ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মাদ এলোরে দুনিয়ায়
jugantor
ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মাদ এলোরে দুনিয়ায়

  মোসা. সানজিদা কুররাতাইন  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবী অন্ধকারাচ্ছন্ন। আরবের চারদিকে হত্যা, লুটতরাজ, জেনা, ব্যভিচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ যেন স্বাভাবিক কর্মপ্রক্রিয়া। এমনই এক ইতিহাসের চরম সন্ধিক্ষণে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার ধরাধামে এলেন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)।

তিনি মক্কার কুরায়েশ বংশের হাশেমী গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের নাম আমিনা, বাবার নাম আব্দুল্লাহ্, দাদার নাম আব্দুল মুত্তালিব। দাদা নাম রাখেন, ‘মুহাম্মাদ’। মা আমেনা তার নাম রাখেন ‘আহমাদ’।

নাম দুটির অর্থ ‘প্রশংসিত’ এবং ‘সর্বাধিক প্রশংসিত’। আরবদের মধ্যে প্রথা চালু ছিল যে, শহরের পরিবেশ থেকে গ্রামের পরিবেশে শিশুদের লালন-পালন করলে তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। এবং বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় কথা বলতে পারে।

বনু সাদ গোত্রের লোকেরা বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় কথা বলতেন। তাই হালিমাকে ধাত্রী হিসাবে মননীত করা হলো। চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বছরে শিশু মুহাম্মাদের (সা.) বক্ষ বিদারণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় হালিমা ভীত হয়ে পড়েন এবং তাকে মায়ের কাছে ফেরত দিয়ে যান। তখন তার বয়স ছয় বছর।

আমেনা তার স্বামীর কবর জেয়ারত করার মনস্থ করেন। এরপর মুহাম্মাদ ও পরিচারিকা উম্মে আয়মানকে নিয়ে তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। মদিনায় পৌঁছে স্বামীর কবর জেয়ারত করেন এবং সেখানে কিছু দিন অবস্থান করে মক্কার উদ্দেশে রওনা দেন।

পথিমধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন ও ‘আবওয়া’ নামক স্থানে ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। উম্মে আয়মান শিশু মুহাম্মাদকে মক্কায় নিয়ে আসেন। এভাবে পিতৃহারা মুহাম্মাদ (সা.) মাত্র ৬ বছর বয়সে মাকে হারালেন। এবার এলেন দাদার স্নেহ নীড়ে। মাত্র দু’বছর পর তার দাদা ইন্তেকাল করেন।

এরপর চাচা আবু তালিব তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১২ বছর বয়সে ৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে চাচার সঙ্গে ব্যবসা উপলক্ষ্যে সিরিয়া যান। সেখানে বুহায়রা নামক পাদ্রির সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি বলেন, ‘এ বালকই আখিরি নবী’।

তার সত্যবাদিতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, আমানতদারির জন্য মক্কাবাসী তাকে ‘আল-আমিন’ বলে ডাকত। ৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘উকাজ মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলায় জুয়াকে কেন্দ্র করে ৫৯১ খ্রিষ্টাব্দে জিলকদ মাসে একটি যুদ্ধ শুরু হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এ যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে সমমনা কিছু যুবককে সঙ্গে নিয়ে ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘হিলফুল ফুজুল বা শান্তি সংঘ’ গড়ে তোলেন।

খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ ছিলেন একজন বিদুষী ব্যবসায়ী মহিলা। মুহাম্মাদের সততা ও আমানতদারির কথা শুনে তিনি তার কাছে ব্যবসায়ের প্রস্তাব পাঠান। চাচার সঙ্গে পরামর্শক্রমে তিনি রাজি হয়ে যান। মায়সারাকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবসায়িক সফরে সিরিয়া গমন করেন।

ব্যবসায় এত বেশি লাভ হয় যে, খাদিজা দারুণ খুশি হন। অন্যদিকে মায়সারার কাছে উত্তম গুণের কথা শুনে খাদিজা মুহাম্মাদের সঙ্গে নিজের বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। তখন উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময় খাদিজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০ এবং মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫। নবুওত লাভের সময়কালে তিনি হেরা পাহাড়ের গুহায় ধ্যানে বসতেন।

৪০ বছরে রমজান মাসের কোনো এক কদরের রাত। ফেরেশতা জিবরাইলের আগমন হলো। মুহাম্মাদকে বললেন, ‘পড়’। নাজিল হলো সূরা আলাকের এক থেকে পাঁচ আয়াত। ওহি পেয়ে দাওয়াতি কাজ চলাতে লাগলেন গোপনে। ৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে আদেশ আসে প্রকাশ্যে তাওহিদ প্রচারের জন্য। তখন তিনি ছাফা পর্বতে ওঠে মানুষকে আহ্বান জানান। সত্য বাণী তুলে ধরেন। শুরু হয় অমানুষিক অত্যাচার।

নবীজি নামাজে দাঁড়ালে তার মাথায় মৃত উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিত। হজরত বিলাল (রা.) কে উন্মুক্ত প্রান্তরে শুইয়ে দিয়ে বুকে পাথর চাপা দেওয়া হয়। নবীজি (সা.) কোথাও দাওয়াত দিতে গেলে আবু জাহেল সবাইকে বলত একে বিশ্বাস করবেন না। এ পাগল। একপর্যায়ে নবীজি আল্লাহতায়ালার আদেশে মদিনা চলে যান। একদিন নবীজি বুঝতে পারলেন তার অন্তিম সময় চলে এসেছে।

এরপর তিনি মানবজাতিকে সুস্পষ্ট গাইডলাইন হিসাবে বিদায় হজের ভাষণ প্রদান করলেন। অবশেষে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন ৬৩ বছর বয়সে ১২ রবিউল আউয়াল পরলোকের পথে পাড়ি জমান আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)।

লেখিকা : শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মাদ এলোরে দুনিয়ায়

 মোসা. সানজিদা কুররাতাইন 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবী অন্ধকারাচ্ছন্ন। আরবের চারদিকে হত্যা, লুটতরাজ, জেনা, ব্যভিচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ যেন স্বাভাবিক কর্মপ্রক্রিয়া। এমনই এক ইতিহাসের চরম সন্ধিক্ষণে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার ধরাধামে এলেন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)।

তিনি মক্কার কুরায়েশ বংশের হাশেমী গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের নাম আমিনা, বাবার নাম আব্দুল্লাহ্, দাদার নাম আব্দুল মুত্তালিব। দাদা নাম রাখেন, ‘মুহাম্মাদ’। মা আমেনা তার নাম রাখেন ‘আহমাদ’।

নাম দুটির অর্থ ‘প্রশংসিত’ এবং ‘সর্বাধিক প্রশংসিত’। আরবদের মধ্যে প্রথা চালু ছিল যে, শহরের পরিবেশ থেকে গ্রামের পরিবেশে শিশুদের লালন-পালন করলে তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। এবং বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় কথা বলতে পারে।

বনু সাদ গোত্রের লোকেরা বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় কথা বলতেন। তাই হালিমাকে ধাত্রী হিসাবে মননীত করা হলো। চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বছরে শিশু মুহাম্মাদের (সা.) বক্ষ বিদারণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় হালিমা ভীত হয়ে পড়েন এবং তাকে মায়ের কাছে ফেরত দিয়ে যান। তখন তার বয়স ছয় বছর।

আমেনা তার স্বামীর কবর জেয়ারত করার মনস্থ করেন। এরপর মুহাম্মাদ ও পরিচারিকা উম্মে আয়মানকে নিয়ে তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। মদিনায় পৌঁছে স্বামীর কবর জেয়ারত করেন এবং সেখানে কিছু দিন অবস্থান করে মক্কার উদ্দেশে রওনা দেন।

পথিমধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন ও ‘আবওয়া’ নামক স্থানে ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। উম্মে আয়মান শিশু মুহাম্মাদকে মক্কায় নিয়ে আসেন। এভাবে পিতৃহারা মুহাম্মাদ (সা.) মাত্র ৬ বছর বয়সে মাকে হারালেন। এবার এলেন দাদার স্নেহ নীড়ে। মাত্র দু’বছর পর তার দাদা ইন্তেকাল করেন।

এরপর চাচা আবু তালিব তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১২ বছর বয়সে ৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে চাচার সঙ্গে ব্যবসা উপলক্ষ্যে সিরিয়া যান। সেখানে বুহায়রা নামক পাদ্রির সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি বলেন, ‘এ বালকই আখিরি নবী’।

তার সত্যবাদিতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, আমানতদারির জন্য মক্কাবাসী তাকে ‘আল-আমিন’ বলে ডাকত। ৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘উকাজ মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলায় জুয়াকে কেন্দ্র করে ৫৯১ খ্রিষ্টাব্দে জিলকদ মাসে একটি যুদ্ধ শুরু হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এ যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে সমমনা কিছু যুবককে সঙ্গে নিয়ে ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘হিলফুল ফুজুল বা শান্তি সংঘ’ গড়ে তোলেন।

খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ ছিলেন একজন বিদুষী ব্যবসায়ী মহিলা। মুহাম্মাদের সততা ও আমানতদারির কথা শুনে তিনি তার কাছে ব্যবসায়ের প্রস্তাব পাঠান। চাচার সঙ্গে পরামর্শক্রমে তিনি রাজি হয়ে যান। মায়সারাকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবসায়িক সফরে সিরিয়া গমন করেন।

ব্যবসায় এত বেশি লাভ হয় যে, খাদিজা দারুণ খুশি হন। অন্যদিকে মায়সারার কাছে উত্তম গুণের কথা শুনে খাদিজা মুহাম্মাদের সঙ্গে নিজের বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। তখন উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময় খাদিজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০ এবং মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫। নবুওত লাভের সময়কালে তিনি হেরা পাহাড়ের গুহায় ধ্যানে বসতেন।

৪০ বছরে রমজান মাসের কোনো এক কদরের রাত। ফেরেশতা জিবরাইলের আগমন হলো। মুহাম্মাদকে বললেন, ‘পড়’। নাজিল হলো সূরা আলাকের এক থেকে পাঁচ আয়াত। ওহি পেয়ে দাওয়াতি কাজ চলাতে লাগলেন গোপনে। ৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে আদেশ আসে প্রকাশ্যে তাওহিদ প্রচারের জন্য। তখন তিনি ছাফা পর্বতে ওঠে মানুষকে আহ্বান জানান। সত্য বাণী তুলে ধরেন। শুরু হয় অমানুষিক অত্যাচার।

নবীজি নামাজে দাঁড়ালে তার মাথায় মৃত উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিত। হজরত বিলাল (রা.) কে উন্মুক্ত প্রান্তরে শুইয়ে দিয়ে বুকে পাথর চাপা দেওয়া হয়। নবীজি (সা.) কোথাও দাওয়াত দিতে গেলে আবু জাহেল সবাইকে বলত একে বিশ্বাস করবেন না। এ পাগল। একপর্যায়ে নবীজি আল্লাহতায়ালার আদেশে মদিনা চলে যান। একদিন নবীজি বুঝতে পারলেন তার অন্তিম সময় চলে এসেছে।

এরপর তিনি মানবজাতিকে সুস্পষ্ট গাইডলাইন হিসাবে বিদায় হজের ভাষণ প্রদান করলেন। অবশেষে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুন ৬৩ বছর বয়সে ১২ রবিউল আউয়াল পরলোকের পথে পাড়ি জমান আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)।

লেখিকা : শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন