‘যৌবনের মূল্যায়ন কর বার্ধক্যের আগে’
jugantor
‘যৌবনের মূল্যায়ন কর বার্ধক্যের আগে’

  ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ  

১২ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ আন্তর্জাতিক যুব দিবস। বিশ্বব্যাপী তরুণ ও যুবদের সমৃদ্ধ নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক যুব দিবসের উদ্দেশ্য। মুসলিম যুবকদের জন্য দিবসটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নেতৃত্বে বিশ্বময় ইসলামের যে বার্তা ছড়িয়েছে-তার প্রাণশক্তি ছিলেন যুবসমাজ।

যুবকরা জাতির গৌরব ও ভবিষ্যৎ আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। যুবক প্রতিটি জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির সোপান, জাতির মূল্যবান সম্পদ এবং দেশ গড়ার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। ইসলাম এ সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। যুবকদের নৈতিকতার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, পরিশীলিত মনন ও বলিষ্ঠ চিন্তাধারায় সমৃদ্ধকরণে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

আদর্শ যুবসমাজ গঠনে মহানবি (সা.)-এর সফল ভূমিকা ও সুনিপুণ কর্মধারা অনুসরণ বিকল্প নেই। কারণ মানব ইতিহাসে তিনিই সর্বোত্তম ও অতুলনীয় যুবসমাজ উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। তারই পবিত্র স্পর্শে পৃথিবী পেয়েছে আম্মার ইবনে ইয়াসার, মাসআব ইবনে উমাইর, উসামা ইবনে যায়েদ এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর মতো কলজয়ী মহামানবদের সন্ধান।

এসব নিষ্ঠাবান তারুণ্যের তেজে পালটে গেছে ইতিহাসের গতিধারা, ধুলোয় মিশে গেছে বাতিলের রাজমুকুট, জুলুম ও অত্যাচারের আঁধার দূরীভূত হয়ে পৃথিবীব্যাপী বয়ে গেছে ইনসাফ ও ন্যায়ের ফল্গ–ধারা এবং উন্মোচিত হয়েছে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের নবদিগন্ত। আর পবিত্র কুরআন, সহিহ হাদিস ও ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে।

এ পৃথিবীতে মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহের ধারাকে মোটামুটি তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য। এ তিনকালের মধ্যে সব বিবেচনায় যৌবনকাল হলো-শ্রেষ্ঠ সময়। শৈশবে মানুষ থাকে অসহায় ও পরনির্ভর। পিতা-মাতা ও অন্যের সহযোগিতা ছাড়া সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং এ সময় তার কোনো চিন্তার সুষ্ঠু বিকাশ ঘটে না। অনুরূপভাবে বার্ধক্যেও সে অসহায় দুর্বল ও পরনির্ভর হয়ে পড়ে।

মনের ইচ্ছা থাকলেও সেসব কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারে না। এমনকি চিন্তাশক্তির বিলোপ পর্যন্ত ঘটে থাকে। কিন্তু যৌবনকাল এ দুয়ের ব্যতিক্রম। যৌবনকালে মানুষ অসাধ্য সাধনে আত্মনিয়োগ করতে পারে। এটাই যৌবনের ধর্ম।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) যৌবনকালকে গণিমতের মাল তথা মূল্যবান সম্পদ হিসাবে উল্লেখ করে তা মূল্যায়ন করার তাগিদ দিয়েছেন। কেননা এ সময় সম্পর্কে পরকালে জবাবদিহিতা করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, আমর ইবনু মায়মুন আল আওদি (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) জনৈক ব্যক্তিকে উপদেশস্বরূপ বলেন, পাঁচটি বস্তুর আগে পাঁচটি বস্তুকে গণিমত মনে করো। যথা-১. তোমার বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকে, ২. পীড়িত হওয়ার আগে সুস্বাস্থ্যকে, ৩. দরিদ্র্যতার আগে সচ্ছলতাকে, ৪. ব্যস্ততার আগে অবসরকে ও ৫. মৃত্যুর আগে জীবনকে।’ (তিরমিজি)

ইসলাম মানবজীবনের সবচেয়ে বেশি মূল্যবান সময় নির্ধারণ করেছে যৌবনকালকে।

প্রতিটি মানুষের যৌবনকাল হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বনি আদমই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে এক কদম আগে বা পিছে নড়ার অনুমতি পাবে না। এর মধ্যে প্রথম প্রশ্ন হবে তার জীবন সম্পর্কে, কোথায় সে এটি ব্যয় করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হবে তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কী কাজে সে যৌবনকাল নষ্ট করেছে। তৃতীয় প্রশ্ন-সম্পদ কীভাবে উপার্জন করা হয়েছে। চতুর্থ প্রশ্ন-উপার্জিত সম্পদ কোনো কাজে এবং কোথায় ব্যয় করেছে। পঞ্চম ও শেষ প্রশ্ন যেসব বিষয়ে সে জ্ঞানার্জন করেছিল তার কতটুকু আমল করেছে।’ (সহিহ বোখারি)।

ইতিহাস সাক্ষী, খোদাভীর যুবকদের দ্বারা পৃথিবী উপকৃত হয়েছে এবং পৃথিবীতে উত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার পথভ্রষ্ট যুবকদের দ্বারা পৃথিবীর বহু সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। মহানবি হজরত মুহাম্মাদ (সা.) খোদাভীরু যুবকদের নিয়ে বদর, ওহুদ, খন্দক ও তাবুকসহ অন্যান্য যুদ্ধে বিজয়লাভ করেছেন।

পরিশেষে বলতে চাই, ইসলাম যেখানে যৌবনকালকে এত গুরুত্ব দিয়েছে, মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যৌবনকালকে ভালো কাজে ব্যয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে, সেখানে আমাদের দেশে অপশক্তিগুলো তরুণদের নেশা, সন্ত্রাস অপকর্মের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আল্লাহর দেওয়া পবিত্র আমানত যৌবনের প্রতিটি ধাপ, মেধা, শ্রম ও প্রতি ফোঁটা রক্ত মানুষ সত্যিকার অর্থে আল্লাহর পথে ব্যয় করলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কল্যাণে ভরে যাবে এবং পরকালের ভয়াবহ দিনে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভের সৌভাগ্য অর্জন করবে। যেদিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। অন্যথায় জাহান্নামের লেলিহান শিখায় অগ্নিদগ্ধ হতে হবে।

‘যৌবনের মূল্যায়ন কর বার্ধক্যের আগে’

 ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ 
১২ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ আন্তর্জাতিক যুব দিবস। বিশ্বব্যাপী তরুণ ও যুবদের সমৃদ্ধ নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক যুব দিবসের উদ্দেশ্য। মুসলিম যুবকদের জন্য দিবসটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নেতৃত্বে বিশ্বময় ইসলামের যে বার্তা ছড়িয়েছে-তার প্রাণশক্তি ছিলেন যুবসমাজ।

যুবকরা জাতির গৌরব ও ভবিষ্যৎ আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। যুবক প্রতিটি জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির সোপান, জাতির মূল্যবান সম্পদ এবং দেশ গড়ার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। ইসলাম এ সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। যুবকদের নৈতিকতার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, পরিশীলিত মনন ও বলিষ্ঠ চিন্তাধারায় সমৃদ্ধকরণে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

আদর্শ যুবসমাজ গঠনে মহানবি (সা.)-এর সফল ভূমিকা ও সুনিপুণ কর্মধারা অনুসরণ বিকল্প নেই। কারণ মানব ইতিহাসে তিনিই সর্বোত্তম ও অতুলনীয় যুবসমাজ উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। তারই পবিত্র স্পর্শে পৃথিবী পেয়েছে আম্মার ইবনে ইয়াসার, মাসআব ইবনে উমাইর, উসামা ইবনে যায়েদ এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর মতো কলজয়ী মহামানবদের সন্ধান।

এসব নিষ্ঠাবান তারুণ্যের তেজে পালটে গেছে ইতিহাসের গতিধারা, ধুলোয় মিশে গেছে বাতিলের রাজমুকুট, জুলুম ও অত্যাচারের আঁধার দূরীভূত হয়ে পৃথিবীব্যাপী বয়ে গেছে ইনসাফ ও ন্যায়ের ফল্গ–ধারা এবং উন্মোচিত হয়েছে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের নবদিগন্ত। আর পবিত্র কুরআন, সহিহ হাদিস ও ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে।

এ পৃথিবীতে মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহের ধারাকে মোটামুটি তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য। এ তিনকালের মধ্যে সব বিবেচনায় যৌবনকাল হলো-শ্রেষ্ঠ সময়। শৈশবে মানুষ থাকে অসহায় ও পরনির্ভর। পিতা-মাতা ও অন্যের সহযোগিতা ছাড়া সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং এ সময় তার কোনো চিন্তার সুষ্ঠু বিকাশ ঘটে না। অনুরূপভাবে বার্ধক্যেও সে অসহায় দুর্বল ও পরনির্ভর হয়ে পড়ে।

মনের ইচ্ছা থাকলেও সেসব কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারে না। এমনকি চিন্তাশক্তির বিলোপ পর্যন্ত ঘটে থাকে। কিন্তু যৌবনকাল এ দুয়ের ব্যতিক্রম। যৌবনকালে মানুষ অসাধ্য সাধনে আত্মনিয়োগ করতে পারে। এটাই যৌবনের ধর্ম।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) যৌবনকালকে গণিমতের মাল তথা মূল্যবান সম্পদ হিসাবে উল্লেখ করে তা মূল্যায়ন করার তাগিদ দিয়েছেন। কেননা এ সময় সম্পর্কে পরকালে জবাবদিহিতা করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, আমর ইবনু মায়মুন আল আওদি (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) জনৈক ব্যক্তিকে উপদেশস্বরূপ বলেন, পাঁচটি বস্তুর আগে পাঁচটি বস্তুকে গণিমত মনে করো। যথা-১. তোমার বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকে, ২. পীড়িত হওয়ার আগে সুস্বাস্থ্যকে, ৩. দরিদ্র্যতার আগে সচ্ছলতাকে, ৪. ব্যস্ততার আগে অবসরকে ও ৫. মৃত্যুর আগে জীবনকে।’ (তিরমিজি)

ইসলাম মানবজীবনের সবচেয়ে বেশি মূল্যবান সময় নির্ধারণ করেছে যৌবনকালকে।

প্রতিটি মানুষের যৌবনকাল হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বনি আদমই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে এক কদম আগে বা পিছে নড়ার অনুমতি পাবে না। এর মধ্যে প্রথম প্রশ্ন হবে তার জীবন সম্পর্কে, কোথায় সে এটি ব্যয় করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হবে তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কী কাজে সে যৌবনকাল নষ্ট করেছে। তৃতীয় প্রশ্ন-সম্পদ কীভাবে উপার্জন করা হয়েছে। চতুর্থ প্রশ্ন-উপার্জিত সম্পদ কোনো কাজে এবং কোথায় ব্যয় করেছে। পঞ্চম ও শেষ প্রশ্ন যেসব বিষয়ে সে জ্ঞানার্জন করেছিল তার কতটুকু আমল করেছে।’ (সহিহ বোখারি)।

ইতিহাস সাক্ষী, খোদাভীর যুবকদের দ্বারা পৃথিবী উপকৃত হয়েছে এবং পৃথিবীতে উত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার পথভ্রষ্ট যুবকদের দ্বারা পৃথিবীর বহু সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। মহানবি হজরত মুহাম্মাদ (সা.) খোদাভীরু যুবকদের নিয়ে বদর, ওহুদ, খন্দক ও তাবুকসহ অন্যান্য যুদ্ধে বিজয়লাভ করেছেন।

পরিশেষে বলতে চাই, ইসলাম যেখানে যৌবনকালকে এত গুরুত্ব দিয়েছে, মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যৌবনকালকে ভালো কাজে ব্যয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে, সেখানে আমাদের দেশে অপশক্তিগুলো তরুণদের নেশা, সন্ত্রাস অপকর্মের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আল্লাহর দেওয়া পবিত্র আমানত যৌবনের প্রতিটি ধাপ, মেধা, শ্রম ও প্রতি ফোঁটা রক্ত মানুষ সত্যিকার অর্থে আল্লাহর পথে ব্যয় করলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কল্যাণে ভরে যাবে এবং পরকালের ভয়াবহ দিনে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভের সৌভাগ্য অর্জন করবে। যেদিন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। অন্যথায় জাহান্নামের লেলিহান শিখায় অগ্নিদগ্ধ হতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন