বঙ্গবন্ধুকে শহিদের ঐতিহাসিক ফতোয়া দিয়েছিলেন মুফতি নূরুল্লাহ
jugantor
বঙ্গবন্ধুকে শহিদের ঐতিহাসিক ফতোয়া দিয়েছিলেন মুফতি নূরুল্লাহ

  তানজিল আমির  

১২ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট! ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞের কালো অধ্যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের এ দিন নৃশংসভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ১৮ জনকে এই পৃথিবীথেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে পাষণ্ড ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশু রাসেল, শিশু বাবু, এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারীও।

ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বঙ্গবন্ধুর নামটিও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধুর লাশের প্রতিও দেখিয়েছে অমানবিক আচরণ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর সাধারণ মানুষ, দলের নেতা, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী- কাউকেই তার লাশের কাছে ভিড়তে দেয়নি ঘাতকরা।

১৫ আগস্ট ভোরে নির্মমভাবে হত্যার পর প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরেই পড়ে ছিল বাংলার মহানয়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মরদেহ।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার সময় তৎকালীন সরকার ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল অনেকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা ওই হত্যাকাণ্ডপরবর্তী সময়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে সম্পূর্ণ নীরব থেকেছেন। অথচ এক সময় তারাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠজন।

দেশ ও জাতির এমন দুঃসময়ে যে কয়েকজন নিজের জীবন বাজি রেখে ইতিহাসের নৃশংসতম এ হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রয়াত মুফতি নূরুল্লাহ ছিলেন তাদের অন্যতম।

যেদিন রাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল তার পরের দিনটি ছিল শুক্রবার। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুছিয়ার প্রিন্সিপাল, মুফতিয়ে আযম আল্লামা মুফতি নূরুল্লাহ জেলা জামে মসজিদে জুমার খুতবায় এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছিলেন। তার কথায় সেদিন যেন আগুন ঠিকরে পড়ছিল।

তিনিই প্রথম সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুকে শহিদি মৃত্যু হিসাবে ঐতিহাসিক ফতোয়া দেন। তাদের শহিদ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।

মুফতি নূরুল্লাহর ছোট ছেলে ফার্মগেট কৃষি ল্যাবরেটরি জামে মসজিদের খতিব মুফতি নুসরাতুল্লাহ নূর সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মুফতি নূরুল্লাহ সাহেব জুমার খুতবার আগে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর কেউ তার ব্যাপারে কথা বলছে না, কিন্তু আমি এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, কুরআন-হাদিসের দলিল অনুযায়ী এ মানুষটি মুমিন-মুসলমান। তার জন্য কেউ দোয়া না করলেও আমি করব।’

সেদিন সেই জুমাপূর্ব বয়ানে শাহাদতের পক্ষে দলিল দিয়ে মুফতিয়ে আযম (র.) বলেছিলেন, ‘আমার ধারণামতে তিনি (বঙ্গবন্ধু) মজলুম এবং শহিদ। তিনি এটার দলিল দিয়েছিলেন তিনটি। ১৫ আগস্টে যখন বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন, সেটা ছিল জুমার রাত (বৃহস্পতিবার দিবাগত)। জুমার রাতে মারা যাওয়ায় এটাও বঙ্গবন্ধুর শাহাদতের একটা কারণ। দুই নম্বর ব্যাপার হলো, তিনি ঘুমন্ত ছিলেন। এটাও শহিদের একটি প্রকার। ঘুমন্ত অবস্থায় যাকে মারা হয় তাকে ইসলামে শহিদ বলে গণ্য করা হয়। তিন নম্বর বঙ্গবন্ধু আততায়ীর হাতে মারা গেছেন, সে হিসাবেও তিনি শহিদ। তার ঘরের ভেতরে আক্রমণ করে মারা হয়েছে।’

১৯৭৫ সালের সে জুমায় মুফতি নূরুল্লাহর বড় ছেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামে মসজিদের সাবেক খতিব মুফতি কেফায়েত উল্লাহ সরাসরি উপস্থিত থেকে এসব কথা শুনেছিলেন। ২০২০ সালের মার্চে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সে জুমায় উপস্থিত ছিলাম। আমরাও এ কথার ওপর এখনো আছি। আমরা মরহুম শেখ মুজিবকে শহিদ মনে করি।’

মুফতি নুসরাতুল্লাহ নূর জানান, ১৫ আগস্টের সেই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করে মুফতি নূরুল্লাহ জুমার খুতবায় আরও বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু থাকতে অনেকে অনেক কথাই বলেছেন। এখন তার হত্যার পর কেউ কোনো কথা বলছেন না। কিন্তু দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, আমি দলমত বুঝি না। আমি বুঝি কুরআন-হাদিস’।

এ কথা বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মসজিদে উপস্থিত মুসল্লিদের নিয়ে বিশাল দোয়া ও মোনাজাত করেছিলেন। আজো সে দিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা জীবিত আছেন। সেদিনের সেই দুর্বিষহ অবস্থায় মুফতিয়ে আযম মুফতি নূরুল্লাহ (র.)-এর সাহসিকতার কথা তারা সশ্রদ্ধে স্মরণ করেন।

তরুণ প্রজন্মের এ আলেম বলেন, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু বন্দনায় অন্যদের পাশাপশি আলেম সমাজের অনেকেও প্রবন্ধ-নিবন্ধে বা সভা-সেমিনার খুব সরব ভূমিকায় থাকেন। তবে তখনকার পরিস্থিতিতে কাজটি এত সহজ ছিল না। কেননা ঘাতকগোষ্ঠী দেশের সবকিছু পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর আশপাশের লোকজনও যে যার মতো আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। সে পরিস্থিতিতে মুফতিয়ে আযম মুফতি নূরুল্লাহ (র.) জাগতিক স্বার্থের কথা চিন্তা না করে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিলেন। কারণ ওলি-আল্লাহরা আল্লাহর শক্তিতে বলবান হয়ে কাজ করেন। তারা কে কি ভাবল সেদিকে না তাকিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য বলে যান।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুফতি নূরুল্লাহ (র.)-এর সাহসিকতার আরেকটি তথ্য জানিয়ে তার ছেলে বলেন, সংগ্রামের বছর শ্রীপুরের রাইফেলধারী এক রাজাকারকে জিনা-ব্যভিচার থেকে তওবা করতে বলা হয়েছিল। সেই জালেম বলেছিল একটি দেশ রক্ষা করতে হলে দু-চারটা জিনার অনুমতি দিতেই হয়। (নাউজুবিল্লাহ!) একদিকে মৃত্যু, রাইফেল আর স্বজনদের ভালোবাসা। অপরদিকে আল্লাহর বিধান সমুন্নত রাখার মহান দায়িত্ব! মুফতিয়ে আযম (র.) মৃত্যু, রাইফেল আর স্বজনদের ভালোবাসার চিন্তা উপেক্ষা করে সে রাজাকারকে হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘তবে তোর বউ-শ্বাশুড়ি আর মা-বোনকে দিয়ে দে, পবিত্র নারীদের পিছু ছেড়ে দে..।’

কিন্তু হতাশার কথা হলো-খোদাপ্রেমে উজ্জীবিত, স্বাধীনতার পক্ষের এ আলেমের এসব সাহসী কীর্তির কথা এ প্রজন্ম জানেন না। এসব ইতিহাস জানানোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এত বছরে।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মুফতি নুসরাতুল্লাহ নূর বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা হলেও এত বছরে আলেমদের কীর্তির বিষয়গুলো এখনো সেভাবে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। অথচ অপশক্তির বিরুদ্ধে সে সময় তাদের অবস্থান নেওয়াটা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। জীবনের মায়া ও সামাজিক হুমকি উপেক্ষা করেই তারা সাহস করে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথা বলেছিলেন। তাদের এসব ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মকে জানাতে হবে। অন্যথায় এমন আচরণ হবে তাদের প্রতি অকৃজ্ঞতা। মুফতি নূরুল্লাহ সাহেবের এসব সাহসী কর্মকাণ্ডের কথা জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করলে জাতি হিসাবে আমরাই উপকৃত হব।

উল্লেখ্য, যুগশ্রেষ্ঠ আলেম মুফতি নূরুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুছিয়ার প্রিন্সিপাল, প্রধান মুফতি ও শায়খুল হাদিস ছিলেন। দেশের বর্তমান শীর্ষ শ্রেণির আলেমদের মধ্যে অনেকেই তার শাগরেদ। বহু ইসলামি পণ্ডিত আলেম তৈরি করে গেছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব হিসাবে দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজন শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। ইসলাম, মানবতা, দেশ ও জাতির সেবায় নিঃস্বার্থ কাজ করে যাওয়াই ছিল তার জীবনের সাধনা। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন।

লেখক: তরুণ আলেম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

tanjilamir95@gmail.com

বঙ্গবন্ধুকে শহিদের ঐতিহাসিক ফতোয়া দিয়েছিলেন মুফতি নূরুল্লাহ

 তানজিল আমির 
১২ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট! ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞের কালো অধ্যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের এ দিন নৃশংসভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ১৮ জনকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে পাষণ্ড ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশু রাসেল, শিশু বাবু, এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারীও।

ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বঙ্গবন্ধুর নামটিও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধুর লাশের প্রতিও দেখিয়েছে অমানবিক আচরণ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর সাধারণ মানুষ, দলের নেতা, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী- কাউকেই তার লাশের কাছে ভিড়তে দেয়নি ঘাতকরা।

১৫ আগস্ট ভোরে নির্মমভাবে হত্যার পর প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরেই পড়ে ছিল বাংলার মহানয়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মরদেহ।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার সময় তৎকালীন সরকার ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল অনেকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা ওই হত্যাকাণ্ডপরবর্তী সময়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে সম্পূর্ণ নীরব থেকেছেন। অথচ এক সময় তারাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠজন।

দেশ ও জাতির এমন দুঃসময়ে যে কয়েকজন নিজের জীবন বাজি রেখে ইতিহাসের নৃশংসতম এ হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রয়াত মুফতি নূরুল্লাহ ছিলেন তাদের অন্যতম।

যেদিন রাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল তার পরের দিনটি ছিল শুক্রবার। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুছিয়ার প্রিন্সিপাল, মুফতিয়ে আযম আল্লামা মুফতি নূরুল্লাহ জেলা জামে মসজিদে জুমার খুতবায় এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছিলেন। তার কথায় সেদিন যেন আগুন ঠিকরে পড়ছিল।

তিনিই প্রথম সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুকে শহিদি মৃত্যু হিসাবে ঐতিহাসিক ফতোয়া দেন। তাদের শহিদ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।

মুফতি নূরুল্লাহর ছোট ছেলে ফার্মগেট কৃষি ল্যাবরেটরি জামে মসজিদের খতিব মুফতি নুসরাতুল্লাহ নূর সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মুফতি নূরুল্লাহ সাহেব জুমার খুতবার আগে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর কেউ তার ব্যাপারে কথা বলছে না, কিন্তু আমি এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, কুরআন-হাদিসের দলিল অনুযায়ী এ মানুষটি মুমিন-মুসলমান। তার জন্য কেউ দোয়া না করলেও আমি করব।’

সেদিন সেই জুমাপূর্ব বয়ানে শাহাদতের পক্ষে দলিল দিয়ে মুফতিয়ে আযম (র.) বলেছিলেন, ‘আমার ধারণামতে তিনি (বঙ্গবন্ধু) মজলুম এবং শহিদ। তিনি এটার দলিল দিয়েছিলেন তিনটি। ১৫ আগস্টে যখন বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন, সেটা ছিল জুমার রাত (বৃহস্পতিবার দিবাগত)। জুমার রাতে মারা যাওয়ায় এটাও বঙ্গবন্ধুর শাহাদতের একটা কারণ। দুই নম্বর ব্যাপার হলো, তিনি ঘুমন্ত ছিলেন। এটাও শহিদের একটি প্রকার। ঘুমন্ত অবস্থায় যাকে মারা হয় তাকে ইসলামে শহিদ বলে গণ্য করা হয়। তিন নম্বর বঙ্গবন্ধু আততায়ীর হাতে মারা গেছেন, সে হিসাবেও তিনি শহিদ। তার ঘরের ভেতরে আক্রমণ করে মারা হয়েছে।’

১৯৭৫ সালের সে জুমায় মুফতি নূরুল্লাহর বড় ছেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামে মসজিদের সাবেক খতিব মুফতি কেফায়েত উল্লাহ সরাসরি উপস্থিত থেকে এসব কথা শুনেছিলেন। ২০২০ সালের মার্চে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সে জুমায় উপস্থিত ছিলাম। আমরাও এ কথার ওপর এখনো আছি। আমরা মরহুম শেখ মুজিবকে শহিদ মনে করি।’

মুফতি নুসরাতুল্লাহ নূর জানান, ১৫ আগস্টের সেই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করে মুফতি নূরুল্লাহ জুমার খুতবায় আরও বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু থাকতে অনেকে অনেক কথাই বলেছেন। এখন তার হত্যার পর কেউ কোনো কথা বলছেন না। কিন্তু দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, আমি দলমত বুঝি না। আমি বুঝি কুরআন-হাদিস’।

এ কথা বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মসজিদে উপস্থিত মুসল্লিদের নিয়ে বিশাল দোয়া ও মোনাজাত করেছিলেন। আজো সে দিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা জীবিত আছেন। সেদিনের সেই দুর্বিষহ অবস্থায় মুফতিয়ে আযম মুফতি নূরুল্লাহ (র.)-এর সাহসিকতার কথা তারা সশ্রদ্ধে স্মরণ করেন।

তরুণ প্রজন্মের এ আলেম বলেন, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু বন্দনায় অন্যদের পাশাপশি আলেম সমাজের অনেকেও প্রবন্ধ-নিবন্ধে বা সভা-সেমিনার খুব সরব ভূমিকায় থাকেন। তবে তখনকার পরিস্থিতিতে কাজটি এত সহজ ছিল না। কেননা ঘাতকগোষ্ঠী দেশের সবকিছু পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর আশপাশের লোকজনও যে যার মতো আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল। সে পরিস্থিতিতে মুফতিয়ে আযম মুফতি নূরুল্লাহ (র.) জাগতিক স্বার্থের কথা চিন্তা না করে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিলেন। কারণ ওলি-আল্লাহরা আল্লাহর শক্তিতে বলবান হয়ে কাজ করেন। তারা কে কি ভাবল সেদিকে না তাকিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য বলে যান।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুফতি নূরুল্লাহ (র.)-এর সাহসিকতার আরেকটি তথ্য জানিয়ে তার ছেলে বলেন, সংগ্রামের বছর শ্রীপুরের রাইফেলধারী এক রাজাকারকে জিনা-ব্যভিচার থেকে তওবা করতে বলা হয়েছিল। সেই জালেম বলেছিল একটি দেশ রক্ষা করতে হলে দু-চারটা জিনার অনুমতি দিতেই হয়। (নাউজুবিল্লাহ!) একদিকে মৃত্যু, রাইফেল আর স্বজনদের ভালোবাসা। অপরদিকে আল্লাহর বিধান সমুন্নত রাখার মহান দায়িত্ব! মুফতিয়ে আযম (র.) মৃত্যু, রাইফেল আর স্বজনদের ভালোবাসার চিন্তা উপেক্ষা করে সে রাজাকারকে হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘তবে তোর বউ-শ্বাশুড়ি আর মা-বোনকে দিয়ে দে, পবিত্র নারীদের পিছু ছেড়ে দে..।’

কিন্তু হতাশার কথা হলো-খোদাপ্রেমে উজ্জীবিত, স্বাধীনতার পক্ষের এ আলেমের এসব সাহসী কীর্তির কথা এ প্রজন্ম জানেন না। এসব ইতিহাস জানানোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এত বছরে।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মুফতি নুসরাতুল্লাহ নূর বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা হলেও এত বছরে আলেমদের কীর্তির বিষয়গুলো এখনো সেভাবে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। অথচ অপশক্তির বিরুদ্ধে সে সময় তাদের অবস্থান নেওয়াটা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। জীবনের মায়া ও সামাজিক হুমকি উপেক্ষা করেই তারা সাহস করে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কথা বলেছিলেন। তাদের এসব ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মকে জানাতে হবে। অন্যথায় এমন আচরণ হবে তাদের প্রতি অকৃজ্ঞতা। মুফতি নূরুল্লাহ সাহেবের এসব সাহসী কর্মকাণ্ডের কথা জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করলে জাতি হিসাবে আমরাই উপকৃত হব।

উল্লেখ্য, যুগশ্রেষ্ঠ আলেম মুফতি নূরুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুছিয়ার প্রিন্সিপাল, প্রধান মুফতি ও শায়খুল হাদিস ছিলেন। দেশের বর্তমান শীর্ষ শ্রেণির আলেমদের মধ্যে অনেকেই তার শাগরেদ। বহু ইসলামি পণ্ডিত আলেম তৈরি করে গেছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব হিসাবে দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজন শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। ইসলাম, মানবতা, দেশ ও জাতির সেবায় নিঃস্বার্থ কাজ করে যাওয়াই ছিল তার জীবনের সাধনা। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন।

লেখক: তরুণ আলেম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

tanjilamir95@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন