হাফেজ সাহেব আলীর জীবনে বঙ্গবন্ধু

  তানজিল আমির ১৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাফেজ সাহেব আলীর জীবনে বঙ্গবন্ধু

১৯৬৯ সালের অক্টোবরের কথা। টুঙ্গিপাড়ার ঈমানউদ্দিন তার জন্মান্ধ ছেলে সাহেব আলীকে নিয়ে এলেন ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারে শেখ সাহেবের কাছে। সাহেব আলী তখন ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের ছাত্র। গ্রাম্য সরলতায় ঈমানউদ্দিন শেখ সাহেবকে বললেন, আমার ছেলে লালবাগ মাদ্রাসায় হিফজ পড়ে।

ঢাকায় তো তার দেখাশোনার কেউ নেই, আপনি একটু খোঁজখবর রাখবেন। শেখ সাহেব তার বিখ্যাত ভঙ্গিতে বললেন, ‘এই, তুই এখানে নিয়মিত এসে দেখা করে যাবি’। এরপর থেকে প্রতি শুক্রবার ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারে বালক সাহেব আলীর আসা-যাওয়া শুরু হল। এক বছর পর যখন হিফজ শেষ হল, তখন থেকে তার অবস্থান হল বঙ্গবন্ধুর বাসায়। ছিলেন ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত। এভাবে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ও আন্তরিকতার স্মৃতিচারণ করলেন অন্ধ হাফেজ সাহেব আলী।

জীবনের এ পড়ন্ত বেলায় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সঙ্গে কৈশোরের স্বৃতিগুলো এখনও হৃদয় পটে ভাসছে অন্ধ এ হাফেজের। জীবনের শুরুর দিকে বাঙালির মহান নেতার যে ভালোবাসা মমতা পেয়েছিলেন, তা নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন মনে করেন তিনি। বহুগুণে গুণী ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

একজন মুসলিম হিসেবেও তিনি ছিলেন পূর্ণ মুমিন ও খোদাভীরু বান্দা। ১৯৬৯ ও ’৭০ সালের প্রতি শুক্রবার হাফেজ সাহেব আলী বঙ্গবন্ধুর বাসায় এসে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। বঙ্গবন্ধু খুশি হয়ে তাকে হাদিয়া দিতেন। পুরো সপ্তাহের খরচ চলে যেত বঙ্গবন্ধুর বখশিশের টাকায়।

হিফজ শেষ হলে রেডিও পাকিস্তানে কোরআন তিলাওয়াতের সুযোগও করে দেন তিনি। রেডিও পাকিস্তানের তৎকালীন মহাপরিচালককে বঙ্গবন্ধু নিজে ফোন করে বলেছিলেন হাফেজ সাহেব আলীর কথা। এভাবে জাতির জনকের পরিবারের সদস্য হয়ে যান হাফেজ সাহেব আলী।

১৯৭১-এর ১৭ মার্চ নিজের জন্মদিনে বঙ্গবন্ধু তাকে কাছে টেনে বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় বলা যায় না, তুই বাড়ি চলে যা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার চলে আসিস।’ ২৬ মার্চ থেকে শুরু হল গণহত্যা। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হল পশ্চিম পাকিস্তানে। জন্মান্ধ হাফেজ সাহেব আলী গ্রামে বসে খবর পেলেন বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের। অনুভব করলেন পিত্রবিয়োগের ব্যথা।

টুঙ্গিপাড়ার হাফেজ সাহেব আলীর মতো পুরো বাঙালি জাতি তখন ব্যথিত। এভাবেই শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির হৃদয়ে আসন করে নিয়েছিলেন। নেতা থেকে পরিণত হয়েছেন পিতায়।

১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু। জানুয়ারির শেষের দিকে হাফেজ সাহেব আলীও এসে উপস্থিত হলেন ধানমণ্ডির ৩২ নাম্বারে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কিরে তুই বেঁচে আছিস?’ পর দিন থেকে থাকা শুরু হল প্রেসিডেন্ট হাউসে। বাসার নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে থাকলেও খাবার খেতেন বঙ্গবন্ধুর বাসায়।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত একটানা ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারের প্রেসিডেন্ট হাউসে ছিলেন হাফেজ সাহেব আলী। বাংলাদেশ বেতারে কোরআন তিলাওয়াত করতেন সপ্তাহে একদিন। সম্মানী পেতেন ১৪০ টাকা। বাসার নিরাপত্তারক্ষী ও সদস্যদের নিয়ে নামাজের জামাত করতেন। রমজানে পড়াতেন খতমে তারাবি। এভাবে খুব কাছ থেকে বাঙালির মহান নেতাকে দেখা ও তার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছিলেন তিনি। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘খাওয়া-দাওয়া ও নামাজ পড়ানো ছাড়া তেমন কোনো কাজ ছিল না।

তাই খুব কাছ থেকেই বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গ পেয়েছি। একটি আদর্শ পরিবার বলতে যা বোঝায় তেমনটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর পরিবার। খালাম্মাসহ সবাই আমাকে আদর করতেন। শেখ কামাল ও শেখ জামাল ভাই আমাকে তুমি করে বলতেন, বঙ্গবন্ধু একদিন শুনতে পেয়ে তাদের শাসন করে বললেন, ও কিন্তু হাফেজ, ওকে আপনি করে ডাকবি। এরপর থেকে কামাল ভাই জামাল ভাই আমাকে আপনি করে সম্বোধন করতেন, অথচ বয়সে আমি তাদের অনেক ছোট ছিলাম। শুধু কোরআনের হাফেজ হওয়ার কারণেই তিনি আমাকে এমন স্নেহ করতেন’।

কোরআনের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অনুরাগের কথা আমরা জানতে পারি তার লিখিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও। জেল জীবনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু লেখেন ‘আমি তখন নামাজ পড়তাম এবং কোরআন তিলাওয়াত করতাম রোজ। কোরআন শরিফের বাংলা তরজমাও কয়েক খণ্ড ছিল আমার কাছে। ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজি তরজমাও পড়েছি’। (পৃষ্ঠা ১৮০)।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মানবিক গুণাবলী ও মমত্ববোধ এখনও হাফেজ সাহেব আলীকে অনুপ্রাণিত করে। ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারের খানার আয়োজন ছিল সবার জন্যই সমান। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যরা যে খাবার খেতেন, সে খাবারই ছিল স্টাফ ও নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য।

এক পাতিলেই রান্না হতো সবার জন্য। সরকারি কাজকর্ম সেরে বাসায় এসে যখন বঙ্গবন্ধু খাবার টেবিলে বসতেন, মাঝে মাঝেই ডেকে পাঠাতেন সাহেব আলীকে। ‘এই হাফেজ, এ দিকে আয়, খাওয়া-দাওয়া করছস’? বঙ্গবন্ধুর মুখের ‘তুই’ শব্দটি ছিল খুব মধুর ডাক। প্রায় সবাইকেই তিনি ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতেন। এভাবে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত জাতির জনকের একান্ত স্নেহে কাটিয়েছেন হাফেজ সাহেব আলী। কোনোরকম আত্মীয় সম্পর্ক ছাড়া একটি অন্ধ ছেলেকে প্রেসিডেন্ট হাউসে যিনি আশ্রয় দিয়েছেন, তার হৃদয়ের বিশালতা ও কোরআনের প্রতি অগাধ ভালোবাসা অনুমান করা কীভাবে সম্ভব? ১৫ আগস্টের কালরাতে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান হাফেজ সাহেব আলী। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সবদিক দিয়েই শুরু হয় বিপর্যয় । রেডিওতে কোরআন তিলাওয়াতের সুযোগটাও বন্ধ হয়ে যায়।

জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে আসার পর আবার ছুটে যান হাফেজ সাহেব আলী। বঙ্গবন্ধুকন্যা ভোলেননি তার পিতার স্নেহধন্য এ হাফেজকে। ১৯৮৬ সালে সরকারি রেশনের ডিলারশিপ পান সাহেব আলী।

রাজউকের মাধ্যমে উত্তরায় প্লটও পান তিনি। ডেভেলপারের মাধ্যমে সে জায়গাতেই এখন বিল্ডিং গড়েছেন তিনি। বাসা ভাড়ার আয়েই সংসার চলে। সন্তানদের নিয়ে ভালোই আছেন তিনি। সামাজিক অবক্ষয়ের মহোৎসবের যুগে তার প্রত্যাশা তরুণ প্রজন্ম জানুক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চিন্তার কথা। বঙ্গবন্ধুকে শুধু স্মরণ নয়, যেন ধারণ করা হয় হৃদয়ে। কারণ বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলার জন্মই হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে।

লেখক : তরুণ আলেম ও গণমাধ্যমকর্মী

ই-মেইল : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter