প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগুক দাওয়াতের মেহনতে

  আল ফাতাহ মামুন ১২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগুক দাওয়াতের মেহনতে
ছবি: সংগৃহীত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী ফারদিন এহসান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই একটি টি-স্টলে বসে কথা হয় তার সঙ্গে। ‘ভাই! কখনও ইজতেমায় গিয়েছেন?’

‘না, যাওয়া হয়নি।’

‘যাওয়ার ইচ্ছা আছে?’

‘এখনও ভাবিনি। তবে তাবলিগের ভাইদের আমি ভালোবাসি। আমার কয়েকজন সহপাঠী চিল্লা দিয়েছে। মহল্লায় যখন জামাত আসে তাদের সঙ্গে সময় দিই। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও বের হতে পারিনি।’

ফারদিনের মতো অনেক তরুণ-মনই তাবলিগের প্রতি ঝুঁকে আছে। আবার তরুণদের বড় একটা অংশ তাবলিগের একনিষ্ঠ অনুসারিও। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহসিন ও তার সহপাঠীরা। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী ইমরান, শান্তসহ সাতজনের একটি গ্রুপ সময় পেলেই তিন দিনের জামাতে বের হয়ে পড়ে। অন্য সহপাঠীদেরও দ্বীনের পথে ভেড়াতে চেষ্টা করেন তারা। তাদের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের বারান্দায়।

‘তরুণদের নিয়ে তাবলিগ জামাতের ভাবনা কী’- জানতে চাইলে তাহসিন বলেন, ‘সত্যি বলতে তরুণদের নিয়ে তাবলিগ জামাত আলাদা করে ভাবে না বললেই চলে। এটা খুবই দুঃখজনক’- বলল ইমরান। ভিন্ন মত জানাল শান্ত। তার মতে, ‘তাবলিগ জামাত তরুণদের নিয়ে ভাবে। তাই তো তাবলিগ বৃক্ষে আগের চেয়ে এখন তরুণ ফুলই বেশি ফোটে।’

ফিরে আসি ফারদিন এহসানের কাছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ফারদিন বলল, ‘তাবলিগের নায়ে তরুণদের ভেড়াতে হলে আরও বেশি কৌশলী ও যুগোপযোগী হতে হবে এ দাওয়াতি কাফেলাকে। তরুণরা এখন প্রযুক্তিমুখী। কিশোর-তরুণদের বড় একটা অংশ ক্লাস-কোচিং-প্রাইভেটের সমুদ্রে ডুবে থাকে। বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচয় বলতে ফেসবুক-ইন্টারনেটই তাদের একমাত্র ভরসা। ইন্টারনেট ছাড়া তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ভিন্ন কোনো মাধ্যম নেই। প্রযুক্তির দুনিয়ায় এমন তরুণদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। তাই তাবলিগের কর্ণধাররা যদি এখনই প্রযুক্তিনির্ভর দাওয়াতে এগিয়ে না আসেন তবে তাবলিগ বৃক্ষে তরুণ ফুল দিন দিন অদৃশ্য হয়ে পড়বে এটাই নির্মম সত্য।’

কথার এই পর্যায়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন একই ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী আবুল খায়ের। ফারদিন বলল, ‘পরিচয় হোন। ও আবুল খায়ের। আমরা এক সঙ্গেই পড়ি।’ চায়ের অর্ডার দিয়ে ফারদিন জানাল, ‘আবুল খায়ের এক চিল্লার সাথী।’

মুখভর্তি দাড়ি। মাথায় টুপি। গায়ে কালো পাঞ্জাবি। মিষ্টি হেসে আমার দিকে তাকাল আবুল খায়ের। ফারদিনের কথায় বোধ হয় কিছুটা লজ্জা পেয়েছে ও। অনেকটা কৈফিয়তের সুরে বলল, ‘চেষ্টা করি দ্বীনের পথে চলতে। বন্ধুদেরও দ্বীনের কথা বলি। আসলে সব সম্ভব হয়েছে তাবলিগের সঙ্গে থাকার কারণে। নয় তো অন্য তরুণদের মতো আমিও হারিয়ে যেতাম মাদক বা বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডের ভয়ঙ্কর জগতে।’

প্রশ্ন করলাম, ‘তরুণদের কাছে দাওয়াত উপস্থাপনে তাবলিগ কতটা কৌশলী হতে পেরেছে?’ প্রশ্ন শুনে আগাগোড়া দেখে নিলেন আমাকে। কিছু একটা আঁচ করার চেষ্টা করছেন হয়তো। বললেন, ‘পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘উদউ ইলা সাবিলি রাব্বিকা বিল হিকমাতি ওয়াল মাওয়িজাহ। ডাকো আল্লাহর পথে। প্রযুক্তি ও চমকপ্রদ কৌশলের মাধ্যমে।’ আমরা দেখেছি রাসূল (সা.) দাওয়াতের ক্ষেত্রে সমসাময়িক সব প্রযুক্তি ও জনপ্রিয় কৌশল ব্যবহার করেছেন। তিনি তরুণদের আড্ডায়-মেলায় এমনকি মূর্তিপূজার আসরে গিয়েও তাবলিগ করেছেন। একটি বইতে পড়েছি, রাসূল (সা.) দাওয়াতের জন্য তখনকার শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি সাহিত্যকে ব্যবহার করেছেন বেশি।’ ‘কোরআন পুরোটাই তো আগাগোড়া সাহিত্য’- যোগ করলাম আমি।

টি-স্টল থেকে উঠে আরেকটু সামনে এগিয়ে যাই আমরা। আবুল খায়ের বলতে শুরু করল- ‘তো আমাদেরও প্রযুক্তির হাত ধরেই দাওয়াতের মেহনত এগিয়ে নিতে হবে। আফসোস! এখনও আমরা প্রযুক্তির গুরুত্ব বুঝতে পারিনি।’ ফারদিন বলল, ‘তাবলিগে যে বৈচিত্র্য আনা দরকার তা হল, তারা দাওয়াতের ক্ষেত্রে একই ভাষা ও বিষয় সবার জন্য প্রয়োগ করেন। এই যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট, আমাকে যে কথাগুলো বলে দাওয়াত দেয়া হয়, একজন রিকশাওয়ালাকেও একই কথা বলে দাওয়াত দেন তারা। পদ্ধতির মধ্যে কোনো বৈচিত্র্য নেই। আমি যতটুকু জানি, নবীজীর সিস্টেমের মধ্যে ভ্যারিয়েশন ছিল। নয়তো কীভাবে তিনি বিলালের মতো ক্রীতদাসকে বশ করলেন, আবার ওমরের মতো জ্ঞানীকে হাত করলেন। বৈচিত্র্য না থাকলে এটা সম্ভব হতো না।’

ফারদিনের সঙ্গে একমত প্রতিবেদক নিজেও। কোরআন দাওয়াতের ক্ষেত্রে বারবার বৈচিত্র্যময় ঢং ব্যবহার করেছে। রাসূল (সা.) নিজেও মানুষ বুঝে দাওয়াতের ভাষায় ও আচরণে ভিন্নতা এনেছেন। সময়কে বুঝে যুগোপযোগী পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন দাওয়াতের মেহনতে। তাই তাবলিগ জামাতসহ সব দাওয়াতি কাফেলাকেই যুগোপযোগী পদ্ধতি বেছে নিতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য! প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এখন পর্যন্ত তাবলিগ জামাতের বার্ষিক মিলনমেলা বিশ্ব ইজতেমায় প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি। সেখানে নেই কোনো অডিও-ভিডিও কিংবা লাইভ সম্প্রচারের ব্যবস্থা। সাংবাদিকদের ছবি তুলতে হয় আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে। অনেক জায়গায় প্রবেশ করতে পারে না তারা। হায়! প্রযুক্তিময় গ্রন্থ কোরআনের দাওয়াতি কাফেলা তাবলিগ ও বিশ্ব ইজতেমা আর কত পিছিয়ে থাকবে প্রযুক্তি থেকে? সময় সাধক মুহাম্মাদ (সা.) এর দ্বীনি কাফেলা কবে সময়কে ধরে এগিয়ে যাবে সময়েরও আগে? সেই আশায় দিন গুনছে তাবলিগ প্রেমিক যুব মন।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

E-mail : [email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter