বেইজিং নগরীর পরিকল্পনাকারী মুসলিম স্থপতি
jugantor
বেইজিং নগরীর পরিকল্পনাকারী মুসলিম স্থপতি

  বেলায়েত হুসাইন  

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের প্রথম পরিকল্পনাকারী ও তার প্রথম মানচিত্র প্রস্তুতকারী একজন আরব মুসলিম

মানববসতির একেবারে শুরুর দিকে, চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের প্রথম পরিকল্পনাকারী ও তার প্রথম মানচিত্র প্রস্তুতকারী একজন আরব মুসলিম-বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো।

বেইজিংয়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে তার গোড়ার সম্পর্ক। আজও মহান এ মুসলিম স্থপতিকে গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করে চীনারা-এ জন্য রাজধানীতে তার একটি পাথুরে প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি এখানে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের বস্তু।

তিনি হলেন বিখ্যাত স্থপতি ইখতিয়ার উদ্দিন। আট শতাব্দীকালেরও বেশি সময় আগে তিনি এ অনন্য কর্ম করে আজও অমর হয়ে আছেন।

ইউয়ান বা মঙ্গোল রাজবংশের শাসনামলের গোড়ার দিকে আরবি বংশোদ্ভূত স্থপতি ইখতিয়ার উদ্দিন সপরিবারে চীনের অভিবাসী হন। স্থপত্যশিল্পে নিজ প্রতিভা গুণে খুব অল্প সময়ে তৎকালীন চীনা রাজ-রাজড়াদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

তিনি ‘সিডেল’ স্থপত্য বিভাগের প্রধান ছিলেন, তাকে রাজ পরিবার তৃতীয় শ্রেণির একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদা দান করে। সিডেল হলো-একটি মঙ্গোলীয় শব্দ, এর অর্থ বাঁশ দিয়ে নির্মিত বিশেষ ধরনের তাঁবু বা ঘর। তবে তাঁবু তৈরির মঙ্গোলীয় এ পদ্ধতি চীনের প্রাচীন নির্মাণরীতির সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

ফলে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় বেইজিংকে এমন রূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে-যা চীনের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের রীতির অনুসরণ করে। তখনকার মঙ্গোল রাজবংশের রাজপুত্র কুবলাই খান ১২৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম স্থপতি ইখতিয়ার উদ্দিনকে একটি নতুন ও আধুনিক বেইজিং শহরের মানচিত্র আঁকার দায়িত্ব অর্পণ করেন।

মানচিত্র তৈরি ও নয়ানগরের পরিকল্পনায় তাকে সাহায্য করেন গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রী ঝাং রু এবং দুয়ান তিয়ান লু। একই সঙ্গে এ দু’জন দেশটির সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাও ছিলেন, তাদের মূল কাজ ছিল প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা। ইখতিয়ার উদ্দিন নগরের পরিকল্পনা তৈরির শুরু থেকে শেষ অবধি সব প্রযুক্তিগত কাজের নেতৃত্ব দেন।

বেইজিং নগরের পরিকল্পনা শুরুর আগে ইখতিয়ার উদ্দিন বন্ধুবান্ধব সমেত শহরটির একটি টপোগ্রাফি বা স্থলচিত্র জরিপের কাজে অংশ নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে জমিনের ঢাল অনুসারে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার রূপায়ণও করেছিলেন তারা।

এ ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই পরে তিনি বেইজিংয়ের একটি সর্বজনীন মানচিত্র তৈরি করেন, যাতে চীনা ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগুলো সমুন্নত ও অক্ষত ছিল।

মানচিত্রে অভ্যন্তরীণ রাজ-প্রাসাদ ও ইমারতগুলো নির্মাণ পরিকল্পনায় বেশ মনোযোগ দিয়েছিলেন ইখতিয়ার উদ্দিন। রাজনৈতিক বিষয়াদি সুরাহার জন্য নির্ধারিত আদালত কক্ষগুলো অভ্যন্তরীণ প্রাসাদেই রেখেছিলেন তিনি।

সম্রাটদের বাপ-দাদাদের অর্চনাখানা, দাস-দাসীদের অবস্থান কক্ষ, কৃত্রিম সমুদ্র-হ্রদ এবং উদ্যানে সবই ভেতরের সৌন্দর্য ছিল। তা ছাড়া আহার-পরিচ্ছদসহ জীবন-প্রয়োজনীয় সব উপকরণেরই স্থান ছিল মূল ভবনে।

ইখতিয়ার উদ্দিন নির্মিত মানচিত্র অনুসারে বেইজিংয়ের আদি পরিধি ছিল সাড়ে চার কিলোমিটার। জ্যামিতিক দূরত্বে এর চতুর্দিকে ছিল ১১টি দৃষ্টিনন্দন ফটক। পশ্চিম দিকের প্রধান ফটকটির নাম শিয়ুহা মেন আর পূর্বদিকের ফটকটি ডংহু মেন নামে প্রসিদ্ধ।

