বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র
jugantor
বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র

  মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান  

২৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতিতে আল্লাহতায়ালা আমাদের জন্য হাজার রকমের শিক্ষা ছড়িয়ে রেখেছেন। আল্লাহতায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং উৎপন্ন করেছি নয়নাভিরাম বিবিধ উদ্ভিদ। এটি আল্লাহর অনুরাগী বান্দাদের জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ।’ (সূরা কাফ : আয়াত ৭-৮)।

আমরা গাছের দিকে যদি লক্ষ করি, আমাদের প্রথমে চোখ পড়বে গাছের একটি অংশ, কাণ্ড ও শাখার দিকে, আরেকটি অংশ কিন্তু মাটির গভীরে সেটি হলো শিকড়।

লোকে বলে, গাছের যতটুকু অংশ মাটির ওপরে দেখা যায়, ততটুকু পরিমাণই শিকড় হয়ে নিচের দিকের মাটি আঁকড়ে রাখে। একটি গাছ সবুজ-শ্যামল হয়ে তখনই মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, যখন তার শক্তিশালী শিকড় থাকে। গাছের এ উদাহারণ মানুষের জন্য আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে নির্দেশনা। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি

জীবনকে উচ্চতায় দাঁড় করাতে আমাদের কী কী প্রয়োজন। পাশ্চাত্যের এক দার্শনিক বলেন, ‘গাছের শিকড় নিচে, আর ফল থাকে ওপরে। এটা আল্লাহর নিয়ম। গোলাপ ফুলের রং ও সুগন্ধি গাছের একটি শাখায় প্রকাশ পায়, কিন্তু সে তার রং-রূপ সংগ্রহ করে মাটির নিচ থেকে।

কৃষক ও বাগানের মালিরা এসব ভালো করে জানে। কিন্তু আমাদের ফল লাভের আগ্রহ এত বেশি যে, শিকড় ছড়ানোর কথা ভুলে যাই। আমরা কখনোই প্রকৃত সাফল্য ও সুখ লাভ করতে পারব না যদি আমাদের সম্পর্কের শিকড় ভালো করে মাটি আঁকড়ে ধরতে না পারে। পরিপূর্ণ সফলতা সম্পর্কহীন জীবনে হতে পারে না।’

গাছকে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, এ দাঁড়ানোর জন্যই সে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। আর মাটির সঙ্গে সম্পর্কের ফলে সে ওপরের দিকে বাড়ে, ওপর থেকে নিচে নামে না। গাছ সম্ভবত স্রষ্টার নিযুক্ত শিক্ষক, যে মানুষকে এ শিক্ষা দেয়, অন্তরে ভিত্তি ছাড়া বাইরের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এরপর আমরা যদি প্রাণী জগতের দিকে তাকাই, দেখব কর্মোদ্যম প্রাণী মৌমাছিকে এদিক-ওদিক উড়ে বেড়াতে। আল্লাহতায়ালা কুরআনে বলেন, ‘তোমার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ করলেন প্রত্যেক ফল থেকে আহার কর, অতঃপর তোমার প্রতিপালকের (শিখানো) সহজ পদ্ধতি অনুসরণ কর। এর পেট থেকে রং-বেরঙের পানীয় বের হয়। এতে মানুষের জন্য আছে আরোগ্য ও চিন্তাশীল মানুষের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শন আছে।’ (সূরা নাহল : আয়াত ৬৮-৭০)।

মৌমাছি ফুল থেকে যে পরিমাণ রস আহরণ করে, তার সবটাই কিন্তু মধু হয় না, মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ মধুতে পরিণত হয়। মাত্র এক পাউন্ড মধু তৈরিতে ২০ লাখ ফুলের রস এবং তার জন্য মৌমাছি বাহিনীর প্রায় ৩০ লাখ বার উড়তে হয়, আর ৫০ হাজার মাইল পথ অতিক্রম করতে হয়। যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ রস সংগ্রহ হয়, তারপর গিয়ে মধু বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

মধু প্রথম দিকে পানির মতো পাতলা থাকে। মৌমাছি বাহিনী নিজেদের পাখনা পাখার মতো ব্যবহার করে বাড়তি পানি বাষ্পে পরিণত করে। যখন সব পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়, তখন কেবল গাঢ় মিষ্ট পদার্থ বাকি থাকে। মৌমাছির মুখে এক ধরনের লালা থাকে, যা ওই মিষ্ট পদার্থকে মধুতে রূপান্তর করে। এরপর মৌমাছি বাহিনী তাদের কারিগর দিয়ে বানানো মোমের বাসায় প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ছিদ্রতে সেই মধু সংরক্ষণ করে, ছিদ্র পূর্ণ হলে ঢাকনা লাগিয়ে দেয়।

এভাবে অনেক শ্রমের ফলে মধু তৈরি হয়। আল্লাহ চাইলে পারতেন এমনি এমনি মধু উৎপন্ন করতে অথবা মধুর ঝরনা বা নদী বইয়ে দিতে। কিন্তু এমনটি তিনি করেননি। আল্লাহ সর্বশক্তিমান হওয়া সত্ত্বেও সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা নিয়মশৃঙ্খলা রেখেছেন, যেন মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। মানুষ যেন বোঝে এ পৃথিবীতে কীভাবে কোন রীতিনীতি অনুসারে চললে সাফল্য হাতের নাগালে আসে। মৌমাছি যেভাবে মধু তৈরি করে, তাকে এক কথায় বলা যায় ‘শৃঙ্খলাপূর্ণ কাজ’। মানুষের জন্যও

একই নীতি। মানুষ কেবল ওই সময় অর্থময় সফলতা অর্জন করতে পারবে যখন লক্ষ্যের দিকে তার যাত্রা শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে। শৃঙ্খলাপূর্ণ হওয়াই এ জগতে সাফল্যের একমাত্র পরীক্ষিত পন্থা মৌমাছির জন্যও, মানুষের জন্যও।

অনুবাদ: মৌলভী আশরাফ

বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র

 মাওলানা ওহিদুদ্দিন খান 
২৭ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতিতে আল্লাহতায়ালা আমাদের জন্য হাজার রকমের শিক্ষা ছড়িয়ে রেখেছেন। আল্লাহতায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং উৎপন্ন করেছি নয়নাভিরাম বিবিধ উদ্ভিদ। এটি আল্লাহর অনুরাগী বান্দাদের জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ।’ (সূরা কাফ : আয়াত ৭-৮)।

আমরা গাছের দিকে যদি লক্ষ করি, আমাদের প্রথমে চোখ পড়বে গাছের একটি অংশ, কাণ্ড ও শাখার দিকে, আরেকটি অংশ কিন্তু মাটির গভীরে সেটি হলো শিকড়।

লোকে বলে, গাছের যতটুকু অংশ মাটির ওপরে দেখা যায়, ততটুকু পরিমাণই শিকড় হয়ে নিচের দিকের মাটি আঁকড়ে রাখে। একটি গাছ সবুজ-শ্যামল হয়ে তখনই মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, যখন তার শক্তিশালী শিকড় থাকে। গাছের এ উদাহারণ মানুষের জন্য আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে নির্দেশনা। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি

জীবনকে উচ্চতায় দাঁড় করাতে আমাদের কী কী প্রয়োজন। পাশ্চাত্যের এক দার্শনিক বলেন, ‘গাছের শিকড় নিচে, আর ফল থাকে ওপরে। এটা আল্লাহর নিয়ম। গোলাপ ফুলের রং ও সুগন্ধি গাছের একটি শাখায় প্রকাশ পায়, কিন্তু সে তার রং-রূপ সংগ্রহ করে মাটির নিচ থেকে।

কৃষক ও বাগানের মালিরা এসব ভালো করে জানে। কিন্তু আমাদের ফল লাভের আগ্রহ এত বেশি যে, শিকড় ছড়ানোর কথা ভুলে যাই। আমরা কখনোই প্রকৃত সাফল্য ও সুখ লাভ করতে পারব না যদি আমাদের সম্পর্কের শিকড় ভালো করে মাটি আঁকড়ে ধরতে না পারে। পরিপূর্ণ সফলতা সম্পর্কহীন জীবনে হতে পারে না।’

গাছকে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, এ দাঁড়ানোর জন্যই সে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। আর মাটির সঙ্গে সম্পর্কের ফলে সে ওপরের দিকে বাড়ে, ওপর থেকে নিচে নামে না। গাছ সম্ভবত স্রষ্টার নিযুক্ত শিক্ষক, যে মানুষকে এ শিক্ষা দেয়, অন্তরে ভিত্তি ছাড়া বাইরের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এরপর আমরা যদি প্রাণী জগতের দিকে তাকাই, দেখব কর্মোদ্যম প্রাণী মৌমাছিকে এদিক-ওদিক উড়ে বেড়াতে। আল্লাহতায়ালা কুরআনে বলেন, ‘তোমার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ করলেন প্রত্যেক ফল থেকে আহার কর, অতঃপর তোমার প্রতিপালকের (শিখানো) সহজ পদ্ধতি অনুসরণ কর। এর পেট থেকে রং-বেরঙের পানীয় বের হয়। এতে মানুষের জন্য আছে আরোগ্য ও চিন্তাশীল মানুষের জন্য এতে অবশ্যই নিদর্শন আছে।’ (সূরা নাহল : আয়াত ৬৮-৭০)।

মৌমাছি ফুল থেকে যে পরিমাণ রস আহরণ করে, তার সবটাই কিন্তু মধু হয় না, মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ মধুতে পরিণত হয়। মাত্র এক পাউন্ড মধু তৈরিতে ২০ লাখ ফুলের রস এবং তার জন্য মৌমাছি বাহিনীর প্রায় ৩০ লাখ বার উড়তে হয়, আর ৫০ হাজার মাইল পথ অতিক্রম করতে হয়। যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ রস সংগ্রহ হয়, তারপর গিয়ে মধু বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

মধু প্রথম দিকে পানির মতো পাতলা থাকে। মৌমাছি বাহিনী নিজেদের পাখনা পাখার মতো ব্যবহার করে বাড়তি পানি বাষ্পে পরিণত করে। যখন সব পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়, তখন কেবল গাঢ় মিষ্ট পদার্থ বাকি থাকে। মৌমাছির মুখে এক ধরনের লালা থাকে, যা ওই মিষ্ট পদার্থকে মধুতে রূপান্তর করে। এরপর মৌমাছি বাহিনী তাদের কারিগর দিয়ে বানানো মোমের বাসায় প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ছিদ্রতে সেই মধু সংরক্ষণ করে, ছিদ্র পূর্ণ হলে ঢাকনা লাগিয়ে দেয়।

এভাবে অনেক শ্রমের ফলে মধু তৈরি হয়। আল্লাহ চাইলে পারতেন এমনি এমনি মধু উৎপন্ন করতে অথবা মধুর ঝরনা বা নদী বইয়ে দিতে। কিন্তু এমনটি তিনি করেননি। আল্লাহ সর্বশক্তিমান হওয়া সত্ত্বেও সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা নিয়মশৃঙ্খলা রেখেছেন, যেন মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। মানুষ যেন বোঝে এ পৃথিবীতে কীভাবে কোন রীতিনীতি অনুসারে চললে সাফল্য হাতের নাগালে আসে। মৌমাছি যেভাবে মধু তৈরি করে, তাকে এক কথায় বলা যায় ‘শৃঙ্খলাপূর্ণ কাজ’। মানুষের জন্যও

একই নীতি। মানুষ কেবল ওই সময় অর্থময় সফলতা অর্জন করতে পারবে যখন লক্ষ্যের দিকে তার যাত্রা শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে। শৃঙ্খলাপূর্ণ হওয়াই এ জগতে সাফল্যের একমাত্র পরীক্ষিত পন্থা মৌমাছির জন্যও, মানুষের জন্যও।

অনুবাদ: মৌলভী আশরাফ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন