আল্লাহর ঘরের মেহমানদের জন্য শুভ কামনা

  মোহাম্মদ তালহা তারীফ ১৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহর ঘরের মেহমানদের জন্য শুভ কামনা

হাজীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারতের। জীবনের প্রথম থেকেই স্বপ্ন বুনেছেন কবে যাব সোনার মদিনায়। সেখানে গিয়ে জুড়াবে মনের ব্যথা; পূর্ণ হবে মনের আশা। হাজীরা আল্লাহর মেহমান।

অথচ প্রতি বছর হজের সময় আল্লাহর ঘরের মেহমানদের কাঁদতে দেখা যায়। মিডিয়াতে কিংবা প্রিন্ট মিডিয়াতে দেখা যায় রাস্তায় তারা কাঁদছেন। হজযাত্রীদের বাড়ি থেকে হজ করার উদ্দেশে বের হয়ে হজ ক্যাম্পে বা রাস্তায় কান্নাকাটি, মানববন্ধন ও মিছিল করতে দেখে আমাদের বড় লজ্জা হয়। হাজীদের দেখা যায় বিমানবন্দরে বসে কাঁদছেন। একজন ফ্লাইট পেলেও অনিশ্চয়তায় অন্যজন।

বিমানবন্দরে চিন্তায় তাদের ঘুম নষ্ট হয়। কর্মকর্তাদের কাছে ছোটাছুটি করে জুতা ক্ষয় করেন তারা। স্বামী-স্ত্রী একই ফ্লাইটে স্বপ্নের হজ করতে যেতে পারবেন কি? এ ভাবনায় বিমানবন্দরে কাটে তাদের সময়।

হাজী কাঁদছেন, কাঁদছেন আল্লাহর ঘরের সম্মানিত মেহমান, তা দেখে কেঁদে ওঠে বাংলাদেশ। কেন কাঁদেন আল্লাহর ঘরের মেহমান? কোন ধরনের সমস্যায় তারা চোখের পানি ফেলেন প্রতি বছর। হাজীরা মুখে হাসি নিয়ে কীভাবে নির্বিঘ্নে হজ করতে পারবেন সেই ব্যাপারে দেশের প্রখ্যাত দু’জন বুজুর্গ পীরের মতামত তুলে ধরছি-

সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন

পীর বুজুর্গ ও প্রধান গদিনশীন পীর, দরবারে আউলিয়া, সুরেশ্বর দ্বায়রা শরিফ

প্রশ্ন : প্রতিবার হজের সময় বাংলাদেশে হাজীদের চোখে পানি দেখা যায় এর কারণ কী?

সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন : হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অনেক পক্ষ জড়িত রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়। যেমন- ধর্ম, বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিমান, ট্রাভেল এজেন্সি, হাব, হজ অফিস। আমার মনে হয় সব পক্ষের কাজের সুসমন্বয় না থাকায় হাজীদের নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ভিসা পেতে বিলম্ব, ভিসার প্রিন্ট নিতে যান্ত্রিক ত্র“টি, হজ এজেন্সির প্রতারণা, হজ অফিসের কর্মকর্তাদের অবহেলা, বাংলাদেশ বিমান ও সৌদি ফ্লাইট বাতিল, ইত্যাদি কারণে হজযাত্রীরা দুর্ভোগের শিকার হয়ে চোখের পানি ফেলেন রাস্তায় রাস্তায়। আর তা মিডিয়াগুলো লুফে নিচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনার মতে চোখের পানি দূর করার কী উপায় হতে পারে?

সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন : হাজীদের উন্নত ও আন্তরিক সেবাদানের জন্য হজ সেবায় নিয়োজিত সব পক্ষকে প্রথম থেকেই অনেক বেশি যত্নবান হতে হবে। আল্লাহর মেহমানকে নিজেদের ব্যবসায়ের উপলক্ষ মনে না করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হজ সেবা প্রদানে নিয়োজিত সব পক্ষই হাজীদের আন্তরিকতাপূর্ণ উন্নত সেবা দান, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, অপরিচিত স্থানগুলো দেখিয়ে দিতে হবে। হাজীদের সেবাদানের জন্য দুই দেশে আরও বেশিসংখ্যক তথ্যানুসন্ধান কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে সেখানে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মী সার্বক্ষণিক সেবাদান করলে তাদের চোখের পানি দূর হবে বলে আমি মনে করি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।

প্রশ্ন : হজ সেবা বাড়ানোর জন্য কোন বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?

সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন : আমি প্রথমত গুরুত্ব দিতে বলব হজ সেবায় নিয়োজিত হজ এজেন্সিগুলোকে কড়া নজরদারিতে রাখা। হাজীরা আরামের সঙ্গে ত্র“টিমুক্তভাবে হজ সম্পাদন করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখবেন তারাই। এ দেশের বেশিরভাগ হাজী অর্ধশিক্ষিত, তাই তাদের উপযোগী সেবা নিশ্চিত করে হজ ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে দক্ষতার সঙ্গে।

হজ সংক্রান্ত সব সংবাদ যেমন- মেডিকেল চেকআপের সময়, ফ্লাইট নম্বর, তারিখ ও সময় ইত্যাদি মোবাইলের মাধ্যমে হাজীদের জানানো প্রয়োজন হজ কর্তৃপক্ষের। হাজীদের উচিত আগে যারা হজ করতে গিয়েছিলেন তাদের পরামর্শ গ্রহণ করে সঠিকভাবে হজ পালন করা। আর হজে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে এবং তার রাসূল (সা.)-এর রওজায় উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত বিনয়ীভাবে সব আহকাম সম্পন্ন করে অন্তরে এ ভাবনা করা যে এখানে এ পবিত্র ভূমিতে পুনর্জন্ম লাভ করেছি। আল্লাহ যেন আমার হজ নির্বিঘ্নে করান। হজযাত্রীদের জন্য আমার সালাম ও শ্রদ্ধা রইল।

সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী

পীর-বুজুর্গ, ইমামে রব্বানী দরবার শরিফ, চাঁদপুর

প্রশ্ন : খেদমতের নাম করে হাজীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় কি বৈধ বলে আপনি মনে করেন?

সৈয়দ বাহাদুর শাহ : খেদমতের নাম করে হাজীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করা সম্পূর্ণ অবৈধ। আমি খেদমত করব বলেই হাজীরা আমার কাছে আসেন। খেদমত করা হল আমার দায়িত্ব। কেয়ামতের দিন আল্লাহ প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।

প্রশ্ন : হাজীদের সঙ্গে প্রতারণা কি শুধু এ দেশেই হয়? তাদের সঙ্গে কোন ধরনের প্রতারণা বেশি হয়?

সৈয়দ বাহাদুর শাহ : হাজীরা শুধু এ দেশেই প্রতারিত হচ্ছে না, হজে গিয়েও মক্কায় প্রতারিত হচ্ছেন তারা। বিশেষ কিছু মহল হাজীদের ব্যবসায়ের পণ্য মনে করে। প্রাথমিক পর্যায়ে হাজীরা এজেন্সি কর্মকর্তাদের চমক দেয়া সেবার কথা শুনে আকৃষ্ট হয়ে যান, অথচ তাদের সৌদিতে পৌঁছে দিয়ে এজেন্সির কথার সঙ্গে আর বাস্তবে কোনো মিল থাকে না। আমি হজ করতে গিয়ে সেখানে দেখেছি অসংখ্য হাজীদের কাঁদতে; তারা সঠিক সময়ে খাবার পাচ্ছেন না। যে হোটেলে থাকার কথা বলে টাকা নেয়া হয়েছে সেখানে না রেখে নিুমানের হোটেলে রাখা হয়েছে।

পাঁচজন থাকতে পারে এমন রুমে রাখা হচ্ছে প্রায় পনেরো জনের মতো হাজীকে। তাদের জন্য থাকছে না পর্যাপ্ত ওজু-গোসলের ব্যবস্থা। হেরেম শরিফে ও মদিনার কাছে রাখার কথা বললেও এমন স্থানে রাখা হচ্ছে যেখান থেকে এসে বাইতুল্লাহ শরিফে ও মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় করা ভাগ্যে জোটে না। রুমেই নামাজ আদায় করে নেয় বাধ্য হয়ে তখন। তাদের করতে হয় খুব বেশি কষ্ট।

তা ছাড়া এজেন্সির কর্মকর্তারা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে আমাদের লস হচ্ছে ইত্যাদি কথা বলে আবারও হাজীদের কাছ থেকে কোরবানির টাকা বা অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। হাজীদের সঠিকভাবে সাহায্য না করায় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা হাজীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বেশি। এমনকি হজ এজেন্সিগুলো অতিরিক্ত মোনাফার আশায় হাজীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিছিন্ন করে দেয়। আমি অনেকবার খবর পেয়েছি অনেক এজেন্সি হাজীদের থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। হজ করতে গিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদে আমাদের হাজীরা।

প্রশ্ন : সরকার হজযাত্রীদের জন্য কোন ধরনের পদক্ষেপ নিলে তাদের কান্না থামানো যাবে?

সৈয়দ বাহাদুর শাহ : হজ ব্যবস্থাপনা সুন্দর করতে সরকারকে আরও সতর্কতা ও আন্তরিকার সঙ্গে এগোতে হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনার মান ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। হজ সেবায় নিয়োজিত এজেন্সিগুলোকে প্রথম থেকেই কড়া নজরদারিতে রাখতে হবে। এজেন্সিগুলো হাজীদের যেসব সুবিধা দেয়ার কথা বলে তা লিখিতভাবে চুক্তি আকারে থাকতে হবে। সরকার দুই দেশে একটি মনিটরিং সেল গঠন করবে।

নীতিমালা লঙ্ঘনকারী, প্রতারণাকারী ও চুক্তিতে উল্লেখিত সুবিধাগুলো যদি প্রদান না করে হাজীরা সরকারি মনিটরিং সেলে অভিযোগ করলে হাজীদের অভিযোগের আলোকে যদি সরকার শাস্তি ও জরিমানা প্রদান করে তাহলে আমি মনে করি হাজীদের সঙ্গে অনেকাংশে প্রতারণা বন্ধ হবে। হাজীরা যেসব সমস্যায় পড়ছেন তা চিহ্নিত করে প্রিন্ট মিডিয়া ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার মাধ্যমে হাজীদের জানিয়ে তাদের সচেতন করা যেতে পারে।

আমাদের দেশে প্রচুর হাজী হজ করতে যান। আমি আমার দেশের সরকারের কাছে হজ মন্ত্রণালয় গঠন করার জন্য আবেদন করছি। যারা বছরজুড়ে হজ নিয়ে ভাববেন ও কাজ করবেন। বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয় যেমন ধর্ম, বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিমান, ট্রাভেল এজেন্সি, হাব, হজ অফিসে কিছু কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অবহেলিত না হয়ে হজ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারিভাবে এ দেশের হাজীরা একদিন হজ করতে যাবেন বলে আমি মনে করি।

প্রিয় পাঠক, হাজীরা যদি সেখানে প্রতারণার শিকার হয়ে সময়মতো খাবার ও বিশ্রামের একটু জায়গা না পান, তাহলে কি তাদের ইবাদত বন্দেগিতে মন বসবে? হাজীরা মক্কায় গিয়ে তার জীবনকে সঁপে দেবে আল্লাহর কাছে। ইবাদত-বন্দেগিতে কাটবে তার জীবন। দু

ই হাত তুলে হাজীরা দোয়া করবেন প্রভুর দরবারে নিজের জন্য, আমাদের জন্য, আমাদের এ মাতৃভূমির জন্য। হাজীরা সুন্দরভাবে হজে যাবেন এ দেশের মানুষের কাছে হজ শেষে সুস্থভাবে ফিরে আসবেন, আমরা চেয়ে থাকব তাদের পথটি চেয়ে। তাদের হজ সহি হলে সে ছোঁয়া আমাদের আত্মায়ও পরশ বুলাবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×