মিং এবং জিং রাজ বংশের শাসনামল থেকে আজ অবধি আলোচিত ফটক দুটি একই নামে মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়ে আসছে, যদিও কাল পরিক্রমায় এর আকৃতি ও রূপে নানা পরিবর্তন এসেছে।

যানবাহন চলাচলের জন্য শহরের রাস্তাগুলো যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল। বড় রাস্তাগুলোর প্রশস্ততা ছিল ২৪ ফুট আর ছোটগুলো ১২ ফুট। শহরের অভ্যন্তরে জালের মতো বিছানো ছিল ৩৬৪টি বড় গলি এবং ২ হাজার ৯০০ ছোট গলি।

ইখতিয়ার উদ্দিন স্বোৎসাহে দিনরাত পরিশ্রম করে নগরের নকশা প্রস্তুত করেছিলেন। আরও বিস্ময়ের খবর হলো-কোনো ধরনের মাপস্কেল বা ফিতার ব্যবহার ছাড়াই তিনি নিজের হাত ও আঙুলের পরিমাপের সাহয্যে একনিষ্ঠ চিত্তে মানচিত্রটি তৈরি করতে সফল হন এবং ১২৮৫ খ্রিষ্টাব্দে নতুন বেইজিংয়ের একটি বিস্ময়কর পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন।

বেইজিং নগর পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ইখতিয়ারুদ্দিন নিজের ভেতর থাকা সব প্রজ্ঞা ও শক্তি ব্যয় করেছিলেন। এর ফলে শারীরিকভাবে তিনি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকেন এবং এর মাত্র অল্প কিছুদিন পরই তার ইন্তেকাল হয়।

সহযোগী শ্রমিক ও স্থপতিরা ইখতিয়ার উদ্দিনের গৌরবময় কীর্তির স্মরণে তার সমাধির সামনে একটি মূর্তি বা প্রতিকৃতি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু ইসলামী ঐতিহ্য ও অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পরে তা পরিত্যাগ করেন। যদিও বর্তমানে বেইজিংয়ে তার ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।

এ ছাড়া চীনাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় ইখতিয়ারুদ্দিনের কীর্তিগুলো আজও অমর হয়ে আছে।

[উত্তর চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উসামাহ মানসুরের প্রবন্ধ অবলম্বনে আরবি লেখক হানি সালাহের প্রতিবেদনের পরিমার্জিত অনুবাদ]

বেইজিং নগরীর পরিকল্পনাকারী মুসলিম স্থপতি

 বেলায়েত হুসাইন 
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের প্রথম পরিকল্পনাকারী ও তার প্রথম মানচিত্র প্রস্তুতকারী একজন আরব মুসলিম
বেইজিং নগরী।

মানববসতির একেবারে শুরুর দিকে, চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের প্রথম পরিকল্পনাকারী ও তার প্রথম মানচিত্র প্রস্তুতকারী একজন আরব মুসলিম-বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো।

বেইজিংয়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে তার গোড়ার সম্পর্ক। আজও মহান এ মুসলিম স্থপতিকে গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করে চীনারা-এ জন্য রাজধানীতে তার একটি পাথুরে প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি এখানে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের বস্তু।

তিনি হলেন বিখ্যাত স্থপতি ইখতিয়ার উদ্দিন। আট শতাব্দীকালেরও বেশি সময় আগে তিনি এ অনন্য কর্ম করে আজও অমর হয়ে আছেন।

ইউয়ান বা মঙ্গোল রাজবংশের শাসনামলের গোড়ার দিকে আরবি বংশোদ্ভূত স্থপতি ইখতিয়ার উদ্দিন সপরিবারে চীনের অভিবাসী হন। স্থপত্যশিল্পে নিজ প্রতিভা গুণে খুব অল্প সময়ে তৎকালীন চীনা রাজ-রাজড়াদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

তিনি ‘সিডেল’ স্থপত্য বিভাগের প্রধান ছিলেন, তাকে রাজ পরিবার তৃতীয় শ্রেণির একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদা দান করে। সিডেল হলো-একটি মঙ্গোলীয় শব্দ, এর অর্থ বাঁশ দিয়ে নির্মিত বিশেষ ধরনের তাঁবু বা ঘর। তবে তাঁবু তৈরির মঙ্গোলীয় এ পদ্ধতি চীনের প্রাচীন নির্মাণরীতির সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

ফলে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় বেইজিংকে এমন রূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে-যা চীনের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের রীতির অনুসরণ করে। তখনকার মঙ্গোল রাজবংশের রাজপুত্র কুবলাই খান ১২৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম স্থপতি ইখতিয়ার উদ্দিনকে একটি নতুন ও আধুনিক বেইজিং শহরের মানচিত্র আঁকার দায়িত্ব অর্পণ করেন।

মানচিত্র তৈরি ও নয়ানগরের পরিকল্পনায় তাকে সাহায্য করেন গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রী ঝাং রু এবং দুয়ান তিয়ান লু। একই সঙ্গে এ দু’জন দেশটির সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাও ছিলেন, তাদের মূল কাজ ছিল প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা। ইখতিয়ার উদ্দিন নগরের পরিকল্পনা তৈরির শুরু থেকে শেষ অবধি সব প্রযুক্তিগত কাজের নেতৃত্ব দেন।

বেইজিং নগরের পরিকল্পনা শুরুর আগে ইখতিয়ার উদ্দিন বন্ধুবান্ধব সমেত শহরটির একটি টপোগ্রাফি বা স্থলচিত্র জরিপের কাজে অংশ নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে জমিনের ঢাল অনুসারে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার রূপায়ণও করেছিলেন তারা।

এ ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই পরে তিনি বেইজিংয়ের একটি সর্বজনীন মানচিত্র তৈরি করেন, যাতে চীনা ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগুলো সমুন্নত ও অক্ষত ছিল।

মানচিত্রে অভ্যন্তরীণ রাজ-প্রাসাদ ও ইমারতগুলো নির্মাণ পরিকল্পনায় বেশ মনোযোগ দিয়েছিলেন ইখতিয়ার উদ্দিন। রাজনৈতিক বিষয়াদি সুরাহার জন্য নির্ধারিত আদালত কক্ষগুলো অভ্যন্তরীণ প্রাসাদেই রেখেছিলেন তিনি।

সম্রাটদের বাপ-দাদাদের অর্চনাখানা, দাস-দাসীদের অবস্থান কক্ষ, কৃত্রিম সমুদ্র-হ্রদ এবং উদ্যানে সবই ভেতরের সৌন্দর্য ছিল। তা ছাড়া আহার-পরিচ্ছদসহ জীবন-প্রয়োজনীয় সব উপকরণেরই স্থান ছিল মূল ভবনে।

ইখতিয়ার উদ্দিন নির্মিত মানচিত্র অনুসারে বেইজিংয়ের আদি পরিধি ছিল সাড়ে চার কিলোমিটার। জ্যামিতিক দূরত্বে এর চতুর্দিকে ছিল ১১টি দৃষ্টিনন্দন ফটক। পশ্চিম দিকের প্রধান ফটকটির নাম শিয়ুহা মেন আর পূর্বদিকের ফটকটি ডংহু মেন নামে প্রসিদ্ধ।

মিং এবং জিং রাজ বংশের শাসনামল থেকে আজ অবধি আলোচিত ফটক দুটি একই নামে মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়ে আসছে, যদিও কাল পরিক্রমায় এর আকৃতি ও রূপে নানা পরিবর্তন এসেছে।

যানবাহন চলাচলের জন্য শহরের রাস্তাগুলো যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল। বড় রাস্তাগুলোর প্রশস্ততা ছিল ২৪ ফুট আর ছোটগুলো ১২ ফুট। শহরের অভ্যন্তরে জালের মতো বিছানো ছিল ৩৬৪টি বড় গলি এবং ২ হাজার ৯০০ ছোট গলি।

ইখতিয়ার উদ্দিন স্বোৎসাহে দিনরাত পরিশ্রম করে নগরের নকশা প্রস্তুত করেছিলেন। আরও বিস্ময়ের খবর হলো-কোনো ধরনের মাপস্কেল বা ফিতার ব্যবহার ছাড়াই তিনি নিজের হাত ও আঙুলের পরিমাপের সাহয্যে একনিষ্ঠ চিত্তে মানচিত্রটি তৈরি করতে সফল হন এবং ১২৮৫ খ্রিষ্টাব্দে নতুন বেইজিংয়ের একটি বিস্ময়কর পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন।

বেইজিং নগর পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ইখতিয়ারুদ্দিন নিজের ভেতর থাকা সব প্রজ্ঞা ও শক্তি ব্যয় করেছিলেন। এর ফলে শারীরিকভাবে তিনি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকেন এবং এর মাত্র অল্প কিছুদিন পরই তার ইন্তেকাল হয়।

সহযোগী শ্রমিক ও স্থপতিরা ইখতিয়ার উদ্দিনের গৌরবময় কীর্তির স্মরণে তার সমাধির সামনে একটি মূর্তি বা প্রতিকৃতি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু ইসলামী ঐতিহ্য ও অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পরে তা পরিত্যাগ করেন। যদিও বর্তমানে বেইজিংয়ে তার ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।

এ ছাড়া চীনাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় ইখতিয়ারুদ্দিনের কীর্তিগুলো আজও অমর হয়ে আছে।

[উত্তর চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উসামাহ মানসুরের প্রবন্ধ অবলম্বনে আরবি লেখক হানি সালাহের প্রতিবেদনের পরিমার্জিত অনুবাদ]

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন