মা-বাবার সেবা করলে জান্নাত মেলে

  হাফেজ তরীকুর রহমান ০৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মা-বাবার সেবা করলে জান্নাত মেলে

সন্তান স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র ভালোবাসার প্রতীক; যা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে মাটির এ পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখার পথ প্রশস্ত করে।

সুসন্তানকে প্রভুর এক বিশেষ নিয়ামত বলে আখ্যা দিয়ে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ তোমাদের থেকেই তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের যুগল থেকে পুত্র-পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন; তবুও কি তারা মিথ্যাতে বিশ্বাস করবে?

তারা কি আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করবে? (সূরা নাহল-৭২)। প্রকৃত পক্ষেই সুসন্তান তার পিতা-মাতার যৌবনের সৌন্দর্য, বার্ধক্যে চোখের আলো।

যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে তিনটি আমল জারি থাকে। তৃতীয়টি হচ্ছে নেক সন্তান যে তার পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে (মিশকাত) আর এ জন্য প্রভু সুসন্তান প্রাপ্তির চমৎকার এক দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন পবিত্র কোরআনে।

ইরশাদ হচ্ছে, হে আমাদের প্রতিপালক আমাদের নেক সন্তান দান করো। হাদিসে রাসূলে নেক সন্তানের কিছু গুণাবলির ইঙ্গিত রয়েছে।

সুসন্তান কখনও তার মা-বাবার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে না, বেফাস কথা বলে তাদের ব্যথা দেয় না, পিতা-মাতা অন্য ধর্মের হলেও। হজরত আবুবকর (রা.) বলেন, আমার মা মুশরিক থাকা অবস্থায় তার প্রয়োজনে মদিনায় আমার কাছে এসেছিলেন, এ ব্যাপারে আমি রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞাসা করলাম হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমি কি তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করব?

জবাবে রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ তুমি তার সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করবে। (বুখারি ও মুসলিম) পার্থিব সব বিষয়ে পিতা-মাতার পূর্ণ আনুগত্য করা সুসন্তানের অন্যতম গুণ; যা কোরআনুল কারিমের ভাষ্যে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

ইরশাদ হচ্ছে- যদি তারা আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার জন্য চাপ দেয় যার জ্ঞান তোমার নেই, তা মেনে নেবে না, তবে পার্থিব জীবনে তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। (সূরা লুকমান-১৫)

পিতা-মাতা দরিদ্র ও অসহায় হলে তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে। আল্লাহ বলেন, তোমরা যে সম্পদ ব্যয় কর তা তোমাদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ব্যয় করবে। (বাকারা-২১৫)

সব সময় তাদের খেদমতে নিয়োজিত থাকা ও নম্র ভাষায় কথা বলা। ইরশাদ হচ্ছে- তোমাদের সামনে তাদের একজন বা দু’জনই যদি বার্ধক্যে পৌঁছায় তাদের প্রতি বিরক্তসূচক উহ কথাটি উচ্চারণ করবে না, তাদের সঙ্গে কর্কশ ভাষায় কথা বলবে না।

তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলবে। তাদের জন্য দয়াশীল হবে। বিনয়ের সঙ্গে বাহু প্রসারিত করে তাদের দায়িত্ব পালন কর। (বনি ইসরাইল-২৩-২৪)

বার্ধক্যে পৌঁছা পিতা-মাতার বিশেষভাবে সেবা-যত্ন করা ও তাদের একাকিত্ব দূর করা। রাসূল (সা.) বলেন, সে ধ্বংস হোক, সে ধ্বংস হোক। বলা হল হে আল্লাহর রাসূল (সা.)কে ধ্বংস হবে?

জবাবে তিনি বলেন, যে তার মাতা-পিতা দু’জনের একজনকে অথবা দু’জনকেই বৃদ্ধ অবস্থায় পেল অথচ তাদের সেবা করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না (সহিহ মুসলিম)।

কারণ পিতা-মাতার অবাধ্যতা আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না। বরং মৃত্যুর আগেই তার শাস্তি দেয়া হয়। ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ চাইলে সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। পিতা-মাতার অবাধ্যতার অপরাধ ক্ষমা করা হবে না। এ ধরনের গুনাগারের শাস্তি মৃত্যুর পূর্বে দুনিয়াতেই দেয়া হয়ে থাকে। (বায়হাকী)

মাটির এ পৃথিবীতে সন্তানের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা সব ক্ষেত্রেই প্রভুর পর পিতা-মাতার অবদান সবচেয়ে বেশি। ইরশাদ হচ্ছে- মা তাকে বহু কষ্ট সহ্য করে গর্ভধারণ করেছেন এবং দুই বছর দুগ্ধপান করিয়েছেন; অতএব সে যেন আল্লাহর ও তার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে (সূরা লুকমান-১৪)।

পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জনে সব সময় সচেষ্ট থাকতে হবে; কেননা পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি আর পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি (তিরমিযী)

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া করা। যা প্রভু তার বান্দাদের চমৎকারভাবে শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন হাকিমে- হে আমাদের প্রতিপালক।

তারা যেভাবে আমাকে আদর-যত্নে লালন-পালন করেছেন তুমিও তাদের প্রতি সেভাবে সদয় হও (সূরা বনি ইসরাইল-২৩)। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন কোনো সন্তানের পিতা-মাতা বা একজন এমন অবস্থায় মারা যায়, ওই সন্তান তাদের অবাধ্য ছিল।

সে যদি পিতা-মাতার জন্য সব সময় দোয়া করতে থাকে ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে তাহলে আল্লাহপাক ওই সন্তানকে বাধ্য সন্তানের তালিকাভুক্ত করে নেন। (বায়হাকী)

পিতা-মাতার কোন ঋণ বা অসিয়ত থাকলে ঋণ পরিশোধ এবং অসিয়ত পালন করা জরুরি।

পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। ইরশাদ হচ্ছে- পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের আত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা, পিতা-মাতার প্রতি ভালো আচরণের শামিল (মুসলিম)।

সন্তানের জন্য পিতা-মাতার ত্যাগের কোনো অন্ত থাকে না। বুকভরা মায়া-মমতা ও স্নেহ-যত্ন দিয়ে লালন-পালন করে তিলে তিলে বড় করে তোলেন কলিজার টুকরা সন্তানকে।

মা বহু কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে গর্ভধারণ করেন। পিতা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেন। তার নিজের সব শখ-আহ্লাদ দূরে ঠেলে দিয়ে সন্তানের শখ-আহ্লাদ পূরণ করেন।

প্রকৃত অর্থেই পিতা-মাতা সন্তানের জন্য এক বিশেষ নিয়ামত। তাদের প্রতি কর্তব্যগুলো যথাযথভাবে পালন করলে সন্তানের জন্য জান্নাত যেমন অনিবার্য, তেমনি পালন না করলে জাহান্নাম অবধারিত। পিতা-মাতার যথার্থ খেদমত করে হে আল্লাহ আমাদের জান্নাত অর্জন করার তৌফিকদান করুন। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter