একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘর
jugantor
একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘর

  মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী  

২৪ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনার পাল তুলে জীবন নামক নৌকাটি দুই হাজার বাইশের বন্দর পর্যন্ত নিয়ে আসতে জীবন সমুদ্র থেকে বহু মূল্যবান ঢেউ হারিয়ে গেছে। ‘সমুদ্র’ বলাতে মনে পড়ে গেল জীবনের প্রথম সমুদ্র দেখার কথা। রাত তিনটা। চারদিকে সুনসান নীরবতা।

দিনের কোলাহলে মানুষ সমুদ্র দেখে, রাতের নির্জনতায় সমুদ্র মানুষ দেখে। মন্থরগতিতে তীর ভূমিতে হাঁটছি। অনেক দূরে কয়েকজন তরুণ গান করছে। সমুদ্র তাদেরও পরখ করছে। তীব্র গর্জনে ঢেউ আসছে, কূলে আছড়ে পড়েই আবার ফিরে যাচ্ছে।

হঠাৎ হৃদয়ের কান খুলে গেল। কে যেন বলল, হে মানুষ! তোমার জীবনও ঢেউয়ের ছন্দে গড়া। ভালো করে খেয়াল করো, তোমার নিশ্বাসের আসা-যাওয়া ঢেউ ছাড়া কিছুই নয়। মনের সেই অজানা কথককে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে সমুদ্র কোথায়? উত্তর এলো, সমুদ্র হলো মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালা। সে সমুদ্র থেকেই তোমার মাটির দেহে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছে।

যতদিন জীবনে ঢেউয়ের আসা-যাওয়া অর্থাৎ নিশ্বাস জারি থাকবে, ততদিন তুমি মানুষ, ঢেউ শেষ হলেই লাশ। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি মানুষ সৃষ্টি করে তার ভেতর আমার থেকে রুহ ফুঁকে দিলাম।’ (সূরা হিজর, আয়াত ২৯)। কে তুমি পাঠক আজ আমার পড়ছ।

আমি বিশ্বাস করছি, তুমি মুমিন বান্দা। তুমি জীবনের প্রতিটি নিশ্বাসকে, প্রতিটি ক্ষণকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করেছ। অন্যদিকে কেউ হয়তো জীবনের প্রতিটি সত্যকে হত্যা করে অন্ধকার জীবন বেছে নিয়ে পথ চলছে। মিথ্যার বিষ ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রতিদিন শিরা-উপশিরায়। এ দুইজন মানুষের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। কূলে আছড়ে পড়ার আগে আর পরে ঢেউয়ের দৃশ্য কি একই থাকে? কখনো নয়। আছড়ে পড়ার আগে ঢেউয়ের গর্জনে বুকে কাঁপন ধরে। আর আছড়ে পড়ার পর ঢেউয়ের নীরব প্রস্থান হৃদয়ে হাহাকার জাগায়। যে ঢেউ বুকে কাঁপন ধরিয়েছে, সে ঢেউই খাঁ খাঁ জাগিয়ে বুকের পাঁজর ভেঙেছে। ঢেউ কিন্তু একই।

আল্লাহ বলেন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পালায়নকর সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখামুখি হবে; অতঃপর তোমাদের দৃশ্য ও অদৃশ্যর জ্ঞানের অধিকারির কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। (সূরা জুমুআহ : ০৮)।

পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্ত সম্পর্কে সাবধান করে আল্লাহ বলেন, সাবধান, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। তখন সে জিজ্ঞেস করবে কেউ কি নেই যে, তাকে রক্ষা করবে। তখন সে বুঝতে পারবে দুনিয়া থেকে বিদায়ের ক্ষণ এসে গেছে। পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে এবং প্রভুর পানে যাত্রা শুরু করবে। (সূরা কিয়ামাহ : ২৬-৩০)। আমরা ঘুমকাতুর ঘুমিয়ে আছি, মৃত্যু ঘুমিয়ে নেই, মৃত্যু জীবনের খুবই, কাছাকাছি অবস্থান করে আছে। মানুষের জীবনের অন্তিম মুহূর্তের শেষ আকুতির কথা তুলে ধরে আল্লাহ বলেন, অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, সে বলে, হে আমার প্রতিপালক আমাকে আবার পৃথিবীর জীবনে ফেরত পাঠান যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি, যা আমি আগে করিনি। (সূরা মু’মিনুন-৯৯)। সে বলবে হায়। আমার এ জীবনের জন্য যদি কিছু অগ্রিম পাঠাতাম। (সূরা আল ফজর-২৪)।

এ দুনিয়ায় আমাদের সর্বশেষ নিশ্বাসগুলো নেওয়ার ও ছাড়ার সময়টিই হলো আমাদের অন্তিম মুহূর্ত। অন্তিম মুহূর্তে মৃত্যুমুখে পড়ে যাওয়া ব্যক্তির ওপর নেমে আসে নানা কঠিন ও ভয়াবহ বিপদ। এ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে যথাযথ প্রস্তুতি থাকতে হবে।

হজরত দাউদ (আ.)-এর কাছে যখন মালাকুল মাউত এলো, তখন তিনি বললেন, ‘আপনি কে?’ সে বলল, ‘আমি এমন ব্যক্তি, যে কোনো রাজা-বাদশাহকে ভয় করে না, কোনো মজবুত দুর্গই যাকে আটকাতে পারে না এবং যে কোনো ঘুস গ্রহণ করে না।’ দাউদ (আ.) তখন বললেন, ‘তাহলে আপনি কি মালাকুল মাউত।’ সে বলল, ‘হ্যাঁ।’ দাউদ (আ.) বললেন, ‘আপনি আমার কাছে চলে এসেছেন, অথচ আমার প্রস্তুতি এখনো শেষ হয়নি।’ মালাকুল মাউত বললো ‘হে দাউদ (আ.) আপনার অমুক নিকটাত্মীয় কোথায়? আপনার অমুক প্রতিবেশী কোথায়?’ দাউদ (আ.) বললেন, ‘তারা মারা গেছে।’ সে বলল, ‘তাদের মৃত্যুর মধ্যে কি আপনার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য শিক্ষা ছিল না? (আত-তাজকিরাহ : ২০৪)। আমরা অন্তিম মুহূর্তের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে পারছি না। কিন্তু আল্লাহর মাহবুব বান্দারা ঠিকই নিজেদের তৈরি রাখতেন।

কা’কা ইবনে হাকিম বলেন, ‘ত্রিশ বছর ধরে আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এবার মৃত্যু যদি আমার কাছে আসে, তাহলে আমি আমার ইবাদতের তালিকার ক্ষেত্রে কোনোটাকে আগে-পিছে করতে পছন্দ করব না।’

হে আমার দরদি পাঠক! এবার তুমিই সিদ্ধান্ত নাও ঢেউয়ে আছড়ে পড়া আনন্দে শামিল হবে, নাকি বেদনায় মিলিয়ে যাওয়া কষ্টের শিকার হবে! শেষ করার আগে মনে করিয়ে দিচ্ছি মাবুদের আয়াতখানি, ‘নিশ্চয়ই আমি তাকে পথনির্দেশ দিয়েছি। এখন এটা তার ওপর নির্ভর করে সে কৃতজ্ঞ হবে, না অকৃতজ্ঞ হবে। আমি তো সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি শিকল, বেড়ি ও গনগনে আগুন।’ (সূরা দাহর, আয়াত ৩-৪)।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, পির সাহেব, আউলিয়ানগর

www.selimayadi.com

একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘর

 মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী 
২৪ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনার পাল তুলে জীবন নামক নৌকাটি দুই হাজার বাইশের বন্দর পর্যন্ত নিয়ে আসতে জীবন সমুদ্র থেকে বহু মূল্যবান ঢেউ হারিয়ে গেছে। ‘সমুদ্র’ বলাতে মনে পড়ে গেল জীবনের প্রথম সমুদ্র দেখার কথা। রাত তিনটা। চারদিকে সুনসান নীরবতা।

দিনের কোলাহলে মানুষ সমুদ্র দেখে, রাতের নির্জনতায় সমুদ্র মানুষ দেখে। মন্থরগতিতে তীর ভূমিতে হাঁটছি। অনেক দূরে কয়েকজন তরুণ গান করছে। সমুদ্র তাদেরও পরখ করছে। তীব্র গর্জনে ঢেউ আসছে, কূলে আছড়ে পড়েই আবার ফিরে যাচ্ছে।

হঠাৎ হৃদয়ের কান খুলে গেল। কে যেন বলল, হে মানুষ! তোমার জীবনও ঢেউয়ের ছন্দে গড়া। ভালো করে খেয়াল করো, তোমার নিশ্বাসের আসা-যাওয়া ঢেউ ছাড়া কিছুই নয়। মনের সেই অজানা কথককে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে সমুদ্র কোথায়? উত্তর এলো, সমুদ্র হলো মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালা। সে সমুদ্র থেকেই তোমার মাটির দেহে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছে।

যতদিন জীবনে ঢেউয়ের আসা-যাওয়া অর্থাৎ নিশ্বাস জারি থাকবে, ততদিন তুমি মানুষ, ঢেউ শেষ হলেই লাশ। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি মানুষ সৃষ্টি করে তার ভেতর আমার থেকে রুহ ফুঁকে দিলাম।’ (সূরা হিজর, আয়াত ২৯)। কে তুমি পাঠক আজ আমার পড়ছ।

আমি বিশ্বাস করছি, তুমি মুমিন বান্দা। তুমি জীবনের প্রতিটি নিশ্বাসকে, প্রতিটি ক্ষণকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করেছ। অন্যদিকে কেউ হয়তো জীবনের প্রতিটি সত্যকে হত্যা করে অন্ধকার জীবন বেছে নিয়ে পথ চলছে। মিথ্যার বিষ ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রতিদিন শিরা-উপশিরায়। এ দুইজন মানুষের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। কূলে আছড়ে পড়ার আগে আর পরে ঢেউয়ের দৃশ্য কি একই থাকে? কখনো নয়। আছড়ে পড়ার আগে ঢেউয়ের গর্জনে বুকে কাঁপন ধরে। আর আছড়ে পড়ার পর ঢেউয়ের নীরব প্রস্থান হৃদয়ে হাহাকার জাগায়। যে ঢেউ বুকে কাঁপন ধরিয়েছে, সে ঢেউই খাঁ খাঁ জাগিয়ে বুকের পাঁজর ভেঙেছে। ঢেউ কিন্তু একই।

আল্লাহ বলেন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পালায়নকর সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখামুখি হবে; অতঃপর তোমাদের দৃশ্য ও অদৃশ্যর জ্ঞানের অধিকারির কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। (সূরা জুমুআহ : ০৮)।

পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্ত সম্পর্কে সাবধান করে আল্লাহ বলেন, সাবধান, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। তখন সে জিজ্ঞেস করবে কেউ কি নেই যে, তাকে রক্ষা করবে। তখন সে বুঝতে পারবে দুনিয়া থেকে বিদায়ের ক্ষণ এসে গেছে। পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে। অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে এবং প্রভুর পানে যাত্রা শুরু করবে। (সূরা কিয়ামাহ : ২৬-৩০)। আমরা ঘুমকাতুর ঘুমিয়ে আছি, মৃত্যু ঘুমিয়ে নেই, মৃত্যু জীবনের খুবই, কাছাকাছি অবস্থান করে আছে। মানুষের জীবনের অন্তিম মুহূর্তের শেষ আকুতির কথা তুলে ধরে আল্লাহ বলেন, অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, সে বলে, হে আমার প্রতিপালক আমাকে আবার পৃথিবীর জীবনে ফেরত পাঠান যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি, যা আমি আগে করিনি। (সূরা মু’মিনুন-৯৯)। সে বলবে হায়। আমার এ জীবনের জন্য যদি কিছু অগ্রিম পাঠাতাম। (সূরা আল ফজর-২৪)।

এ দুনিয়ায় আমাদের সর্বশেষ নিশ্বাসগুলো নেওয়ার ও ছাড়ার সময়টিই হলো আমাদের অন্তিম মুহূর্ত। অন্তিম মুহূর্তে মৃত্যুমুখে পড়ে যাওয়া ব্যক্তির ওপর নেমে আসে নানা কঠিন ও ভয়াবহ বিপদ। এ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে যথাযথ প্রস্তুতি থাকতে হবে।

হজরত দাউদ (আ.)-এর কাছে যখন মালাকুল মাউত এলো, তখন তিনি বললেন, ‘আপনি কে?’ সে বলল, ‘আমি এমন ব্যক্তি, যে কোনো রাজা-বাদশাহকে ভয় করে না, কোনো মজবুত দুর্গই যাকে আটকাতে পারে না এবং যে কোনো ঘুস গ্রহণ করে না।’ দাউদ (আ.) তখন বললেন, ‘তাহলে আপনি কি মালাকুল মাউত।’ সে বলল, ‘হ্যাঁ।’ দাউদ (আ.) বললেন, ‘আপনি আমার কাছে চলে এসেছেন, অথচ আমার প্রস্তুতি এখনো শেষ হয়নি।’ মালাকুল মাউত বললো ‘হে দাউদ (আ.) আপনার অমুক নিকটাত্মীয় কোথায়? আপনার অমুক প্রতিবেশী কোথায়?’ দাউদ (আ.) বললেন, ‘তারা মারা গেছে।’ সে বলল, ‘তাদের মৃত্যুর মধ্যে কি আপনার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য শিক্ষা ছিল না? (আত-তাজকিরাহ : ২০৪)। আমরা অন্তিম মুহূর্তের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে পারছি না। কিন্তু আল্লাহর মাহবুব বান্দারা ঠিকই নিজেদের তৈরি রাখতেন।

কা’কা ইবনে হাকিম বলেন, ‘ত্রিশ বছর ধরে আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এবার মৃত্যু যদি আমার কাছে আসে, তাহলে আমি আমার ইবাদতের তালিকার ক্ষেত্রে কোনোটাকে আগে-পিছে করতে পছন্দ করব না।’

হে আমার দরদি পাঠক! এবার তুমিই সিদ্ধান্ত নাও ঢেউয়ে আছড়ে পড়া আনন্দে শামিল হবে, নাকি বেদনায় মিলিয়ে যাওয়া কষ্টের শিকার হবে! শেষ করার আগে মনে করিয়ে দিচ্ছি মাবুদের আয়াতখানি, ‘নিশ্চয়ই আমি তাকে পথনির্দেশ দিয়েছি। এখন এটা তার ওপর নির্ভর করে সে কৃতজ্ঞ হবে, না অকৃতজ্ঞ হবে। আমি তো সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি শিকল, বেড়ি ও গনগনে আগুন।’ (সূরা দাহর, আয়াত ৩-৪)।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, পির সাহেব, আউলিয়ানগর

www.selimayadi.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন