স্থাপনার নৈসর্গিক রূপ ও নান্দনিকতা এ সংস্কার কাজে প্রতিফলিত হয়েছে।

ইরানি শিল্প সংস্কৃতির চিত্র ফুটিয়ে উঠেছে সুস্পষ্টভাবে। সংস্কারের আগে ভেতরে রংবেরঙের নকশা করা কাচের মাধ্যমে যে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, তা পরিবর্তন করে বিভিন্ন আয়াত ও মুদ্রা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। একইভাবে এর পূর্বদিকের ফটকে এবং উত্তর দিকের চৌকোনা থামগুলোয় আয়াত ও সূরা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। ইরান থেকে আমদানি করা টাইলসগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইরানের ধর্মীয় শিল্পকলা ক্যালিগ্রাফি।

ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য হোসাইনি দালান উৎকৃষ্ট জায়গা। স্বচ্ছ পানির একটি পুকুরের পারে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। পাশেই গাছগাছালিতে ঘেরা একটি কবরস্থানে পরিবেশ নিয়েছে গাম্ভীর্যপূর্ণ রূপ। সেখানে গেলে এক অসম্ভব ভালো লাগায় মন ভরে ওঠে। শুধু শিয়াই না সুন্নি মুসলমানরাও সেখানে বরকতের জন্য যান হজরতের হোসাইনের আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন। অন্যায়ের সামনে মাথানত না করার হোসাইনি চেতনার সবক নেন।

প্রতি বছর মহররম মাসের শুরু থেকেই জমজমাট আর লোকে লোকারণ্য থাকে হোসাইনি দালান। পহেলা মহররম থেকে ৬ মহররম পর্যন্ত প্রতিদিন চলে ‘মেহেদি নাজার’ নামের বিশেষ মজলিশ।

মিছিল শুরু হয় ৭ মহররম থেকে। এ মিছিলকে বলা হয় ‘গাশত’। মহররমের মিছিলকে সাধারণত ‘তাজিয়া’ মিছিল বলা হলেও ৭ মহররম থেকে যে মিছিলগুলো বের হয়, তার প্রতিটিরই আলাদা নাম আছে। ৭ মহররম সন্ধ্যায় বের হয় নিশান মিছিল-এর আরেক নাম হলো ‘আলম গাশত’।

এ মিছিলে ইমাম হোসেন (রা.)-এর স্মরণে কালো পতাকা নিয়ে মাতম করেন ইমামভক্তরা। ৮ মহররম সন্ধ্যায় যে মিছিলটি বের হয়, তার নাম ‘তাগ গাশত’। এই মিছিলে থাকে বিশেষ সজ্জায় সজ্জিত ভেস্তা ও কাসেদের দল। ৯ মহররম সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় ‘মজলিশ-এ-আশুরা’। এতে ইমাম হোসেন (রা.)-এর শিশুপুত্র হজরত আলী আসগরের শহিদের ঘটনা তুলে ধরা হয়। মাতম করা হয় তার জন্য। মজলিশ শেষে রাত দেড়টায় বের হয় ‘গাহওয়ারা গাশত’ নামের শোক মিছিল।

আর ১০ মহররম সকাল ১০টায় বের হয় আশুরার ঐতিহ্যবাহী ‘মঞ্জিল গাশত’, যেটাকি আমরা তাজিয়া মিছিল বলে থাকি। মিছিলে থাকে তাজিয়া, ঝুলা, নিশান, দুলদুল, পাকপাঞ্জাতুনসহ বিভিন্ন উপকরণ।

আশুরার পরের দুদিনও জনাকীর্ণ থাকে হোসাইনি দালান। আশুরার দিন বিকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘ফাঁকা শিকানি’ নামের বিশেষ মাহফিল। সন্ধ্যার পর থেকে সারা রাত ধরে চলে ‘মজলিশ-এ-শামে গারিবাঁ’।

১২ মহররম রাতে অনুষ্ঠিত হয় ‘মজলিশ-এ-সায়েম’। শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে ইমামভক্ত অসংখ্য মানুষ তাদের নিজ নিজ মকসুদ পূরণের জন্য আশুরার মানত করে থাকে। এ মানতকারীসহ ইমামভক্তরা এসব মজলিশে অংশ নিয়ে শিরনি দেয়। আশুরা শুধু শিয়া সম্প্রদায়ের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কারণে সুন্নি মুসলমানদের কাছেও এর বিরাট তাৎপর্য রয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন