নবী নন্দিনী মা ফাতিমা

  অধ্যাপিকা আখতারা মাহবুবা ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে হজরত খাদিজা ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার ছিল কন্যা ফাতিমা যাহ্রা। হজরত ফাতিমা তার দুই ভাই কাশেম ও আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তাদের নয়নের মণি ও অন্তরের প্রশান্তি। তিনি তাদের ঘরে নিয়ে আসেন দোয়া ও রহমত। শিশুকালে সন্তানেরা সমবয়সীদের সঙ্গে খেলায় মেতে থাকে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো ছোটাছুটি করে। কিন্তু হজরত ফাতিমা সেসব থেকে ছিলেন পুরোটাই আলাদা। ইসলাম প্রচার করতে গেলে মক্কার কাফের মুশরেকদের অত্যাচার চরম আকার ধারণ করলে মুহাম্মদ (সা.) স্বগোত্রীয় লোকদের সঙ্গে নিয়ে শেবে আবু তালিব নামে সংকীর্ণ এক গিরি পর্বতে আশ্রয় নেন। হজরত ফাতিমা শিশু বয়সেই সংকীর্ণ গিরি গুহায় তিন বছরের নিদারুণ দুঃখ কষ্টের একজন ভাগিদার হন। অবরোধের তিন বছরে মা খাদিজার বিশাল সম্পদ শেষ পর্যায়ে চলে এলে তিনি ঘরে ফিরে আসেন। দুঃসহ দুঃখ-কষ্টে হজরত খাদিজার জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন। হজরত ফাতিমার বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। পাঁচ বছর বয়সের মাতৃহারা হজরত ফাতিমা অভাব অনটন অর্থকষ্টে সংসারে পিতার মায়ের ভূমিকা পালন করেন। এ জন্য তাকে বলা হতো ‘উম্মে আবিহা’। রাসূল (সা.) মাতৃহারা কন্যা ফাতিমার মাতা-পিতা দুটিরই দায়িত্ব পালন করেন। তাকে নারী জাতির উত্তম আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলেন নবী (সা.)। পিতার ইসলাম প্রচারে বহু দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে নবীজির রক্তাক্ত মুখমণ্ডল, দন্ত মোবারক শহীদ ও আবর্জনা নাড়ি-ভুঁড়িতে গাত্র মোড়ানো দেখে হজরত ফাতিমা চোখের পানি ফেলে সেবা করে পিতার কষ্ট দূর করেন। তার পিতা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে অর্ধাহার-অনাহার থেকে জীর্ণশীর্ণ, জোড়াতালি দেয়া জামাকাপড় পরেছেন। সবসময় তিনি আল্লাহর মর্জির ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছেন।

পরিণত বয়সে হজরত ফাতিমার জন্য অনেক প্রভাবশালী, সম্পদশালী ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু রাসূল (সা.) আল্লাহর ইঙ্গিতে জ্ঞানের সাগর হজরত আলীর সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। ধৈর্য সংগ্রামের প্রশিক্ষণে শুরু হল হজরত ফাতিমার পারিবারিক জীবন। আলীর অভাবের সংসার হাসিমুখে বরণ করেন তিনি। সন্তানের কষ্টে পিতার চোখে পানি এসে যেত। তিনি বলতেন, ‘হে ফাতিমা! এ দুনিয়া দুঃখ-বেদনা, দৃঢ়তা ও সহনশীলতা দিয়েই শোধ কর’।

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হজরত ফাতিমার জীবন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হজরত আয়েশা ও হজরত ফাতিমার মধ্যে একদিন সামান্য কথাকাটাকাটি হয়েছিল। আল্লাহর রাসূল শুনতে পেয়ে বলেছিলেন- ফাতিমার অভিযোগই সত্য। কেননা সে কখনও মিথ্যা কথা বলে না। হজরত ফাতিমার সত্যবাদিতার প্রশংসাপত্র তিনি করেছলেন স্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে।

নবী নন্দিনী ফাতিমা যাহ্রা আল্লাহর ইবাদতে, আত্মসংযমে, জ্ঞানে-গুণে, তাকওয়ায়, নম্রতায় মানবতাবোধ পিতার ‘প্রতিচ্ছবি’। রাসূল (সা.) তাকে নারী জাতির নেত্রী উপাধিতে ভূষিত করেন। রাসূল (সা.) বলেন, ‘আমার মেয়ে ফাতিমা যখন সে তার নামাজের স্থানে দাঁড়ায়, তখন তার নুর এমনভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যেভাবে পৃথিবীর জন্য তারকাগুচ্ছ জ্বলে থাকে। মহিমান্বিত আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, ‘হে আমার ফেরেশতারা! দেখ আমার দাসী এবং দাসীদের নেত্রী ফাতিমা আমার ভয়ে কীভাবে আমার সামনে কাঁপছে এবং মনোযোগসহ আমার ইবাদত করছে’। ইমাম হাসান ও শহীদে আজম ইমাম হুসাইন এবং শহীদের রক্তে রঞ্জিত কারবালার ধারাভাষ্যকার হজরত জয়নব তার সন্তান ছিলেন।

ওহি নাজিলের ঘরে জন্মগ্রহণ করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এমন কোনো ইবাদত নেই তিনি করেননি। রাসূল (সা.) বলতেন, ‘ফাতিমা আমার কলিজার টুকরা, যে ফাতিমাকে কষ্ট দেয় সে আমাকে কষ্ট দেয়’। রাসূল (সা.) কখনও বলতেন, ‘ফাতিমা আমার অংশ’। রাসূল (সা.)-এর উক্তিগুলো অনেক তাৎপর্যময় ।

বনু সাকিফার ঘটনা, ফাদাকের হৃদয় বিদারক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফাতিমা স্বামীকে বলেছিলেন, মৃত্যুর পর আমাকে চুপিচুপি রাতের বেলায় দাফন করো। রাসূল (সা.) ফাতিমাকে বলেছিলেন, আমার মৃত্যুর পর সর্বপ্রথম তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর ছয় মাস পর ১২ হিজরি, ৩ রমজান সোমবার এ দুনিয়া ছেড়ে বেহেশতের পথে যাত্রা করেন। আজও লাখ লাখ মানুষ দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে এসে ভালোবাসার অশ্র“ ফেলে হজরত ফাতিমার রওজা জিয়ারত করে শান্তি খুঁজে নেন। রাসূল (সা.) কে যেভাবে ভালো বেসেছি হজরত ফাতিমাকেও সেভাবে ভালোবাসতে চেষ্টা করব। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter