খাদ্যদ্রব্য মজুদদারের সঙ্গে আল্লাহ সম্পর্ক রাখেন না

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এহসান সিরাজ

আধুনিকমনা রুচিশীল মাওলানা নুরুল আমিন মাহদী। চট্টগ্রাম ফ’য়সলেকের লেকভিউ জামে মসজিদের খতিব এবং ইমপ্রেস নিউটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেডের পরিচালক। জাঁদরেল আলেম ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত তিনি। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম রোজার মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সম্পর্কে।

যুগান্তর : রমজান মাস এলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাড়ে কেন?

মাহদী : ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারিগর। এরপর মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত লোভ তো আছেই। তা ছাড়া শিল্প মালিক, উদ্যোক্তা, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের ওপর মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়ে। শুল্ক বৃদ্ধির কারণেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকির ক্ষেত্রে সরকারের অমনোযোগিতা ও ব্যর্থতায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পায়।

যুগান্তর : অতিরিক্ত মুনাফালোভী ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে ইসলাম কী বলে?

মাহদী : পর্যাপ্ত পণ্যদ্রব্য থাকা সত্ত্বেও অধিক মুনাফার আশায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মানুষকে কষ্ট দেয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। এ ধরনের লোকের কোনো ইবাদত কবুল হয় না বলে হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা এসেছে। স্টককৃত দ্রব্য সরকার নিজের জিম্মায় নিয়ে বিক্রি করে দেয়ার অধিকারও রাখে।

হজরত মা’মার ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ফাজালা (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি, পাপাচারি ছাড়া অন্য কেউ মজুদদারি করে না। (তিরমিজি)। অন্য হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি ৪০ রাত পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য মজুদ রাখে, আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকে না।

যুগান্তর: মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যাপারে ধর্মের ব্যাখ্যা কী?

মাহদী : এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী স্বল্পমূল্যে দ্রব্য খরিদ করে পাইকারি বাজারে তাদের ইচ্ছানুযায়ী উচ্চমূল্যে বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া যায়। পণ্য হস্তগত করার আগে ফের বিক্রি, মালিকানা অর্জনের আগেই বিক্রি, নামে মাত্র বিক্রি ইত্যাদি বেচাকেনাগুলো ইসলাম হারাম ও নিষিদ্ধ করে মূলত মধ্যস্বত্বভোগকে নিরুৎসাহিত করেছে।

কারণ অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের কারণেই পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ইসলাম এ ধরনের লালসার কঠোরবিরোধী। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) স্বল্পমূল্যে কেনার জন্য বহিরাগত বিক্রেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করেছেন। (তিরমিজি)।

তাবরানি শরিফে বর্ণিত রয়েছে, রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মূল্য বৃদ্ধির অসৎ উদ্দেশ্যে মুসলমানদের লেনদেনে হস্তক্ষেপ করে, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তাকে আগুনের পাহাড়ে উঠিয়ে শাস্তি দেবেন।

অন্য এক হাদিসে আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, কোনো শহরবাসী কোনো গ্রামবাসীর পক্ষ হয়ে বিক্রি করবে না। মানুষকে তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে দাও, যেন আল্লাহতায়ালা তাদের একের মাধ্যমে অন্যের রিজিকের ব্যবস্থা করেন।’ (তিরমিজি)।

যুগান্তর : ব্যবসায়িক কাজে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আপনার। বাংলাদেশে রমজানকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয় অন্য কোথাও এমনটা দেখেছেন কী?

মাহদী : না, আমি কোথাও এমনটা দেখিনি। তবে উদাহরণ দেয়ার মতো এমন অনেক দেশ আছে যেসব দেশে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সর্ব শ্রেণীর মানুষ শুধু ইবাদতের জন্য রমজান মাসের অপেক্ষা করেন!

যুগান্তর : একজন ব্যবসায়ী রমজান মাসে কী কী আমল করতে পারে?

মাহদী : শুধু ব্যবসায়ী নন সব মানুষেরই উচিত রমজানকে ইবাদতের জন্য নির্বাচন করা। আমাদের দেশের পাইকার ব্যবসায়ী যারা তারা কিন্তু শবেবরাতের আগেই তাদের বেচাকেনা শেষ করে ফেলেন।

এমনিভাবে খুচরা বিক্রেতা এবং ক্রেতাসাধারণ যদি রমজানের আগেই ঈদের বাজার বা মার্কেটিং সেরে ফেলেন তাহলে রমজানে আর তাদের মার্কেটমুখী হতে হবে না। আমাদের ইমাম-খতিবরা যদি রমজানের দুই একমাস আগে থেকে মসজিদে মসজিদে এ বিষয়ে সতর্ক বয়ান রাখেন তাহলে দশ দিনে তারাবি শেষ করে ব্যবসায়ীরা বাকি দিনগুলো নামাজ না পড়ে থাকতেন না।