আল্লাহর আদালতে দাঁড়ানোর কথা ভাবুন
jugantor
আল্লাহর আদালতে দাঁড়ানোর কথা ভাবুন

  মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী  

২০ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আলহাকু মুত্তাকাছুর। হাত্তাজুরতুমুল মাকাবির। বেশি বেশি পাওয়ার লোভ তোমাদের আমৃত্য মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।’ (সূরা তাকাসুর, আয়াত : ১-২)।

মানুষের ‘চাহিদা’ এত বেশি, যা অল্পে তুষ্ট হয় না কেউ। যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়েও অনেক বেশি পাওয়ার আশায়, বেশি লাভের নেশায় সে মোহাবিষ্ট থাকে।

প্রয়োজনের চেয়ে, ধারণক্ষমতার বাইরে মানুষ খেতে পারে না, পরতে পারে না, করতে পারে না-এসব জানা সত্ত্বেও মানুষ অতিরিক্ত পাওয়ার নেশায় কত রকম অনিষ্টকর কাজের পেছনে যে জীবন নষ্ট করছে, তা আমাদের চারপাশের মানুষজনকে দেখলেই বোঝা যায়।

হজরত আলী (রা.) বলেন, মানুষের লাগামহীন চাহিদা সম্পর্কে সূরা তাকাছুর নাজিল হওয়ার আগে একটি হাদিস আমরা কুরআনের মতো আওড়াতাম।

হাদিসটি হলো নবিজি (সা.) বলতেন, ‘আদম সন্তানের লোভ এক লাগামহীন ঘোড়ার মতো। তাকে যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও দেওয়া হয়, সে বলবে আমার আরও চাই, আরও চাই...। এমনিভাবে তার লোভ বাড়তেই থাকে। একমাত্র কবরের মাটি ছাড়া তার পেট কিছুতেই শান্ত হয় না।’

সূরা আদিয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, মানুষ এক ছুটন্ত লোভী ঘোড়ার মতো জীবনযপান করছে। নিজের স্বার্থে সে সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে। ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকে তার এই তছনছ করা কার্যক্রম। এরপর আল্লাহতায়ালা আসল কথাটি বলেন, ইন্নাল ইনসানা লিরাব্বিহি লাকানুদ। স্বার্থের পেছনে ছুটে চলা মানুষগুলো অবশ্যই তার প্রভুর প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ।

তাই তো প্রভুর বিধিনিষেধের কোনো রকম তোয়াক্কাই করে না তারা। ওয়া ইন্নাহু লিহুব্বিল খায়রি লাশাদিদ। বরং সে বস্তুতগত ঐশ্বর্যের মায়ায় জর্জরিত। আরও ভালো থাকা, আরও ভালো পরা, ভালো খাওয়ার জন্য সে দুনিয়া-আখেরাত নষ্ট করে অন্ধের মতো জীবন পার করছে।

এই ছুটে চলা দেখে আল্লাহর বড় মায়া হয়। তাইতো আফসোস জড়ানো ভাষায় আল্লাহ বলছেন, আফালা ইয়ালামু ইজা বুসিরা মাফিল কুবুর। আহারে! বান্দা কি জানে না-একদিন সে মরে যাবে এবং মরে যাওয়ার পর আবার তাকে ওঠানো হবে। জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। আল্লাহর আদালতে কঠিন জবাবদিহি করতে হবে তাকে।

সূরা তাকাসুরেও ভিন্ন আঙ্গিকে একই কথা বলেছেন আল্লাহতায়ালা, যখন মানুষের কবরের জীবন শুরু হবে, সত্যিকারভাবে সে দেখতে পাবে নশ্বর এ দুনিয়ার জীবন-সম্পদ-পরিজন কিছুই না, কেউই না, তখন সে বুঝতে পারবে কী ভুলটাই না সে করেছে।

সূরা তাকাসুরের শেষ আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, লাতারা উন্নাল জাহিম। সুম্মা লাতারা উন্নাহা আইনাল ইয়াকিন। সুম্মা লাতুস আলুন্না ইয়াওমাইজিন আনিন্নায়িম। তখন সে জাহান্নামকে চোখে দেখবে। আর তখনই সে দৃঢ় বিশ্বাস করবে, দুনিয়ার মোহে জীবন শেষ করাটা কত বড় ভুল ছিল তার। সেদিন তাকে প্রতিটি নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।

হে প্রিয় পাঠক! কুরআনের আয়াতে আয়াতে পাতায় পাতায় আল্লাহতায়ালা এভাবে মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্ক থাকার উপদেশ দিয়েছেন। বারবার বলেছেন, এ দুনিয়া মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য। এটি আসলে একটি খেলা ঘরের মতো। মৃত্যু ঝড় এসে তোমার এ খেলাঘর গুঁড়িয়ে দেবে। তোমাকে নিয়ে যাবে তোমার আসল ঠিকানায়। সুতরাং সেই আখেরাতের জন্য প্রস্তুত হও। নিজের লোভ সংযত করো। পাশবিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করো। তবেই তুমি দুনিয়াতে পাবে শান্তি, আখেরাতে পাবে মুক্তি। আল্লাহতায়ালা সবাইকে পরিশুদ্ধ মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার তাওফিক দিন।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, পির সাহেব, আউলিয়ানগর

www.selimayadi.com

আল্লাহর আদালতে দাঁড়ানোর কথা ভাবুন

 মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী 
২০ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আলহাকু মুত্তাকাছুর। হাত্তাজুরতুমুল মাকাবির। বেশি বেশি পাওয়ার লোভ তোমাদের আমৃত্য মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।’ (সূরা তাকাসুর, আয়াত : ১-২)।

মানুষের ‘চাহিদা’ এত বেশি, যা অল্পে তুষ্ট হয় না কেউ। যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়েও অনেক বেশি পাওয়ার আশায়, বেশি লাভের নেশায় সে মোহাবিষ্ট থাকে।

প্রয়োজনের চেয়ে, ধারণক্ষমতার বাইরে মানুষ খেতে পারে না, পরতে পারে না, করতে পারে না-এসব জানা সত্ত্বেও মানুষ অতিরিক্ত পাওয়ার নেশায় কত রকম অনিষ্টকর কাজের পেছনে যে জীবন নষ্ট করছে, তা আমাদের চারপাশের মানুষজনকে দেখলেই বোঝা যায়।

হজরত আলী (রা.) বলেন, মানুষের লাগামহীন চাহিদা সম্পর্কে সূরা তাকাছুর নাজিল হওয়ার আগে একটি হাদিস আমরা কুরআনের মতো আওড়াতাম।

হাদিসটি হলো নবিজি (সা.) বলতেন, ‘আদম সন্তানের লোভ এক লাগামহীন ঘোড়ার মতো। তাকে যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও দেওয়া হয়, সে বলবে আমার আরও চাই, আরও চাই...। এমনিভাবে তার লোভ বাড়তেই থাকে। একমাত্র কবরের মাটি ছাড়া তার পেট কিছুতেই শান্ত হয় না।’

সূরা আদিয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, মানুষ এক ছুটন্ত লোভী ঘোড়ার মতো জীবনযপান করছে। নিজের স্বার্থে সে সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে। ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকে তার এই তছনছ করা কার্যক্রম। এরপর আল্লাহতায়ালা আসল কথাটি বলেন, ইন্নাল ইনসানা লিরাব্বিহি লাকানুদ। স্বার্থের পেছনে ছুটে চলা মানুষগুলো অবশ্যই তার প্রভুর প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ।

তাই তো প্রভুর বিধিনিষেধের কোনো রকম তোয়াক্কাই করে না তারা। ওয়া ইন্নাহু লিহুব্বিল খায়রি লাশাদিদ। বরং সে বস্তুতগত ঐশ্বর্যের মায়ায় জর্জরিত। আরও ভালো থাকা, আরও ভালো পরা, ভালো খাওয়ার জন্য সে দুনিয়া-আখেরাত নষ্ট করে অন্ধের মতো জীবন পার করছে।

এই ছুটে চলা দেখে আল্লাহর বড় মায়া হয়। তাইতো আফসোস জড়ানো ভাষায় আল্লাহ বলছেন, আফালা ইয়ালামু ইজা বুসিরা মাফিল কুবুর। আহারে! বান্দা কি জানে না-একদিন সে মরে যাবে এবং মরে যাওয়ার পর আবার তাকে ওঠানো হবে। জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। আল্লাহর আদালতে কঠিন জবাবদিহি করতে হবে তাকে।

সূরা তাকাসুরেও ভিন্ন আঙ্গিকে একই কথা বলেছেন আল্লাহতায়ালা, যখন মানুষের কবরের জীবন শুরু হবে, সত্যিকারভাবে সে দেখতে পাবে নশ্বর এ দুনিয়ার জীবন-সম্পদ-পরিজন কিছুই না, কেউই না, তখন সে বুঝতে পারবে কী ভুলটাই না সে করেছে।

সূরা তাকাসুরের শেষ আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, লাতারা উন্নাল জাহিম। সুম্মা লাতারা উন্নাহা আইনাল ইয়াকিন। সুম্মা লাতুস আলুন্না ইয়াওমাইজিন আনিন্নায়িম। তখন সে জাহান্নামকে চোখে দেখবে। আর তখনই সে দৃঢ় বিশ্বাস করবে, দুনিয়ার মোহে জীবন শেষ করাটা কত বড় ভুল ছিল তার। সেদিন তাকে প্রতিটি নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।

হে প্রিয় পাঠক! কুরআনের আয়াতে আয়াতে পাতায় পাতায় আল্লাহতায়ালা এভাবে মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্ক থাকার উপদেশ দিয়েছেন। বারবার বলেছেন, এ দুনিয়া মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য। এটি আসলে একটি খেলা ঘরের মতো। মৃত্যু ঝড় এসে তোমার এ খেলাঘর গুঁড়িয়ে দেবে। তোমাকে নিয়ে যাবে তোমার আসল ঠিকানায়। সুতরাং সেই আখেরাতের জন্য প্রস্তুত হও। নিজের লোভ সংযত করো। পাশবিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করো। তবেই তুমি দুনিয়াতে পাবে শান্তি, আখেরাতে পাবে মুক্তি। আল্লাহতায়ালা সবাইকে পরিশুদ্ধ মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার তাওফিক দিন।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, পির সাহেব, আউলিয়ানগর

www.selimayadi.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন