কদরের শ্রেষ্ঠ রাত খুঁজে নাও হে প্রেমিক

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন

কদরের রাতে আল্লাহ জিবরাইল (আ.) কে বলেন, সিদরাতুল মুনতাহার সব ফেরেশতাকে নিয়ে দুনিয়ায় প্রবেশ কর। ফেরেশতারা এসে কাবা গৃহের কাছে, রাসূল (সা.)-এর রওজার ওপরে, বায়তুল মুকাদ্দাসের কাছে এবং তুরে সিনার মসজিদের পাশে পতাকা উড়িয়ে দেন।

শবেকদরের মর্যাদা বর্ণনায় সূরা কদর নাজিল করেছেন আল্লাহ। রাসূল (সা.)-এর সময় থেকে যুগে যুগে মুসলিম সমাজ শবেকদর পালন করে আসছে।

সাধারণ মুসলমানের তুলনায় আল্লাহর অলিগণ শবেকদরের মর্যাদা বেশি উপলব্ধি করতে পারেন। যা তাদের কথা, কাজ ও গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। শবেকদর সম্পর্কে তাদের বর্ণনা তুলে ধরছি।

হজরত বড়পীর মহিউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) হাদিস শরিফের আলোকে বলেছেন, একদিন রাসূল (সা.) সাহাবাদের কাছে বনি ইসরাইলের চার ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন, তারা ৮০ বছর একাধারে ইবাদত করে। এ সময় তারা কোনো নাফরমানির কাজ করেনি।

তাদের কথা শুনে সাহাবিরা বিস্মিত হন। তখন হজরত জিবরাইল (আ.) এসে বলেন, এর চেয়েও বিস্ময়কর বস্তু আল্লাহ পাক আপনার উম্মতদের দিয়েছেন।

এরপর তিনি সূরা কদর পাঠ করে বলেন, যে বিষয়ে আপনার সাহাবারা বিস্মিত হয়েছেন এটি তার চেয়েও বিস্ময়কর। তা শুনে রাসূল (সা.) খুবই আনন্দিত হলেন। কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। হাজার মাসে ৮৩ বছর ৪ মাস হয়।

বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা.)-এর উম্মতদের বয়স তাঁর সামনে পেশ করা হলে তিনি দেখলেন, তাঁর উম্মতের বয়স কম। আর সেই স্বল্পতাকে পূর্ণ করার জন্যই কদরের রাত দান করা হয়েছে।

হজরত বড়পীর (রহ.) আরও বলেছেন, এ রাতেই আল্লাহ পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন। লাওহে মাহফুজ থেকে কোরআনকে সুফরাহ ফেরেশতাদের কাছে অবতীর্ণ করেছেন। লেখাপড়ার কাজে নিয়োজিত ফেরেশতাদের সুফরাহ বলে। বছরে যতটা কোরআন নাজিল হতো ঠিক ততটা লাওহে মাহফুজ থেকে দেয়া হতো।

পরবর্তী কদর পর্যন্ত এ পরিমাণ কোরআন জিবরাইল (আ.) হুজুর (সা.)-এর সামনে নিয়ে আসতেন। এভাবে তেইশ বছরে পূর্ণ কোরআন নাজিল হয়েছে।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ইবনে ওমর (রা.) বলেছেন, শবেকদর সম্বন্ধে আমি বিজোড় সংখ্যার মধ্যে চিন্তা করে দেখলাম, সাত সংখ্যাই অধিক প্রযোজ্য। কেননা আসমানের সংখ্যা সাত। সাফা-মারওয়া সায়ী সাতবার। কাবার তাওয়াফ সাতবার। সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ। মানুষের সৃষ্টি সাতটি অঙ্গে। মানুষের আহার সাতদানা। মানুষের মুখমণ্ডলে সাতটি ছিদ্র। সূরা ফাতিহার সাতটি আয়াত। কোরআন মজিদের সাতটি কিরাত।

দোজখ সাতটি, তার দরজাও সাতটি এবং স্তম্ভও সাতটি। আদ সম্প্রদায় সাত রাতের বাতাসে ধ্বংস হয়েছিল। হজরত ইউসুফ (আ.) সাত বছর কারাগারে ছিলেন। সূরা ইউসুফে বর্ণিত গাভীর সংখ্যা সাত। এ সময়কার দুর্ভিক্ষ ছিল সাত বছর।

আবার সাত বছর বিপুল পরিমাণে শস্যের ফলন হয়েছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজ রাকাতের সংখ্যা সতেরো। সূরা কদরের সালাম শব্দ পর্যন্ত অক্ষরের সংখ্যা সাতাশ। হজরত আইয়ুব (আ.) সাত বছর বিপদাপদে ছিলেন।

আল্লাহ সাতটি বস্তুর শপথ করেছেন- চন্দ্র, সূর্য, চাশতের সময়, দিন, রাত, আকাশ এবং আসমান-জমিনের সৃষ্টিকারী। এ থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ বহু কিছু সাতেরো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করেছেন। আর শবেকদর যখন রমজানের শেষ দশ দিনের মধ্যে, তখন সাতেরো সংখ্যা অর্থাৎ সাতাশ তারিখ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

কদরের রাত সুনির্দিষ্ট না করা সম্পর্কে হজরত বড়পীর (রহ.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যেন কদরের রাত জেগে ইবাদত করে এ ধারণা না করতে পারে, আমার আজকের রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

কাজেই আল্লাহ আমাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দিয়েছেন। আমি আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন বলে গণ্য হয়েছি। নিশ্চয় আমি বেহেশতের অধিকারী হব। এ ধারণার বশবতী হয়ে অলস এবং আরামপ্রিয় লোকেরা যাতে অন্যান্য দিনের ইবাদত-বন্দেগি তরক না করে সে জন্যই আল্লাহ কদরের রাতকে অনির্দিষ্ট রেখেছেন।

তিনি বলেছেন, পাঁচটি বস্তুকে গোপন রাখা হয়েছে- ইবাদতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পাপে আল্লাহর গজব, মধ্যবর্তী নামাজ, আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও কদরের রাত।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কদরের রাতে আল্লাহ জিবরাইল (আ.) কে বলেন, সিদরাতুল মুনতাহার সব ফেরেশতাকে নিয়ে দুনিয়ায় প্রবেশ কর।

ফেরেশতারা এসে কাবা গৃহের কাছে, রাসূল (সা.)-এর রওজার ওপরে, বায়তুল মুকাদ্দাসের কাছে এবং তুরে সিনার মসজিদের পাশে পতাকা উড়িয়ে দেন। তারপর তারা জিবরাইল (আ.)-এর আদেশে দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েন এবং মুমিন মুসলিম নর-নারীর আবাসস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের পাপ মার্জনার জন্য দোয়া করতে থাকেন। রাত ফুরানোর সঙ্গে সঙ্গে ফেরেশতারা আকাশে ফিরে যান।

কদরের রাতের লক্ষণ সম্পর্কে হজরত বড়পীর (রহ.) বলেছেন, এ রাতে অধিক ঠাণ্ডা বা গরম অনুভূত হয় না। কোনো কোনো বুজুর্গ বলেন, এই রাতে কুকুরের ডাকের আওয়াজ শুনা যায় না। এ রাতের ভোরে সূর্যোদয় এমনভাবে হয়, মনে হবে সূর্যের আলো নেই। তা ছাড়া এ রাতে বহু বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে যা একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় তার খাস বান্দারাই তা অনুভব করতে পারেন।

হজরত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) বলেছেন, সে মর্যাদার রাত খুঁজে নাও, তাকে যার মাঝে পাবে তুমি জাহান্নাম থেকে মুক্তি। হজরত শেখ আবুবকর ওয়াররাক (রহ.) বলেছেন, এ রাতে ইবাদতের কারণে এমন লোকের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পায় এর আগে যাদের কোনো মর্যাদা মর্তবা কদর ছিল না। তাই এ রাতকে কদর বলে।

হজরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) বলেছেন, রমজানের শেষ ১০ দিনের প্রতি রাতই শবেকদরের রাত। ক্ষমতাবান পুরুষদের উচিত এ ক’দিনের রাতে আল্লাহর ধ্যান থেকে বিরত না থাকা। শায়খ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলভী (রহ.) বলেছেন, রাসূল (সা.) যখন জানতে পারলেন, শবেকদর রমজানের শেষ ১০ দিনে হয়ে থাকে, তখন থেকে তিনি আজীবন রমজানের শেষ ১০ দিন এতেকাফ করতেন।

শবেকদর বছরের নির্দিষ্ট একটি রাত। বছরে একের অধিক শবেকদর হতে পারে না। তাই শেখ সাদী (রহ.) বলেছেন, সকল রাত যদি শবেকদর হতো তাহলে থাকত না শবেকদরের মর্যাদা। উপমহাদেশের প্রখ্যাত অলিয়ে কামেল শামসুল উলামা আল্লামা হজরত জানশরীফ শাহ সুরেশ্বরী (রহ.) বলেছেন, রমজানের একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ ও ঊনত্রিশে কদর থাকতে পারে কিন্তু সাতাশ তারিখেই এজমা।

রাসূল (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইত হজরত ইমাম বাকের (রা.) বলেছেন, কদরের রাতে কোরআন হাতে নাও এবং তা খুলে সামনে রাখ, আর বল, হে আল্লাহ! তোমার নাজিল করা কিতাবের অসিলা দিয়ে বলছি এবং এতে যেসব নাম রয়েছে সেসব সুন্দরতম নামের অসিলায় আমাকে দোজখের আগুন থেকে মুক্তদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে নাও।

লেখক : প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ ও প্রধান গদিনশীন পীর দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দ্বায়রা শরিফ

Email : [email protected]