তাবলিগের সাথীদের মেহনত বাড়াতে হবে

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তাবলিগের সাথীদের মেহনত বাড়াতে হবে

মুসলমানদের ঈমান-আমল ও নৈতিক উন্নতির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাবলিগ জামাত। এ জামাতের কাজের পরিধি বিশ্বজুড়েই। অহিংসা, শান্তি ও মুসলমানদের আত্মোন্নয়নে তাবলিগ জামাতের ভূমিকা অপরিসীম।

৯০ বছর ধরে আপন গতিতে কাজ করে আসা এ জামাতটিতে এখন অভ্যন্তরীণ ভারি সমস্যা চলছে। এ যেন এক নদীর স্রোত দুই ধারায় বয়ে চলা। যার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব মুসলমানের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ জমায়েত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায়ও। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তাবলিগের মূল মার্কাজ দিল্লির নিজামুদ্দীনের

অন্যতম দায়িত্বশীল মুফতি আসাদুল্লাহ। তিনি নিজমুদ্দীনের কাশিফুল উলুম মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক। কিছুদিন আগেও দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগের দায়িত্বশীল ও খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন।

তাবলিগ জামাতের বিরাজমান অস্থিরতা ও সমসাময়িক বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন আহমাদ জামিল। আজ ছাপা হল শেষ কিস্তি।

প্রশ্ন : দেওবন্দের সঙ্গে মাওলানা সাদের বোঝাপড়া কতটুকু হয়েছে। এর কোনো সমাধান কি হবে না?

উত্তর : বাংলাদেশে গত এক মাসের সফরে আমি বুঝতে পেরেছি, দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে মাওলানার সমস্যা ও এর সমাধান কতটুকু হয়েছে, বিষয়টি বাংলাদেশে পরিষ্কার নয়। দারুল উলুমের চিঠিগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়লেই বোঝা যাবে সমস্যা আসলে কতটুকু। দেওবন্দ মাওলানার নির্দিষ্ট কয়েকটি মন্তব্যে আপত্তি জানিয়েছিল, মাওলানাও তা মেনে নিয়ে চারবার রুজু করেছেন।

কিন্তু তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দেওবন্দ হস্তক্ষেপ করবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে। এখানে দুটি বিষয়। দেওবন্দের দৃষ্টিতে মাওলানা সাদের কয়েকটি বক্তব্যে আপত্তি। আর তাবলিগ জামাতের শূরা ও আমিরের বিষয়। দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ শূরা ও আমিরের বিষয়ে কোনো পক্ষাবলম্বন বা হস্তক্ষেপ করবে না। এটিই বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের পার্থক্য। বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন আলেম শূরার পক্ষাবলম্বন করার কারণে এখানে সাথীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে।

ভারতে মুসলিম সমাজে আলেমদের প্রভাব বাংলাদেশের আলেমদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। ভারতে কোথাও তো আলেমদের পক্ষ থেকে তাবলিগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। তাবলিগের ইজতেমাগুলোয় মাওলানা সাদ বা নিজামুদ্দীন মার্কাজের মুরব্বিরা অংশ নিতে পারবে না, দারুল উলুম এমন একটি কথা বলেছে, কেউ বলতে পারবে?

প্রশ্ন : মাওলানা সাদ তো প্রস্তাবিত আলমী শূরা নিতে পারেন, এটাতে সমস্যা কী?

উত্তর : আলমী শূরার প্রক্রিয়াটাই তো অগ্রহণযোগ্য ও অবাস্তব। তাবলিগের ইতিহাস নয় শুধু, ইসলামের ইতিহাসেও এর নজির নেই। এভাবে কয়েকটি দেশে থেকে মুরব্বিদের কমিটি গঠন করলে কী লাভ হবে?

প্রত্যেক দেশে জিম্মাদারদের মাধ্যমে মেহনত চলছে। টঙ্গীর ইজতেমা ও হজের সময় সব মুরব্বি একসঙ্গে পরামর্শ করেন। তাবলিগে শুরু থেকেই আলমী মাশওয়ারা চলে আসছে। আলমী শূরা কখনও ছিল না।

এমন অবাস্তব শূরা মেনে নেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। মূলত আলমী শূরার স্লোগান চটকদার হলেও এর উদ্দেশ্য হল নিজামুদ্দীন মার্কাজের কেন্দ্রীয় মর্যাদা খর্ব করা। তাই তো বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মুরব্বিরা এটি মেনে নেননি। তা ছাড়া যদি আলমী শূরার বিষয়টি প্রয়োজনীয় হতো, তাহলে জুবাইরুল হাসান (রহ.) জীবিত থাকতে কেন এমন প্রস্তাব আনা হল না? আসল কথা হল ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় যারা তাবলিগের মার্কাজ রাইভেন্ডে স্থানান্তরিত করতে চেয়েছিল, আলমী শূরার ফর্মুলাটা সে চিন্তাধারার লোকজন থেকেই এসেছে।

প্রশ্ন : ১৯৪৭ সালে মার্কাজ স্থানান্তরিত করার ইতিহাসটা কী?

উত্তর : আপনারা সবাই জানেন, এখানকার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আগে পুরোটা এক দেশ ছিল। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হয়। ধর্মের ভিত্তিতে এভাবে দেশ ভাগ হওয়ার বিষয়টি তৎকালীন আলেমদের বড় একটি দল সমর্থন করেননি। দারুল উলুম দেওবন্দের তৎকালীন শাইখুল হাদিস সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)সহ অধিকাংশ দেওবন্দি আলেম দ্বিজাতিতত্ত্বের ঘোরবিরোধী ছিলেন।

পাকিস্তান রাষ্ট্র হওয়ার পর বেশিরভাগ মুসলমান পাকিস্তান চলে যাওয়ায় অনেকের ইচ্ছা ছিল তাবলিগের মূল মার্কাজ ভারত থেকে পাকিস্তান সরিয়ে নেয়ার। এ উদ্দেশে লাহোরের রাইভেন্ডে বড় জায়গা দেখে মার্কাজও বানানো হয় তাবলিগ জামাতের তৎকালীন হজরতজি মাওলানা ইউসুফ (রহ.) (মাওলানা সাদের দাদা) বিষয়টি নিয়ে বড় পেরেশানিতে ছিলেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতারাও তাকে এ বিষয়ে অনেক অনুরোধ করেছিলেন।

এ বিষয়ে তিনি ভারতবর্ষের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করলে সবাই তাবলিগের মূল মার্কাজ পাকিস্তানে স্থানান্তরিত করার বিপক্ষে মত দেন। ফলে তাবলিগের মূল মার্কাজ নিজামুদ্দীনেই থেকে যায়। ওই বৈঠকে সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.), শাইখুল হাদিস জাকারিয়া (রহ.) ও মাওলানা আবদুল কাদের রায়পুরী (রহ.) সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। তাবলিগের ইতিহাসে ঐতিহাসিক এ রায় ‘তিন আকাবিরের সিদ্ধান্ত’ বলে প্রসিদ্ধ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে তারা মার্কাজ স্থানান্তরিত করতে পারেনি, তবে এর প্রতিক্রিয়া তারা বিভিন্ন সময় দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এখন নিজামুদ্দীনে মাওলানা সাদকে একা পেয়ে তারা তাদের সেই উদ্দেশই পূর্ণ করতে চাইছে।

প্রশ্ন : বর্তমানে ভারতে তাবলিগের সামগ্রিক অবস্থা কেমন?

উত্তর : আলহামদুলিল্লাহ, ভারতে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির অবনতি তেমন হয়নি। বেশিরভাগ সাথী মার্কাজ নিজামুদ্দীনের সঙ্গে জোড়েই মেহনতে লেগে আছেন। তবে আলমী শূরার সমর্থনে মার্কাজের প্রবীণ দু’জন মুরব্বি মার্কাজ থেকে বেরিয়ে গেছেন। তাদের অনেকটা ভুল বুঝিয়ে মার্কাজ থেকে সরানো হয়েছে। নিজামুদ্দীন মার্কাজ এখনও তাদের অপেক্ষায় রয়েছে। মাওলানা সাদ তাদের ফিরিয়ে আনতে নিজে তাদের বাড়ি গিয়ে দেখা করে এসেছেন।

দারুল উলুম দেওবন্দসহ ভারতের আলেমগণ নিজামুদ্দীনের সহযোগিতাই করছেন। ওয়াকফ দারুল উলুমে নতুন ভবন উদ্বোধনের জন্য মাওলানাকে দাওয়াত করে নেয়া হয়েছে। নিজামুদ্দীনের খতমে বোখারিতে দেওবন্দের সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি ইউসুফ তাওলবী নিজে এসেছেন। শূরার পক্ষে কিছু আলেম থাকলেও তারা কোনো চাপ প্রয়োগ করেন না। বিভিন্ন প্রদেশে নিয়মিত জোড়, ইজতেমা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো হক-বাতিলের লড়াই কেউ কল্পনাও করে না।

প্রশ্ন : এক কথায় সমাধান জানতে চাইব, এ সংকট কাটিয়ে উঠার পথ কী?

উত্তর : সমস্যাটা হল কেন? বিগত ৯০ বছর যেভাবে নিজামুদ্দীন মার্কাজের তত্ত্বাবধানে মেহনত চলে আসছিল, সে ধারা থেকে বেরোতে গিয়েই সংকট শুরু হয়েছে। তাই দৃঢ়তার সঙ্গে সবাই মেহনতে জমে থাকলেই নতুন কোনো ফর্মুলা বাস্তবায়িত হবে না।

তাবলিগের সাথীরা মেহনতে আরও বেশি সময় দেবে। অনর্থক কথাবার্তা ও সমালোচনায় লিপ্ত না হয়ে মেহনতকে আপন করে নিলে অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বাকি সমস্যার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া ও কান্নাকাটি বাড়িয়ে দিতে হবে। সবার দিল আল্লাহমুখী হয়ে গেলে সমাধান হবেই ইনশাআল্লাহ। আর ওলামায়ে কেরাম সবসময় তাবলিগের আসল জিম্মাদার। হাক্কানি আলেমরাই সাধারণ সাথীদের বিভক্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। এ কথাটি সবার গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করতে হবে, আমাদের মেহনতসহ সব কাজ যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও উম্মাহর কল্যাণে হয়।

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter