কোরআনের প্রাণ হাফেজে কোরআন

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হাফেজ শাহ শরীফ

রমজানে হাফেজদের ঠিকানা হয় মসজিদ। পেশায় ভিন্নতা থাকলেও রমজানে সবাই খতমে তারাবির ইমাম বনে যান।

তারাবির সালাতে পুরো কোরআন তেলাওয়াত করে মুসল্লিদের হৃদয় কাড়েন। যুগ যুগ ধরে চলে আসা হাফেজদের প্রতি মানুষের সম্মান ও ভক্তি আজকাল কমে আসছে। গ্রাম অঞ্চলে এক সময় দেখা যেত বাড়ি বাড়ি থেকে হাফেজদের জন্য খাবার আসত।

আবার কেউ বাটিতে করে দুধ এবং গাছের ফলফলাদি হাফেজদের জন্য নিয়ে আসতেন। বিষয়টা হাফেজদের জন্য অনেক আনন্দের ছিল। এখন আর এমনটি দেখা যায় না। দুঃখের বিষয় হচ্ছে রমজান চলে গেলে হাফেজদের আর সমাজের কেউ খোঁজখবর রাখেন না।

আরবি লেখা কাগজের পবিত্র কোরআনে পাককে মানুষ সব সময় সম্মান করে বুকে জড়িয়ে মুখে চুমু খায় কিন্তু যারা কাগজের লেখা অক্ষরগুলো হৃদয়ে ধারণ করে রাখেন তাদের সবসময় সম্মান করা দরকার।

হাফেজরা রাতের ঘুম হারাম করে বছর বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোরআনকে সিনায় পুষে রেখেছেন। সিনায় কোরআন রাখা এ মানুষগুলো আল্লাহর কাছে অনেক বেশি মর্যাদার।

আল্লাহর কাছে যার মর্যাদা বেশি সমাজে তাকে অবহেলা করা ঠিক কি? অনেকের ধারণা হাফেজদের সম্মান শুধু মসজিদের আর মাদ্রাসায় থাকবে। কিন্তু কোরআন কি শুধু মসজিদ আর মাদ্রাসায় প্রচার করার জন্য নাজিল হয়েছে? সমাজের সর্বত্র কি কোরআনের প্রচার প্রসার ঘটাতে হবে না? ভিন্ন ভিন্ন পেশার চার হাফেজের কথা বলছি আজকের লেখায়-

হাফেজ আহসান হাবীব খোরশেদ (৩৮) ময়মনসিংহের পাগলা থানার দীঘিরপাড় দারুসসুন্নাহ নেসারিয়া আলিম মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক। পাগলা বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব। তারাবি পাড়াচ্ছেন পাগলা উত্তরপাড়া বেপারিবাড়ি মসজিদে।

গ্রামের মুসল্লিদের প্রতিদিনের তেলাওয়াতের অর্থ জানিয়ে তারাবি পড়ানো শুরু করেছেন তিনি। গ্রামের মসজিদে এমন উদ্যোগ নেয়ার কারণ জানতে চাইলে হাফেজ আহসান হাবীব বলেন, গ্রামের অধিকাংশ মসজিদের ইমাম হাফেজ নন।

সামান্য অর্থের লোভে গ্রামের মুসল্লিদের খতমে তারাবির ব্যাপারে যুগ যুগ ধরে অনুৎসাহিত করেন তারা। মুসল্লিরা কোরআনের মর্ম বুঝতে পারলে খতমে তারাবির প্রতি আগ্রহী হবেন। এ জন্য আমি কোরআনের অর্থ জানাচ্ছি গ্রামে গ্রামে। গ্রামের মসজিদে খতমে তারাবি চালু হলে গ্রামেও হাফেজরা তারাবি পড়ানোর সুযোগ পাবেন এতে কোরআনের প্রসার ঘটবে।

হাফেজ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন হিরা (৩০) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স মাস্টার্স শেষ করে রাজধানীর কুড়িলে কুইন মেরী কলেজের বাংলা প্রভাষক পদে চাকরি করছেন।

১০ বছর বয়সে হেফজ শেষ করার পর থেকেই টানা তারাবি পড়িয়ে আসছেন। এ বছর তারাবি পড়াচ্ছেন রামপুরা মসজিদে গাউছিয়ায়। হাফেজ হয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়ার কারণ জানতে চাইলে হাফেজ মহিউদ্দিন বলেন, বাংলা সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা আর আমাদের সমাজের মানুষের ভুল ধারণা ভাঙার জন্য আগ্রহটা হয়েছে।

মানুষ মনে করে হাফেজরা শুধু এক খতম কোরআন পাঠ করতে পারে এর বেশি কিছু জানে না। তিনি বলেন, হাফেজদের যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। তাহলে মানুষ হাফেজদের ছোট চোখে দেখার সুযোগ পাবে না।

হাফেজ মোহাম্মদ রাশেদ চৌধুরী (৩৪)। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতি বিভাগে অনার্স শেষ করে বর্তমানে নুভিস্তা ফার্মা ওষুধ কম্পানিতে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার পদে চাকরি করছেন।

হাফেজ হয়ে ভিন্ন পেশায় গেলেও তারাবি পড়ানো বাদ দেননি কোনো বছর। এ বছর তারাবি পড়াচ্ছেন কল্যাণপুর নতুন বাজার পণ্ডিত শাহর দরবার চিশতি মনজিলে। হাফেজ হয়ে ভিন্ন ধরনের পেশায় আসার কারণ কী জানতে চাইলে হাফেজ রাশেদ বলেন, বর্তমান সমাজে হাফেজদের মোটেও মূল্যায়ন করা হয় না।

হাফেজদের আর্থিক অনটনে জীবনযাপন করতে হয়। তাদের যথাযথ কর্মের ব্যবস্থা করা হয় না। চাকরির পাশাপাশি কোরআন মুখস্থ রাখার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন নিয়মিত তেলাওয়াত করতে হয়। তাই চাকরির পাশাপাশি কোরআনকে মুখস্থ ধরে রাখতে সমস্যা হয় না।

হাফেজ শরীফ বিন আয়াতুল্লাহ (২০)। ফরিদাবাদ মাদ্রাসার জালালাইন জামাতের ছাত্র। ৩ বছর ধরে তারাবি পড়াচ্ছেন বারিধারা বাইতুল আতিক কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। হাফেজদের জন্য আশার বাণী হচ্ছে কিছু কিছু এলাকা এমন রয়েছে যেখানে হাফেজদের যথাযথ সম্মান করা হয়। এমনি বক্তব্য শোনা গেল হাফেজ শরীফের মুখে।

আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে শরীফ বলেন, এ মহল্লার মুসল্লিদের অন্তরে রয়েছে হাফেজদের প্রতি ভালোবাসা। রমজানের বাইরেও তাদের হাফেজদের সঙ্গে আছে সুসম্পর্ক। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এই রমজানের আগে এক মুসল্লি ৬ হাজার টাকা দিয়েছেন আমাকে কক্সবাজার ঘুরে ফ্রেশ হয়ে প্রফুল্ল হৃদয়ে তারাবি পড়াতে। আমার মসজিদে রমজানে হাফেজদের থাকার জন্য এসি রুমসহ উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তেলাওয়াতের ব্যাপারে মুসল্লিদের নেই কোনো তাড়াহুড়া। ধীরস্থির সুন্দর সুরময় তেলাওয়াত শুনতে আগ্রহী সবাই। সামাজের মানুষের কাছে অনুরোধ কোরআনের খাদেম হাফেজদের যেন যথাযথ মর্যাদা দেয়া হয়। আল্লাহর সুরের পাখি কোরআনের মুহব্বতে তাদের ভালোবাসলে আল্লাহকে ভালোবাসা হবে। আল্লাহ আমাদের তার কোরআনের খাদেম হওয়ার তৌফিক দিন।

Email : Md. Shahsharif [email protected]