রাসূলের মসজিদ
jugantor
রাসূলের মসজিদ

  আশরাফ জিয়া  

০৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বশীর সাহেবের সঙ্গে আমার প্রায়ই আড্ডা হয়। রাজ্যের নানা বিষয়ে কথা বলি আমরা। বশীর সাহেব চিন্তাশীল মানুষ। ধর্মীয় জ্ঞান তার যথেষ্ট পরিমাণ আছে। পুরোনো যুগের আলিয়ার আলেম। তার বিশেষত্বের মধ্যে একটা হলো, তিনি সিরিয়াস কিছু বলার সময় চোখ বন্ধ করে ফেলেন। এ বিষয়টি আমার ভালো লাগে। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনি। পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যারা কথা শুরু করলে সবার কান তার কথার দিকে ফিরে। নাসির সাহেব তাদের একজন। আমাদের এবারের আলোচনা ছিল রাসূলের মসজিদ বিষয়ে। নাসির সাহেব চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করলেন, বুঝলেন আশরাফ সাহেব, আমি রাসূলের মসজিদের সঙ্গে আমাদের দেশের কোনো মসজিদের মিল পাই না। আমি বললাম, কেন বশীর সাহেব? মসজিদ তো মসজিদই, মিল না পাওয়ার কারণ কী? ব্যাখ্যা করেন।

বশীর সাহেবের চোখ বন্ধ হয়ে গেল, যার অর্থ হচ্ছে তিনি এখন গম্ভীর আলোচনা শুরু করবেন। বশীর সাহেব বলতে শুরু করলেন, রাসূলের মসজিদ নিছক প্রার্থনাগৃহ ছিল না, রাসূলের মসজিদের আঙিনা ছিল ইলমের মারকাজ। সেখানে সব সময় একদল শিক্ষার্থী অবস্থান করত। যাদের আসহাবুস সুফফা বলা হতো। তারা সব সময় রাসূল (সা.)-এর সান্নিধ্যে থেকে দ্বীনি জ্ঞান আহরণ করতেন। রাসূল (সা.)-এর ওফাতের পর তারাই মুসলিম বিশ্বের শিক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করেন। এ মারকাজের ছাত্র ছিলেন হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এর মতো সাহাবা। মসজিদে নববি ছিল হুজুর (সা.)-এর কার্যালয় ও বাসভবন। নবপ্রতিষ্ঠিত অসাম্প্রদায়িক মদিনা রাষ্ট্রের পার্লামেন্ট, মজলিশে শূরা বা আইন সভা, প্রধান বিচারালয়, বাইতুল মাল বা সরকারি ট্রেজারি। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবির এবং জেনারেল হেডকোয়ার্টার। মসজিদে নববি ছিল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন, পথিক, গৃহহীন, শরণার্থীদের আশ্রয় কেন্দ্র, নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্তদের ত্রাণ ও সাহায্য সংস্থা। আহত ও অসুস্থদের চিকিৎসালয়, মিশনারি মুবাল্লিগদের সদর দপ্তর, জ্ঞান অন্বেষীদের গবেষণাগার ও লাইব্রেরি। যুগশ্রেষ্ঠ শিক্ষায়তন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মদিনার প্রধান শিল্প ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

রাসূলের মসজিদের দুয়ার কখনো বন্ধ হতো না। আল্লাহতায়ালা সূরা তাওবার ১৮নং আয়াতে মসজিদ আবাদ রাখতে আদেশ করেছেন। রাসূলের মসজিদে সব সময় আমল চলত। কখনো হাদিসের দরস, কখনো আল্লাহর একত্ববাদের আলোচনা, কখনো নামাজ, কখনো তেলাওয়াত। রাসূলের যুগে মসজিদে উদ কাঠের সুগন্ধি দেওয়া হতো। রাসূলের ওফাতের পর হজরত উমর (রা.)ও সুগন্ধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। দুঃখের কথা হলো, আমাদের দেশের চিহ্ন উলটা। আমাদের দেশের মসজিদগুলো শুধুই প্রার্থনাগৃহ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। জামাত শেষ হওয়ার পর মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশের মসজিদে সুগন্ধি দেওয়া হয় না। অথচ এটি উত্তম একটি আদব। মসজিদে ঢুকলে একটি ভ্যাপসা আর ভেজা গন্ধ নাকে আসে। এ গন্ধ থাকলে নামাজে মন বসে না। অথচ কত সুন্দর ছিল রাসূলের মসজিদ।’ বশীর সাহেব একনাগাড়ে কথা শেষ করে শ্বাস ছাড়লেন। আমি বললাম, আমাদের মসজিদগুলো কি রাসূলের মসজিদের মতো করতে পারি না? তিনি বললেন, অবশ্যই পারি, আমরা চাইলেই আমাদের মসজিদগুলো রাসূলের মসজিদের মতো গড়ে উঠতে পারে। এটি কঠিন কাজ নয়। আমাদের মসজিদগুলোতে যদি একটি ধর্মীয় পাঠাগার গড়ে তুলি, বয়স্কদের কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করি, মক্তব চালু করি, জামাত শেষ হওয়ার পর একাকী নামাজ আদায়কারীর জন্য অন্তত মসজিদের বারান্দা খোলা রাখি। তাহলে পুরোপুরি না হলেও অনেকাংশেই আমাদের মসজিদগুলো রাসূলের মসজিদের মতো আবাদ হবে। আমি সব সয়ের মতো হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম এবং মুগ্ধ হলাম।

রাসূলের মসজিদ

 আশরাফ জিয়া 
০৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বশীর সাহেবের সঙ্গে আমার প্রায়ই আড্ডা হয়। রাজ্যের নানা বিষয়ে কথা বলি আমরা। বশীর সাহেব চিন্তাশীল মানুষ। ধর্মীয় জ্ঞান তার যথেষ্ট পরিমাণ আছে। পুরোনো যুগের আলিয়ার আলেম। তার বিশেষত্বের মধ্যে একটা হলো, তিনি সিরিয়াস কিছু বলার সময় চোখ বন্ধ করে ফেলেন। এ বিষয়টি আমার ভালো লাগে। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনি। পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যারা কথা শুরু করলে সবার কান তার কথার দিকে ফিরে। নাসির সাহেব তাদের একজন। আমাদের এবারের আলোচনা ছিল রাসূলের মসজিদ বিষয়ে। নাসির সাহেব চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করলেন, বুঝলেন আশরাফ সাহেব, আমি রাসূলের মসজিদের সঙ্গে আমাদের দেশের কোনো মসজিদের মিল পাই না। আমি বললাম, কেন বশীর সাহেব? মসজিদ তো মসজিদই, মিল না পাওয়ার কারণ কী? ব্যাখ্যা করেন।

বশীর সাহেবের চোখ বন্ধ হয়ে গেল, যার অর্থ হচ্ছে তিনি এখন গম্ভীর আলোচনা শুরু করবেন। বশীর সাহেব বলতে শুরু করলেন, রাসূলের মসজিদ নিছক প্রার্থনাগৃহ ছিল না, রাসূলের মসজিদের আঙিনা ছিল ইলমের মারকাজ। সেখানে সব সময় একদল শিক্ষার্থী অবস্থান করত। যাদের আসহাবুস সুফফা বলা হতো। তারা সব সময় রাসূল (সা.)-এর সান্নিধ্যে থেকে দ্বীনি জ্ঞান আহরণ করতেন। রাসূল (সা.)-এর ওফাতের পর তারাই মুসলিম বিশ্বের শিক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করেন। এ মারকাজের ছাত্র ছিলেন হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এর মতো সাহাবা। মসজিদে নববি ছিল হুজুর (সা.)-এর কার্যালয় ও বাসভবন। নবপ্রতিষ্ঠিত অসাম্প্রদায়িক মদিনা রাষ্ট্রের পার্লামেন্ট, মজলিশে শূরা বা আইন সভা, প্রধান বিচারালয়, বাইতুল মাল বা সরকারি ট্রেজারি। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবির এবং জেনারেল হেডকোয়ার্টার। মসজিদে নববি ছিল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন, পথিক, গৃহহীন, শরণার্থীদের আশ্রয় কেন্দ্র, নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্তদের ত্রাণ ও সাহায্য সংস্থা। আহত ও অসুস্থদের চিকিৎসালয়, মিশনারি মুবাল্লিগদের সদর দপ্তর, জ্ঞান অন্বেষীদের গবেষণাগার ও লাইব্রেরি। যুগশ্রেষ্ঠ শিক্ষায়তন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মদিনার প্রধান শিল্প ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

রাসূলের মসজিদের দুয়ার কখনো বন্ধ হতো না। আল্লাহতায়ালা সূরা তাওবার ১৮নং আয়াতে মসজিদ আবাদ রাখতে আদেশ করেছেন। রাসূলের মসজিদে সব সময় আমল চলত। কখনো হাদিসের দরস, কখনো আল্লাহর একত্ববাদের আলোচনা, কখনো নামাজ, কখনো তেলাওয়াত। রাসূলের যুগে মসজিদে উদ কাঠের সুগন্ধি দেওয়া হতো। রাসূলের ওফাতের পর হজরত উমর (রা.)ও সুগন্ধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। দুঃখের কথা হলো, আমাদের দেশের চিহ্ন উলটা। আমাদের দেশের মসজিদগুলো শুধুই প্রার্থনাগৃহ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। জামাত শেষ হওয়ার পর মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশের মসজিদে সুগন্ধি দেওয়া হয় না। অথচ এটি উত্তম একটি আদব। মসজিদে ঢুকলে একটি ভ্যাপসা আর ভেজা গন্ধ নাকে আসে। এ গন্ধ থাকলে নামাজে মন বসে না। অথচ কত সুন্দর ছিল রাসূলের মসজিদ।’ বশীর সাহেব একনাগাড়ে কথা শেষ করে শ্বাস ছাড়লেন। আমি বললাম, আমাদের মসজিদগুলো কি রাসূলের মসজিদের মতো করতে পারি না? তিনি বললেন, অবশ্যই পারি, আমরা চাইলেই আমাদের মসজিদগুলো রাসূলের মসজিদের মতো গড়ে উঠতে পারে। এটি কঠিন কাজ নয়। আমাদের মসজিদগুলোতে যদি একটি ধর্মীয় পাঠাগার গড়ে তুলি, বয়স্কদের কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করি, মক্তব চালু করি, জামাত শেষ হওয়ার পর একাকী নামাজ আদায়কারীর জন্য অন্তত মসজিদের বারান্দা খোলা রাখি। তাহলে পুরোপুরি না হলেও অনেকাংশেই আমাদের মসজিদগুলো রাসূলের মসজিদের মতো আবাদ হবে। আমি সব সয়ের মতো হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম এবং মুগ্ধ হলাম।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন