মক্তবের আলোয় আলোকিত সকাল
jugantor
মক্তবের আলোয় আলোকিত সকাল

  রাকিবুল হাসান  

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুয়াজ্জিনের আজানের সুমধুর সুরের ডানায় ভর করে নেমে এসেছে সকাল। পুবাকাশে উঁকি দেওয়া মিষ্টি লাল সূর্যের আভা গায়ে মেখে, নীলফামারী সদর থেকে প্রায় ২০ কিমি. দূরে ডোমার থানার এক নিভৃত পল্লির পথে হেঁটে যাচ্ছে কয়েকজন বালক। ঘুমের রেশ এখনো ফুটে আছে তাদের চোখে-মুখে। গায়ে পাজামা-পাঞ্জাবি, বুকে শ্রদ্ধায় জড়ানো রেহাল-কায়দা।

ডোমারের পূর্ব খাটুরিয়া জামে মসজিদে নুরুল ইসলাম ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মক্তবের ছাত্র এরা। গতকাল মক্তবে হুজুর কী পড়িয়েছেন, তা নিয়ে বালকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। দোয়াটা কে ঠিকঠাক বলতে পারছে, এ নিয়েও চলছে ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা।

একটি সময় গ্রাম-বাংলায় সকাল হতো মক্তবগামী শিশুদের এমন কোলাহল মুখর দৃশ্যে। সকালের নির্মল আবহাওয়া আরও পবিত্র হয়ে উঠত তাদের কলকাকলিতে। দূর থেকে শোনা যেত শিশুদের সম্মিলিত কলধ্বনি ‘অজুর ফরজ চারটি’...। কিন্তু এখন এসব দৃশ্য কদাচিৎ চোখে পড়ে। শহর-গ্রাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মুসলিম শিশুদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় পাঠশালা মক্তব। বিশ্লেষকরা বলছেন, কালক্রমে মানুষের শিক্ষাচিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে। মক্তবে সুপরিকল্পিত পাঠপদ্ধতি না থাকার কারণে অভিভাবকরাও মক্তবমুখী হচ্ছেন না। তারা বাসায় আলাদা শিক্ষক রেখে সন্তানকে আরবি পড়াচ্ছেন। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মক্তব শিক্ষায়। ফলে কোথাও মক্তব উঠেই যাচ্ছে, কোথাও চলছে ঢিমেতেতালে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এর সমাধান হিসাবে তারা বলছেন, মক্তব শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আধুনিকীকরণ করতে হবে।

মক্তব শিক্ষার বিপর্যয়ে উদ্বিগ্ন পূর্ব খাটুরিয়া জামে মসজিদের মক্তব শিক্ষক মাওলানা আবু বকর। তিনি বলেন, ‘মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের প্রথম পাঠশালা মক্তব। মক্তব হারিয়ে যাওয়া মানে মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের প্রাথমিক ও সহজ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। তাই নুরুল ইসলাম ফাউন্ডেশন শুরু করেছে মক্তব মিশন। এ ফাউন্ডেশনের অধীনে এ রকম শাতাধিক মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে গ্রামগঞ্জে। এভাবে সবাই এগিয়ে এলে আশা করি আবার মক্তব শিক্ষার জাগরণ তৈরি হবে।’

কালের প্রয়োজনে প্রতিটি শিক্ষা কারিকুলামে সংস্কার ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় মক্তব শিক্ষার কারিকুলাম নিয়েও সচেতন হচ্ছেন অনেকে। তালিমুল ফুরকান বাংলাদেশের পরিচালক মাওলানা মঞ্জুরুল হক বলেন, আমরা মক্তবের উন্নয়নে কাজ করছি। এ উন্নয়নের মধ্যে রয়েছে-মক্তবের সিলেবাস প্রণয়ন, শিশুদের পাঠোপযোগী বই রচনা, পাঠপদ্ধতির পুনর্বিন্যাস। এখানে দুই ধরনের সিলেবাস করেছি আমরা। এক শুধু আরবি।

এখানে একটি শিশুকে ছয় মাসের মধ্যে কায়দা সম্পন্ন করানো হবে। এমনভাবে তাকে কুরআন থেকে প্রাকটিসের মাধ্যমে কায়দা পড়ানো হবে, যেন কায়দা শেষ করতে করতেই সে কুরআন পড়তে পারে। কায়দা পড়ার সময় তাকে কেবল সেসব দোয়াই শেখানো হবে, যেগুলো তার বেশি প্রয়োজন। দুই আরবির সঙ্গে বাংলার সমন্বয়। এ সিলেবাসটি দুই বছরের। এখানে দুই বছরে একটি শিশু কুরআন পাঠের সঙ্গে পড়তে পারবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা অঙ্ক ইংরেজি। প্রতিটি বিষয়ের জন্য থাকবে আলাদা আলাদা শিক্ষক।

মক্তবের উন্নয়নে ইমামদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি মক্তব পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা রাখেন ইমাম। তারা যদি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন, তাহলে অবশ্যই দুই বছরের মধ্যে একটি শিশুকে পূর্ণ কুরআন পড়ানো সম্ভব। লক্ষ্য না থাকলে পাঁচ বছরেও কায়দা শেষ করানো যায় না। অভিভাবকরা এত সময়ক্ষেপণ পছন্দ করেন না। তাই মক্তবের সুনির্দিষ্ট একটি সিলেবাস থাকতে হবে। সিলেবাস থাকলে লক্ষ্য ঠিক থাকবে। এ বিষয়ে আমরা মসজিদের ইমামদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি।

সকালবেলার মক্তবগুলো আবার ফিরিয়ে আনতে চায় আঞ্জুমানে তালিমুল কুরআন। আঞ্জুমানের একটি শাখা ফুরকানিয়া মক্তব অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা কারি ইমদাদুল হক বলেন, মক্তবের পাঠ্যসূচি এবং পাঠপদ্ধতি আধুনিকায়ন করে বাস্তবসম্মত একটি মক্তব অবকাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। সে লক্ষ্যে আমরা প্রথমত সিলেবাস সংস্কার করেছি। সকালের মক্তবকে তিনটি ক্লাসে বিভক্ত করেছি। একেকটি ক্লাস করান একেকজন শিক্ষক। সারা বছর বাচ্চারা একজনের কাছে পড়ে একঘেয়েমিতে ভোগে। আবার একজন শিক্ষক এতজন ছাত্রকে পূর্ণ সময়ও দিতে পারেন না। তাই এ ব্যবস্থা। পাশাপাশি আমরা মক্তবভিত্তিক প্রতিযোগিতা চালু করেছি। কোন মসজিদের মক্তব পুরস্কার নিতে পারে, এ নিয়ে ছাত্রদের মধ্যেও বেশ উৎসাহ কাজ করে। এতে মক্তবের শিক্ষার্থীরা নিজেদের উন্নতি ঘটাতে বেশ উদ্বুদ্ধ হয়।

তবে সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকট হলো, মসজিদে মক্তব পড়ান মুয়াজ্জিন। ইমাম পড়ান না। ফলে শিক্ষাটা তেমন মানসম্মত হয় না। আমরা চেষ্টা করছি মসজিদ কমিটিকে বুঝিয়ে ইমামকেও মক্তব শিক্ষায় যুক্ত করতে। এ ছাড়া মক্তব শিক্ষার জন্য আলাদা শিক্ষক রাখতে। শিশুদের তত্ত্বাবধান যত বেশি করা যাবে, তারা তত বেশি শিখতে পারবে।’

সকালবেলায় মক্তবের এত অল্প সময় শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তেমন ফলপ্রসূ নয় বলে মন্তব্য করেছেন নুরানি তা’লিমুল কুরআন বোর্ড বাংলাদেশের পরিচালক মাও. ইসমাইল বেলায়েত হোসাইন। তিনি বলেন, মক্তবের সময়টা একটু বাড়াতে হবে। কারণ এত অল্প সময়ে এতজন শিশুকে একজন শিক্ষক পড়ান। এটা অযৌক্তিক পন্থা। সময় বাড়ানোর পাশাপাশি আরবির সঙ্গে পড়াতে হবে দ্বীনি ফারায়েজগুলো। প্রতিটি বিষয়ের জন্য রাখতে হবে আলাদা আলাদা শিক্ষক। তাহলে কিছুটা ফলপ্রসূ হবে।’

মক্তব শিক্ষাকে অনেকে মধ্যযুগীয় প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা অভিহিত করে উপেক্ষা করতে চায়। অথচ শতশত বছর ধরে ভারতবর্ষে এ শিক্ষাব্যবস্থাই ছিল মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের প্রথম পাঠশালা। ৭১১ হিজরিতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পরপরই ভারতবর্ষে মক্তব ও মাদ্রাসা শিক্ষার সূচনা হয়। তবে ভারতবর্ষে মক্তব ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার ঘটে মূলত মোগল আমলে। সেই শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাপক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিল সব মহলে। বর্তমানে ভারতবর্ষ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনায় মক্তব ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। মসজিদের ইমামরা সাপ্তাহিক ছুটির দিন শিশুদের কুরআন পাঠ ও মৌলিক ধর্মীয় বিষয়গুলো শিক্ষা দিয়ে থাকে। মক্তব শিক্ষার ঐতিহ্যকে এখনো গুরুত্বের সঙ্গে ধরে রেখেছে তিউনিসিয়া। তিউনিসিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় ‘মক্তব’ শিক্ষাকে এখনো বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মসজিদ ছাড়াও বিভিন্ন অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মক্তব শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। তিউনিসিয়ার শিশুদের কুরআন পড়ার হাতেখড়ি মক্তবেই হয়।

জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের একটি শিশু মক্তবে গড়ে তিন বছর সময় কাটায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ তিন বছরে একটি শিশুকে কুরআন এবং প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। কুরআন পাঠের সঙ্গে মক্তবে শিশুদের উপযোগী করে লেখা কুরআন তরজমা পড়ানো যেতে পারে। অন্তত যে পাঁচটি সূরা সব সময় পড়া হয়, সেগুলোর তরজমা। হাদিস এবং দোয়ার বইয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে ছবি ও রং। ছবি ও রং ছাড়া শিশুর মনোজগতে ইমেজ তৈরি করা যায় না। যেমন কাবার কথা বলে যদি কাবার ছবি দেখানো হয়, শিশুর মনে ছবিটা খোদিত হয়ে যায়। কোথাও যদি সকালবেলার মক্তব না জমে, শিশুরা যদি অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যায়, সেখানে বৈকালিক মক্তব চালু করতে হবে। মক্তবের শিক্ষকদের জন্য প্রতি বছর রাখতে হবে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা। তারা তাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে শিশুদের মনে ধর্মীয় শিক্ষার বীজ বপন করেন। সুতরাং তাদের বেতন-ভাতাও বছর বছর বৃদ্ধি করে সহজ করতে হবে তাদের জীবিকা নির্বাহ।

আবার শিশুদের হাতে উঠুক কায়দা-কুরআন। সকালবেলা তারা ছুটুক মক্তবে। ইমানের প্রথম পাঠ গ্রহণ করুক নিরাপদ আশ্রয়ে। আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের হাতেই রচিত হবে নতুন প্রজšে§র ভাগ্য।

মক্তবের আলোয় আলোকিত সকাল

 রাকিবুল হাসান 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুয়াজ্জিনের আজানের সুমধুর সুরের ডানায় ভর করে নেমে এসেছে সকাল। পুবাকাশে উঁকি দেওয়া মিষ্টি লাল সূর্যের আভা গায়ে মেখে, নীলফামারী সদর থেকে প্রায় ২০ কিমি. দূরে ডোমার থানার এক নিভৃত পল্লির পথে হেঁটে যাচ্ছে কয়েকজন বালক। ঘুমের রেশ এখনো ফুটে আছে তাদের চোখে-মুখে। গায়ে পাজামা-পাঞ্জাবি, বুকে শ্রদ্ধায় জড়ানো রেহাল-কায়দা।

ডোমারের পূর্ব খাটুরিয়া জামে মসজিদে নুরুল ইসলাম ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মক্তবের ছাত্র এরা। গতকাল মক্তবে হুজুর কী পড়িয়েছেন, তা নিয়ে বালকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। দোয়াটা কে ঠিকঠাক বলতে পারছে, এ নিয়েও চলছে ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা।

একটি সময় গ্রাম-বাংলায় সকাল হতো মক্তবগামী শিশুদের এমন কোলাহল মুখর দৃশ্যে। সকালের নির্মল আবহাওয়া আরও পবিত্র হয়ে উঠত তাদের কলকাকলিতে। দূর থেকে শোনা যেত শিশুদের সম্মিলিত কলধ্বনি ‘অজুর ফরজ চারটি’...। কিন্তু এখন এসব দৃশ্য কদাচিৎ চোখে পড়ে। শহর-গ্রাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মুসলিম শিশুদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় পাঠশালা মক্তব। বিশ্লেষকরা বলছেন, কালক্রমে মানুষের শিক্ষাচিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে। মক্তবে সুপরিকল্পিত পাঠপদ্ধতি না থাকার কারণে অভিভাবকরাও মক্তবমুখী হচ্ছেন না। তারা বাসায় আলাদা শিক্ষক রেখে সন্তানকে আরবি পড়াচ্ছেন। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মক্তব শিক্ষায়। ফলে কোথাও মক্তব উঠেই যাচ্ছে, কোথাও চলছে ঢিমেতেতালে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এর সমাধান হিসাবে তারা বলছেন, মক্তব শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আধুনিকীকরণ করতে হবে।

মক্তব শিক্ষার বিপর্যয়ে উদ্বিগ্ন পূর্ব খাটুরিয়া জামে মসজিদের মক্তব শিক্ষক মাওলানা আবু বকর। তিনি বলেন, ‘মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের প্রথম পাঠশালা মক্তব। মক্তব হারিয়ে যাওয়া মানে মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের প্রাথমিক ও সহজ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। তাই নুরুল ইসলাম ফাউন্ডেশন শুরু করেছে মক্তব মিশন। এ ফাউন্ডেশনের অধীনে এ রকম শাতাধিক মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে গ্রামগঞ্জে। এভাবে সবাই এগিয়ে এলে আশা করি আবার মক্তব শিক্ষার জাগরণ তৈরি হবে।’

কালের প্রয়োজনে প্রতিটি শিক্ষা কারিকুলামে সংস্কার ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় মক্তব শিক্ষার কারিকুলাম নিয়েও সচেতন হচ্ছেন অনেকে। তালিমুল ফুরকান বাংলাদেশের পরিচালক মাওলানা মঞ্জুরুল হক বলেন, আমরা মক্তবের উন্নয়নে কাজ করছি। এ উন্নয়নের মধ্যে রয়েছে-মক্তবের সিলেবাস প্রণয়ন, শিশুদের পাঠোপযোগী বই রচনা, পাঠপদ্ধতির পুনর্বিন্যাস। এখানে দুই ধরনের সিলেবাস করেছি আমরা। এক শুধু আরবি।

এখানে একটি শিশুকে ছয় মাসের মধ্যে কায়দা সম্পন্ন করানো হবে। এমনভাবে তাকে কুরআন থেকে প্রাকটিসের মাধ্যমে কায়দা পড়ানো হবে, যেন কায়দা শেষ করতে করতেই সে কুরআন পড়তে পারে। কায়দা পড়ার সময় তাকে কেবল সেসব দোয়াই শেখানো হবে, যেগুলো তার বেশি প্রয়োজন। দুই আরবির সঙ্গে বাংলার সমন্বয়। এ সিলেবাসটি দুই বছরের। এখানে দুই বছরে একটি শিশু কুরআন পাঠের সঙ্গে পড়তে পারবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা অঙ্ক ইংরেজি। প্রতিটি বিষয়ের জন্য থাকবে আলাদা আলাদা শিক্ষক।

মক্তবের উন্নয়নে ইমামদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি মক্তব পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা রাখেন ইমাম। তারা যদি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন, তাহলে অবশ্যই দুই বছরের মধ্যে একটি শিশুকে পূর্ণ কুরআন পড়ানো সম্ভব। লক্ষ্য না থাকলে পাঁচ বছরেও কায়দা শেষ করানো যায় না। অভিভাবকরা এত সময়ক্ষেপণ পছন্দ করেন না। তাই মক্তবের সুনির্দিষ্ট একটি সিলেবাস থাকতে হবে। সিলেবাস থাকলে লক্ষ্য ঠিক থাকবে। এ বিষয়ে আমরা মসজিদের ইমামদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি।

সকালবেলার মক্তবগুলো আবার ফিরিয়ে আনতে চায় আঞ্জুমানে তালিমুল কুরআন। আঞ্জুমানের একটি শাখা ফুরকানিয়া মক্তব অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা কারি ইমদাদুল হক বলেন, মক্তবের পাঠ্যসূচি এবং পাঠপদ্ধতি আধুনিকায়ন করে বাস্তবসম্মত একটি মক্তব অবকাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। সে লক্ষ্যে আমরা প্রথমত সিলেবাস সংস্কার করেছি। সকালের মক্তবকে তিনটি ক্লাসে বিভক্ত করেছি। একেকটি ক্লাস করান একেকজন শিক্ষক। সারা বছর বাচ্চারা একজনের কাছে পড়ে একঘেয়েমিতে ভোগে। আবার একজন শিক্ষক এতজন ছাত্রকে পূর্ণ সময়ও দিতে পারেন না। তাই এ ব্যবস্থা। পাশাপাশি আমরা মক্তবভিত্তিক প্রতিযোগিতা চালু করেছি। কোন মসজিদের মক্তব পুরস্কার নিতে পারে, এ নিয়ে ছাত্রদের মধ্যেও বেশ উৎসাহ কাজ করে। এতে মক্তবের শিক্ষার্থীরা নিজেদের উন্নতি ঘটাতে বেশ উদ্বুদ্ধ হয়।

তবে সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকট হলো, মসজিদে মক্তব পড়ান মুয়াজ্জিন। ইমাম পড়ান না। ফলে শিক্ষাটা তেমন মানসম্মত হয় না। আমরা চেষ্টা করছি মসজিদ কমিটিকে বুঝিয়ে ইমামকেও মক্তব শিক্ষায় যুক্ত করতে। এ ছাড়া মক্তব শিক্ষার জন্য আলাদা শিক্ষক রাখতে। শিশুদের তত্ত্বাবধান যত বেশি করা যাবে, তারা তত বেশি শিখতে পারবে।’

সকালবেলায় মক্তবের এত অল্প সময় শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তেমন ফলপ্রসূ নয় বলে মন্তব্য করেছেন নুরানি তা’লিমুল কুরআন বোর্ড বাংলাদেশের পরিচালক মাও. ইসমাইল বেলায়েত হোসাইন। তিনি বলেন, মক্তবের সময়টা একটু বাড়াতে হবে। কারণ এত অল্প সময়ে এতজন শিশুকে একজন শিক্ষক পড়ান। এটা অযৌক্তিক পন্থা। সময় বাড়ানোর পাশাপাশি আরবির সঙ্গে পড়াতে হবে দ্বীনি ফারায়েজগুলো। প্রতিটি বিষয়ের জন্য রাখতে হবে আলাদা আলাদা শিক্ষক। তাহলে কিছুটা ফলপ্রসূ হবে।’

মক্তব শিক্ষাকে অনেকে মধ্যযুগীয় প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা অভিহিত করে উপেক্ষা করতে চায়। অথচ শতশত বছর ধরে ভারতবর্ষে এ শিক্ষাব্যবস্থাই ছিল মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের প্রথম পাঠশালা। ৭১১ হিজরিতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের পরপরই ভারতবর্ষে মক্তব ও মাদ্রাসা শিক্ষার সূচনা হয়। তবে ভারতবর্ষে মক্তব ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার ঘটে মূলত মোগল আমলে। সেই শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাপক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিল সব মহলে। বর্তমানে ভারতবর্ষ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনায় মক্তব ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। মসজিদের ইমামরা সাপ্তাহিক ছুটির দিন শিশুদের কুরআন পাঠ ও মৌলিক ধর্মীয় বিষয়গুলো শিক্ষা দিয়ে থাকে। মক্তব শিক্ষার ঐতিহ্যকে এখনো গুরুত্বের সঙ্গে ধরে রেখেছে তিউনিসিয়া। তিউনিসিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় ‘মক্তব’ শিক্ষাকে এখনো বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মসজিদ ছাড়াও বিভিন্ন অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মক্তব শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। তিউনিসিয়ার শিশুদের কুরআন পড়ার হাতেখড়ি মক্তবেই হয়।

জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের একটি শিশু মক্তবে গড়ে তিন বছর সময় কাটায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ তিন বছরে একটি শিশুকে কুরআন এবং প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। কুরআন পাঠের সঙ্গে মক্তবে শিশুদের উপযোগী করে লেখা কুরআন তরজমা পড়ানো যেতে পারে। অন্তত যে পাঁচটি সূরা সব সময় পড়া হয়, সেগুলোর তরজমা। হাদিস এবং দোয়ার বইয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে ছবি ও রং। ছবি ও রং ছাড়া শিশুর মনোজগতে ইমেজ তৈরি করা যায় না। যেমন কাবার কথা বলে যদি কাবার ছবি দেখানো হয়, শিশুর মনে ছবিটা খোদিত হয়ে যায়। কোথাও যদি সকালবেলার মক্তব না জমে, শিশুরা যদি অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যায়, সেখানে বৈকালিক মক্তব চালু করতে হবে। মক্তবের শিক্ষকদের জন্য প্রতি বছর রাখতে হবে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা। তারা তাদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে শিশুদের মনে ধর্মীয় শিক্ষার বীজ বপন করেন। সুতরাং তাদের বেতন-ভাতাও বছর বছর বৃদ্ধি করে সহজ করতে হবে তাদের জীবিকা নির্বাহ।

আবার শিশুদের হাতে উঠুক কায়দা-কুরআন। সকালবেলা তারা ছুটুক মক্তবে। ইমানের প্রথম পাঠ গ্রহণ করুক নিরাপদ আশ্রয়ে। আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদের হাতেই রচিত হবে নতুন প্রজšে§র ভাগ্য।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন