মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা

  সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা

সূরা হজে আল্লাহর ঘোষণা, ‘আর মানবজাতির জন্য হজের ঘোষণা দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং ক্লান্ত উটের পিঠে সওয়ার হয়ে। তারা আসবে দূরদূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) আবু কুবাইস পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আজান দিলেন।

সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে আল্লাহর বান্দাগণ বাড়িঘর ছেড়ে আল্লাহর ঘরে হাজির হন। যখন তারা হজে যাওয়ার নিয়ত করে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন তখন থেকেই লাব্বাইক আল্লহুম্মা লাব্বাইক আহ্বান তাদের অন্তরে বাজবে।

তারা ইহরামের কাপড় পরে থাকে। মক্কায় কাবাগৃহ দেখে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় ব্যাকুল হন। তখন তারা উচ্চারণ করেন, লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক (আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির), লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক (আমি উপস্থিত, কোনো শরিক নেই তোমার, আমি উপস্থিত), ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক (নিশ্চয়ই সব প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই আর সব সাম্রাজ্যও তোমার), লা-শারিকা লাক (তোমার কোনো শরিক নেই)। তারা ৮ জিলহজ মিনায় রওনা করেন এবং সেখানে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। তখন আল্লাহর প্রেমে তাদের হৃদয় পরিপূর্ণ হয়। এরপর তারা ৯ জিলহজ আরাফার উদ্দেশে যাত্রা করেন।

আরাফার ময়দান মক্কা থেকে ২০ কিমি. দক্ষিণ-পূর্বে। এর পশ্চিম সীমান্তে আছে বিখ্যাত মসজিদে নামিরা। বিদায় হজের সময় আরাফার দিনে যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজের ইমামতি করেছিলেন, খুতবা দিয়েছিলেন সেখানেই হিজরি দ্বিতীয় শতকে নামিরা মসজিদটি নির্মিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে এ মসজিদের জমিনেই হজরত জিবরাইল (আ.) হজরত ইবরাহিম (আ.) কে হজের নিয়মকানুন শিক্ষা দিয়েছিলেন। তা ছাড়া হজরত আদম ও হাওয়ার জান্নাত থেকে পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বসবাসের পর এ ময়দানেই আবার সাক্ষাৎ ঘটেছিল। তাই এ ময়দানকে আরাফাত বলে।

মসজিদে নামিরা থেকে আরাফাতের দিন হজের খুতবা পড়া হয়। হজের খুতবায় সমসাময়িক বিষয়ে দিকনির্দেশনার পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের নির্দেশ দেয়া হয়। ভ্রাতৃত্ব, মুসলিম ঐক্য এবং নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহর জানমাল ও ইজ্জত রক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। মানুষের ঈমান, আমল ও মুক্তির পথ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মচর্চার তাগিদ দেয়া হয়। সবশেষে মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিবস ৯ জিলহজ বা ইয়াওমুল আরাফা। হাজীরা এ দিন ফজরের নামাজ আদায়ের পর মিনা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করেন। আরাফাতে নির্দিষ্ট সীমানায় থাকা হজের ফরজ। সেখানে সীমানা চিহ্নিত আছে।

হজের খতিব মসজিদে নামিরা থেকে যে খুতবা প্রদান করেন মনোযোগ দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। খুতবা শেষে জোহরের আজান হয়। একই আজানে দুই ইকামতে জোহর ও আসরের কসর দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়।

এ দুই ওয়াক্ত নামাজের আগে ও পরে দরুদ, দোয়া ও জিকির করতে হয়। আল্লাহর দরবারে রোনাজারি ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। আরাফাতের ময়দানে থাকা অবস্থায় সূর্য অস্ত যাবে। কিন্তু সেখানে মাগরিবের আজান দেবে না এবং নামাজও পড়া যাবে না। মাগরিবের ওয়াক্ত ফারেগ হওয়ার পর ধীর স্থিরভাবে আরাফার ময়দান ছেড়ে মুজদালিফায় যেতে হবে। মুজদালিফায় গিয়ে এক আজান ও দুই ইকামতে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করতে হবে।

মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব। সেখানে থেকে রাতভর দোয়া ও জিকিরে মশগুল থাকবে। জামারায় শয়তানের উদ্দেশে পরপর তিন দিন ঢিল ছোড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাথরের টুকরা এখান থেকেই সংগ্রহ করতে হয়।

রাত শেষে আজানের পর ফজরের নামাজ পড়ে ১০ জিলহজ সূর্যোদয়ের ঠিক পূর্বক্ষণে মুজদালিফা থেকে তালবিয়া পড়তে পড়তে মিনার উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে। মিনার পথে জামারায় পাথর ছুড়তে হবে। সুফিরা মনে করেন, প্রতীকী শয়তানকে পাথর মারার মাধ্যমে অন্তরের শয়তানকে ঘায়েল করা হয়। তারপর কোরবানি দিতে হয়। সম্ভব হলে সম্মুখে থেকে কোরবানি করা দেখবে এবং অন্তরে উপলব্ধি করবে নিজের ভেতরের পশুবৃত্তি কোরবানি হয়ে গেল।

আরও উপলব্ধি করতে হবে, আল্লাহর প্রেমে নিজের জীবনও যেন এভাবে কোরবানি করতে প্রস্তুত থাকি। এ অনুভূতির মাঝে নতুন জীবন লাভের নিদর্শন রয়েছে। এরপর মাথা মুণ্ডন ও গোসল করে ইহরাম ছাড়তে হবে। এরপর কাবা শরিফ তাওয়াফ ও সায়ি করতে হবে এবং পাথর মারার উদ্দেশ্যে মিনাতে তিন দিন অবস্থান করতে হবে।

১০ জিলহজ তাওয়াফে জিয়ারত করার জন্য মক্কায় যেতে হয়। এটি হজের অন্যতম ফরজ কাজ। কাবা শরিফের তাওয়াফ শুরু করতে হয় হাজরে আসওয়াদ থেকে। ভিড়ের কারণে হাজরে আসওয়াদ চুমু দেয়া সম্ভব না হলে ইশারায় চুমু দিতে হয়। এরপর সায়ি (সাফা-মারওয়ায় সাতবার আসা-যাওয়া) করতে হয়। এখান থেকে পাথর ছোড়ার জন্য আবার জামারাতে যেতে হয়।

হাজিরা মিনায় দুই দিন অবস্থান করে হজের অন্য আনুষঙ্গিক কাজ শেষে মক্কায় বিদায়ী তাওয়াফ করবেন। যারা মদিনায় যাননি, তারা মদিনায় যাবেন। হজের আগে বা পরে অবশ্যই রাসূল (সা.)-এর রওজা মোবারক জেয়ারত করবেন।

মদিনা শরিফে কমপক্ষে ৮ দিন অবস্থানপূর্বক প্রতি ওয়াক্তের নামাজ মসজিদে নববীতে আদায় করা জরুরি। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে আল্লাহর জন্য হজ করে, তারপর অশ্লীল কথা না বলে এবং গুনাহের কাজ না করে সে প্রত্যাবর্তন করে সেই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যে দিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল। তাই সবার উচিত অতি বিনয় ও একগ্রতার সঙ্গে হজের আহকামগুলো পালন করা এবং হজের পরবর্তী দিনগুলো একই রকম ধ্যানে-জ্ঞানে থাকা। এটাই মুমিনের স্বার্থক জীবন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ গদিনশীন পীর দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দ্বায়রা শরিফ

E-mail: [email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter