অনিবার্য মৃত্যুর ডাক
jugantor
অনিবার্য মৃত্যুর ডাক

  হাফেজা জান্নাতুল ফেরদাউস সারা  

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মৃত্যু অনিবার্য। জন্ম নিলে মরতে হয়। শুধু মানুষ নয়। যার ভেতরে প্রাণ আছে সে মরবেই। মৃত্যুর সময় থেকে নিয়ে প্রাণ বা রুহ বের হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষকে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। কুরআন-সুন্নাহের আলোকে মৃত্যুর কয়েকটি

ধাপ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন- হাফেজা জান্নাতুল ফেরদাউস সারা

প্রথম ধাপ

প্রথম ধাপ মৃত্যুর দিন। এ দিন মানুষের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে। হায়াত ফুরিয়ে যাবে। আল্লাহ ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন বান্দার প্রাণবায়ু বের করে নিয়ে আসতে। চিরন্তন সত্য কথা হলো, কেউ এই দিন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এমনকি যখন এই দিন চলে আসবে সেদিনও কেউ জানবে না আজ তার মৃত্যুর দিন।

কুরআন-সুন্নাহ থেকে যেটুকু বোঝা যায় তাহলো- মৃত্যুর বিষয়টি উপলব্ধি না করা সত্ত্বেও বান্দা তার দেহে কিছু পরিবতর্ন অনুভব করবে। মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি অনুভব হবে আর পাপিষ্ঠ বুকে খুব চাপ অনুভব করবে। এ দিন শয়তান এবং দুষ্ট জিন ফেরেশতাদের আকাশ থেকে নামতে দেখবে। কিন্তু মানুষ তাদের দেখবে না।

এ ধাপটির কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘তোমরা সেই দিনকে ভয় কর যেদিন তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে আল্লাহর কাছে। অতঃপর প্রতিটি আÍাকে পরিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হবে তার কর্মফল।’ (সূরা বাক্বারা : ২৮১)।

দ্বিতীয় ধাপ

এটি হচ্ছে ধীরে ধীরে বান্দার ভেতর থেকে প্রাণ বের করার পালা। এ ধাপে প্রাণবায়ু পায়ের পাতা থেকে শুরু করে গোছা, হাঁটু, পেট, নাভি ও বুক হয়ে মানবদেহের কণ্ঠনালির নিচের ২ কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ সময় মানুষ ক্লান্তি ও অস্থিরতা অনুভব করে এবং এক ধরনের অসহনীয় চাপ অনুভব করে। তখনো সে জানতে পারে না যে, তার রুহ বের হয়ে যাচ্ছে।

তৃতীয় ধাপ

এই ধাপে প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে যায়। কুরআনে এ স্তরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে : ‘কখনো না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে এবং বলা হবে, কে ঝাড়বে এবং সে মনে করবে যে, বিদায়ের ক্ষণ এসে গেছে’। পায়ের গোছা অন্য গোছার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে। (সূরা কিয়ামাহ : ২৬-৩০)।

কে ঝাড়বে অর্থাৎ আÍীয়স্বজনদের কেউ কেউ বলবে : ডাক্তার ডাকি, অন্যজন বলবে ইমার্জেন্সিতে কল করি, আবার কেউ বলবে কুরআন পড়ে ফুঁ দেই। অর্থাৎ সে চাইবে মৃত্যু থেকে বাঁচতে, কিন্তু কেউই এমন অবস্থা থেকে তার পরিত্রাণ ঘটাতে পারবে না।

চতুর্থ ধাপ

মৃত্যুর এটাই সর্বশেষ ও চূড়ান্ত স্তর। এ সময় তার চোখের পর্দা সরিয়ে দেওয়া হবে এবং সে চারপাশে উপস্থিত ফেরেশতাদের দেখতে পাবে। এখান থেকেই আখেরাত দেখার স্তর শুরু হবে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আমি তোমার সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি, এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর।’ (সূরা ক্বাফ : ২২)।

পঞ্চম ধাপ

এ স্তরে মানুষ পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারবে সেকি জান্নাতি না জাহান্নামি। সে তার আমলের ফলাফল দেখবে এবং তার পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই স্তর নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন। বিশেষভাবে যারা বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং তাওবা না করেই পাহাড়সম পাপ নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শপথ সেই ফেরেশতাদের যারা নির্মমভাবে (রুহ) টেনে বের করে।’ (সূরা নাযিয়াত)।

জাহান্নামে একদল ফেরেশতা থাকবে, যারা আগুনের কাফন প্রস্তুত করে এবং খুব নির্দয়ভাবে পাপী ব্যক্তির রুহ কবজ করে। কোনো মুমিন বান্দার যখন দুনিয়া ত্যাগ করে আখেরাতে পাড়ি জমানোর সময় উপস্থিত হয়; তখন আসমান থেকে সাদা চেহারাবিশিষ্ট ফেরেশতারা নিচে নেমে আসেন। তাদের চেহারা সূর্যের মতো আলোকজ্জ্বল। তাদের সঙ্গে থাকে বেহেশতের কাফন ও আতর।

ষষ্ঠ ধাপ

এই ধাপে মানুষের রুহ বের হওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুত নিয়ে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যায়। তখন রুহ বের হওয়ার জন্য এবং আজরাইল আলাইহিস সালামের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য নাকে-মুখে অবস্থান করে। বান্দা যদি পাপীষ্ঠ হয়, তখন আজরাইল তাকে বলবে; হে নিকৃষ্ট আত্মা !

তুমি আগুন ও জাহান্নামের এবং ক্রোধান্বিত ও প্রতিশোধপরায়ণ রবের উদ্দেশে বের হয়ে আস। তখন তার অভ্যন্তরীণ চেহারা কালো হয়ে যাবে এবং চিৎকার করে বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে পুনরায় পাঠান যাতে আমি সৎকাজ করি, যা আমি পূর্বে করিনি।’ (সূরা মুমিন)।

আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের পরিপূর্ণ বদলা দেওয়া হবে। তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোঁকার বস্তু ছাড়া কিছুই নয়।’ [সূরা আল ইমরান : আয়াত ১৮৫]।

সুতরাং সর্বাবস্থায় আমাদের উচিত মৃত্যুকে স্মরণ করা। আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি জীবনদান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই, কোনো সাহায্যকারীও নেই।’

(সূরা তাওবা, আয়াত : ১১৬)।

অনিবার্য মৃত্যুর ডাক

 হাফেজা জান্নাতুল ফেরদাউস সারা 
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মৃত্যু অনিবার্য। জন্ম নিলে মরতে হয়। শুধু মানুষ নয়। যার ভেতরে প্রাণ আছে সে মরবেই। মৃত্যুর সময় থেকে নিয়ে প্রাণ বা রুহ বের হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষকে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। কুরআন-সুন্নাহের আলোকে মৃত্যুর কয়েকটি

ধাপ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন- হাফেজা জান্নাতুল ফেরদাউস সারা

প্রথম ধাপ

প্রথম ধাপ মৃত্যুর দিন। এ দিন মানুষের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে। হায়াত ফুরিয়ে যাবে। আল্লাহ ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন বান্দার প্রাণবায়ু বের করে নিয়ে আসতে। চিরন্তন সত্য কথা হলো, কেউ এই দিন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এমনকি যখন এই দিন চলে আসবে সেদিনও কেউ জানবে না আজ তার মৃত্যুর দিন।

কুরআন-সুন্নাহ থেকে যেটুকু বোঝা যায় তাহলো- মৃত্যুর বিষয়টি উপলব্ধি না করা সত্ত্বেও বান্দা তার দেহে কিছু পরিবতর্ন অনুভব করবে। মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি অনুভব হবে আর পাপিষ্ঠ বুকে খুব চাপ অনুভব করবে। এ দিন শয়তান এবং দুষ্ট জিন ফেরেশতাদের আকাশ থেকে নামতে দেখবে। কিন্তু মানুষ তাদের দেখবে না।

এ ধাপটির কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘তোমরা সেই দিনকে ভয় কর যেদিন তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে আল্লাহর কাছে। অতঃপর প্রতিটি আÍাকে পরিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হবে তার কর্মফল।’ (সূরা বাক্বারা : ২৮১)।

দ্বিতীয় ধাপ

এটি হচ্ছে ধীরে ধীরে বান্দার ভেতর থেকে প্রাণ বের করার পালা। এ ধাপে প্রাণবায়ু পায়ের পাতা থেকে শুরু করে গোছা, হাঁটু, পেট, নাভি ও বুক হয়ে মানবদেহের কণ্ঠনালির নিচের ২ কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ সময় মানুষ ক্লান্তি ও অস্থিরতা অনুভব করে এবং এক ধরনের অসহনীয় চাপ অনুভব করে। তখনো সে জানতে পারে না যে, তার রুহ বের হয়ে যাচ্ছে।

তৃতীয় ধাপ

এই ধাপে প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে যায়। কুরআনে এ স্তরের কথা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে : ‘কখনো না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে এবং বলা হবে, কে ঝাড়বে এবং সে মনে করবে যে, বিদায়ের ক্ষণ এসে গেছে’। পায়ের গোছা অন্য গোছার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে। (সূরা কিয়ামাহ : ২৬-৩০)।

কে ঝাড়বে অর্থাৎ আÍীয়স্বজনদের কেউ কেউ বলবে : ডাক্তার ডাকি, অন্যজন বলবে ইমার্জেন্সিতে কল করি, আবার কেউ বলবে কুরআন পড়ে ফুঁ দেই। অর্থাৎ সে চাইবে মৃত্যু থেকে বাঁচতে, কিন্তু কেউই এমন অবস্থা থেকে তার পরিত্রাণ ঘটাতে পারবে না।

চতুর্থ ধাপ

মৃত্যুর এটাই সর্বশেষ ও চূড়ান্ত স্তর। এ সময় তার চোখের পর্দা সরিয়ে দেওয়া হবে এবং সে চারপাশে উপস্থিত ফেরেশতাদের দেখতে পাবে। এখান থেকেই আখেরাত দেখার স্তর শুরু হবে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আমি তোমার সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি, এখন তোমার দৃষ্টি প্রখর।’ (সূরা ক্বাফ : ২২)।

পঞ্চম ধাপ

এ স্তরে মানুষ পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারবে সেকি জান্নাতি না জাহান্নামি। সে তার আমলের ফলাফল দেখবে এবং তার পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই স্তর নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন। বিশেষভাবে যারা বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং তাওবা না করেই পাহাড়সম পাপ নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শপথ সেই ফেরেশতাদের যারা নির্মমভাবে (রুহ) টেনে বের করে।’ (সূরা নাযিয়াত)।

জাহান্নামে একদল ফেরেশতা থাকবে, যারা আগুনের কাফন প্রস্তুত করে এবং খুব নির্দয়ভাবে পাপী ব্যক্তির রুহ কবজ করে। কোনো মুমিন বান্দার যখন দুনিয়া ত্যাগ করে আখেরাতে পাড়ি জমানোর সময় উপস্থিত হয়; তখন আসমান থেকে সাদা চেহারাবিশিষ্ট ফেরেশতারা নিচে নেমে আসেন। তাদের চেহারা সূর্যের মতো আলোকজ্জ্বল। তাদের সঙ্গে থাকে বেহেশতের কাফন ও আতর।

ষষ্ঠ ধাপ

এই ধাপে মানুষের রুহ বের হওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুত নিয়ে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যায়। তখন রুহ বের হওয়ার জন্য এবং আজরাইল আলাইহিস সালামের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য নাকে-মুখে অবস্থান করে। বান্দা যদি পাপীষ্ঠ হয়, তখন আজরাইল তাকে বলবে; হে নিকৃষ্ট আত্মা !

তুমি আগুন ও জাহান্নামের এবং ক্রোধান্বিত ও প্রতিশোধপরায়ণ রবের উদ্দেশে বের হয়ে আস। তখন তার অভ্যন্তরীণ চেহারা কালো হয়ে যাবে এবং চিৎকার করে বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে পুনরায় পাঠান যাতে আমি সৎকাজ করি, যা আমি পূর্বে করিনি।’ (সূরা মুমিন)।

আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের পরিপূর্ণ বদলা দেওয়া হবে। তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোঁকার বস্তু ছাড়া কিছুই নয়।’ [সূরা আল ইমরান : আয়াত ১৮৫]।

সুতরাং সর্বাবস্থায় আমাদের উচিত মৃত্যুকে স্মরণ করা। আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি জীবনদান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই, কোনো সাহায্যকারীও নেই।’

(সূরা তাওবা, আয়াত : ১১৬)।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন