আত্মত্যাগের কোরবানিতে নৈকট্য অর্জন

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মঈন চিশতী

লাইয়্যানাল্লাহু লুহুমাহা ওয়ালা দিমা উহা। আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত, ওয়ালাকিন ইয়ানালুত্তাকওয়া মিনকুম। বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা হৃদয়ের স্বচ্ছতা।

আর কোরবানি দেয়া হয় ভোরের সূর্য দিগ্বিদিক আলো ছড়িয়ে দুনিয়া আলোকিত করার প্রথম প্রহরে। জোহা বা দ্বোহা এমন এক সময় যে সময়ের কসম করে আল্লাহ বলেন, ‘ওয়াদ্বোহা, সকালের আলোকিত সময়ের কসম করে বলছি’। এই দ্বোহা থেকেই জোহা বা আজহা আমাদের অঞ্চলে পরিচিতি লাভ করেছে। যেমন কবি নজরুলের একটি গীতি কবিতায় এসেছে ‘ঈদুজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দোসরা ঈদ//কোরবানী দে কোরবানী দে শোন খোদার ফরমান তাকিদ’। ঈদুল আজহাকে আবার বকরি ঈদও বলা হয়ে থাকে।

মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই কোরবানির ইতিহাস শুরু। আদম (আ.) পুত্র কাবিল ওই সময়ের শরিয়তের ফায়সালা অগ্রাহ্য করার কারণে আদম (আ.) তার দুই সন্তান হাবিল এবং কাবিলকে আল্লাহর নতুন ফায়সালা গ্রহণের জন্য কোরবানির আদেশ দেন।

কোরবানি শব্দের অর্থ আত্মত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য হাসিল করা। প্রেমিক যখন প্রেমাস্পদের নৈকট্য হাসিল করে তা স্মরণীয় করে রাখতে উৎসবের আয়োজন করে থাকে। ইসলাম ধর্মে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা তেমনি প্রেমাস্পদের আত্মত্যাগের স্মরণোৎসব। রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে ঈদুল ফিতরে নফসে আম্মারার বিজয় উৎসব শেষে শুরু হয় হজ মৌসুম।

হজের কার্যক্রমের প্রায় সবটুকুই আবুল আম্বিয়া মুসলিম মিল্লাতের জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.) এবং তার পরিবারবর্গের স্মৃতি জাগানিয়া স্মারককে কেন্দ্র করে। কোরবানি বাবা আদমের সময় শুরু হলেও আধুনিক কোরবানির সব পদ্ধতি ইবরাহিম (আ.) এবং তার প্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে ঘিরে। ইবরাহিম (আ.) তার ছেলেকে ছুরি নিয়ে জবাই করতে চাইলেন সে সময়ে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে তিনি তাদের আন্তরিক আত্মত্যাগ গ্রহণ করেছেন।

ইসমাঈলকে নয় তার জায়গায় একটি দুম্বা কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন। এ আত্মত্যাগে আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে ইবরাহিম (আ.) কে তার দ্বিতীয় পুত্র ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দান করেন। আল্লাহর আদেশে নিজকে ও প্রিয়তম বস্তুকে কোরবানি করার ঐকান্তিক আগ্রহ প্রকাশ করে ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর প্রতি যে গভীর আনুগত্য ও অনুরাগ প্রকাশ করেছেন তার স্মরণে মুসলমানরা প্রতি বছর ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা উদযাপন করে।

ঈদের নামাজের পর এ দিনের সবচেয়ে উত্তম ইবাদত হল পশু কোরবানি করা। কবি নজরুলের ভাষায় ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ কেতু লক্ষ্য ঐ তোরণ /আজি আল্লাহর নামে জান কোরবানে ঈদের পূত বোধন ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’ এই শক্তির উদ্বোধনের দিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই মুসলিম বিশ্বে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ পালিত হয়ে আসছে।

ঈদ উৎসব আর দশটি উৎসবের মতো নয়। ঈদ উদযাপনের মূল ভিত্তি পবিত্র কোরআনের সূরা মায়িদাতে ‘ঈদ’ শব্দটি দেখতে পাওয়া যায়। যার অর্থ হল ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আনন্দ-উৎসব। ঈদ অর্থ বারবার ফিরে আসাও বোঝায়। ইবনুল আরাবি বলেছেন, ঈদ নামকরণ করা হয়েছে এ কারণে যে তা প্রতি বছর নতুন সুখ ও আনন্দ নিয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসে। আরবিতে ঈদুল আজহা অর্থ হচ্ছে আত্মত্যাগের উৎসব।

বাংলা, উর্দু, হিন্দি, গুজরাটি এবং মালয়ি ও ইন্দোনেশিয়ার মতো অস্ট্রোনেশীয় ভাষায় আত্মত্যাগের আরেকটি আরবি শব্দ কোরবান ব্যবহার করা হয়। এসব দেশে ঈদুল আজহাকে কোরবানির ঈদ বলে। আফগানিস্তান ও ইরানে বলা হয় ঈদে কোরবান।

চীনা ভাষায় ঈদুল আজহাকে বলা হয় ‘কোরবান জিয়ে’ আর উইঘররা বলেন, কোরবান হেইত। মালয়েশীয় ও ইন্দোনেশীয়রা বলেন, ‘হারি রাইয়া কোরবান’। আজারি, তাতারি, বসনীয়ান, ক্রোয়েশিইয়ান এবং তুর্কিরা বলে ‘কোরবান বাইরামি’। ইয়েমেন, সিরিয়া, মিসরসহ এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে বলা হয় ‘ঈদুল কবীর’। আমাদের দেশে বড় ঈদ বা বকরি ঈদও বলা হয়।

হজরত ইবরাহিম এবং ইসমাঈল (আ.) যখন আল্লাহর আদেশে বিনা তর্কে কোরবানির প্রস্তুতি নিলেন তখন আল্লাহ ডেকে বলেন, ‘ইয়া ইবরাহিম ক্বাদ সাদাক্বতার রুইয়া, হে ইবরাহিম তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। ইন্না কাজালিকা নাযযিল মুহসিনিন। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি’। নবী (সা.) বলেন, ‘মান কানা লাহু সা’আতান যার কোরবানি করার সাধ্য আছে ওয়া লাম ইয়ু দ্বাহ্হা, কিন্তু সে কোরবানি করল না, ফালা ইয়াক্বরিবান্না মুসাল্লানা, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে’।

শুধু পশু জবাইয়ের নাম কোরবানি নয়, কোরবানি হল তাকওয়ার নাম। আমাদের এ বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। নতুবা কোরবানি হবে না গোশত খাওয়াই সার হবে। সবার আগে আমাদের মনের পশুকে জবাই করতে হবে।

আসল কোরবানিই সেটি, গৃহপালিত পশু জবাই হল প্রতীকী বিষয়। সারা বছরই কোরবানির শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে গরিব-দুখীর সেবায় নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পারলেই কোরবানির প্রকৃত প্রতিদান পাব, তখন আমাদের হৃদয় হবে খোদায়ী নুরে আলোকিত।

হৃদয় যখন আলোকিত হয়ে ওঠে তখনই মুমিন বান্দা বলে ওঠে ইন্না সালাতি নিশ্চয়ই আমার নামাজ ওয়া নুসুকি আমার কোরবানি ওয়া মাহ্ইয়ায়া আমার জীবন ওয়া মামাতি, আমার মরণ লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, তা শুধু তামাম জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। ইসলামের প্রতিটি ইবাদত-বন্দেগি অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান যখন তাকওয়া বা খোদায়ী রঙে রঙিন হবে তখন দুনিয়ায় আসমানি মদদ নেমে আসবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

Email: [email protected]