রোজার শিক্ষায় কাটুক জীবন

  মঈন চিশতী ২২ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোজার শিক্ষায় কাটুক জীবন

রোজা কেন এসেছিল? ‘লাআল্লাকুম তাত্তাক্বুন’ আল্লাহ বলেন, রোজা এসেছিল যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পার। রোজা শেষে আমাদের ভাবতে হবে আমরা এ রোজায় কতটুকু মুত্তাকি বা পরহেজগার হতে পেরেছি।

পরহেজগারি শুধু তাসবিহ্-তাহ্লিল নিয়ে ব্যস্ত থাকা নয়। পরহেজগারি হৃদয়ের মণিকোঠায় থাকা খোদাভীতি আর রাসূল (সা.) প্রীতির নাম। যা মানবিক আচরণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। জীবে দয়া প্রতিবেশীর হক পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব এগুলো মানবিক আচরণের মধ্যে গণ্য।

নবীজি (সা.) সাহাবিদের এক আবেদা মহিলার কাহিনী শোনান, যিনি দিনে রোজা রাখতেন আর রাতে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কিন্তু তার বিড়ালকে অনাহারে রাখার কারণে আল্লাহ তার জাহান্নামের ফায়সালা দেন।

আরেক বাজারি মহিলা পিপাসার্ত কুকুরের তৃষ্ণা নিবারণের কারণে আল্লাহ তাকে জান্নাতের ফায়সালা দেন। রোজা শেষে আমাদের ভাবতে হবে রোজার যে প্রশিক্ষণ আমরা সারা মাসে নিয়েছি তা যেন বাকি ১১ মাস কাজে লাগাতে পারি। নতুবা সব বেকার। দরবারে ইলাহিতে না থাকবে সিয়ামুন নাহার দিনে রোজা কিয়ামুল লাইল রাতের নামাজের কোনো মূল্য।

একদা মসজিদে নববীতে এক সাহাবি প্রবেশ করামাত্র নবীজি (সা.) ফরমান এইমাত্র একজন জান্নাতি লোক আমাদের সঙ্গে শামিল হল। পরপর তিন দিন নবীজি তার বেলায় একই উক্তি করলে এক যুবক তার ব্যক্তিগত আমলের খোঁজ নেয়ার জন্য তার মেহমান হয়ে তার বাড়ি গেল, তিনি গভীর রাতে যে আমল করেন তা নিজে করে সেও যেন জান্নাতি হতে পারে।

বাড়িতে গিয়ে ওই লোক ঘুমিয়ে যান। ফজরের আজান হলে মসজিদে এসে নামাজ পড়ে কাজে বেরিয়ে পড়েন। যুবক আশ্চর্য হয়ে বলে আপনাকে তো এই ফরজ ওয়াজিবের বাইরে কোনো নতুন আমল ইবাদত বন্দেগি তাসবিহ্-তাহ্লিলে দেখলাম না অথচ নবীজি (সা.) আপনার জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন।

সাহাবি বলেন, আমি শ্রমিক মানুষ, সারা দিন পরিশ্রম করে পরিবারের আহার জোগাই নফলের সুযোগ আমার তেমন নেই। তবে আমি অন্যের হক নষ্ট করি না কাউকে কষ্ট দেই না। যখন রাতে বিছানায় যাই অনিচ্ছাকৃত কসুর হতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে ঘুমিয়ে যাই। এই হল আমার প্রতিদিনের রুটিন।

হয়তো আল্লাহ এবং তার রাসূলের কাছে এ কাজ পছন্দনীয় তাই তিনি তা বলেছেন। যুবক বলেন, আল্লাহর কসম করে বলছি আপনি সত্যি বলেছেন। আল্লাহর বন্ধু নবীজি (সা.) বলেছেন ‘আল কাসিবু হাবীবুল্লাহ শ্রমজীবীরা আল্লাহর বন্ধু’। বন্ধু কী বন্ধুকে জাহান্নামে দিতে পারে?

রোজা আসলে কী? শরিয়তের ভাষায় সুবেহ্ সাদেক থেকে বেলা ডোবা পর্যন্ত পানাহার যৌনাচার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। রোজার আধুনিক নাম অটোফেজি। অটোফেজি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ অটো এবং ফাজেইন থেকে। বাংলায় এর অর্থ হচ্ছে আত্মভক্ষণ বা নিজেকে খেয়ে ফেলা।

রোজার সময় আমাদের শরীরের সক্রিয় কোষগুলো চুপচাপ বসে না থেকে সারা বছরে তৈরি হওয়া ক্ষতিকারক আর নিষ্ক্রিয় কোষগুলোকে খেয়ে ফেলে শরীরকে নিরাপদ আর পরিষ্কার করে দেয়। এটাই ‘অটোফেজি’।

রোজার ওপর গবেষণা করে জাপানি গবেষক ইয়োশিনোরি ওহশোমি ২০১৬ সালে ‘অটোফেজি’ আবিষ্কার করে নোবেল পেয়েছেন। অটোফেজি আবিষ্কারের পর থেকে স্বাস্থ্য সচেতন পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের বা ধর্ম মানে না এমন অনেক মানুষ সারা বছরে বিভিন্ন সময় অটোফেজি করে শরীরটাকে সুস্থ রাখেন। অটোফেজিতে ক্যান্সারের জীবণুও মারা যায়। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেল। আল্লাহ বলেছেন কামা কুতিবা আলাল্লাজিনা মিন ক্বাবলিকুম, যেমন রোজা তোমাদের আগের লোকদের বেলায়ও ফরজ ছিল। অনেকে বলেন, তোমাকে অভুক্ত রেখে আল্লাহ খুশি হয় কী করে? রোজার মাধ্যমে ‘অটোফেজি’ করিয়ে আমাকে আল্লাহ সুস্থ রাখছেন, আমি সুস্থ থাকলে আল্লাহ খুশি থাকবেন এটাই স্বাভাবিক।

অটোফেজি আবিষ্কার হল ২০১৬ সালে। এরপর অনেক অমুসলিমরা স্বাস্থ্য রক্ষায় তা করছে। আর মুসলিমরা ‘অটোফেজি’ করে আসছে হাজার বছর ধরে কিছু না জেনে শুধু বিশ্বাস করে। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। এই জন্য শুধু রমজানের রোজা নয় সুফি সাধক পরহেজগার ব্যক্তিগণ ‘আইয়াম বিজ’ প্রতি চান্দ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনটি রোজা রাখেন।

আর নবীজি (সা.) তো প্রতি সোমবারে রোজা রাখতেন বলে হাদিসে প্রমাণিত। সুতরাং ত্রিশ দিনের রোজার সঙ্গে সঙ্গে সাওয়ালের ছয় রোজা প্রতি মাসের তিন রোজা রেখে নফসে আম্মারাকে দমন করে রাখতে পারলে বাকি ১১ মাস আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

আসুন রমজানের নিয়মানুবর্তিতাগুলো সারা বছর জাগ্রত রাখি। রোজাবস্থায় হালাল-হারাম বেছে চলেছি কারণ; এতে রোজার ক্ষতি হয় রমজানের শেষেও তা মেনে চলব নতুবা ঈমানী সম্পদের ক্ষতি হবে।

পাক-সাফ বা অজুর হালতে থাকা। রোজা থেকে আমরা সাধারণত মুসল্লির বেশে থাকতাম, রোজা শেষেও সেই ট্রেনিংটা যেন অব্যাহত থাকে। একদা এস্তেঞ্জা শেষে নবীজি (সা.) তার খাদেমকে অজুর পানি আনতে বলেন।

খাদেম অজুর পানি নিয়ে এসে দেখেন নবীজি (সা.) তাইয়্যাম্মুম করছেন, খাদেম জিজ্ঞেস করেন ইয়া রাসূলাল্লাহ পানির তো সমস্যা নেই তাইয়্যাম্মুমের কারণ কী? নবীজি (সা.) ফরমান, অজু করার আগে যদি মৃত্যুদূত এসে যায়? আমি কী বিনা অজুতে তার ডাকে সাড়া দেব? তাই তাইয়্যাম্মুম করে নিলাম। বুজুর্গানে দ্বীন বলেন, অজুর সঙ্গে থাকলে তার ঈমানী মৃত্যু নসিব হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক

Email :[email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.