কুচিন্তা হৃদয়কে কলুষিত করে
jugantor
কুচিন্তা হৃদয়কে কলুষিত করে

  মো. আবদুল গনী শিব্বীর  

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুচিন্তা হৃদয়কে কলুষিত করে। কুমানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি নানাবিধ পাপ কাজে শামিল হয়ে নিজের আমলনামাকে পাপরাশিতে ভরে ফেলে। পাপের অনুতাপে নিজের ব্যক্তি সত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইহকাল ও পরকালে নিজেকে পাপিষ্ঠের তকমায় কলুষিত করে। পাপের কারণে নিজের মানসম্মান নষ্ট করে জনগণের কাছে নিজেকে উপহাসের পাত্র বানায়। ঘৃণিত ব্যক্তিও তার সঙ্গে তাচ্ছিল্যের মতো অমানবিক আচরণ করে।

কুচিন্তাজনিত কারণে পাপের ময়লায় তার জীবন কয়লার মতো জ্বলতে থাকে। যার ফলে সুন্দর জীবনটা কালো ছাইয়ের মতো হয়ে যায়। মোটকথা কুচিন্তা ব্যক্তিকে কয়লার মতো জ্বালিয়ে মরার আগেই মের ফেলে।

মানবজাতির পরীক্ষিত চিরশত্রু ইবলিস। ইবলিসকে শয়তান বলা হয়, শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা বনি ইসরাইল : আয়াত-৫৩)। আল্লাহতায়ালা তাকে কিছু এমন ক্ষমতা দিয়েছেন যা অন্য কাউকে দেননি, এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘অবশ্যই শয়তান আদম সন্তানের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে।’ (সহিহ বুখারি, ১২৮৮)।

শয়তান মানুষের মনে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয়। পবিত্র কুরআন মাজিদে এ মর্মে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে। জিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে।’ (সূরা নাস : আয়াত-৫, ৬)।

ইবলিস তার মারাত্মক অস্ত্র ‘ওয়াসওয়াসা’ দিয়ে মানব হৃদয়ের রাজপ্রাসাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ইমান হরণ করে এবং মানুষকে কুপ্রবৃত্তির প্ররোচনা দেয়, কুচিন্তায় চিন্তিত ও ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মানুষ যেন দিগি¦দিক জ্ঞান হারিয়ে বিপথে চলে, কুকর্ম করে এ জন্য সে তার সব শক্তি প্রয়োগ করে বিধ্বংসী মিশন পরিচালনা করে। তার ধ্বংসাত্মক মিশনের বর্ণনা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত।

তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইবলিস (শয়তান) সমুদ্রের পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর মানুষের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য সেখান থেকে তার বাহিনী চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শয়তানই তার কাছে সর্বাধিক সম্মানিত যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশি ফিতনায় নিপতিত করতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে, আমি এরূপ এরূপ ফিতনাহ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। তখন সে (ইবলিস) প্রত্যুত্তরে বলে, তুমি কিছুই করনি।

তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর এদের অপর একজন এসে বলে, আমি মানব সন্তানকে ছেড়ে দেইনি, এমনকি দম্পতির মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করে দিয়েছি। তিনি (সা.) বলেন, শয়তান এ কথা শুনে তাকে নিকটে বসায় আর বলে, তুমিই উত্তম কাজ করেছ। বর্ণনাকারী আ’মাশ বলেন, আমার মনে হয় জাবির (রা.) এটাও বলেছেন যে, ‘অতঃপর ইবলিস তার সঙ্গে আলিঙ্গন করে’। (সহিহ মুসলিম : হাদিস-২৮১৩)।

আল্লাহর স্মরণ ব্যক্তিকে কুচিন্তা থেকে দূরে রাখে। মানুষ যখনই আল্লাহকে ভুলে যায়, তাঁর ইবাদত বন্দেগি থেকে দূরে থাকে তখন মানব মনে শয়তান ‘ওয়াসওয়াসা’ বা কুন্ত্রণা দেয়। শয়তানের কুমন্ত্রণার কারণেই মানুষ কুচিন্তা করে, কুকর্মে নিয়োজিত হয়। কুকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তির আমলনামায় পাপ লেখা হয়। যে ব্যক্তি কুচিন্তা করে তবে কুকর্মে লিপ্ত হয় না তার আমলনামায় পাপ লেখা হয় না। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের অন্তরে যেসব কুচিন্তা জাগ্রত হয় আল্লাহতায়ালা তা থেকে আমার উম্মতকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। যতক্ষণ তারা তা মুখে উচ্চারণ না করবে বা কর্মে বাস্তবায়ন না করবে’ (বুখারি ও মুসলিম)।

কুচিন্তার অভ্যাসটি মূলত শয়তানের কুমন্ত্রণার কারণে হয়। অনেক ব্যক্তি নিজেকে কুচিন্তা থেকে বাঁচাতে পারে তার ইমানের দৃঢ়তার কারণে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবিদের একদল লোক রাসূল (সা.)-এর কাছে আগমন করে জিজ্ঞেস করল, আমরা আমাদের অন্তরে কখনো কখনো এমন বিষয় অনুভব করি, যা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা আমাদের কাছে খুব কঠিন মনে হয়। রাসূল (সা.) বললেন, সত্যিই কি তোমরা এরকম পেয়ে থাক? তারা বললেন হ্যাঁ, আমরা এরকম অনুভব করে থাকি। রাসূল (সা.) বললেন, এটি তোমাদের ইমানের স্পষ্ট প্রমাণ’। (সহিহ মুসলিম)।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি (সা.)-এর কাছে একজন লোক আগমন করে বলল, আমার মনে কখনো এমন কথার উদয় হয়, যা উচ্চারণ করার চেয়ে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া আমার কাছে বেশি ভালো মনে হয়। রাসূল (সা.) বললেন, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি এ বিষয়টিকে নিছক একটি মনের ‘ওয়াস্ওয়াসা’ (কুমন্ত্রণা) হিসাবে নির্ধারণ করেছেন।’ (সুনানে আবু দাউদ)।

লেখক : মুহাদ্দিস, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদ্রাসা, সোনাপুর, সদর, নোয়াখালী

কুচিন্তা হৃদয়কে কলুষিত করে

 মো. আবদুল গনী শিব্বীর 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুচিন্তা হৃদয়কে কলুষিত করে। কুমানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি নানাবিধ পাপ কাজে শামিল হয়ে নিজের আমলনামাকে পাপরাশিতে ভরে ফেলে। পাপের অনুতাপে নিজের ব্যক্তি সত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইহকাল ও পরকালে নিজেকে পাপিষ্ঠের তকমায় কলুষিত করে। পাপের কারণে নিজের মানসম্মান নষ্ট করে জনগণের কাছে নিজেকে উপহাসের পাত্র বানায়। ঘৃণিত ব্যক্তিও তার সঙ্গে তাচ্ছিল্যের মতো অমানবিক আচরণ করে।

কুচিন্তাজনিত কারণে পাপের ময়লায় তার জীবন কয়লার মতো জ্বলতে থাকে। যার ফলে সুন্দর জীবনটা কালো ছাইয়ের মতো হয়ে যায়। মোটকথা কুচিন্তা ব্যক্তিকে কয়লার মতো জ্বালিয়ে মরার আগেই মের ফেলে।

মানবজাতির পরীক্ষিত চিরশত্রু ইবলিস। ইবলিসকে শয়তান বলা হয়, শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা বনি ইসরাইল : আয়াত-৫৩)। আল্লাহতায়ালা তাকে কিছু এমন ক্ষমতা দিয়েছেন যা অন্য কাউকে দেননি, এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘অবশ্যই শয়তান আদম সন্তানের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে।’ (সহিহ বুখারি, ১২৮৮)।

শয়তান মানুষের মনে কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয়। পবিত্র কুরআন মাজিদে এ মর্মে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে। জিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে।’ (সূরা নাস : আয়াত-৫, ৬)।

ইবলিস তার মারাত্মক অস্ত্র ‘ওয়াসওয়াসা’ দিয়ে মানব হৃদয়ের রাজপ্রাসাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ইমান হরণ করে এবং মানুষকে কুপ্রবৃত্তির প্ররোচনা দেয়, কুচিন্তায় চিন্তিত ও ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মানুষ যেন দিগি¦দিক জ্ঞান হারিয়ে বিপথে চলে, কুকর্ম করে এ জন্য সে তার সব শক্তি প্রয়োগ করে বিধ্বংসী মিশন পরিচালনা করে। তার ধ্বংসাত্মক মিশনের বর্ণনা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত।

তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইবলিস (শয়তান) সমুদ্রের পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর মানুষের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য সেখান থেকে তার বাহিনী চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শয়তানই তার কাছে সর্বাধিক সম্মানিত যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশি ফিতনায় নিপতিত করতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে, আমি এরূপ এরূপ ফিতনাহ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। তখন সে (ইবলিস) প্রত্যুত্তরে বলে, তুমি কিছুই করনি।

তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর এদের অপর একজন এসে বলে, আমি মানব সন্তানকে ছেড়ে দেইনি, এমনকি দম্পতির মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করে দিয়েছি। তিনি (সা.) বলেন, শয়তান এ কথা শুনে তাকে নিকটে বসায় আর বলে, তুমিই উত্তম কাজ করেছ। বর্ণনাকারী আ’মাশ বলেন, আমার মনে হয় জাবির (রা.) এটাও বলেছেন যে, ‘অতঃপর ইবলিস তার সঙ্গে আলিঙ্গন করে’। (সহিহ মুসলিম : হাদিস-২৮১৩)।

আল্লাহর স্মরণ ব্যক্তিকে কুচিন্তা থেকে দূরে রাখে। মানুষ যখনই আল্লাহকে ভুলে যায়, তাঁর ইবাদত বন্দেগি থেকে দূরে থাকে তখন মানব মনে শয়তান ‘ওয়াসওয়াসা’ বা কুন্ত্রণা দেয়। শয়তানের কুমন্ত্রণার কারণেই মানুষ কুচিন্তা করে, কুকর্মে নিয়োজিত হয়। কুকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তির আমলনামায় পাপ লেখা হয়। যে ব্যক্তি কুচিন্তা করে তবে কুকর্মে লিপ্ত হয় না তার আমলনামায় পাপ লেখা হয় না। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের অন্তরে যেসব কুচিন্তা জাগ্রত হয় আল্লাহতায়ালা তা থেকে আমার উম্মতকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। যতক্ষণ তারা তা মুখে উচ্চারণ না করবে বা কর্মে বাস্তবায়ন না করবে’ (বুখারি ও মুসলিম)।

কুচিন্তার অভ্যাসটি মূলত শয়তানের কুমন্ত্রণার কারণে হয়। অনেক ব্যক্তি নিজেকে কুচিন্তা থেকে বাঁচাতে পারে তার ইমানের দৃঢ়তার কারণে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবিদের একদল লোক রাসূল (সা.)-এর কাছে আগমন করে জিজ্ঞেস করল, আমরা আমাদের অন্তরে কখনো কখনো এমন বিষয় অনুভব করি, যা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা আমাদের কাছে খুব কঠিন মনে হয়। রাসূল (সা.) বললেন, সত্যিই কি তোমরা এরকম পেয়ে থাক? তারা বললেন হ্যাঁ, আমরা এরকম অনুভব করে থাকি। রাসূল (সা.) বললেন, এটি তোমাদের ইমানের স্পষ্ট প্রমাণ’। (সহিহ মুসলিম)।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি (সা.)-এর কাছে একজন লোক আগমন করে বলল, আমার মনে কখনো এমন কথার উদয় হয়, যা উচ্চারণ করার চেয়ে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া আমার কাছে বেশি ভালো মনে হয়। রাসূল (সা.) বললেন, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি এ বিষয়টিকে নিছক একটি মনের ‘ওয়াস্ওয়াসা’ (কুমন্ত্রণা) হিসাবে নির্ধারণ করেছেন।’ (সুনানে আবু দাউদ)।

লেখক : মুহাদ্দিস, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদ্রাসা, সোনাপুর, সদর, নোয়াখালী

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন