সৌদি আরবে বাঙালি হাফেজদের তারাবি

  মুফতি আহমাদ ফয়সাল ০৮ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৌদি আরবে বাঙালি হাফেজদের তারাবি
হাফেস আরিফুল ইসলাম, হাফেজ আল আমিন, হাফেজ ওমায়ের আবদুল্লাহ এবং হাফেজ শামসুদ্দিন (বাম থেকে ডানে)

হাজার হাজার বাঙালি হাফেজ দেশ-বিদেশে তারাবি পড়াচ্ছেন। যুগান্তরের পাঠকদের সঙ্গে সৌদি আরবের মদিনা মুনাওয়ারার কয়েকজন হাফেজের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

১৯৯৪ সালে হেফজ শেষ করেন ঢাকা কদমতলীর ছেলে হাফেজ মাওলানা আরিফুল ইসলাম। দেশের মাটিতে প্রায় ১৯ বছর তারাবি পড়িয়েছেন। বর্তমানে সৌদি আরবে তারাবি পড়াচ্ছেন। সৌদি তারাবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারাবি পড়া ও পড়ানোর প্রকৃত স্বাদ সৌদি এসে পাচ্ছি।

দেশের মানুষ কর্মমুখী ও কর্মজীবী। ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত থাকে। তা ছাড়া কোরআন না বোঝা ও ধর্মীয় জ্ঞান স্বল্পতাও একটি কারণ। সব মিলিয়ে দেশের মুসল্লিদের মাঝে তাড়াহুড়ার প্রবণতাই বেশি লক্ষ করা যায়। নামাজে দ্রুত কোরআন তেলাওয়াত করা হয়।

ফলে কোরআন ও তারাবির প্রকৃত স্বাদ অনুভব করা যায় না। কোরআন খতমই একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু সৌদিতে তার ব্যতিক্রম। প্রায় সবাই কোরআন বোঝেন। কোরআনে আজমতও তাদের অন্তরে পরিপূর্ণ রয়েছে।

আরেকটি বিষয় হল- রমজান মাসে সৌদিতে দিনেরবেলা প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ থাকে। রাতে তারাবির পর সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাই তারা তারাবিতে ক্লান্ত থাকে না। ধীরে ধীরে একাগ্রতার সঙ্গে তারাবি পড়ানো হয়। ফলে কোরআন ও তারাবির প্রকৃত স্বাদ অনুভব করা যায়।

সৌদি আরবে হাফেজদের সম্মান ও মর্যাদা ঈর্ষণীয় পর্যায়ে। মাওলানা, মুফতি ও মুহাদ্দিসের তুলনায় হাফেজদের সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হয়। হাফেজদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। যেমন- মসজিদভিত্তিক সরকারি কিছু সংস্থা আছে।

সেখানে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সার্টিফিকেট অর্জনকারীদের সরকারিভাবে চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। তাদের আকামা, দেশে আসা-যাওয়া, ফ্যামেলি আনা ও থাকা-খাওয়ার যাবতীয় খরচ সরকারিভাবে বহন করা হয়। এ ছাড়া রয়েছে হুফফাজুল কোরআন প্রতিযোগিতা।

বিজয়ীদের দেয়া হয় মোটা অঙ্কের পুরস্কার ও সম্মাননা ক্রেস্ট। হাফেজদের সঙ্গে কখনও মন্দ আচরণ ও কটু কথা বলা হয় না। আমাদের দেশে অনেক মসজিদে হাফেজরা কমিটি ও মুসল্লিদের মাধ্যমে অপমানিত ও অপদস্থ হন। কিন্তু সৌদিতে এমন ঘটনা বিরল ও অকল্পনীয়।

একটি গৌরবের বিষয় হল, আরববিশ্বে বাংলাদেশি হাফেজদের কদর ও চাহিদা অনেক বেশি। এমনটি বলছিলেন হাফেজ মাওলানা মুফতি শামছুউদ্দিন। ২০০৫ সালে জামিয়া ইসলামিয়া মাইজদী নোয়াখালী থেকে হেফজ শেষ করেছেন তিনি। হেফজ শেষ করার পর থেকে নিয়মিত তারাবি পড়িয়েছেন। বর্তমানে সৌদিতে তারাবি পড়াচ্ছেন।

হাফেজ মাওলানা আল আমিন। কুমিল্লা, চান্দিনা। ২০০৭ সালে মাদ্রাসাই সিরাতে মুসতাকিম থেকে হেফজ শেষ করেন। তারপর থেকে নিয়মিত তারাবি পড়িয়েছেন। বর্তমানে সৌদি আরব তারাবি পড়াচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে রমজান এলে মানুষ টাকা রোজগারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সৌদিয়ানরা রমজান এলে বেশি বেশি নেকি অর্জনের চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন। যেমন- বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া। দান-সদকা করা। জাকাত দেয়া। রোজাদারদের ইফতারি করান। প্রায় সব মসজিদে রোজাদারদের জন্য ইফতারির ব্যবস্থা করা হয়। অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো। সামর্থ্যহীনদের ওমরাহ করানো ইত্যাদি।

সৌদির মসজিদগুলো থেকে শেখার মতো অনেক বিষয় আছে। দেশের মসজিদগুলোতে শোরগোল ও চিল্লা-ফাল্লা বেশি হয়ে থাকে। গিবত-শেকায়েত হয়ে থাকে। মুসল্লিরা মসজিদে গল্প করেই সময় কাটায়। কমিটি ও নেতা পর্যায়ের ব্যক্তিরা মসজিদে আসেন যেন ইমাম ও হাফেজদের সঙ্গে রুক্ষ আচরণের জন্য। কিন্তু সৌদির মসজিদগুলোর পরিবেশ ভিন্ন। কোনো শোরগোল নেই। হইচই নেই। নীরব-নিস্তব্ধ।

মুসল্লিরা এসে নফল নামাজ পড়েন। জিকির করেন। দোয়া করেন। ছোট-বড় প্রায় সবাই নামাজের আগে-পরে কিছু সময় কোরআন তেলাওয়াত করেন। রমজান মাসে এ চিত্র বেশি দেখা যায়। প্রতি শুক্রবার জুমার খুতবার আগে মসজিদে এসে সূরা কাহাফ অবশ্যই তেলাওয়াত করবে তারা। এ বিষয়গুলো আমাদের দেশে একেবারেই নেই।

নারায়ণগঞ্জের ছেলে হাফেজ ওমায়ের আব্দুল্লাহ। ২০১৩ সালে তাহফিজুল কোরআন ওয়াসসুন্নাহ মাদ্রাসা যাত্রাবাড়ী থেকে হেফজ শেষ করেছেন। দেশে ৫ বছর তারাবি পড়িয়েছেন। দুই বছর হল সৌদি আরব এসেছেন।

ইন্সটিটিউট অফ মসজিদে নববীতে অধ্যয়ন করছেন। মদিনা মুনাওয়ারার এক মসজিদে তারাবি পড়াচ্ছেন। তিনি দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেন, হাফেজরা তারাবি পড়ান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। টাকা-পয়সার জন্য নয়। তারপরও কিছু দিতে চাইলে সম্মানের সঙ্গে দেয়া উচিত। অপমান ও অপদস্থ করে নয়।

মসজিদে মসজিদে, হাটেবাজারে এমনকি বাসাবাড়িতে হাফেজদের নামে ভিক্ষাবৃত্তি করে টাকা তোলার যে ঘৃণিত পথ আমাদের দেশে চালু হয়েছে, সেটা বড় মন্দ ও হাফেজদের জন্য অপমানকর। হাফেজদের অপমান মানে কোরআনের অপমান।

সৌদি আরব ও অন্যান্য আরববিশ্বেও হাফেজদের হাদিয়া দেয়া হয়। সাধারণত ত্রিশ হাজার থেকে আশি হাজার টাকা পর্যন্ত। সেটা সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে। আরববিশ্বে সরকারিভাবে হাফেজদের জন্য হাদিয়া ও বিভিন্ন সম্মাননার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করব, হাফেজদের জন্য যেন সরকারিভাবে সম্মান ও মর্যাদার ব্যবস্থা করা হয়।

সৌদি আরব, মদিনা মুনাওয়ারা

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter