এক নদীর স্রোত বইছে দুই ধারায়

  আহমাদ জামিল। ২৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক নদীর স্রোত বইছে দুই ধারায়

মুসলমানদের ঈমান-আমল ও নৈতিক উন্নতির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাবলিগ জামাত। এ জামাতের কাজের পরিধি বিশ্বজুড়েই। অহিংসা, শান্তি ও মুসলমানদের আত্মোন্নয়নে তাবলিগ জামাতের ভূমিকা অপরিসীম।

৯০ বছর ধরে আপন গতিতে কাজ করে আসা এ জামাতটিতে এখন অভ্যন্তরীণ ভারি সমস্যা চলছে। এ যেন এক নদীর স্রোত দুই ধারায় বয়ে চলা। যার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব মুসলমানের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ জমায়েত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায়ও।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তাবলিগের মূল মার্কাজ দিল্লির নিজামুদ্দীনের অন্যতম দায়িত্বশীল মুফতি আসাদুল্লাহ। তিনি নিজমুদ্দীনের কাশিফুল উলুম মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক। কিছুদিন আগেও দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগের দায়িত্বশীল ও খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। তাবলিগ জামাতের বিরাজমান অস্থিরতা ও সমসাময়িক বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন-

আহমাদ জামিল। আজ ছাপা হল প্রথম কিস্তি।

প্রশ্ন : তাবলিগ জামাত এখন অভ্যন্তরীণ বিবাদে জর্জরিত হয়ে বিভক্ত হয়েছে বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

উত্তর : তাবলিগ জামাতে মৌলিক কোনো সমস্যা নেই। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের ধরন নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। তবে তা স্থায়ী কোনো সমস্যা নয়। তাবলিগের মূল মার্কাজ নিজামুদ্দীনের তত্ত্বাবধানে সারা বিশ্বে সাথীরা মেহনতে লেগে আছেন। এ বিষয়টি সবার মনে রাখতে হবে তাবলিগ জামাত বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংগঠন। বিশ্বব্যাপী পরিচালিত এ কাজে নেতৃত্ব নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছে, এখানে কিছু অস্থিরতা থাকলে তা মূল কাজের গতিকে খর্ব করেনি।

প্রশ্ন : দেখতে পাচ্ছি প্রায় সব দেশেই সংকট চলছে, বিশেষত আমাদের বাংলাদেশে ভীষণ সমস্যা হচ্ছে, সংক্ষেপে কী বলবেন?

উত্তর : তাবলিগের মহান মেহনত সারা বিশ্বে সমানতালে চলছিল। কোনো ধরনের বিবাদ ও সমস্যা ছাড়া এভাবে কাজ চলতে পারে, তা সবার জন্য দৃষ্টান্ত ছিল। বিভিন্ন ধরনের লোকজন বহু আগে থেকে তাবলিগকেন্দ্রিক তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার সুযোগ খুঁজছিল।

২০১৪ সালে মাওলানা জুবাইরুল হাসান (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তারা এ সুযোগ কাজে লাগায়। ১৯৯৫ সালে তৃতীয় হজরতজি মাওলানা এনামুল হাসান (রহ.) ইন্তেকালের সময় তিনজনের হাতে তাবলিগের দায়িত্ব অর্পণ করেন। মাওলানা ইজহারুল হাসান, মাওলানা জুবাইরুল হাসান ও মাওলানা সাদ কান্ধলভি। ২০১৪ মাওলানা জুবাইরুল হাসান (রহ.) ইন্তেকালের পর একক জিম্মাদার হিসেবে মাওলানা সাদ রয়েছেন।

কিন্তু নিজামুদ্দীন মার্কাজকে যারা শুরু থেকেই মানতে পারছিল না, তারা মাওলানাকে বিভিন্ন ধরনের অসহযোগিতা শুরু করেন। যার বেশিরভাগই পাকিস্তান রাইভেন্ড মার্কাজের। পরে তাদের সঙ্গে ভারতের কিছু দায়িত্বশীল যোগ হয়। এ কারণেই এখন বিভিন্ন মার্কাজে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

প্রশ্ন : সমস্যটা শুরুটা হল কীভাবে? কবে থেকে তা প্রকাশ পেয়েছে?

উত্তর : তাবলিগ জামাতের মূল মার্কাজ হল দিল্লির নিজামুদ্দীন। পাকিস্তানের রাইভেন্ড ও বাংলাদেশের কাকরাইল নিজামুদ্দীনের সহযোগী মার্কাজ। তাবলিগের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে। বিশ্বব্যাপী পরিচালিত এ কাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিজামুদ্দীন বা টঙ্গী ইজতেমায় নেয়া হয়।

কিন্তু ২০১৫ রাইভেন্ড ইজতেমায় পাকিস্তানের সাথীরা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কয়েকজন মুরব্বির একটি তালিকা পেশ করে বলল, এখন থেকে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। তারা এর নাম দিল ‘আলমী শূরা’। বিশ্বের অন্য দেশের মুরব্বি ও শূরাদের সঙ্গে পরামর্শ এবং মতামত গ্রহণ ছাড়াই তারা এ কমিটি ঘোষণা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ভারত, বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশের শূরাদের আপত্তির কারণে সফল হতে পারেনি। বিষয়টির সমাধান বা পর্যালোচনার জন্য সামনে হজ ও টঙ্গীর ইজতেমা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের শূরারা হজ থেকেই আলাদা হয়ে যান।

প্রতি বছর হজের সময় ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুরব্বিরা একসঙ্গে থাকতেন। কিন্তু ২০১৬ থেকে পাকিস্তান ঘোষণা দিয়ে আলাদা হয়ে যায়। সে বছর ভারত, বাংলাদেশসহ সব দেশের মুরব্বিরা একসঙ্গে থাকলেও পাকিস্তানের মুরব্বিরা আলাদা থাকেন।

এরপর তারা বিভিন্ন দেশে সফর করে নিজামুদ্দীনের বিরোধিতা করা শুরু করেন। তাদের গঠিত আলমী শূরা মেনে নেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। তখন থেকে অনেক দেশে বিশৃঙ্খলা শুরু হলেও তেমন অসুবিধা হয়নি। কিন্তু ২০১৭ তে নিজামুদ্দীন থেকে দু’জন মুরব্বি আলমী শূরার সমর্থনে বেরিয়ে যান। এরপর থেকেই অস্থিরতা দৃশ্যমান হয়।

প্রশ্ন : মাওলানা সাদের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দের কিছু আপত্তি আমরা জেনেছি, তা নিয়েই মূলত জলঘোলা হয়েছে বেশি।

উত্তর : হ্যাঁ, সমস্যা যখন আসে তখন সবদিকেই তা ছড়িয়ে পড়ে। মাওলানা সাদের কয়েকটি মন্তব্যের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দ আপত্তি জানায়। কিন্তু এটি শরিয়তের কোনো ফতোয়া নয়, বরং পর্যবেক্ষণ। ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর দেওবন্দের ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ করা হয়।

মাওলানা কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থন ছাড়াই দেওবন্দের পর্যবেক্ষণকে সম্মান দেখিয়ে নিজের ভুল মেনে নিয়েছেন এবং লিখিত ও মৌখিক উভয়ভাবে ওই কথাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তা ছাড়া বিষয়টি নিয়ে যখন দেওবন্দে পর্যালোচনা চলছিল, অনেক সিনিয়র শিক্ষক ও শূরা সদস্য এর পক্ষে ছিলেন না।

দেওবন্দের সব শূরা ও শিক্ষকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে এ পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হয়নি। সে সময় আমি দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগে কর্মরত ছিলাম; কিন্তু ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যবেক্ষণ প্রকাশের কয়েকদিন পর ফতোয়া বিভাগ থেকে আমাকেও সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর থেকে আমি নিজামুদীন মার্কাজে আছি। [চলবে]

ইমেইল : : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter