সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় মহানবি (সা.)
jugantor
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় মহানবি (সা.)

  রবিউল আলম  

২২ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অমুসলিমের প্রতি কোনো অন্যায় আচরণ ইসলাম অনুমোদন করে না। শান্তি-সৌহার্দ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষায় মহানবি (সা.)-এর রয়েছে শাশ্বত আদর্শ ও সুমহান ঐতিহ্য।

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মহানবি (সা.)-এর প্রতিটি আচরণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরল ও প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এক অমুসলিম বৃদ্ধার ঘটনা ইতিহাসে আমরা জেনেছি। বৃদ্ধা প্রতিদিন মহানবি (সা.)-এর চলার পথে কাঁটা দিত। একদিন রাসূল (সা.) দেখলেন পথে কাঁটা নেই।

তখন তিনি ভাবলেন, হয়তো ওই বৃদ্ধা অসুস্থ হয়েছে বা কোনো বিপদে আছে তার খোঁজ নেওয়া দরকার। এরপর দয়াল নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) বৃদ্ধার বাড়িতে পৌঁছে দেখেন ঠিক সে অসুস্থ। তিনি বৃদ্ধাকে বললেন, আমি আপনাকে দেখতে এসেছি। এতে বৃদ্ধা অভিভূত হয়ে গেল যে, আমি যাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য পথে কাঁটা পুঁতে রাখতাম, তিনি আজ আমার বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইনিই তো সত্যিকার অর্থে শান্তি ও মানবতার অগ্রদূত।

রাসূল (সা.)-এর ঘরে একবার এক ইহুদি মেহমান হয়ে এলে রাসূল (সা.) তাকে যথাযথ মেহমানদারি করালেন এবং রাতে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিলেন। পরে সে ইহুদি মেহমান অসুস্থতাবশত বিছানায় মলমূত্র ত্যাগ করে। তাই রাসূল (সা.) তাকে কিছু বলবেন এ ভয়ে সে প্রভাতের আগেই ঘর থেকে পালিয়ে গেল।

ভোরে ওই ময়লাযুক্ত বিছানা দেখে রাসূল (সা.) এ মর্মে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে, হায়! আমি হয়তো ওই ব্যক্তিকে যথাযথ মেহমানদারি করাতে পারিনি; এতে সে কষ্ট পেয়েছে। অতঃপর বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ হাতে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত বিছানাটি পরিষ্কার করলেন।

আর সেই ব্যক্তির কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন। এভাবে যে, ‘ভাই আমি আপনার যথাযথ মেহমানদারি করতে পারিনি এজন্য আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন’। তখন ইহুদি লোকটি বলল, অপরাধ করলাম আমি আর ক্ষমা চাচ্ছেন আপনি। ইসলামের আদর্শ তো সত্যিই মহৎ!

অতঃপর রাসূল (সা.)-এর এমন উদারতা ও আদর্শে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।

মহানবি (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর যে মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন তা বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান এবং শান্তি ও সম্প্রীতির ঐতিহাসিক দলিল। এ সনদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাসহ সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য ধারা সন্নিবেশিত রয়েছে।

যেমন সনদে স্বাক্ষরকারী সব গোত্র-সম্প্রদায় ‘মদিনা রাষ্ট্রে’ সমান অধিকার ভোগ করবে, সব ধর্ম সম্প্রদায়ের স্ব-স্ব ধর্ম-কর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার যথারীতি বহাল থাকবে; কেউ কারও ওপর কোনোরূপ আক্রমণ করবে না, সন্ধিভুক্ত কোনো সম্প্রদায় বহিঃশত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে ওই আক্রান্ত সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করতে হবে এবং শত্রুদের প্রতিহত করতে হবে, কোনো নাগরিক কোনো অপরাধ করলে তা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। (সিরাতে ইবনে হিশাম)

কোনো মুসলিম যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করে, তবে রোজ-কিয়ামতে মহানবী (সা.) তার বিপক্ষে লড়বেন বলে হাদিসে এসেছে। রাসূল (সা.) বলেন, সাবধান! যদি কোনো মুসলিম কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে তার অধিকার খর্ব করে, তার ক্ষমতার বাইরে কষ্ট দেয় এবং তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক নিয়ে যায়, তাহলে কেয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপন করব। (আবু দাউদ : ৩০৫২)।

এভাবে ঐতিহাসিক মদিনা সনদের মাধ্যমে শান্তির বার্তা বাহক বিশ্বনবি (সা.) ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার মধ্যে সৌহার্দ-সম্প্রীতি, সাম্য-মৈত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন রচনা করে আদর্শ কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অদ্বিতীয় নজির স্থাপন করেন।

রাসূল (সা.) বিশ্ববাসীর সামনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই যে নজির রেখেছেন তা যেমন বিশ্বজনীন, তেমনি কিয়ামত অবধি সর্বকাল ও সব সময়ের জন্য তা প্রযোজ্য। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মক্কা বিজয়ের দিন মহানবি (সা.) বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করে খানায়ে কাবায় চৌকাঠে হাত রেখে দাঁড়াল, তখন তাঁর সামনে ছিল অতীতের সব জঘন্য অপরাধ নিয়ে অবনত মস্তকে মক্কাবাসী।

তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চারপাশ ঘিরে নির্দেশের অপেক্ষায় তীক্ষ্ণ তরবারি হাতে মুসলিম সেনাদল। সেদিন মহানবি (সা.) বলতে পারতেন, ‘ওদের গর্দান উড়িয়ে দাও। আর যে হাত শান্তিকামী তৌহিদবাদীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল, ওই হাত ভেঙে দাও। যে চোখগুলো অসহায় মুসলিমদের দিকে হায়েনার হিংস্রতা নিয়ে তাকাত, সে চোখগুলো উপড়ে ফেলে দাও। তিনি ঘোষণা করতে পারতেন, আজ থেকে কোরাইশ পুরুষরা বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর গোলাম। আর নারীরা দাসী হিসাবে গণ্য হবে’।

কিন্তু মহানবি (সা.) তেমন কিছুই বলেননি। বরং তিনি শত্রু সম্প্র্রদায়ের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। তিনি তাদের বলেছেন, হে কুরাইশগণ! আমি তোমাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করব বলে তোমরা মনে কর? তারা বলল, আপনি আমাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করবেন বলে আমাদের ধারণা। আপনি দয়ালু ভাই।

দয়ালু ভাইয়ের পুত্র। অতঃপর রাসূল (সা.) বললেন, আমি তোমাদের সঙ্গে সেই কথাই বলছি, যে কথা হজরত ইউসুফ (আ.) তার ভাইদের উদ্দেশে বলেছিলেন-আজ তোমাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত।

প্রতিশোধের পরিবর্তে শত্রুদের প্রতি মহানবির ক্ষমা ও মহানুভবতার এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত শান্তি-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের চিরন্তন আদর্শের জানান দেয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য মহানবি (সা.) এতই সোচ্চার যে, রাসূল (সা.) নিজেদের জান-মালের পাশাপাশি সংখ্যালঘু অমুসলিম সম্প্রদায়ের জান-মাল রক্ষায় সচেষ্ট থাকার জন্যও মুসলমানদের প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহয় একাধিক স্থানে অমুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার তুলে ধরা হয়েছে। অমুসলিমরা নিজ নিজ উপাসনালয়ে উপাসনা করবেন। নিজ ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মালয়কে সুরক্ষিত রাখবেন। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে তাদের সমান অধিকার রয়েছে। তাদের প্রতি কোনো প্রকার বৈষম্য ইসলাম সাপোর্ট করে না।

কোনো ধর্মের প্রতি সামান্য কটূক্তিও না করার জন্য কুরআনে আল্লাহপাক নির্দেশ দিয়েছেন-‘তোমরা তাদের মন্দ বল না, যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে। কেননা তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞানবশত আল্লাহকে গালি দেবে।’ (সূরা আন’আম-১০৮)।

পরিশেষে বলা যায় যে, মহানবি (সা.)-এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অসংখ্য-অগণিত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, শান্তি, সৌহার্দপূর্ণ সহাবস্থান ও সদ্ব্যবহার মহানবির অনুপম শিক্ষা। কোন সংকীর্ণতা হিংসা-বিদ্বেষ নয়। বরং উদার-মহানুভবতাই হচ্ছে মহানবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বিশ্বনবি (সা.) বিশ্বে শান্তির অমোঘ বাণী নিয়েই এসেছিলেন। শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম সংঘাত-সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িকতাকে চরমভাবে ঘৃণা করে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় মহানবি (সা.)

 রবিউল আলম 
২২ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অমুসলিমের প্রতি কোনো অন্যায় আচরণ ইসলাম অনুমোদন করে না। শান্তি-সৌহার্দ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষায় মহানবি (সা.)-এর রয়েছে শাশ্বত আদর্শ ও সুমহান ঐতিহ্য।

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মহানবি (সা.)-এর প্রতিটি আচরণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরল ও প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এক অমুসলিম বৃদ্ধার ঘটনা ইতিহাসে আমরা জেনেছি। বৃদ্ধা প্রতিদিন মহানবি (সা.)-এর চলার পথে কাঁটা দিত। একদিন রাসূল (সা.) দেখলেন পথে কাঁটা নেই।

তখন তিনি ভাবলেন, হয়তো ওই বৃদ্ধা অসুস্থ হয়েছে বা কোনো বিপদে আছে তার খোঁজ নেওয়া দরকার। এরপর দয়াল নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) বৃদ্ধার বাড়িতে পৌঁছে দেখেন ঠিক সে অসুস্থ। তিনি বৃদ্ধাকে বললেন, আমি আপনাকে দেখতে এসেছি। এতে বৃদ্ধা অভিভূত হয়ে গেল যে, আমি যাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য পথে কাঁটা পুঁতে রাখতাম, তিনি আজ আমার বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইনিই তো সত্যিকার অর্থে শান্তি ও মানবতার অগ্রদূত।

রাসূল (সা.)-এর ঘরে একবার এক ইহুদি মেহমান হয়ে এলে রাসূল (সা.) তাকে যথাযথ মেহমানদারি করালেন এবং রাতে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিলেন। পরে সে ইহুদি মেহমান অসুস্থতাবশত বিছানায় মলমূত্র ত্যাগ করে। তাই রাসূল (সা.) তাকে কিছু বলবেন এ ভয়ে সে প্রভাতের আগেই ঘর থেকে পালিয়ে গেল।

ভোরে ওই ময়লাযুক্ত বিছানা দেখে রাসূল (সা.) এ মর্মে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে, হায়! আমি হয়তো ওই ব্যক্তিকে যথাযথ মেহমানদারি করাতে পারিনি; এতে সে কষ্ট পেয়েছে। অতঃপর বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ হাতে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত বিছানাটি পরিষ্কার করলেন।

আর সেই ব্যক্তির কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন। এভাবে যে, ‘ভাই আমি আপনার যথাযথ মেহমানদারি করতে পারিনি এজন্য আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন’। তখন ইহুদি লোকটি বলল, অপরাধ করলাম আমি আর ক্ষমা চাচ্ছেন আপনি। ইসলামের আদর্শ তো সত্যিই মহৎ!

অতঃপর রাসূল (সা.)-এর এমন উদারতা ও আদর্শে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।

মহানবি (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর যে মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন তা বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান এবং শান্তি ও সম্প্রীতির ঐতিহাসিক দলিল। এ সনদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাসহ সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য ধারা সন্নিবেশিত রয়েছে।

যেমন সনদে স্বাক্ষরকারী সব গোত্র-সম্প্রদায় ‘মদিনা রাষ্ট্রে’ সমান অধিকার ভোগ করবে, সব ধর্ম সম্প্রদায়ের স্ব-স্ব ধর্ম-কর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার যথারীতি বহাল থাকবে; কেউ কারও ওপর কোনোরূপ আক্রমণ করবে না, সন্ধিভুক্ত কোনো সম্প্রদায় বহিঃশত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে ওই আক্রান্ত সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করতে হবে এবং শত্রুদের প্রতিহত করতে হবে, কোনো নাগরিক কোনো অপরাধ করলে তা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। (সিরাতে ইবনে হিশাম)

কোনো মুসলিম যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করে, তবে রোজ-কিয়ামতে মহানবী (সা.) তার বিপক্ষে লড়বেন বলে হাদিসে এসেছে। রাসূল (সা.) বলেন, সাবধান! যদি কোনো মুসলিম কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে তার অধিকার খর্ব করে, তার ক্ষমতার বাইরে কষ্ট দেয় এবং তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক নিয়ে যায়, তাহলে কেয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপন করব। (আবু দাউদ : ৩০৫২)।

এভাবে ঐতিহাসিক মদিনা সনদের মাধ্যমে শান্তির বার্তা বাহক বিশ্বনবি (সা.) ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার মধ্যে সৌহার্দ-সম্প্রীতি, সাম্য-মৈত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন রচনা করে আদর্শ কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অদ্বিতীয় নজির স্থাপন করেন।

রাসূল (সা.) বিশ্ববাসীর সামনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই যে নজির রেখেছেন তা যেমন বিশ্বজনীন, তেমনি কিয়ামত অবধি সর্বকাল ও সব সময়ের জন্য তা প্রযোজ্য। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মক্কা বিজয়ের দিন মহানবি (সা.) বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করে খানায়ে কাবায় চৌকাঠে হাত রেখে দাঁড়াল, তখন তাঁর সামনে ছিল অতীতের সব জঘন্য অপরাধ নিয়ে অবনত মস্তকে মক্কাবাসী।

তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চারপাশ ঘিরে নির্দেশের অপেক্ষায় তীক্ষ্ণ তরবারি হাতে মুসলিম সেনাদল। সেদিন মহানবি (সা.) বলতে পারতেন, ‘ওদের গর্দান উড়িয়ে দাও। আর যে হাত শান্তিকামী তৌহিদবাদীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল, ওই হাত ভেঙে দাও। যে চোখগুলো অসহায় মুসলিমদের দিকে হায়েনার হিংস্রতা নিয়ে তাকাত, সে চোখগুলো উপড়ে ফেলে দাও। তিনি ঘোষণা করতে পারতেন, আজ থেকে কোরাইশ পুরুষরা বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর গোলাম। আর নারীরা দাসী হিসাবে গণ্য হবে’।

কিন্তু মহানবি (সা.) তেমন কিছুই বলেননি। বরং তিনি শত্রু সম্প্র্রদায়ের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। তিনি তাদের বলেছেন, হে কুরাইশগণ! আমি তোমাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করব বলে তোমরা মনে কর? তারা বলল, আপনি আমাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করবেন বলে আমাদের ধারণা। আপনি দয়ালু ভাই।

দয়ালু ভাইয়ের পুত্র। অতঃপর রাসূল (সা.) বললেন, আমি তোমাদের সঙ্গে সেই কথাই বলছি, যে কথা হজরত ইউসুফ (আ.) তার ভাইদের উদ্দেশে বলেছিলেন-আজ তোমাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত।

প্রতিশোধের পরিবর্তে শত্রুদের প্রতি মহানবির ক্ষমা ও মহানুভবতার এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত শান্তি-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের চিরন্তন আদর্শের জানান দেয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য মহানবি (সা.) এতই সোচ্চার যে, রাসূল (সা.) নিজেদের জান-মালের পাশাপাশি সংখ্যালঘু অমুসলিম সম্প্রদায়ের জান-মাল রক্ষায় সচেষ্ট থাকার জন্যও মুসলমানদের প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহয় একাধিক স্থানে অমুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার তুলে ধরা হয়েছে। অমুসলিমরা নিজ নিজ উপাসনালয়ে উপাসনা করবেন। নিজ ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মালয়কে সুরক্ষিত রাখবেন। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে তাদের সমান অধিকার রয়েছে। তাদের প্রতি কোনো প্রকার বৈষম্য ইসলাম সাপোর্ট করে না।

কোনো ধর্মের প্রতি সামান্য কটূক্তিও না করার জন্য কুরআনে আল্লাহপাক নির্দেশ দিয়েছেন-‘তোমরা তাদের মন্দ বল না, যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে। কেননা তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞানবশত আল্লাহকে গালি দেবে।’ (সূরা আন’আম-১০৮)।

পরিশেষে বলা যায় যে, মহানবি (সা.)-এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অসংখ্য-অগণিত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, শান্তি, সৌহার্দপূর্ণ সহাবস্থান ও সদ্ব্যবহার মহানবির অনুপম শিক্ষা। কোন সংকীর্ণতা হিংসা-বিদ্বেষ নয়। বরং উদার-মহানুভবতাই হচ্ছে মহানবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বিশ্বনবি (সা.) বিশ্বে শান্তির অমোঘ বাণী নিয়েই এসেছিলেন। শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম সংঘাত-সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িকতাকে চরমভাবে ঘৃণা করে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন