মুসা নবির কাহিনি ও আমাদের শিক্ষা
jugantor
মুসা নবির কাহিনি ও আমাদের শিক্ষা

  মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি  

২১ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হজরত মুসা (আ.)-এর কাহিনি আমরা কেবল মোজেজা বা মুখরোচক আশ্চর্য ঘটনা হিসাবেই শুনে থাকি। লাঠির আঘাতে লোহিত সাগরের পানি দুই দিকে সরে গিয়ে তলদেশ বের হয়ে আসা, তারপর বনি ইসরাইলের সাগরের ওপারে চলে যাওয়ার পর ফেরাউন বাহিনীর ডুবে মরা মুসা (আ.)-এর কাহিনি বলতে কেবল এ সবেই দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখা হয়, অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হয় না।

অথচ এ কাহিনির প্রকৃত মর্ম হলো প্রত্যেক মানুষের জন্য জরুরি যে নিজ জাতিকে জুলুম ও জিল্লতি থেকে উদ্ধার করে উন্নতির পথ প্রদর্শন করা। বনি ইসরাইল নেহায়েত অসহায় অবস্থায় ছিল, শাসকশ্রেণি তাদের পুত্রসন্তানদের হত্যা করত আর কন্যাসন্তানদের জোরপূর্বক সেবাদাসী বানিয়ে রাখত।

মুসা (আ.)-এর কাহিনি সেসব গুণ অর্জনের শিক্ষা দেয় যার মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ জাতিকে উন্নত করার ক্ষমতায় বলিয়ান হতে সক্ষম।

আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.)-কে নির্দেশ করেন, তুমি এবং তোমার ভাই হারুন, দুজনেই ফেরাউনের কাছে যাও। আল্লাহ বলেন-যাও তার কাছে এবং বলো, আমরা তোমার রবের প্রেরিত, বনি ইসরাইলকে আমাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দাও এবং তাদের কষ্ট দিও না। আমরা তোমার কাছে নিয়ে এসেছি তোমার রবের নিদর্শন এবং শান্তি তার জন্য যে সঠিক পথ অনুসরণ করে।

(সূরা ত-হা, আয়াত ৪৭)-এর সঙ্গে আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন তার জাতিকে যেন অতীতের বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস শুনিয়ে সতর্ক করা হয়।

ইরশাদ করেন : আমি এর আগে মুসাকেও নিজের নিদর্শনাবলিসহকারে পাঠিয়ে ছিলাম। তাকেও আমি হুকুম দিয়েছিলাম, নিজের সম্প্রদায়কে অন্ধকার থেকে বের করে আলোকের মধ্যে নিয়ে এসো এবং তাদের আল্লাহর সময় (ইতিহাস) স্মরণ করাও। এ ঘটনাবলির মধ্যে বিরাট নিদর্শন রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে সবর করে ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। (সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৫)।

হজরত শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ.) তার কিতাব ‘ফাওজুল কাবির’-এর তৃতীয় পৃষ্ঠায় লিখেন : আলোচ্য আয়াতে দতাজকির বি-আইয়ামিল্লাহ ‘বা আল্লাহর সময় স্মরণ করানো-মানে ওইসব ঘটনার বর্ণনা উদ্দিষ্ট করা হয়েছে যেখানে নেককার বান্দাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে আর নাফরমান বান্দাদের আজাব দেওয়া হয়েছে।

এরপর আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন : আর আমি মুসা ও তার ভাইকে ইশারা করলাম এই বলে যে, মিসরে নিজের কওমের জন্য কিছু ঘরের বন্দোবস্ত করো, নিজেদের ওই ঘরগুলোকে কেবলায় পরিণত করো এবং নামাজ কায়েম করো। আর ইমানদারদের সুখবর দাও। (সূরা ইউনুস, আয়াত ৮৭)। অর্থাৎ এখন তোমাদের মুক্তির সময় কাছাকাছি চলে এসেছে।

খেয়াল করে দেখুন, একটা মৃত জাতিকে জিন্দা করার জন্য আল্লাহতায়ালা ‘পূর্বকালের বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস এবং সফলতার পূর্ণ আশা’ হৃদয়ে বদ্ধমূল করার শিক্ষা দিচ্ছেন। এ দুই বিষয়ের শিক্ষার যে কী ফায়দা, ওই জামানার মানুষজন খুব ভালো করেই তা বুঝে নিয়েছিল।

তারপর দেখুন, ফেরাউনের জাদুকরেরা যখন হজরত মুসা (আ.)-এর ধর্ম কবুল করে নিল, তখন ফেরাউন বলল : এখন আমি তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেব এবং খেজুর গাছের কাণ্ডে তোমাদের ক্রুশবিদ্ধ করব। (সূরা ত-হা, আয়াত ৭১)।

তখন তারা জওয়াব দিল : যা করার করতে পার। (সূরা ত-হা, আয়াত ৭২)।

হজরত মুসা (আ.) ও সঙ্গী-সাথিরা নিজেদের মূল উদ্দেশ্য ও মাকসাদের পরিপূর্ণতার জন্য সব রকমের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন। এভাবেই তারা সফল হয়েছেন এবং দুশমনেরা ধ্বংস হয়ে গেছে।

হজরত মুসা (আ.)-এর কাহিনিতে বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতিগত ঐক্য বজায় রাখার ওপর খুব জোর দেওয়া হয়েছে। মুসা (আ.) যখন তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাক্ষাতে যান এবং হজরত হারুন (আ.)-কে তার স্থলাভিষিক্ত করেন, তখন বনি ইসরাইলে একদল গোমরাহ হয়ে গিয়ে গরুর বাছুর পূজা করতে শুরু করে।

হজরত মুসা (আ.) তুর পাহাড় থেকে ফিরে এসে যখন দেখলেন তার জাতির এ অবস্থা, তিনি ভয়ানক রেগে গিয়ে হজরত হারুন (আ.)-এর চুল-দাড়ি ধরে বললেন : (মুসা) বললেন, হে হারুন! তুমি যখন দেখলে এরা পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে তখন আমার পথে চলা থেকে কিসে তোমাকে বিরত রেখেছিল?... তুমি কি আমার হুকুম অমান্য করেছ? (সূরা ত-হা, আয়াত ৯২-৯৩)। মানে তারা যখন গোমরাহ হয়ে যাচ্ছে, তুমি কেন জোর-জবরদস্তি করে হলেও তাদের বাধা দাওনি?

উত্তরে হজরত হারুন (আ.) বললেন : আমার আশঙ্কা ছিল তুমি এসে বলবে যে, তুমি বনি ইসরাইলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ এবং আমার কথা রক্ষা করনি। (সূরা ত-হা, আয়াত ৯৪)-এর মানে হজরত হারুন (আ.) যখন তার জাতিকে সংশোধনের চেষ্টা করে কামিয়াব হননি, তখন কিছু সময়ের জন্য তাদের গোমরাহির ওপর নিশ্চুপ ছিলেন, সেটাও এক বৃহৎ স্বার্থে যে, এখন যদি তাদের গোমরাহি বন্ধ করার জন্য জোর-জবরদস্তি করি, তাহলে সম্ভাবনা আছে পুরো জাতি খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাবে, ঐক্যবদ্ধ থাকবে না।

এখানে লক্ষণীয় যে, একজন পয়গম্বর বিচ্ছিন্নতা বা অনৈক্যের বিপরীতে বাছুর পূজার মতো শিরকি কাণ্ডেও কিছু সময়ের জন্য নীরবতা পালন করেছেন। বাস্তবতা হলো যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো জাতি একতাবদ্ধ থাকে, তালিম-তরবিয়ত তাদেরকে খুব ভালোভাবে প্রভাবিত করে। আর যখন তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা দেখা দেবে, তাদের ধ্বংস অনিবার্য, কোনোভাবেই তারা সফলকাম হতে পারবে না।

অনুবাদ : মওলবি আশরাফ

মুসা নবির কাহিনি ও আমাদের শিক্ষা

 মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি 
২১ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হজরত মুসা (আ.)-এর কাহিনি আমরা কেবল মোজেজা বা মুখরোচক আশ্চর্য ঘটনা হিসাবেই শুনে থাকি। লাঠির আঘাতে লোহিত সাগরের পানি দুই দিকে সরে গিয়ে তলদেশ বের হয়ে আসা, তারপর বনি ইসরাইলের সাগরের ওপারে চলে যাওয়ার পর ফেরাউন বাহিনীর ডুবে মরা মুসা (আ.)-এর কাহিনি বলতে কেবল এ সবেই দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখা হয়, অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হয় না।

অথচ এ কাহিনির প্রকৃত মর্ম হলো প্রত্যেক মানুষের জন্য জরুরি যে নিজ জাতিকে জুলুম ও জিল্লতি থেকে উদ্ধার করে উন্নতির পথ প্রদর্শন করা। বনি ইসরাইল নেহায়েত অসহায় অবস্থায় ছিল, শাসকশ্রেণি তাদের পুত্রসন্তানদের হত্যা করত আর কন্যাসন্তানদের জোরপূর্বক সেবাদাসী বানিয়ে রাখত।

মুসা (আ.)-এর কাহিনি সেসব গুণ অর্জনের শিক্ষা দেয় যার মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ জাতিকে উন্নত করার ক্ষমতায় বলিয়ান হতে সক্ষম।

আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.)-কে নির্দেশ করেন, তুমি এবং তোমার ভাই হারুন, দুজনেই ফেরাউনের কাছে যাও। আল্লাহ বলেন-যাও তার কাছে এবং বলো, আমরা তোমার রবের প্রেরিত, বনি ইসরাইলকে আমাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দাও এবং তাদের কষ্ট দিও না। আমরা তোমার কাছে নিয়ে এসেছি তোমার রবের নিদর্শন এবং শান্তি তার জন্য যে সঠিক পথ অনুসরণ করে।

(সূরা ত-হা, আয়াত ৪৭)-এর সঙ্গে আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন তার জাতিকে যেন অতীতের বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস শুনিয়ে সতর্ক করা হয়।

ইরশাদ করেন : আমি এর আগে মুসাকেও নিজের নিদর্শনাবলিসহকারে পাঠিয়ে ছিলাম। তাকেও আমি হুকুম দিয়েছিলাম, নিজের সম্প্রদায়কে অন্ধকার থেকে বের করে আলোকের মধ্যে নিয়ে এসো এবং তাদের আল্লাহর সময় (ইতিহাস) স্মরণ করাও। এ ঘটনাবলির মধ্যে বিরাট নিদর্শন রয়েছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে সবর করে ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। (সূরা ইবরাহিম, আয়াত ৫)।

হজরত শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ.) তার কিতাব ‘ফাওজুল কাবির’-এর তৃতীয় পৃষ্ঠায় লিখেন : আলোচ্য আয়াতে দতাজকির বি-আইয়ামিল্লাহ ‘বা আল্লাহর সময় স্মরণ করানো-মানে ওইসব ঘটনার বর্ণনা উদ্দিষ্ট করা হয়েছে যেখানে নেককার বান্দাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে আর নাফরমান বান্দাদের আজাব দেওয়া হয়েছে।

এরপর আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন : আর আমি মুসা ও তার ভাইকে ইশারা করলাম এই বলে যে, মিসরে নিজের কওমের জন্য কিছু ঘরের বন্দোবস্ত করো, নিজেদের ওই ঘরগুলোকে কেবলায় পরিণত করো এবং নামাজ কায়েম করো। আর ইমানদারদের সুখবর দাও। (সূরা ইউনুস, আয়াত ৮৭)। অর্থাৎ এখন তোমাদের মুক্তির সময় কাছাকাছি চলে এসেছে।

খেয়াল করে দেখুন, একটা মৃত জাতিকে জিন্দা করার জন্য আল্লাহতায়ালা ‘পূর্বকালের বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস এবং সফলতার পূর্ণ আশা’ হৃদয়ে বদ্ধমূল করার শিক্ষা দিচ্ছেন। এ দুই বিষয়ের শিক্ষার যে কী ফায়দা, ওই জামানার মানুষজন খুব ভালো করেই তা বুঝে নিয়েছিল।

তারপর দেখুন, ফেরাউনের জাদুকরেরা যখন হজরত মুসা (আ.)-এর ধর্ম কবুল করে নিল, তখন ফেরাউন বলল : এখন আমি তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেব এবং খেজুর গাছের কাণ্ডে তোমাদের ক্রুশবিদ্ধ করব। (সূরা ত-হা, আয়াত ৭১)।

তখন তারা জওয়াব দিল : যা করার করতে পার। (সূরা ত-হা, আয়াত ৭২)।

হজরত মুসা (আ.) ও সঙ্গী-সাথিরা নিজেদের মূল উদ্দেশ্য ও মাকসাদের পরিপূর্ণতার জন্য সব রকমের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন। এভাবেই তারা সফল হয়েছেন এবং দুশমনেরা ধ্বংস হয়ে গেছে।

হজরত মুসা (আ.)-এর কাহিনিতে বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতিগত ঐক্য বজায় রাখার ওপর খুব জোর দেওয়া হয়েছে। মুসা (আ.) যখন তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাক্ষাতে যান এবং হজরত হারুন (আ.)-কে তার স্থলাভিষিক্ত করেন, তখন বনি ইসরাইলে একদল গোমরাহ হয়ে গিয়ে গরুর বাছুর পূজা করতে শুরু করে।

হজরত মুসা (আ.) তুর পাহাড় থেকে ফিরে এসে যখন দেখলেন তার জাতির এ অবস্থা, তিনি ভয়ানক রেগে গিয়ে হজরত হারুন (আ.)-এর চুল-দাড়ি ধরে বললেন : (মুসা) বললেন, হে হারুন! তুমি যখন দেখলে এরা পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে তখন আমার পথে চলা থেকে কিসে তোমাকে বিরত রেখেছিল?... তুমি কি আমার হুকুম অমান্য করেছ? (সূরা ত-হা, আয়াত ৯২-৯৩)। মানে তারা যখন গোমরাহ হয়ে যাচ্ছে, তুমি কেন জোর-জবরদস্তি করে হলেও তাদের বাধা দাওনি?

উত্তরে হজরত হারুন (আ.) বললেন : আমার আশঙ্কা ছিল তুমি এসে বলবে যে, তুমি বনি ইসরাইলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ এবং আমার কথা রক্ষা করনি। (সূরা ত-হা, আয়াত ৯৪)-এর মানে হজরত হারুন (আ.) যখন তার জাতিকে সংশোধনের চেষ্টা করে কামিয়াব হননি, তখন কিছু সময়ের জন্য তাদের গোমরাহির ওপর নিশ্চুপ ছিলেন, সেটাও এক বৃহৎ স্বার্থে যে, এখন যদি তাদের গোমরাহি বন্ধ করার জন্য জোর-জবরদস্তি করি, তাহলে সম্ভাবনা আছে পুরো জাতি খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাবে, ঐক্যবদ্ধ থাকবে না।

এখানে লক্ষণীয় যে, একজন পয়গম্বর বিচ্ছিন্নতা বা অনৈক্যের বিপরীতে বাছুর পূজার মতো শিরকি কাণ্ডেও কিছু সময়ের জন্য নীরবতা পালন করেছেন। বাস্তবতা হলো যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো জাতি একতাবদ্ধ থাকে, তালিম-তরবিয়ত তাদেরকে খুব ভালোভাবে প্রভাবিত করে। আর যখন তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা দেখা দেবে, তাদের ধ্বংস অনিবার্য, কোনোভাবেই তারা সফলকাম হতে পারবে না।

অনুবাদ : মওলবি আশরাফ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন