ঐশী আলোয় আলোকিত হোক আমাদের মসজিদ
jugantor
ঐশী আলোয় আলোকিত হোক আমাদের মসজিদ

  মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন  

২১ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মসজিদকে আল্লাহর ঘর বলা হয়। কিন্তু আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন স্থান-কালের ঊর্ধ্বে কিংবা কোনো ঘরে অবস্থান করা আল্লাহপাকের শান নয়।

দুনিয়ার প্রথম মসজিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত খানায়ে কাবাকেও বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বলা হয়। এরূপ বলার পেছনে কারণ বহুবিধ-প্রথমত মসজিদে দৈনিক পাঁচবার জামাতের সঙ্গে সালাত আদায় করা হয় এবং দ্বিতীয়ত মসজিদে তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার ও হাম্দ-নাতের মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহর জিকির করা হয়।

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘পৃথিবীর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হচ্ছে মসজিদ এবং সর্বনিকৃষ্ট স্থান হচ্ছে বাজার। উম্মুল মুমিনিন মা আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) আমাদের বাসগৃহের মধ্যেও মসজিদ অর্থাৎ নফল নামাজ পড়ার বিশেষ জায়গা তৈরি করা এবং তাকে পবিত্র রাখার জন্য আদেশ করেছেন। (কুরতুবি)।

মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মসজিদ সমাজের অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। বছর বছর দেশে মসজিদের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটলেও মসজিদ আবাদকারী তথা মুসল্লিদের কিংবা মসজিদ পরিচালনাকারীদের গুণগত প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। পরিদর্শন করলে এবং ঈদের নামাজ কিংবা সাপ্তাহিক জুমার নামাজের হিসাব বাদ দিলে দেখা যাবে, গড়ে বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে পাঞ্জেগানা নামাজির সংখ্যা হাতেগোনা।

শহরাঞ্চলে কিঞ্চিত প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেলেও গ্রামাঞ্চলে এ দৃশ্য আরও করুণ। কোথাও কোথাও এমনও দেখা গেছে, মাত্র ২০০ গজের ব্যবধানে কিংবা পুকুরের দুপাড়ে দুটি বিশালাকার মসজিদ গড়ে তোলা হয়েছে। যুক্তির খাতিরে ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এ দৃশ্য মেনে নিলেও গ্রামাঞ্চলে মোটেও কাম্য নয়, বরং উদ্বেগজনক।

খোঁজ করলে দেখা যাবে, গ্রামাঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে এসব মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে ধর্মীয় গুরুত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, ভিন্ন মতবাদগত এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রাধান্য লাভ করে। যে যেখানে খুশি এবং যার যার ইচ্ছামতো যত্রতত্র মসজিদ গড়ে তুললে মসজিদ প্রতিষ্ঠার মূল তাৎপর্য ব্যাহত হয়। এরূপ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা যে আদৌ ইসলামসম্মত নয় তা অনেক আলেম ওলামাও বুঝতে চান না। রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশায় এরূপ অসৎ উদ্দেশ্যে মসজিদে জিরার নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে কুরআনিক নির্দেশ এবং রাসূল (সা.)-এর আদেশে ওই মসজিদ ধ্বংস ও ভস্মীভূত করা হয়েছে।

মসজিদের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি ইসলাম বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। পবিত্র কুরআন মজিদে রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে উজাড় করতে চেষ্টা করে তারচেয়ে বড় জালেম আর কে?

এদের পক্ষে মসজিদগুলোতে প্রবেশ করা বিধেয় নয়, অবশ্য ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায়। ওদের জন্য ইহকালে লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে। (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১১৪)।

রাসূল (সা.)-এর হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, কোনো মসজিদের মোকাবিলায় তার কাছাকাছি অন্য মসজিদ নির্মাণ করা হলে এবং এর পেছনে যদি মুসলমানদের বিভক্তিকরণ ও পূর্বতন মসজিদে মুসল্লি হ্রাস পায় তবে নতুন মসজিদ নির্মাতারা বিভেদ সৃষ্টি ও মুসল্লি হ্রাসকরণের অপরাধে গুনাহগার হবে। এ জন্য অর্ধ-পৃথিবীর শাসক হজরত উমর ফারুক (রা.) তার শাসনামলে এক আদেশে বলেছিলেন, এক মসজিদের পাশে অন্য মসজিদ নির্মাণ করবে না যাতে পূর্বতন মসজিদের জামাত ও সৌন্দর্য হ্রাস পায়। (কাশশাফ)।

বাংলাদেশেও মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে মসজিদ প্রতিষ্ঠা, কার্যকরীভাবে মসজিদ পরিচালনা কমিটি গঠন করা দরকার। মসজিদ পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় চেতনা যেমন দরকার, তেমনই দরকার রাজনীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বলয় থেকে মসজিদকে মুক্ত রাখা। বাংলাদেশের অনেক মসজিদেই পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা ধর্মীয় জ্ঞানহীন, অসৎ, দুর্নীতিপরায়ণ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। অর্থ ও রাজনৈতিক দাপটে ঘুরেফিরেই তারা পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়, মসজিদ ফান্ডে ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন বাবদ অর্থ প্রদান করে। কাজেই মাস শেষে বেতন নেওয়ার স্বার্থে ইমাম মুয়াজ্জিন একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের হুকুম পালনে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশে মসজিদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়নের জন্য জাতীয় সংসদে মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৬ পাশ হয়েছে কিন্তু ওই নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। আমরা আশা করি, ওই নীতিমালার আলোকে সারা দেশের মসজিদ ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানো হবে।

মসজিদ পরিচালনা কমিটি গঠন থেকে শুরু করে ইমাম মুয়াজ্জিনের বেতন কাঠামো ও তাদের প্রশিক্ষণ, মসজিদ ফান্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সরকার ইসলামিক ফাউন্ডেশন দ্বারা সারা দেশে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক দক্ষ ও কার্যকর মসজিদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

ঐশী আলোয় আলোকিত হোক আমাদের মসজিদ

 মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন 
২১ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মসজিদকে আল্লাহর ঘর বলা হয়। কিন্তু আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন স্থান-কালের ঊর্ধ্বে কিংবা কোনো ঘরে অবস্থান করা আল্লাহপাকের শান নয়।

দুনিয়ার প্রথম মসজিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত খানায়ে কাবাকেও বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বলা হয়। এরূপ বলার পেছনে কারণ বহুবিধ-প্রথমত মসজিদে দৈনিক পাঁচবার জামাতের সঙ্গে সালাত আদায় করা হয় এবং দ্বিতীয়ত মসজিদে তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার ও হাম্দ-নাতের মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহর জিকির করা হয়।

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘পৃথিবীর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হচ্ছে মসজিদ এবং সর্বনিকৃষ্ট স্থান হচ্ছে বাজার। উম্মুল মুমিনিন মা আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) আমাদের বাসগৃহের মধ্যেও মসজিদ অর্থাৎ নফল নামাজ পড়ার বিশেষ জায়গা তৈরি করা এবং তাকে পবিত্র রাখার জন্য আদেশ করেছেন। (কুরতুবি)।

মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মসজিদ সমাজের অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। বছর বছর দেশে মসজিদের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটলেও মসজিদ আবাদকারী তথা মুসল্লিদের কিংবা মসজিদ পরিচালনাকারীদের গুণগত প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। পরিদর্শন করলে এবং ঈদের নামাজ কিংবা সাপ্তাহিক জুমার নামাজের হিসাব বাদ দিলে দেখা যাবে, গড়ে বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে পাঞ্জেগানা নামাজির সংখ্যা হাতেগোনা।

শহরাঞ্চলে কিঞ্চিত প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেলেও গ্রামাঞ্চলে এ দৃশ্য আরও করুণ। কোথাও কোথাও এমনও দেখা গেছে, মাত্র ২০০ গজের ব্যবধানে কিংবা পুকুরের দুপাড়ে দুটি বিশালাকার মসজিদ গড়ে তোলা হয়েছে। যুক্তির খাতিরে ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এ দৃশ্য মেনে নিলেও গ্রামাঞ্চলে মোটেও কাম্য নয়, বরং উদ্বেগজনক।

খোঁজ করলে দেখা যাবে, গ্রামাঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে এসব মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে ধর্মীয় গুরুত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, ভিন্ন মতবাদগত এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রাধান্য লাভ করে। যে যেখানে খুশি এবং যার যার ইচ্ছামতো যত্রতত্র মসজিদ গড়ে তুললে মসজিদ প্রতিষ্ঠার মূল তাৎপর্য ব্যাহত হয়। এরূপ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা যে আদৌ ইসলামসম্মত নয় তা অনেক আলেম ওলামাও বুঝতে চান না। রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশায় এরূপ অসৎ উদ্দেশ্যে মসজিদে জিরার নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে কুরআনিক নির্দেশ এবং রাসূল (সা.)-এর আদেশে ওই মসজিদ ধ্বংস ও ভস্মীভূত করা হয়েছে।

মসজিদের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি ইসলাম বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। পবিত্র কুরআন মজিদে রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে উজাড় করতে চেষ্টা করে তারচেয়ে বড় জালেম আর কে?

এদের পক্ষে মসজিদগুলোতে প্রবেশ করা বিধেয় নয়, অবশ্য ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায়। ওদের জন্য ইহকালে লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে। (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১১৪)।

রাসূল (সা.)-এর হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, কোনো মসজিদের মোকাবিলায় তার কাছাকাছি অন্য মসজিদ নির্মাণ করা হলে এবং এর পেছনে যদি মুসলমানদের বিভক্তিকরণ ও পূর্বতন মসজিদে মুসল্লি হ্রাস পায় তবে নতুন মসজিদ নির্মাতারা বিভেদ সৃষ্টি ও মুসল্লি হ্রাসকরণের অপরাধে গুনাহগার হবে। এ জন্য অর্ধ-পৃথিবীর শাসক হজরত উমর ফারুক (রা.) তার শাসনামলে এক আদেশে বলেছিলেন, এক মসজিদের পাশে অন্য মসজিদ নির্মাণ করবে না যাতে পূর্বতন মসজিদের জামাত ও সৌন্দর্য হ্রাস পায়। (কাশশাফ)।

বাংলাদেশেও মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে মসজিদ প্রতিষ্ঠা, কার্যকরীভাবে মসজিদ পরিচালনা কমিটি গঠন করা দরকার। মসজিদ পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় চেতনা যেমন দরকার, তেমনই দরকার রাজনীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বলয় থেকে মসজিদকে মুক্ত রাখা। বাংলাদেশের অনেক মসজিদেই পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা ধর্মীয় জ্ঞানহীন, অসৎ, দুর্নীতিপরায়ণ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। অর্থ ও রাজনৈতিক দাপটে ঘুরেফিরেই তারা পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়, মসজিদ ফান্ডে ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন বাবদ অর্থ প্রদান করে। কাজেই মাস শেষে বেতন নেওয়ার স্বার্থে ইমাম মুয়াজ্জিন একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের হুকুম পালনে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশে মসজিদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়নের জন্য জাতীয় সংসদে মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৬ পাশ হয়েছে কিন্তু ওই নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। আমরা আশা করি, ওই নীতিমালার আলোকে সারা দেশের মসজিদ ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানো হবে।

মসজিদ পরিচালনা কমিটি গঠন থেকে শুরু করে ইমাম মুয়াজ্জিনের বেতন কাঠামো ও তাদের প্রশিক্ষণ, মসজিদ ফান্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সরকার ইসলামিক ফাউন্ডেশন দ্বারা সারা দেশে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক দক্ষ ও কার্যকর মসজিদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন