কাজের শুরুতে বলি বিসমিল্লাহ
jugantor
কাজের শুরুতে বলি বিসমিল্লাহ

  মাসুম আবদুল্লাহ কাসেমি  

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাহবুব সাহেব ঢাকায় যাবেন। প্রায় আধাঘণ্টা হেঁটে পৌঁছলেন মহাসড়কে। সেখানে অটো পেলেন। অটোতে বসতে বসতে ড্রাইভারকে বললেন-ভাই! একটু তাড়া আছে, জলদি চলো।

গাড়ি কতদূর যেতে না যেতে মাহবুব সাহেব টের পেলেন-সিটে বৃষ্টির ফোঁটার মতো পানি ছিটানো। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন-ভাই! সিটে পানি কেন? ড্রাইভার বলল-স্যার! এমনি। সমস্যা নেই, ভালো পানি! মাহবুব সাহেব বললেন-এখন তো বৃষ্টি হয়নি। আপনার গাড়িতে বৃষ্টির ফোঁটা এলো কোত্থেকে?

এবার ড্রাইভার বলল-স্যার! আমার উস্তাদ; যার থেকে আমি ড্রাইভ শিখেছি, তিনি শিখিয়েছেন-যাত্রা শুরুতে গাড়ির ভেতরে পানি ছিটাতে। তাহলে নাকি বৃষ্টির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে যাত্রী গাড়িতে ওঠে!

মাহবুব সাহেব ড্রাইভারের কথা শুনলেন, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারলেন না। পানি ছিটানোর সঙ্গে যাত্রী ওঠার সম্পর্ক তিনি কোনোভাবেই মেলাতে পারছিলেন না। এটি নিছক সামাজিক কুসংস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে। তিনি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন-ভাইজান! আপনার নাম?

ড্রাইভার বলল-মোতালেব। তিনি নিশ্চিত হলেন-ড্রাইভার মুসলমান। এবার কথা শুরু করলেন-আপনি যাত্রা শুরুতে গাড়িতে পানি ছিটিয়েছেন, বেশ করেছেন! কিন্তু বলুন তো; এর সঙ্গে যাত্রী ওঠার কী সম্পর্ক?

ড্রাইভার মাহবুব সাহেবকে যৌক্তিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। কথায় অসহায়ত্ব ও অজ্ঞতার ছাপ সুস্পষ্ট হওয়ায় এবার তিনি ড্রাইভারকে বোঝাতে লাগলেন। আমরা জানি, ‘মানুষ পানিতে ডুবলে বাঁচে না। মানুষ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাবা-মা ছাড়া সন্তান হয় না।

এগুলো অতি সাধারণ বিষয়। ছোট্ট বাচ্চাও জানে। কিন্তু একজন মুসলমানের দৃঢ় বিশ্বাস-আল্লাহ চাইলে সব হয়। তিনি না চাইলে কিছুই হয় না।’

ইতিহাস সাক্ষী! বিশুদ্ধ দলিল দ্বারাও প্রমাণিত। হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেটে সমুদ্রের তলদেশে প্রায় চল্লিশ দিন বেঁচে ছিলেন। পানি তাকে মারতে পারেনি। তার শ্বাসরোধ করতে পারেনি। হজরত ইবরাহিম (আ.) ফেরাউনের অগ্নিকুণ্ডে কত লম্বা সময় ছিলেন! আগুন তাকে একটুও জ্বালাতে পারেনি।

হজরত আদম (আ.) কে আল্লাহতায়ালা মা-বাবা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। হজরত ঈসা (আ.) কে আল্লাহতায়ালা পিতা ছাড়া দুনিয়াতে এনেছেন।

এভাবে আরও বহু প্রমাণ দিয়ে বোঝালেন-আল্লাহ চাইলে সব হয়। তিনি না চাইলে কিছুই হয় না। আল্লাহ চাইলে আপনার যাত্রীর অভাব পড়বে না। তিনি না চাইলে পানি কেন, অন্য কোনো কিছুই যাত্রী টেনে আনতে পারবে না। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-‘বলুন! আমাদের জন্য আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ছাড়া আমাদের কিছু হবে না। তিনি আমাদের কর্মবিধায়ক’। (সূরা : তাওবা, আয়াত : ৫১)।

আয়-রোজগারে বরকতসহ যাত্রাপথে কল্যাণ ও সমূহ নিরাপত্তা পেতে আমাদের করণীয় হলো-বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বাম পা দিয়ে বের হওয়া। জুতা পরার সময় ডান পা আগে প্রবেশ করানো। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারকে সালাম দিয়ে বের হওয়া।

‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’ বলে সামনে পা ফেলা। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে বাহনে চড়া। সিটে বসে গাড়ি ছাড়ার আগে ‘সুবহানাল্লাজি সাখ্খারা-লানা হাজা, ওমা কুন্না লাহু মুকরিনিন’ দোয়াটি পড়া। হাদিস শরিফের ভাষ্যমতে-কেউ যদি এভাবে যাত্রা শুরু করে তবে তার যাত্রা শুভ হবে।

মহান আল্লাহ দুর্ঘটনাসহ সব ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে তাকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে নেবেন। (ইবনে হিব্বান : ২৬৯৫, তিরমিজি শরিফ : ৩৪২৬ ও ৩৪৩৭, আবু দাউদ শরিফ : ৫০৯৫)।

কোনো ব্যক্তি যদি নতুন গাড়ি ক্রয় করে বা নতুন গাড়ি চালানো শুরু করে, তবে তার দায়িত্ব হলো-গাড়ির সামনে হাত রেখে বলবে-‘ইন্নি আতলুবু খায়রাহা, ওয়া আউজু বিল্লাহি মিন শাররিহা’। কেউ যদি এ কাজটি করে তবে গাড়ি কখনো ব্রেকফেল করবে না। অ্যাক্সিডেন্ট করবে না-ইনশাআল্লাহ। গাড়িতে যাত্রী বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঝাঁকে ঝাঁকে আসবে। (মুসলিম শরিফ : ৩৫৫৩, আবু দাউদ শরিফ : ২১৬০, ইবনে মাজা শরিফ : ১৯১৮)।

কথা বলতে বলতে গাড়ি বাস স্টেশনে পৌঁছে যায়। মাহবুব সাহেব ভাড়া চুকিয়ে গাড়িতে থেকে নামতে নামতে বললেন-ভাই! কিছু পারেন আর না পারেন ‘বিসমিল্লাহ’ বলে যাত্রা শুরু করবেন। নিজের জীবনের প্রতিটি ভালো কাজ আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করবেন-দেখবেন কাজ কতটা সহজে হয়ে যায়! আয়-রোজগারে কতটা বরকত হয়! স্বচক্ষে আপনি আল্লাহর সাহায্য ও দয়া দেখতে পাবেন-ইনশাআল্লাহ।

লেখক : মুহাদ্দিস, লেখক ও গবেষক

masumabdullah18@gmail.com

কাজের শুরুতে বলি বিসমিল্লাহ

 মাসুম আবদুল্লাহ কাসেমি 
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাহবুব সাহেব ঢাকায় যাবেন। প্রায় আধাঘণ্টা হেঁটে পৌঁছলেন মহাসড়কে। সেখানে অটো পেলেন। অটোতে বসতে বসতে ড্রাইভারকে বললেন-ভাই! একটু তাড়া আছে, জলদি চলো।

গাড়ি কতদূর যেতে না যেতে মাহবুব সাহেব টের পেলেন-সিটে বৃষ্টির ফোঁটার মতো পানি ছিটানো। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন-ভাই! সিটে পানি কেন? ড্রাইভার বলল-স্যার! এমনি। সমস্যা নেই, ভালো পানি! মাহবুব সাহেব বললেন-এখন তো বৃষ্টি হয়নি। আপনার গাড়িতে বৃষ্টির ফোঁটা এলো কোত্থেকে?

এবার ড্রাইভার বলল-স্যার! আমার উস্তাদ; যার থেকে আমি ড্রাইভ শিখেছি, তিনি শিখিয়েছেন-যাত্রা শুরুতে গাড়ির ভেতরে পানি ছিটাতে। তাহলে নাকি বৃষ্টির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে যাত্রী গাড়িতে ওঠে!

মাহবুব সাহেব ড্রাইভারের কথা শুনলেন, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারলেন না। পানি ছিটানোর সঙ্গে যাত্রী ওঠার সম্পর্ক তিনি কোনোভাবেই মেলাতে পারছিলেন না। এটি নিছক সামাজিক কুসংস্কার ছাড়া আর কী হতে পারে। তিনি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন-ভাইজান! আপনার নাম?

ড্রাইভার বলল-মোতালেব। তিনি নিশ্চিত হলেন-ড্রাইভার মুসলমান। এবার কথা শুরু করলেন-আপনি যাত্রা শুরুতে গাড়িতে পানি ছিটিয়েছেন, বেশ করেছেন! কিন্তু বলুন তো; এর সঙ্গে যাত্রী ওঠার কী সম্পর্ক?

ড্রাইভার মাহবুব সাহেবকে যৌক্তিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। কথায় অসহায়ত্ব ও অজ্ঞতার ছাপ সুস্পষ্ট হওয়ায় এবার তিনি ড্রাইভারকে বোঝাতে লাগলেন। আমরা জানি, ‘মানুষ পানিতে ডুবলে বাঁচে না। মানুষ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাবা-মা ছাড়া সন্তান হয় না।

এগুলো অতি সাধারণ বিষয়। ছোট্ট বাচ্চাও জানে। কিন্তু একজন মুসলমানের দৃঢ় বিশ্বাস-আল্লাহ চাইলে সব হয়। তিনি না চাইলে কিছুই হয় না।’

ইতিহাস সাক্ষী! বিশুদ্ধ দলিল দ্বারাও প্রমাণিত। হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেটে সমুদ্রের তলদেশে প্রায় চল্লিশ দিন বেঁচে ছিলেন। পানি তাকে মারতে পারেনি। তার শ্বাসরোধ করতে পারেনি। হজরত ইবরাহিম (আ.) ফেরাউনের অগ্নিকুণ্ডে কত লম্বা সময় ছিলেন! আগুন তাকে একটুও জ্বালাতে পারেনি।

হজরত আদম (আ.) কে আল্লাহতায়ালা মা-বাবা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। হজরত ঈসা (আ.) কে আল্লাহতায়ালা পিতা ছাড়া দুনিয়াতে এনেছেন।

এভাবে আরও বহু প্রমাণ দিয়ে বোঝালেন-আল্লাহ চাইলে সব হয়। তিনি না চাইলে কিছুই হয় না। আল্লাহ চাইলে আপনার যাত্রীর অভাব পড়বে না। তিনি না চাইলে পানি কেন, অন্য কোনো কিছুই যাত্রী টেনে আনতে পারবে না। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন-‘বলুন! আমাদের জন্য আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ছাড়া আমাদের কিছু হবে না। তিনি আমাদের কর্মবিধায়ক’। (সূরা : তাওবা, আয়াত : ৫১)।

আয়-রোজগারে বরকতসহ যাত্রাপথে কল্যাণ ও সমূহ নিরাপত্তা পেতে আমাদের করণীয় হলো-বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বাম পা দিয়ে বের হওয়া। জুতা পরার সময় ডান পা আগে প্রবেশ করানো। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারকে সালাম দিয়ে বের হওয়া।

‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’ বলে সামনে পা ফেলা। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে বাহনে চড়া। সিটে বসে গাড়ি ছাড়ার আগে ‘সুবহানাল্লাজি সাখ্খারা-লানা হাজা, ওমা কুন্না লাহু মুকরিনিন’ দোয়াটি পড়া। হাদিস শরিফের ভাষ্যমতে-কেউ যদি এভাবে যাত্রা শুরু করে তবে তার যাত্রা শুভ হবে।

মহান আল্লাহ দুর্ঘটনাসহ সব ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে তাকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে নেবেন। (ইবনে হিব্বান : ২৬৯৫, তিরমিজি শরিফ : ৩৪২৬ ও ৩৪৩৭, আবু দাউদ শরিফ : ৫০৯৫)।

কোনো ব্যক্তি যদি নতুন গাড়ি ক্রয় করে বা নতুন গাড়ি চালানো শুরু করে, তবে তার দায়িত্ব হলো-গাড়ির সামনে হাত রেখে বলবে-‘ইন্নি আতলুবু খায়রাহা, ওয়া আউজু বিল্লাহি মিন শাররিহা’। কেউ যদি এ কাজটি করে তবে গাড়ি কখনো ব্রেকফেল করবে না। অ্যাক্সিডেন্ট করবে না-ইনশাআল্লাহ। গাড়িতে যাত্রী বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঝাঁকে ঝাঁকে আসবে। (মুসলিম শরিফ : ৩৫৫৩, আবু দাউদ শরিফ : ২১৬০, ইবনে মাজা শরিফ : ১৯১৮)।

কথা বলতে বলতে গাড়ি বাস স্টেশনে পৌঁছে যায়। মাহবুব সাহেব ভাড়া চুকিয়ে গাড়িতে থেকে নামতে নামতে বললেন-ভাই! কিছু পারেন আর না পারেন ‘বিসমিল্লাহ’ বলে যাত্রা শুরু করবেন। নিজের জীবনের প্রতিটি ভালো কাজ আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করবেন-দেখবেন কাজ কতটা সহজে হয়ে যায়! আয়-রোজগারে কতটা বরকত হয়! স্বচক্ষে আপনি আল্লাহর সাহায্য ও দয়া দেখতে পাবেন-ইনশাআল্লাহ।

লেখক : মুহাদ্দিস, লেখক ও গবেষক

masumabdullah18@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন