মা-বোনদের জন্য হজের কথা

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. জিশান আরা আরাফুন্নেছা

‘হজ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা বা সংকল্প করা। আল্লাহ পাক মুসলমানদের জন্য শর্তসাপেক্ষে হজ ফরজ করেছেন। প্রথম শর্ত হল, সেই পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য থাকতে হবে।

সামর্থ্যরে ব্যাখ্যা সম্পর্কে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে সাংসারিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত এ পরিমাণ অর্থ থাকতে হবে, যা দিয়ে তিনি কাবাগৃহ পর্যন্ত যাতায়াত ও সেখানে অবস্থানের ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন।

গৃহে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত পরিবার পরিজনের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থাও তার থাকতে হবে। তাকে দৈহিক দিক দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া ছাড়াও তার হাত-পা ও চক্ষু কর্মক্ষম হতে হবে। আর নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত, সফরসঙ্গী হিসেবে মাহরাম থাকা আবশ্যক।

মহিলাদের হজের গুরুত্ব প্রসঙ্গে একটি হাদিস উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি রাসূলুলাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! জিহাদকে আমরা নারীরাও সবচেয়ে উত্তম কাজ বলে জানি। আমরা কি জিহাদে অংশগ্রহণ করব না?’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘না, বরং তোমাদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হচ্ছে ‘মাবরুর’ (ত্রুটিবিহীন হজ)।

প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। একাধিকবার হজ করলে অন্যগুলো নফল হবে। হজ ফরজ হওয়ার পর কোনো ওজর দেখিয়ে হজ না করা চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়। সামর্থ্য হলে যৌবনকালেই হজ পালন করা উত্তম। কারণ এটি খুবই কষ্টসাধ্য ইবাদত।

সামর্থ্যবান সব নারীর ওপর পুরুষের মতোই হজ ফরজ। গুরুত্ব সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে আমাদের দেশের অধিকাংশ নারী এ বিষয়টিতে নিজেদের হজকে স্বামী-পুত্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেন। সাবার জন্য নিজ যোগ্যতায় হজ দায়বদ্ধ রয়েছে। শর্ত হল, তিনি একাকী যেতে পারবেন না; তাকে স্বামী বা যে কোনো মাহরামের সঙ্গে যেতে হবে।

‘মাহরাম’ বলতে স্বামী ছাড়াও ওইসব ব্যক্তিকে বোঝায়, যাদের সঙ্গে ওই মহিলার বিয়ে হতে পারে না। যেমন : ১) বাবা (আপন বা সৎ); ২) ভাই (আপন, বৈমাত্রেয়, বৈপিত্রেয়, দুধ ভাই); ৩) ছেলে (আপন বা সৎ); ৪) দাদা (দাদার পিতা বা তার পিতা ইত্যাদি আরও যত ওপরে যাক); ৫) নানা (নানার পিতা বা তার পিতা ইত্যাদি আরও যত ওপরে যাক); ৬) চাচা (আপন বা সৎ); ৭) মামা (আপন বা সৎ); ৮) শ্বশুর (আপন দাদা শ্বশুর, নানা শ্বশুর ও তদূর্ধ্ব); ৯) ভ্রাতুষ্পুত্র (আপন ভাইয়ের পুত্র বা বৈমাত্রেয়, বৈপিত্রেয় ভাইয়ের পুত্র); ১০) ভাগ্নে (আপন বা সৎ বোনের ছেলে); ১১) নাতি (আপন ছেলে বা মেয়ের ছেলে); ও ১২) জামাতা (মেয়ের স্বামী)।

কোনো কারণে কোনো সামর্থ্যবান নারীর স্বামী যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাকে সঙ্গে নিয়ে হজে না যান, অথবা তাকে যেতে অনুমতিও না দেন তাহলে স্বামীর বিনানুমতিতেই মালদার স্ত্রীলোকের মাহরামের সঙ্গে হজে যাওয়ার অধিকার আছে। কারণ এটি ফরজ কাজ এবং এতে স্বামী বাধা দিলে তা মানা বাধ্যতামূলক নয়।

বিত্তমান নারী যে মাহরামকে তার সঙ্গে নিয়ে যাবেন, ওই ব্যক্তির সামর্থ্য না থাকলে তার সব খরচ ওই নারীকেই বহন করতে হবে। সফরসঙ্গীর সব খরচ বহন করা ওই নারীর ওপর ওয়াজিব।

যে নারীর ওপর হজ ফরজ হয়েছে তিনি যদি সারা জীবন তার সফরসঙ্গী হিসেবে কোনো মাহরাম না পান, তবে তার মৃত্যুর পর তার অর্থে বদলি হজ করিয়ে দিতে হবে। এটা করানো তার ওয়ারিশগণের জন্য ওয়াজিব। কোনো নারী ইদ্দতের অবস্থায় থাকলে তার জন্য হজ করা নিষিদ্ধ।

নারীদের নির্ধারিত মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে। ইহরাম বাঁধার আগে গোসল করতে হবে। এ গোসল শুধু পরিচ্ছন্নতার জন্য। ঋতুবতী মহিলাদের জন্যও তা সুন্নত। তবে গোসল করতে অসুবিধা থাকলে অজু করে নিতে হবে।

নারীদের ইহরামের জন্য পুরুষের মতো কোনো নির্দিষ্ট পোশাক নেই। নারীরা সেলাই করা সেসব কাপড় পরবেন যা স্বাভাবিকভাবে তারা পরে। তবে রং-চঙের কাপড় (যেমন লাল, কমলা, জাফরানি রঙের কাপড়) না পরাই ভালো। নতুন অথবা পাক-পবিত্র পোশাক পরতে হবে- যদি মাকরুহ ওয়াক্ত না হয় ....... ইহরামের নিয়তে সাধারণ নফল নামাজের মতো দু’রাকাত নফল নামাজ পড়তে হবে। আর যদি মাকরুহ ওয়াক্ত হয়, তবে নফল নামাজ ছাড়াই ইহরামের নিয়ত করতে হবে।

নারী-পুরুষ সবার জন্য নিয়ত অভিন্ন। নিয়তের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের নিুস্বরে তিনবার তালবিয়া (লাব্বাইকা, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা, লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নিয়ামাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাক্) পড়তে হবে। কোনো মহিলা পড়তে না পারলে তার মাহরাম ব্যক্তি বা সঙ্গে থাকা অন্য কোনো মহিলা তা পড়িয়ে দিলেও হবে। তালবিয়া পাঠ করার পর কয়েকবার দরুদ শরিফ পড়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করা উত্তম।

আবশ্যিকভাবে নারীদের মাথা ঢাকতে হবে; তবে মুখমণ্ডল খোলা রাখা যাবে। আবু দাউদের রেওয়ায়েতে হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। পুরুষেরা যখন আমাদের সামনে দিয়ে যেত তখন আমরা মাথার ওপর থেকে চাদর ঝুলিয়ে দিতাম এবং পর্দা করতাম। পুরুষেরা চলে গেলে আমরা মুখমণ্ডল খুলে নিতাম।’

নারীদের জন্য নির্দেশ হল পর্দা বজায় রেখে হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা। কোনো অবস্থাতেই পর্দার খেলাপ হয় এমন কাপড় পরা যাবে না বা এমন কোনো কাজও করা যাবে না। নারীদের জন্য ইহরাম বাঁধা অবস্থায় অলঙ্কার পরা জায়েজ; তবে না পরাই উত্তম। ইহরাম বাঁধা অবস্থায় হাতে মেহেদি লাগানো নিষিদ্ধ। এ সময় মেহেদি লাগালে কাফ্ফারার দম দেয়া ওয়াজিব হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা