কম টাকার হজযাত্রায় বেশি বেশি বিড়ম্বনা

  এহসান সিরাজ ২০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কম টাকার হজযাত্রায় বেশি বেশি বিড়ম্বনা
ফাইল ফটো

মক্কা গিয়ে বাংলাদেশের হাজীরা প্রতিবছর অসাধু হজ এজেন্সি ও স্থানীয় মোয়াল্লিমদের যে চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রতারণার স্বীকার হচ্ছেন তা অবর্ণনীয়। কেউ কেউ তো হজ থেকে ফেরার পথে এয়ারপোর্টে নেমে কেঁদেও ফেলেন!

হাজীদের থেকে উন্নতমানের বাসা, স্বাস্থ্যসম্মত ভালো খাবার ও গাইড খরচের নামে এজেন্সি মালিকরা নানা কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নিলেও কাক্সিক্ষত সেবা দেন না। গেল ক’বছর কাছ থেকে দেখা হাজীদের কিছু দুর্ভোগ চিত্র তুলে ধরছি-

পরিবহন : জেদ্দা এয়ারর্পোটে নেমে প্রথমেই হাজীরা যে অবহেলা, বিড়ম্বনা আর দুর্ভোগের স্বীকার হন সেটা যাতায়াত ব্যবস্থাপনায়। হাজীরা দেশ থেকে দীর্ঘ পনেরো-ষোলো ঘণ্টার জার্নি শেষে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দুই-তিন ঘণ্টায় ইমিগ্রেশন পার হয়ে সৌদি মোয়াল্লিমের গাড়ির অপেক্ষায় থাকেন।

তখন দেখা যায়, ভারত-পাকিস্তানসহ অন্য দেশের হাজীদের জন্য ভালো মানের ‘সেপকো’ বাস এলেও বাংলাদেশের হাজীদের জন্য আনা হয় ‘আবুফাস’ কোম্পানির নিুমানের বাস! মক্কা থেকে মদিনা বা সেখান থেকে আসতে আট-দশ ঘণ্টার পথে এ বাসগুলো আমাদের দেশের হাজীদের বাহন হিসেবে ব্যবহার হতে দেখেছি। ভাঙা-নড়বড়ে সিট, কম প্রেসারের এসি নিয়ে গাড়ি যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে যায় স্বাভাবিকভাবেই এগুলো অকেজো হয়ে পড়ে।

যাতায়াত পথে এমন অসংখ গাড়ি দেখেছি, এসি বা গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিব্র গরমে ধুধু মরুর রাস্তার কিনারে গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। আহা! হাজীদের সে কী দুর্ভোগ? সৌদি মোয়াল্লিম বা এজেন্সি মালিকদের ভাবটা এমন, ব্যাটারা তোমরা এখন জাহান্নামে আছ, এ পথ পাড়ি দিলেই জান্নাতে প্রবেশ করবে!

আবাসন সমস্যা : কিছু এজেন্সি হাজীদের থাকার জায়গা ভালো দিলেও বেশিরভাগের চিত্র হল- হাজীদের যে ধরনের বাড়িতে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সৌদি আরবে নেয়া হয়, বাস্তবে তা দেয়া হয় না। রাখা হয় অত্যন্ত নিম্নমানের ঘরে, গাদাগাদি করে।

এমন নোংরা ভবন যাতে দুর্গন্ধে বমির উদ্রেগ হয়। কোনো কোনো ভবনের আন্ডার গ্রাউন্ডেও হাজীদের থাকতে দেখা গেছে। যেখানে কোনো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই। এমনকি মোবাইলের নেটওয়ার্কও থাকে না।

ভবনের ভেতরে এমন গরম যে শরীরে ফোসকা পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। অনেককেই অভিযোগ করতে শুনেছি, বাসা দেয়া হয়েছে চিপা গলি দিয়ে আধা কিলো পাহাড়ের ওপর!

দূরত্ব : পবিত্র কাবা বা মদিনাতে মসজিতে নববীর কাছাকাছি বাড়ি ভাড়ার কথা বলে হাজীদের রাখা হয় দূরবর্তী স্থানে। মক্কা থেকে বেশ দূরে আজিজিয়া, শৌকিয়া, কাকিয়া জাবালে নূর, নুজহা, সরাইয়া, গেছলা এলাকাসহ অন্য কোনো দূরের বাড়িতে রাখা হয়। এগুলোর ভাড়া কম।

হজযাত্রীদের বলা হয়, নামাজের সময় বাসে করে কাবা শরিফে আনা-নেয়া করা হবে। তবে দু-তিন দিন বাসে করে আনা-নেয়া করে এলাকার মসজিদে নামাজ আদায় করতে বলা হয়। হাজীরা হজ মিশন না চেনায় অভিযোগও করতে পারেন না।

খাবার : কিছু এজেন্সির বিরুদ্ধে হজযাত্রীদের খাবার না দেয়ার অভিযোগ পেয়েছিলাম। প্রতিবছরই এমনটা হয়ে থাকে। এজেন্সিগুলো খাবার সরবরাহ বাবদ অর্থ নিলেও হাজীদের নির্ভর করতে হয় বাইরে থেকে কিনে আনা খাবারের ওপর। আবার অনেকে দেশ থেকে নেয়া চিড়া মুড়ি খেয়েই দিন পার করেন। আলু ভর্তা, নুন ছাড়া সেদ্ধ করা মাংস, পাতলা ডাল আর ভাত এগুলোই দেয়া হয় বেশি। সকালের নাস্তা দেয়া হয় না। দুপুরের খাবার দেয় সন্ধ্যায়, রাতের খাবার শেষ রাতে।

মিনার তাঁবু : মিনায় লাখ লাখ তাঁবু। একেকটি তাঁবুতে ৫০-৬০ জন মানুষ। নিুমানের খাবার ব্যবস্থা। অন্য দেশের তাঁবুগুলো সমতলে হলেও বাংলাদেশের তাঁবুগুলো পাহাড়ের উঁচুতে বা মিনা এরিয়ার শেষ মাথায়। যেখান থেকে চাইলেও নিচে নামা যায় না। অভিজ্ঞতা হল, মিনা থেকে আরাফার ময়দানে যেতে মুয়াল্লিমের গাড়ির শিডিউল হেরফের হয়ই।

কিন্তু কখনও এমনও দেখলাম, গাড়ি আসার কথা সন্ধ্যায় সে গাড়ি এলো পরদিন ভোরবেলা। ফজরের নামাজের পর হাজীরা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে তো অন্য হাজীদের গাড়ি এলো, তারা উঠে গেলেন বাংলাদেশি হাজীদের গাড়ি আর এলো না।

অপেক্ষা করে করে অবশেষে হেঁটেই আরাফার ময়দানের উদ্দেশে রওনা হতে হল তাদের। সূর্যের তাপ বাড়তে থাকে। রীতিমতো ৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা। হাইওয়েতে দীর্ঘ পথ হাঁটতে গিয়ে ভাড়া বাস পাওয়া গেলেও তখন যে ভাড়া হাঁকে সে ভাড়া মিটিয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না।

বাংলাদেশের হাজীদের কাছে সৌদি আরব যাওয়া মানে এক অজানা জনপদে যাওয়া। দেশে সীমাহীন দুর্ভোগের দিন পেরিয়ে সৌদি আরব পৌঁছে যাওয়ার পর তারা আর কষ্টের কথা চিন্তা করেন না। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তাদের দুর্ভোগ ও কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না। অথচ পৃথিবীর কোনো দেশের হাজীদেরই এ দুর্ভোগ পোহাতে হয় না।

দেখেছি মক্কা-মদিনায় বসবাসরত ভারত ও পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মকে শুধু হাজীদের সেবা করার জন্য স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয়। তাদের দূতাবাস সৌদি সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজটি করে। তারা নিজ দেশের হাজীদের জন্য সব ধরনের সেবা দিয়ে থাকেন। আবার লন্ডন-আমেরিকা থেকে আসা বাংলাদেশি হাজীদের সঙ্গেও কথা হয়েছে।

দেখেছি তারা যে অর্থ ব্যয় করে হজে এসেছেন তা বাংলাদেশের অর্থের প্যাকেজের তুলনায় কম। অথচ তারা যে সুযোগ-সুবিধা পান ও স্বচ্ছন্দে ইবাদত করতে পারেন, বাংলাদেশি হাজীরা তা কল্পনাও করতে পারেন না! এই বিষয়ে কথা বলেছি একজন বিজ্ঞ কোরআন প্রেমিকের সঙ্গে। যিনি দীর্ঘ সময় হাজীদের সেবা দিচ্ছেন সুনাম বজায় রেখে।

কোরআন প্রেমিক মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী ওয়াজ-মাহফিল বা কোরআনের তাফসির করে মানব মনে ধর্মের চারা রোপণ করেছেন প্রতিনিয়ত। এ বিষয়ে যারা কাজ করেন তাদের নিয়ে ‘বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠনও করেছেন। একজন সফল মিডিয়া কর্মী। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজীদের সেবাদানের জন্য এম. সেতারা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

হাজীদের নিয়ে এজেন্সি মালিকদের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ সম্পর্কে, তিনি বললেন, হজ ব্যবস্থাটা সুন্দর ও সুষ্ঠু হওয়ার জন্য তিন পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। এজেন্সি কর্তৃপক্ষ, হাজী এবং সরকার। এ তিন পক্ষের কোনো এক পক্ষ যদি আন্তরিক না হন তাহলেই হজ ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া প্রতিবছরই হজ কার্যক্রমে নতুন নতুন এমন কিছু সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে যেগুলো সম্পর্কে একদিন আগেও এজেন্সি মালিকরা জানতে পারেন না।

যার কারণে পূর্ব অভিজ্ঞতা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান দেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। তাতক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এর বিহিত করতে হয়। যেমন এবার সৌদি সরকার ভ্যাটের জন্য পাঁচ পার্সেন্ট ধার্য করেছে। হাজীদের খাওয়ানো হোক বা না হোক ক্যাটারিংয়ের জন্য ১৪৭ রিয়াল আইবিএন থেকে কেটে নিয়েছে। তা ছাড়া অন্যান্য বছর সৌদি মুয়াল্লিমদের ফি ধরা হতো ৫০০ থেকে ৭০০ রিয়াল, এবার সেটা এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ রিয়াল হয়েছে। এ টাকা বাংলাদেশের হিসাবে কম নয়।

বাংলাদেশে আবার প্রতিটি এজেন্সিকে অন্যান্য বছর সুযোগ দেয়া হতো বিশ পার্সেন্ট। এবার সেটা দেয়া হয়েছে মাত্র চার পার্সেন্ট। এতে এজেন্সি মালিকরা ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। এর একটা প্রভাব অবশ্যই হাজীদের ওপর পড়বে।

হাজীদের আবাসন এবং খাবারের ব্যাপারে সৌদি সরকার খুবই আন্তরিক। আগে সুযোগ ছিল। এখন ইচ্ছা করলেও কোনো এজেন্সি হাজীদের যেনতেন জায়গায় রাখতে পারেন না। খাবারের মান এবং সময়ের ব্যাপারে এজেন্সিগুলোকে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

লাখ লাখ হাজীর সমাগম হয় মক্কা-মদিনায়। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের শৃঙ্খলানুযায়ী রাস্তা ব্যবহারের অনুমতি দেয়। বিশেষ করে নামাজের সময় রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময়ের আগে যদি খাবার না দেয়া যায় তাহলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কোনো সময় খাবার নষ্টও হয়ে যায়। বিষয়টা মাথায় রেখে হাজীদের খাবার দেয়া উচিত।

একটা বিষয় এখনও আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে ধরে না, পরিবহনের ক্ষেত্রে সৌদি মোয়াল্লিম কেন আমাদের দেশের হাজীদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করেন। ভারত-পাকিস্তানে লোকেরা যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে মোয়াল্লিম নেন আমরাও সেই পরিমাণ অর্থ দিয়েই মোয়ল্লিম নিই।

কিন্তু পরিবহনের ক্ষেত্রে তারা নিুমানের গাড়িগুলো দিয়ে বাংলাদেশি হাজী আনা-নেয়া করে! বাংলাদেশ সরকারের উচিত এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করা। হাজীদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, প্রতারণা থেকে বাঁচতে মধ্যস্বত্বভোগী গ্রুপলিডার থেকে দূরে থাকুন এবং কম টাকায় হজে যাওয়ার চিন্তা কখনই করবেন না।

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.